দৈনিক সংবাদের প্রকাশিত আজকের (রোববার, ২৮ জুলাই ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।
প্রিয়া সাহার হ্যান্ডশেক
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর মুসলিম মৌলবাদীদের অত্যাচার, নির্যাতনের কাহিনী শুনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেন প্রিয়া সাহার দিকে; এই হ্যান্ডশেক প্রিয়া সাহার জীবনে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। পৃথিবীর কত রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করার জন্য কত প্রয়াস চালান, কত লবিস্ট নিয়োগ করে থাকেন তা জনগণের জন্য কোন দৃশ্যমান ঘোষিত বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক কোন সম্মেলনে চলার পথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হাই, হ্যালো হলে তা ক্যামেরাবন্দী করে মিডিয়ায় ফলাও করে প্রচার করা হয়। পৃথিবীর অপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতাবান এমন একজন প্রেসিডেন্টের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে প্রিয়া সাহা বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের কথা অবলীলায় বলে গেছেন। দুর্বল ইংরেজি ভাষার জন্য তাড়াতাড়ি বলতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে যা বলেছেন তা হচ্ছে, ৩৭ মিলিয়ন হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে (disappeared), যে ১৮ মিলিয়ন এখনও আছে তারা দেশ ছাড়তে চায় না, দেশে থাকতে চায়। তার বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, জমি দখল করে নিয়ে গেছে মুসলিম মৌলবাদী গোষ্ঠী এবং তারা পলিটিক্যাল শেল্টার পাচ্ছে।
প্রিয়া সাহার এমন বক্তব্যের আলোচনা, সমালোচনায় সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ছেয়ে গেছে। প্রিয়া সাহার অভিযোগের ভিডিওটি ‘জামায়াতে ইসলামীর মুখপাত্র’ হিসেবে পরিচিত ‘বাঁশের কেল্লা’ নামে একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথম প্রচারিত হয়। এই ভিডিও দেখে ব্যারিস্টার সাইয়েদুল হক সুমন ফেসবুকে লাইভে এসে প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এই প্রচার-প্রচারণায় প্রথমদিকে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল আওয়ামী লীগ ও ভারত বিরোধীদের হাতে, পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রিয়া সাহার মতলববাজ অভিসন্ধি নিয়ে প্রশ্ন তোলায় আওয়ামী লীগ পন্থীরা ফেসবুকে সরব হয়ে উঠেন। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ দায়িত্বশীল প্রতিনিধিরা কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে থাকেন; এমনকি সরকারের মন্ত্রীরা প্রিয়া সাহাকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন। এতে ফেসবুকে আওয়ামী লীগ পন্থীরা প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে বাঁশের কেল্লার চেয়েও দ্বিগুণ আক্রোশ নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়া শুরু করেন।
এমন নালিশ নতুন কিছু নয়; এমন নালিশ দেশে এবং দেশের বাইরে অহরহ হয়ে থাকে; বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে আওয়ামী লীগ, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে বিএনপি বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতের কাছে ধরনা দিয়ে অভিযোগ করে থাকে। পদ্মাসেতুর জন্য প্রতিশ্রুত ১২০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ বাতিলের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে মার্কিন প্রশাসনকে প্ররোচিত করেছে আমাদের দেশের লোক। জামায়াতে ইসলামীর লবির কারণে বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর স্বীকৃতি প্রদান বিলম্বিত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। খালেদা জিয়া জিএসপি সুবিধা বাতিলের অনুরোধ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন টাইমস পত্রিকায় নিবন্ধ লিখেছেন বলে সংসদে বলা হয়েছে। বিদেশিদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে বলার জন্য এখনও কোটি কোটি টাকা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগের সংবাদ তো পত্রিকায় ছাপা হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনে নির্যাতনকারীরা পলিটিক্যাল শেল্টার পাচ্ছে—এমন অভিযোগ উত্থাপনের কারণে সরকারের লোকজন এত ক্ষেপেছেন বলে মনে হয়। সরকারের মন্ত্রী, নেতাদের সঙ্গে দহরম-মহরম সম্পর্ক রেখে, তাদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য মাতাল হয়ে তাদের বিরুদ্ধে এমনতর অভিযোগ উত্থাপন সত্যিই বেমানান। দ্বিতীয়ত বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া, সম্পত্তি দখল করার জন্য মৌলবাদী মুসলমান দায়ী—এমন অভিযোগও সঠিক নয়। কারণ নিকট অতীতে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণগুলো পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, এইসব আক্রমণে দলমত নির্বিশেষে সবাই অংশগ্রহণ করেছে। হিন্দুদের সংখ্যা যে কমছে—এটাও প্রিয়া সাহার নতুন আবিষ্কার নয়; বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত তথ্য এবং গবেষণালব্ধ উপাত্ত কষ্ট করে খুঁজে নিলেই পাওয়া যায়। তিনি ৩ কোটি ৭০ লাখ সংখ্যালঘুর দেশ ত্যাগের কোন সময়সীমা উল্লেখ করেননি। বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডে ১৯১১, ১৯৪১, ১৯৪৭, ১৯৬১, ১৯৭৪, ১৯৮১, ১৯৯১ সনে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার ছিল যথাক্রমে ৩১%, ২৮%, ২২%, ১৮.৫%, ১৩.৫%, ১২.১%, ১০%। এখন এই জনসংখ্যা নেমে এসেছে ৯%-এ। মুসলমানদের জন্মহার হিন্দুদের চেয়ে বেশি হলেও দেশ ত্যাগ ব্যতীত শুধু জন্মহারের হেরফেরের জন্য আনুপাতিক হিন্দুর সংখ্যা হ্রাসের শতকরা হারে এত কম হওয়ার কথা নয়। এভাবে হিন্দুদের সংখ্যা কমতে থাকলে আগামী দু’তিন দশক পরে এদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বী কোনো মানুষ আর খুঁজে পাওয়া যাবে না মর্মে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত উল্লেখ করেছেন। তবে এরা কেন দেশ ত্যাগ করছে সে ব্যাপারে ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ প্রচুর রয়েছে এবং এক্ষেত্রে মতভেদও আছে। পঁয়ষট্টি সনে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধ পরবর্তীকালীন হিন্দু বিতাড়নের মহোৎসব দেখেছি। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে বাবরি মসজিদ ভাঙার পর বিএনপি’র শাসনামলে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর অপচেষ্টা নেয়া হয়েছিল এবং ২০০১ সনে নির্বাচনোত্তর হিন্দু নির্যাতন দলবেঁধে করা হয়েছিল, বিজয়ী বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের নেতাকর্মীরা সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়াবহ অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন করেছিল। এছাড়া এই সরকারের আমলে ফেসবুকের উসকানিতে ২০১২ সনে কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধ-পল্লীতে, ২০১৬ সনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, ২০১৭ সনে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় হিন্দুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাঝে মাঝে মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুরের ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়ায় এখনও প্রচারিত হয়। এসব কারণে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতায় ভোগা স্বাভাবিক। এছাড়া পরিবেশ পরিস্থিতিও তাদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করছে। একটি হিন্দু বাড়ির অর্ধেক অংশে মুসলমান, বাকি অর্ধেকে হিন্দুরা বসবাস করছে। গ্রামে ধর্মীয় অনুষ্ঠান করার জন্য পর্যাপ্ত হিন্দু নেই, বিয়ের জন্য জাত, গোষ্ঠী মিলিয়ে বর বা কনে পাওয়া যায় না। হিন্দুরা দেশ ত্যাগ করতে চায় না; কারণ যারা পাকিস্তান আমলে দেশ ত্যাগ করেছে তাদের অধিকাংশ খুব শান্তিতে নেই। তবুও মানুষের নিকট তার প্রাণটি অমূল্য—যে কোন ত্যাগের বিনিময়ে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদ প্রতিটি জীবের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। তাই জীবনের অনিশ্চয়তা দেখা দিলে, নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা অনুভূত হলে জামাই আদর দিয়েও কাউকে আটকে রাখা যাবে না। সাতচল্লিশ সনে ভারত ভাগ হলে সব হিন্দুর বাসস্থান হিন্দুস্তানে, সব মুসলমানের আবাস