দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আজকের (রোববার, ২৫ আগস্ট ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
ভূস্বর্গখ্যাত কাশ্মীর
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
প্রথম পর্ব
ভারতীয় সংবিধানে ১৯৪৯ সালে অন্তর্ভুক্ত ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং ১৯৫৪ সনে সন্নিবেশিত ৩৫(এ) ধারা সম্প্রতি বাদ দেওয়ার কারণে জম্মু ও কাশ্মীরকে প্রদত্ত বিশেষ মর্যাদা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই দুটি অনুচ্ছেদের কারণে জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর চেয়ে বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত। ৩৭০ অনুচ্ছেদে বর্ণিত শর্ত অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর নিজেদের সংবিধান নিজেরা প্রণয়নের ক্ষমতা এবং রাজ্যের জন্য একটি আলাদা পতাকা রাখার অধিকার পেয়েছিল। এছাড়া পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা এবং যোগাযোগব্যবস্থা ব্যতীত অন্যান্য ক্ষেত্রে নীতি-নির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে রাজ্যের স্বাধীনতা ছিল; অর্থাৎ এ তিনটি বিষয় ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে কাশ্মীরের বিধানসভা সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিল। সম্প্রতি শুধু উল্লেখিত দুটি অনুচ্ছেদই সংবিধান থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা প্রয়োগের সুবিধার্থে জম্মু ও কাশ্মীর ভেঙে লাদাখ এবং জম্মু ও কাশ্মীর নামে দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ভারত সংবিধান থেকে উল্লেখিত দুইটি ধারার অবসান করল। পাকিস্তান মনে করছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেয়াতেই ভারত তড়িঘড়ি করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিয়েছে। কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ভারত এখন আর মানতে চায় না। অথচ ১৯৪৮ সালে ভারতই প্রথম কাশ্মীর ইস্যুটি জাতিসংঘে উপস্থাপন করেছিল। ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে জাতিসংঘের গণভোটের প্রস্তাব উভয় দেশ তখন মেনে নিলেও পরবর্তীতে তাতে ভারত স্থির থাকেনি। ভারতীয় নেতাদের বোধোদয় হয় যে, কাশ্মীরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান কখনও জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতে অন্তর্ভুক্তির পক্ষে ভোট দেবে না। তাই জাতিসংঘের ফর্মুলায় গণভোট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছিল ভারত; ১৯৫২ সালে জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচিত গণপরিষদ কাশ্মীরের ভারতভুক্তির পক্ষে ভোট দিলে ভারত গণভোটের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে। অন্যদিকে ১৯৭৩ সালে সিমলা চুক্তির মাধ্যমেও পাকিস্তান এবং ভারত এই মর্মে সম্মত হয় যে, কাশ্মীর ইস্যুটি তারা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে, কাশ্মীর নিয়ে তারা কেউ আর জাতিসংঘ বা অন্য কোন ব্যক্তি, সংস্থার দ্বারস্থ হবে না। পারস্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে সমাধানের এমন চুক্তি থাকায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও এখন কাশ্মীর নিয়ে মাথা ঘামাবে বলে মনে হয় না।