দৈনিক সংবাদের প্রকাশিত আজকের (রোববার, ১৮ আগস্ট ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

আতঙ্কে আছি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের শুরুতে মেয়র ও মন্ত্রী মহোদয়গণ বলতে লাগলেন, ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’। যে বাঙালিরা বায়ান্ন ও একাত্তরে সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রের সামনে দাঁড়িয়েও আতঙ্কিত হয়নি সেই বাঙালিরা আজ একটি ছোট্ট মশার ভয়ে আতঙ্কিত। কারণ আতঙ্ক হওয়ার বিষয়টি মনস্তাত্ত্বিক—ডেঙ্গুতে আক্রান্ত মানুষের মৃত্যু, সেবা প্রদানে হাসপাতালগুলোর করুণদশা, এডিস মশার পরিবর্তে ভুলবশত কিউলেক্স মশা মারার ওষুধের প্রয়োগ, মেয়রদের মশারি ও অ্যারোসল বিতরণ ইত্যাদি সংবাদচিত্র সবার মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। একটু জ্বর হলে বা একটু মাথাব্যথা করলে, বমির ভাব হলে, পেট মোচড় দিয়ে উঠলেই মানুষ ছুটছে হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের জন্য। আমি আমার এক ঘনিষ্ঠ ক্যানসার রোগী নিয়ে একটি হাসপাতালে নিয়মিত যাচ্ছি, সরকারের নির্দেশে ডেঙ্গু রোগ নির্ণয় এখন ক্যানসার রোগীর রক্ত পরীক্ষার চেয়েও বেশি অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ক্যানসার রোগে আক্রান্ত আমার আত্মীয়ের কমে যাওয়া প্লেটলেট দামি ওষুধেও বৃদ্ধি না পাওয়ায় ডাক্তার আতঙ্কিত হয়ে ডেঙ্গু রোগের পরীক্ষা করালেন। পরীক্ষায় দেখা গেল, ডেঙ্গু এখন না থাকলেও আগে কোন এক সময় ডেঙ্গু হয়েছিল। এই ডেঙ্গু কখন হয়েছিল তা রোগীও জানে না। ডেঙ্গুর দুটি পরীক্ষায় এক হাজার টাকা ফি পরিশোধের সময় স্কয়ার হাসপাতালের ক্যাশিয়ার জানালেন, সরকারের নির্দেশের পূর্বে এই একই পরীক্ষার জন্য তারা পাঁচ হাজার টাকা নিতেন। কিন্তু যাদের রক্ত পরীক্ষা করা হচ্ছে তাদের অধিকাংশ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত নন। রক্ত পরীক্ষায় ‘নেগেটিভ’ উল্লেখ করা সত্ত্বেও আমার প্রাক্তন সহকর্মী রুহুল আমিন ভাই তার মেয়েকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। হাসপাতালে বসে থেকে তার সঙ্গে অনেকক্ষণ আলাপ করলাম; তার অভিমত হচ্ছে, রক্ত পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা না পড়লেও ডেঙ্গুর সব লক্ষণ তার মেয়ে অনুভব করছে। দেশজুড়ে বিরাজমান আতঙ্ক ও অস্বস্তিকর অবস্থার কারণে আমার সহকর্মীর মেয়ে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত না হয়েও ডেঙ্গুর মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণে হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে। গতবারের তুলনায় ডেঙ্গুর রূপ বদলে যাওয়ার কারণে ডাক্তার এবং রোগী উভয়েই ডেঙ্গুর বর্ণচোরা ভাবটা নিয়ে টেনশনে আছেন।