পাকিস্তানে করা সম্ভব হয়নি; লাখ লাখ মানুষকে শুধু ধর্মের কারণে নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল। ছেচল্লিশ সনে ‘দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস’-এ ১০ হাজার হিন্দু, মুসলমানের হত্যার পর ধর্মভিত্তিক দেশ ভাগে সব মুসলমানকে পাকিস্তানে এবং সব হিন্দুকে হিন্দুস্তানে অ্যাকোমোডেট করা সম্ভব না হওয়ায় সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। শুধু এ কারণেই মাওলানা আবুল কালাম আজাদ পাকিস্তান সৃষ্টির বিরোধিতা করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মনের গভীরে প্রোথিত থাকার কারণে প্রাণ বাঁচানোর নিশ্চয়তা খুঁজতে সংখ্যালঘুরা ছোটাছুটি করবেই।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা হ্রাসে আওয়ামী লীগ বিরোধীরা খুব খুশি। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশের সংখ্যালঘুরা দলবদ্ধ হয়ে তাদের স্বার্থের অনুকূল কোন একটি রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করে থাকে; বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ অধিকাংশ সংখ্যালঘুর সমর্থন পায় বলে সবার ধারণা, ভারতে মুসলমানদের সমর্থন পায় জাতীয় কংগ্রেস বা তৃণমূল কংগ্রেস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসীদের একচেটিয়া সমর্থন পায় ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, যুক্তরাজ্যে এই সমর্থন পায় লেবার পার্টি। এই সংখ্যালঘুদের আওয়ামী লীগ বলয় থেকে বের করে আনার বহু চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু আওয়ামী লীগের ওপর তাদের আস্থা এখনও অটুট। শুধু এই ভোটব্যাংক ভাঙতে না পারার কারণে হিন্দু আর ভারতের বিরুদ্ধে আওয়ামী বিরোধীরা সোচ্চার। প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হওয়ার পেছনে ইহাও একটি কারণ হতে পারে। প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে এত সোচ্চার হওয়ার কারণে, দেশদ্রোহিতার অভিযোগে মামলা করার হুমকি থেকে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের সত্যতা প্রমাণে মার্কিন প্রশাসন প্রভাবিত হয়ে পড়তে পারে। এতে প্রিয়া সাহা নিজে লাভবান হয়ে যেতে পারেন। নিজের দেশ বা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে অন্য দেশে থাকার চেষ্টা করেছেন বহু লোক। আমার চাচাতো ভাই মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ মোস্তফা নিজের বিরুদ্ধে মামলা করে থানা থেকে গুরুতর অভিযোগ সম্বলিত গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি দিয়েছিলেন, ভাগ্য খারাপ তার, প্রাণঘাতী গ্যাংরিন হওয়ার কারণে সুইজারল্যান্ডের হাসপাতালে পা কেটে ফেলার পরও বাঁচতে পারেননি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী ‘ধর্মীয় স্বাধীনতায় অগ্রগতি’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশি প্রিয়া সাহাসহ ২৭ জন প্রতিনিধি বিভিন্ন দেশ থেকে অংশগ্রহণ করেন। ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হওয়া ১৯টি দেশের ২৭ জন ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্য দেশের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উচ্চবাচ্য করার অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কে দিল—এই কথাটি ব্যারিস্টার সুমন সাহেবেরা কিন্তু একবারও উচ্চারণ করেননি। আমাদের দেশ থেকে লোক ডেকে নিয়ে এভাবে নালিশ শোনার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য সুমনের মতো কোন ব্যারিস্টার এগিয়ে আসেননি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা সাজানোর মালমশলা প্রচুর; তিনি নিজেই একজন ঘোরতর বর্ণবাদী ও সাম্প্রদায়িক। আমেরিকা থেকে লোক বিতাড়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্ট হয়েই তিনি সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিককে আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিলেন; সম্প্রতি চারজন অশ্বেতাঙ্গ নারী কংগ্রেস সদস্যকে নিজ দেশে ফিরে গিয়ে নিজেদের ব্যর্থ সরকারকে পরামর্শ দিতে পরামর্শ দিয়েছেন। পৃথিবীতে শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে মুসলিমদের মঙ্গলগ্রহে পাঠিয়ে দেওয়া উচিত বলে ট্রাম্প মনে করেন; অথচ ট্রাম্পের তৃতীয় বউ মেলানিয়া এবং ট্রাম্পের পূর্বপুরুষ আমেরিকার লোক নন। তাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অভাব এখন বিশ্বব্যাপী।