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলছেন, সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ ধারায় জম্মু-কাশ্মীরকে প্রদত্ত স্বায়ত্তশাসন ভারতবিরোধী সহিংসতা সৃষ্টিতে এতদিন সহায়তা করেছে এবং কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা এই ধারাটির অপব্যবহার করে পাকিস্তানি বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীকে সহায়তা দিচ্ছে। তাই বিজেপিসহ ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দলগুলো এ ধারাটির বিলুপ্তি চায়। তাদের এই অভিযোগের কিছুটা সত্যতা রয়েছে; অসংখ্যবার কেন্দ্রের শাসন বলবৎ করেও ভারত জম্মু ও কাশ্মীরের সহিংস রাজনীতি বন্ধ করতে সক্ষম হয়নি। তবে বর্তমান মোদি সরকারের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনাও থাকতে পারে। সংবিধানের ৩৫(এ) ধারা বাতিল করে দিয়ে ভারতের মোদি সরকার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরে হিন্দু জনসংখ্যা বাড়ানোর ফন্দি আঁটতে পারে। ৩৫(এ) ধারা বলবৎ থাকলে অন্য কোনো রাজ্যের বাসিন্দা কাশ্মীরের কোনো সম্পদের মালিক হতে পারতেন না; এমনকি রাজ্যের কোনো সরকারি দপ্তরেও অন্য কোনো রাজ্যের অধিবাসীরা চাকরি করতে পারতেন না। অধিকন্তু এই ধারা অনুসারে কাশ্মীরের কোনো নারী ঐ রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনিও সেখানকার সম্পত্তির অধিকার হারাতেন। এ ধারাটি বাতিল করার কারণে এখন ভারতের যে কেউ কাশ্মীরে জমি কিনে, বিয়ে করে বসতি স্থাপন করতে পারবেন। ইসরাইলিরাও এভাবে সারা পৃথিবী থেকে ইহুদিদের ডেকে নিয়ে ফিলিস্তিনের ভূমিতে বসতি স্থাপন করে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামেও শুধু বসতি স্থাপন করে অধিকাংশ এলাকায় আজ বাঙালিরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। পঞ্চাশ বা একশ’ বছর পর এভাবে জম্মু ও কাশ্মীরে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলে ভারতের গণভোট মানতেও আর সমস্যা হবে না। তবে কাশ্মীরের উন্নয়নের এমন একটি ব্যবস্থা সুখকর নয়। শিল্পায়ন ও উন্নতির জন্য জমি কেনা ও স্থায়ী বসতি স্থাপনের অধিকার ভারতের অন্য রাজ্যের শিল্পপতিদের দেওয়া কাশ্মীরের স্বার্থেই সমীচীন হবে।
কাশ্মীর সম্পর্কে মতামত দেওয়ার পূর্বে কাশ্মীরের ইতিহাস নিয়ে পাঠকদের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করা দরকার। ইংরেজদের শাসনামলে কাশ্মীর ছিল দেশীয় বা করদ রাজ্য। করদ রাজ্যগুলো ভারতীয় ব্রিটিশরা সরাসরি শাসন করত না; এসব রাজ্য ইংল্যান্ডের রানীর আনুগত্য মেনে নিলেও তারা নিজেদের রাজ্য নিজেরাই ইংরেজদের হস্তক্ষেপ ব্যতিরেকে পরিচালনা করতে পারতো। ১৯৪৭ সনে ভারত ভাগের সময় এমন পাঁচ শতাধিক দেশীয় রাজ্য ছিল। স্বাধীনতা দেওয়ার প্রাক্কালে ভারতের ব্রিটিশ সরকার এই মর্মে ঘোষণা করলো যে, দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতে বা পাকিস্তানে যেখানে তাদের ইচ্ছা সেখানে যোগ দিতে পারবে অথবা নিজেরা স্বাধীন থাকতে পারবে। কিন্তু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অধিকাংশ রাজ্যের পক্ষে স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করা সম্ভব ছিল না। কারণ এগুলোর মধ্যে প্রায় দুইশ’ রাজ্যের মোট এলাকা ছিল মাত্র ৯ বর্গমাইল। পাঁচ শতাধিক দেশীয় রাজ্যের যে ২১টির সরকার ছিল তাদের মধ্যেও শুধু হায়দ্রাবাদ, মহীশূর, বরোদা, জম্মু ও কাশ্মীর ছিল বড় আকারের। দেশীয় রাজ্যগুলো দেশভাগের সময় এবং পরবর্তীতে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায় বা একীভূত হতে বাধ্য হয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগেই ভূপাল, ত্রিবাঙ্কুর এবং যোধপুর এই তিনটি দেশীয় রাজ্য ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। জম্মু ও কাশ্মীর, জুনাগড় ও হায়দ্রাবাদ ঘোষণা করে যে, তারা ভারত বা পাকিস্তান কোন অধিরাজ্যেই যোগ দেবে না। হিন্দু অধ্যুষিত যোধপুরের শাসক হনবন্ত সিংহ পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার পক্ষে থাকলেও ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্টবেটনের