আমি এত বেশি আতঙ্কিত যে, দিনে পায়ে বা হাতে একটু চুলকালেই মনে হয় নিশ্চয়ই এডিস মশা কামড়িয়েছে, শুয়ে বা বসে পত্রিকা পড়ার সময় মশার ভনভন শব্দ শুনলেই পত্রিকা পড়া হারাম হয়ে যায়। এখনকার মশাগুলোর কামড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে জায়গাটি ফুলে উঠে, অনেকক্ষণ ধরে চুলকাতে হয়। বুদ্ধিমান, বলবান একটি মানুষের জীবননাশে একটি ছোট্ট মশা কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা এ বছর সবাই হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। এই ভয়কে উপজীব্য করে কতজন যে কত রকমের ব্যবসা করেছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা; এই মশা চিকুনগুনিয়া, পীতজ্বর এবং জিকা ভাইরাসও ছড়ায়। ফেসবুকে প্রচার হচ্ছে, এডিস মশা হাঁটুর ওপর উঠতে পারে না—তাই এডিস মশার আক্রমণ থেকে হাঁটু পর্যন্ত রক্ষা করতে পারলেই নাকি মশা পরাভূত হবে। হাঁটু পর্যন্ত রক্ষার রক্ষাকবচও বাতলিয়ে দেওয়া হয়েছে—এই জায়গাটুকুতে নারিকেল তেল মাখতে হবে। কিন্তু নারিকেল তেলের ঘনত্ব এমন আবরণ সৃষ্টি করতে পারে না যা ভেদ করতে এডিস মশার হুল ব্যর্থ হবে, অথবা নারিকেল তেলের গন্ধ এডিস মশাকে বিতাড়িত করে বলেও কোন বৈজ্ঞানিক তথ্য নেই। হাঁটুর উপরে উঠতে না পারলেও এই মশা ডিম পাড়ার জন্য, রক্ত খাওয়ার জন্য আকাশচুম্বী ভবনগুলোর উঁচু তলা পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। অনেক উঁচু ভবনে না হয় লিফটে উঠে যায়, কিন্তু যেসব ভবনে লিফট নেই সেই ভবনগুলোর দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ তলায় উঠে যায় কী করে? নিজেদের বেসিনে হারপিক ও ব্লিচিং পাউডার ঢেলে দিলে তা নর্দমায় গিয়ে এডিস মশা মেরে ফেলবে মর্মে একটি বিজ্ঞপ্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কয়েক দিন প্রচার হলেও পরে তা ভাঁওতাবাজি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় হারপিক ও ব্লিচিং পাউডার উৎপাদনকারী বা আমদানিকারকেরা বেশি সুবিধা করতে পারেননি। অ্যারোসল, কয়েল শিশুদের স্বাস্থ্যগত হুমকির কারণ হলেও এখন দিনেও বাসা, বাড়িতে কয়েল জ্বালিয়ে রাখা হয়, অ্যারোসল ছিটানো হয়। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মশারির ব্যবহার। তাই মশারি, কয়েল ও অ্যারোসলের বিক্রি বেড়েছে বহুগুণ। এডিস মশার লার্ভা খেয়ে ফেলার জন্য গাপ্পি, তেলাপিয়া মাছ চাষের সুপারিশ করা হয়েছ; কিন্তু এডিস মশা নাকি পুকুর, ডোবা, খাল, বিলে ডিমই পাড়ে না। নর্দমায় এগুলো ছাড়া হলে এগুলো ধরে খাওয়ার জন্য ওত পেতে থাকবে অনেকে, দুইদিনের মধ্যে তা বাজারে বিক্রির জন্য চলে আসবে। কিছু ভদ্রলোক ফেসবুকে আবার এই আতঙ্কিত লোকদের পরকালের ভয় দেখানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি। ডেঙ্গু নাকি আল্লাহ প্রদত্ত গজব; হতেও পারে, কারণ মসজিদের ইমাম আর মাদরাসার শিক্ষকেরা যেভাবে ধর্ষণে উন্মাদনা দেখাচ্ছেন তাতে গজব নামতেও পারে। তবে এই কথিত গজবে স্ত্রী এডিস মশাগুলো যদি শুধু ধর্ষকদের কামড়াতো জনগণ খুশি হতো, এ গজব ইসরাইলের ইহুদির ওপর নামলে আমরা যারপরনাই খুশি হতাম।

এই আতঙ্কের মধ্যে ঠাট্টা মশকরাও কম হচ্ছে না। আমার এক ফেসবুক বন্ধু ডেঙ্গু রোধে একটি অব্যর্থ কর্মকাণ্ড হাতে নিতে পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে বাঙালিরা পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সর্বত্র জল ঘোলা করতে ওস্তাদ; এডিস মশা নাকি শুধু পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, বংশবিস্তার করে। তার মতে সব বাঙালি বাংলাদেশের সব পানি ঘোলা করে দিলে নিশ্চয়ই এডিস মশা ডিম পাড়ার আর জায়গা পাবে না। হাসি, ঠাট্টার মহড়া ইতোমধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও দিয়েছেন এবং তাতে জনগণ আমোদ পেয়েছেন।