বাংলাদেশে প্রিয়া সাহার এই ঘটনাটি এত গুরুত্বের সঙ্গে সংবেদনশীল করে তোলা হয়েছে যে, প্রিয়া সাহার প্রতি সংক্ষুব্ধদের যুদ্ধংদেহী মনোভাব লক্ষ্য করে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও তার বক্তব্যের দায়-দায়িত্ব নিতে নারাজ, তারা তাকে তাদের সংগঠন থেকে বহিষ্কার করে বাঁচতে চাইছে। তার গ্রামের কিছু হিন্দু এত ভয় পেয়েছে যে, তারা প্রিয়া সাহার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতেও দ্বিধা করছে না, তার ভাইয়ের ঘরে আগুন লাগানোর জন্য প্রিয়া সাহাকে দায়ী করে বিবৃতি দিচ্ছে। হিন্দু জনসংখ্যা হ্রাসের ব্যাপারে পরবর্তীতে ব্যাখ্যায় প্রিয়া সাহা আবুল বারকাতের একটি গবেষণার সূত্র উল্লেখ করায় তিনি প্রিয়ার প্রতি ক্ষেপে প্রতিবাদ পাঠিয়েছেন। তার বক্তব্য হচ্ছে, তিনি কখনও ৩৭ মিলিয়ন সংখ্যালঘুর দেশত্যাগের কথা কোথাও বলেননি; তিনি বলেছেন, ১৯৬৪ থেকে ২০১৩ এই ৫০ বছরে বাংলাদেশের ১ কোটি ১৩ লাখ হিন্দু ‘নিরুদ্দিষ্ট’ হয়েছেন। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন যে, প্রিয়া সাহা পাটিগণিত ভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত দিয়েছেন যা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসৃত নয়। বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের হিন্দুদের সঙ্গে একত্রে তথ্য দেওয়ার বিরুদ্ধেও বারকাত কথা বলেছেন; তার মতে ১৯৪১ সনে বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান জনসংখ্যার অনুপাত যা ছিল, এখনো প্রায় তাই আছে। প্রিয়া সাহার ‘ডিজঅ্যাপিয়ার্ড’, বারকাতের ‘নিরুদ্দিষ্ট’, নোয়াম চমস্কি এবং জর্জ অরওয়েলের ব্যবহৃত ‘আন-পিপলিং’ অথবা অন্যান্য নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদদের ব্যবহৃত ‘মিসিং পপুলেশন’-এর মধ্যে অর্থগত কোন পার্থক্য নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন। কয়েক দশক পর দেশ হিন্দুশূন্য হয়ে যাবে মর্মে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা তিনি এখন ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন যে, বাংলাদেশে শত্রু সম্পত্তি আইন বিলোপের কারণে হিন্দুরা এখন আর আগের মতো দেশ ত্যাগ করছে না।
অনেককে উপহাস করে বলতে শোনা যায়, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুরা জামাই আদরে আছে, চাকরিতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো তাদের দখলে। অদ্ভুত যুক্তি; মনে হয় তাদের করুণা করা হচ্ছে। রাষ্ট্রের সব নাগরিক সমান মর্যাদা ও সম্মানের অধিকারী; কেউ জামাই, কেউ শ্বশুর নয়। মানবিকতা প্রধান বিবেচ্য হলে ধর্ম দ্বারা মানুষকে বিবেচনার অবকাশ থাকে না; ধর্ম দ্বারা মানুষ বিবেচিত হলে সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হবেই। তার জন্মভূমিতে তার জীবনের নিশ্চয়তা বিধানে আলাদা অনুকম্পা লাগার কথা নয়, পাহারার জন্য আলাদা পুলিশের প্রয়োজনীয়তা ভীতি সঞ্চার করে। অনেকের অভিমত, সংখ্যালঘুরাও বাংলাদেশকে মনেপ্রাণে তাদের জন্মভূমি মনে করেন না, তাদের মধ্যে ভারতপ্রীতি অনেক বেশি। হয়তো এর মধ্যে কিছুটা সত্যতা রয়েছে; তবে নিজের জন্মভূমির শত শত বছরের বসতভিটা ত্যাগে তারা কেন বাধ্য হয় তাও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রিয়া সাহার বক্তব্যের উছিলায় বাংলাদেশে হিন্দুদের দাপট নিয়ে ফেসবুকে উত্তেজনা এবং হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানোর অপচেষ্টায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে, ধর্মের নামে মানুষে-মানুষে সৃষ্ট বিভেদ আরও বিস্তৃততর হচ্ছে। প্রিয়া সাহার এমন একটি বক্তব্যকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার আখ্যা দিয়ে যেভাবে ফেসবুকে হিন্দুদের কালসাপ বলে ধোলাই করা হচ্ছে, যেভাবে ব্যারিস্টার, মন্ত্রী মহোদয়গণ মামলা করার হুমকি দিচ্ছেন তাতেই সারা পৃথিবী বুঝে নেবে যে, সংখ্যালঘুদের জন্যে বাংলাদেশ খুব বেশি নিরাপদ আশ্রয় নয়।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com