বিরোধিতার কারণে পরবর্তীতে তিনি ভারতে যোগ দিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে ৮০% হিন্দু অধ্যুষিত জুনাগড়ের নবাব তৃতীয় মুহাম্মদ মহবত খানজিও পাকিস্তানে যোগদানের ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। এ অবস্থায় জুনাগড় সীমান্তে ভারত সৈন্য পাঠালে নবাব পালিয়ে পাকিস্তানে চলে যান; তখন নবাবের দেওয়ান স্যার শাহনওয়াজ ভুট্টোর (পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর বাবা) আহ্বানে ভারত জুনাগড় দখল করে নেয়। ১৯৪৮ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে জুনাগড়বাসীরা ভারতভুক্তির পক্ষে মত দেন। হায়দ্রাবাদ ছিল মুসলিম নবাব নিজাম উসমান আলী খানের অধীন হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য। নিজাম স্বাধীনতা ঘোষণা করলে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ভারত তা দখল করে নেয়। তবে হায়দ্রাবাদ, যোধপুর ও জুনাগড় শুধু হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্য নয়, এই তিনটি রাজ্যে ছিল ভারতবেষ্টিত, ভারতের ভেতরে এগুলোর অবস্থান। হায়দ্রাবাদ ভারতবর্ষের ঠিক মধ্যভাগে অবস্থিত। পাকিস্তানের সঙ্গেও কয়েকটি করদ রাজ্য যোগ দেয়। ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত বাহাওয়ালপুর স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য হিসেবে টিকে থাকলেও এরপর তা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হয়। বেলুচিস্তানের কালাত করদ রাজ্য ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা করেও টিকে থাকতে পারেনি, ১৯৪৮ সালে এই দেশীয় রাজ্যটিকে পাকিস্তানে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পরপরই কাশ্মীরের এক-তৃতীয়াংশ বা ১৩২৯৭ বর্গকিলোমিটার পাকিস্তান দখল করে নেয়, বাকি দুই-তৃতীয়াংশ বা ২২২২৩৬ বর্গকিলোমিটার ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৪৮ এবং ১৯৬২ সালে চীন কাশ্মীরের কিছু অংশ দখল করে নেয় এবং কিছু অংশ পাকিস্তান চীনের কাছে সমর্পণ করে। বর্তমানে ভারতের দখলে আছে কাশ্মীরের ৪৩ শতাংশ, পাকিস্তানের দখলে ৩৭ শতাংশ এবং চীনের দখলে ২০ শতাংশ। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরে রয়েছে প্রায় দেড় কোটি লোকের বাস এবং পাকিস্তান অধিভুক্ত আজাদ কাশ্মীরে রয়েছে প্রায় পঞ্চাশ লাখ লোকের বাস। ভারত অধিকৃত কাশ্মীরের লাদাখে বৌদ্ধরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাশ্মীরে মুসলিম এবং জম্মুতে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ; তবে পুরো জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে ৬৮.৩% মুসলিম, ২৮.৪% হিন্দু। ত্রয়োদশ থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীতে কাশ্মীরে ইসলাম ধর্মের বিস্তার ঘটার পূর্বে হিন্দুধর্ম, বৌদ্ধধর্ম এবং শৈব মতবাদের প্রচলন ছিল। ১৩৩৯ সাল থেকে অনবচ্ছিন্নভাবে মুসলমানদের শাসনের পর ১৮১৯ সালে রঞ্জিত সিংয়ের নেতৃত্বে পাঞ্জাবের শিখেরা কাশ্মীর দখল করে। ১৮৪৬ সালে সংঘটিত যুদ্ধে শিখেরা ইংরেজদের কাছে হেরে গেলে জম্মুর রাজা গুলাব সিংহ অঞ্চলটি ব্রিটিশদের কাছে থেকে ৭৫ লাখ রুপির বিনিময়ে ক্রয় করেন এবং তিনি ও তার বংশধরগণ ব্রিটিশ রাজমুকুটের অনুগত শাসক হিসেবে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কাশ্মীর শাসন করেন। এদের বংশধর হরি সিং ১৯২৫ সালে কাশ্মীরের রাজা হন এবং ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত কাশ্মীরের শাসক ছিলেন।