দক্ষিণের মেয়র মহোদয় স্যুট, বুট, টাই পরে ফগার মেশিন চালিয়েছেন, দুই মেয়র ফকফকা রাস্তায় ময়লা ঢেলে তা আবার ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করেছেন, তথ্যমন্ত্রী মহোদয় সিনেমার নায়ক, নায়িকাদের নিয়ে রাস্তায় ঝাড়ু দিতে নায়িকাদের হাসিমুখ নিয়ে ছবি তুলেছেন। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের কতগুলো উদ্ভট আচরণ মানুষের হাসির খোরাক জোগায়। কোন শুভ কাজের উদ্বোধনে পৃথিবীর সভ্য কোন দেশের নেতা, নেত্রী এমন হাসির আচরণ করেন না; তিনি যখন গাছ রোপণ করেন বা রোপণের পর পানি দেন অথবা নদী, নালা, পুকুরে মাছ ছাড়েন তখন তা তিনি একাই করেন, আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধস্তনেরা চোখ খোলা রেখে শুধু দেখে যান, সাহায্য করার কোন প্রচেষ্টাই করেন না। অন্যদিকে আমাদের দেশে বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুদিবসে নেতার আগমন বিলম্বিত হওয়ায় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মিসকিনেরা খিচুড়ি খেতে পায় বিকাল ৪টায়। বন্যার্তদের খাদ্য বিতরণেও নেতাদের দিয়ে উদ্বোধন করানো হয়; তাও এক পোলাও খাদ্য তুলে দেন ১০-১২ জন নেতা; সবাই আবার ছবি তোলার সময় ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকেন। অদ্ভুত ব্যঙ্গচিত্র। এগুলো নতুন কিছু নয়—যুগ যুগ ধরে সব সরকারের আমলে দেখে আসছি। আয়োজকেরা এগুলো বিতরণ করলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, নেতারা গোস্বা করেন।

প্রায় দেড়, দুই যুগ পূর্বে এডিস মশা ও ডেঙ্গুর কথা প্রথম শুনি; তখন থেকেই মেয়র, মন্ত্রীগণ অনর্গল বলে যাচ্ছেন, ‘আপনারা আতঙ্কিত হবেন না, এডিস মশা ও ডেঙ্গু রোগ আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে’। প্রথম প্রথম মনে হতো এটি একটি বিশেষজ্ঞ মত, বিশ্বাস করে আশ্বস্ত হওয়া যায়। কিন্তু এইবার মেয়র সাহেব ও মন্ত্রী মহোদয়ের কথার তোড়ে ডেঙ্গু রোগ ও

এডিস মশার বৃদ্ধি হয়েছে দ্রুতগতিতে। দিনদিন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অধিক হারে রোগী মরেছে। ডেঙ্গু রোগের ভয়াবহ রূপ দেখে এখন সবাই আতঙ্কিত। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক স্পষ্টভাবে বলেছেন, এডিস মশা ভিআইপি আর সাধারণ মানুষকে আলাদা করে শনাক্ত করতে পারে না বিধায় সবাইকেই এ রোগ প্রতিরোধ ও প্রতিকারে সচেষ্ট ও সক্রিয় হতে হবে এবং মন্ত্রী ও মেয়রদের কথাবার্তায় সংযত হতে হবে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম। সরকারের একটি পরিপত্রে কী লেখা ছিল তা আমাদের মতো সাধারণ লোকের অনুধাবন করা সহজসাধ্য নয়; এই পরিপত্রের দোহাই দিয়ে সিটি করপোরেশনের টেকনিক্যাল কর্মকর্তারা এডিস মশার ওষুধ আমদানি বিলম্বিত করে দিয়েছেন। প্রতি সংস্থায় এই টেকনিকাল লোকগুলো জঞ্জাল উৎপাদন করতে ওস্তাদ।

ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বন্যার দুর্গতিকেও ম্লান করে দিয়েছে। সবগুলো হাসপাতাল এখন এডিসে আক্রান্ত রোগী নিয়ে ব্যস্ত। দুই-চারজন করে প্রতিদিন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মারা যাচ্ছে। জ্বর আর গায়ে সামান্য ব্যথায় মানুষের মৃত্যু যাদের আতঙ্কিত করে না তারা সংবেদনশীল মনুষ্য পদবাচ্য হতে পারে না। বিশ্বজুড়েই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, হন্ডুরাস,

নিকারাগুয়া এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার

ফিলিপিন্স, মালয়েশীয়া, ব্যাংকক, লাওস, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুরেও এডিস মশার আক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে; ডেঙ্গুর ভয়াবহ অবস্থা মোকাবিলায় ফিলিপিন্স জাতীয় মহামারি ঘোষণা করেছে। ১৯৭০ সনের আগে মাত্র ৯টি দেশ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল, বর্তমানে নাকি ১২৬টি দেশ আক্রান্ত। প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশা নাকি গরম, আর্দ্র ও অপেক্ষাকৃত অন্ধকার পরিবেশ থাকতে পছন্দ করে; তাই এরা বিশ্রাম নেয় সোফা বা বিছানার নিচে। তাই রাস্তায় ওষুধ দিয়ে মেয়র ডেঙ্গু রোগের প্রাদুর্ভাব কমাতে পারবেন বলে মনে হয় না, মেয়রের ওষুধ ভবনের ১০-১৫ তলায় পৌঁছবে না, মেয়রের প্রচেষ্টায় রাস্তার ঘটি, বাটি, অব্যবহৃত পাত্র ধ্বংস করা গেলেও আমাদের বাড়ির ছাদের ওপর তৈরি করা বাগানে জমে থাকা পানি পরিষ্কার করা সম্ভব না। এ জন্য দরকার আপনার, আমার সবার সচেতনতা। জনগণ সচেতন না হলে এই রোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। অন্যদিকে এডিস মশার বংশবিস্তার প্রতিরোধে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস করা জরুরি। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশার উৎপত্তিস্থল নিয়েও কীটতত্ত্ববিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এতদিন জেনে এসেছি, জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা ডিম পাড়ে; অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটতত্ত্ববিদ ডা. ভুপেন্দর নাগপাল বলছেন, এডিস মশা পানিতে নয়, পাত্রের কানায় ডিম দেয় এবং ডিমগুলো এক বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত টিকে থাকে; এ সময়ের মধ্যে পাত্রটি বন্যা বা বৃষ্টির পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠলে পানি নাগাল পেয়ে দ্রুত ডিম ফুটে যায়। এখন মনে হচ্ছে, ছাদে ছাদে ফুলের টবের কানা পরিষ্কার করা জরুরি।

ডেঙ্গু হলে কী খেতে হবে, কী খেলে প্লেটলেট বেড়ে যাবে তা নিয়ে হাজারো পরামর্শ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখেছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অহরহ চিকিৎসকেরা আবির্ভূত হয়ে কী রোগে কী খেতে হবে তার ফিরিস্তি দিয়ে থাকেন। ফেসবুকের সব কথা মানা ঠিক নয়। আম, কাঁঠাল, কলার যত উপকারিতারই থাকুক না কেন, বহুমূত্র ও কিডনি রোগীর জন্য তা ক্ষতিকারক। ডেঙ্গু রোগীর প্রচুর পানি খাওয়ার পরামর্শ কিডনি রোগীর জন্য বিপজ্জনক। এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচার জন্য আপাদমস্তক ঢেকে চলাফেরা করার ব্যাপারে মেয়রের পরামর্শ অতি গরমে হিটস্ট্রোক হতে পারে। পেঁপে গাছের পাতা খেয়ে প্লেটলেট বাড়ানোর চেষ্টা না করে তা ডাক্তারের হাতে ছেড়ে দেয়াই ভালো। কারণ প্রতিজন রোগী আলাদা আলাদাভাবে বিচার্য—একটি রোগে আক্রান্ত কোন রোগী আগে থেকে অন্য কোন এক বা একাধিক রোগে চিকিৎসাধীন থাকলে তাকে ওষুধ দেওয়ার সময় চিকিৎসক রোগীর ইতিহাস বিচার করেন। ডেঙ্গু ভাইরাসের কোন স্বীকৃত টিকা বা ভ্যাকসিন না থাকায় ডেঙ্গু জ্বরের কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসাও নেই। এই রোগে চিকিৎসকরা শুধু প্যারাসিটামল খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন; এক্ষেত্রেও কোন রোগীর লিভার, হার্ট বা কিডনি সংক্রান্ত জটিলতা থাকলে প্যারাসিটামল সেবনেও ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া সমীচীন। অ্যাসপিরিন ও প্যারাসিটামলের কাজ প্রায় একই, ডেঙ্গু রোগীকে প্যারাসিটামল দেওয়া হলেও অ্যাসপিরিন দেওয়া যাবে না; অনেক সময় ওষুধ বিক্রেতা নিজেরা সমজাতীয় ওষুধ গছিয়ে দেন। অ্যাসপিরিন খেলে প্লেটলেট দ্রুত কমতে থাকবে। তাই নির্বিচারে কোন কিছু খাওয়া রোগীর জন্য জীবনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হার্টের রোগীর নিয়মিত সেবনযোগ্য অ্যাসপিরিন খাওয়া ডাক্তার কিছু দিনের জন্য বন্ধ করে দেন।

এডিস মশার নির্মূলে আমাদের সবার দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে, নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ডেঙ্গু রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসকদের পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে। ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত রোগ। এন্টিবায়োটিক ভাইরাসের ওপর কাজ করে না। ভাইরাসজনিত সংক্রমণে বিশ্রামই হচ্ছে প্রধান ওষুধ, মারাত্মক কিডনি রোগী না হলে গ্লাসভর্তি লেবু আর কমলালেবুর সরবত খেতে হবে। আর পরিষ্কার করার শুভযাত্রা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে শুরু হোক; এই হাসপাতালের কার্নিশ ও আশেপাশে যত আবর্জনা পত্রিকার ছবিতে দেখলাম তা আবর্জনার ভাগাড় মনে হলো। প্রাইভেট হাসপাতালগুলোর জরিমানা হয়, এই হাসপাতালের কোন রহস্যে হয় না তা জানতে হলে মনে হয় গোপাল ভাঁড়ের দ্বারস্থ হতে হবে।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com