১৯৪৭ সালের আগস্টে ভারত বিভক্তির দুই মাস পর অক্টোবরে পাকিস্তান সরকারের মদদে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পশতুন উপজাতিরা কাশ্মীর আক্রমণ করে রাজধানী শ্রীনগর থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত বারামুলা শহরে পৌঁছে যায়। পাকিস্তানি উপজাতির আক্রমণ প্রতিহত করার শক্তি রাজা হরি সিংয়ের না থাকায় তিনি শ্রীনগর থেকে দ্রুত হিন্দু অধ্যুষিত জম্মুতে পালিয়ে যান। বারামুলায় পাকিস্তানি উপজাতিরা দুই দিন ধরে লুটতরাজ, হত্যা ও নারী ধর্ষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইত্যবসরে কংগ্রেসের ঘোরবিরোধী জম্মু ও কাশ্মীরের রাজা হরি সিং বাধ্য হয়ে ভারতের সামরিক সহায়তা প্রার্থনা করেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সামরিক সহায়তা প্রদানে সম্মত ছিলেন, কিন্তু লর্ড মাউন্টব্যাটন সামরিক সহায়তা দেওয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে হরি সিং-কে ভারতে যোগ দিতে বলেন। কূটকৌশল ও বিচক্ষণতায় কংগ্রেসের নেতারা মুসলিম লীগের নেতাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলেন। ভারত স্বাধীন হওয়া সত্ত্বেও ভারতীয় নেতারা লর্ড মাউন্টবেটনকে ভারতের গভর্নর জেনারেল করে রেখে দিলেন, অন্যদিকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হলেন মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ৫৬৫টি দেশীয় রাজ্যের মধ্যে ৫৩৮টি ভারতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পেছনে বড় কৃতিত্ব ছিল লর্ড মাউন্টব্যাটন ও বল্লভভাই প্যাটেলের। তবে ভৌগোলিক কারণেও দেশীয় রাজ্যগুলো ভারতে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিল; অধিকাংশ দেশীয় রাজ্য ছিল ভারতের অভ্যন্তরে। সর্বশেষ সিকিম ১৯৭৫ সনে ভারতে যোগদান করে। পাকিস্তান পশতুন উপজাতিকে দিয়ে কাশ্মীর আক্রমণ করলে লর্ড মাউন্টবেটন বহুবার পাকিস্তান-ভারতে দৌড়াদৌড়ি করে যুদ্ধ থামানোর জন্য দূতিয়ালি করেছিলেন। লর্ড মাউন্টবেটনের শর্তানুযায়ী হরি সিং ভারতে যোগ দিলে ভারত ত্বরিতগতিতে কাশ্মীরে সৈন্য প্রেরণ করে পাকিস্তানি উপজাতিদের ঠেকিয়ে দেয়। তবে ওই দু’দিন যদি পশতুন উপজাতি পাঠানেরা বারামুলায় লুটতরাজ ও ধর্ষণ করে ব্যয় না করত তাহলে সম্পূর্ণ কাশ্মীর হয়তো আজ পাকিস্তানের দখলে থাকত, কাশ্মীর নিয়ে এত বাদবিবাদ, যুদ্ধবিগ্রহ হয়তো হতো না। ভারতীয় সেনা পাকিস্তানি সেনা সমর্থিত উপজাতির অগ্রগতি প্রতিহত করতে পারলেও অত্যধিক ঠান্ডা ও সমগ্র এলাকা বরফাচ্ছাদিত থাকায় পাকিস্তানিদের পুরো কাশ্মীর থেকে হটাতে পারেনি। দুই পক্ষের এ দখলই কোরিয়ার মতো কাশ্মীরকে বিভক্ত করে রেখেছে। দখলদার দেশ দুইটি এরপরও পুরো কাশ্মীরের মালিকানা দাবি করে আসছে, কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে তিনটি যুদ্ধ করেছে।
মুসলমান অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলেও বহু বছর যাবৎ কোন সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। কিন্তু পরবর্তীতে এক সময় জম্মু ও কাশ্মীরের রাজনীতিবিদদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং পাকিস্তানের ইন্ধনে স্বাধীন কাশ্মীর প্রতিষ্ঠায় ১৯৯৮ সাল থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হয়। সশস্ত্র বিদ্রোহ ও রাস্তার বিক্ষোভ ঠেকাতে ভারতের নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর আচরণ তরুণদের সশস্ত্র সংগ্রামে অংশগ্রহণে বেশি করে উদ্বুদ্ধ করেছে। যত দিন যাচ্ছে ততই ধর্মীয় মৌলবাদের বিস্তৃতি ঘটছে, কাশ্মীরের এক সময়ের অবিসংবাদিত নেতা শেখ আবদুল্লাহর ধর্মনিরপেক্ষ নীতি পরিত্যাজ্য হচ্ছে। পাথর নিক্ষেপকারীরা এখন আত্মঘাতী জিহাদি রূপে আবির্ভূত হচ্ছে, গত এক দশকে কাশ্মীরে ওয়াহাবী মতাদর্শের প্রায় তিন হাজার মসজিদ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com