আজকের (রোববার, ০৪ আগস্ট ২০১৯) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়।
গুণে নয়, মানে আলাদা
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
একজন যুগ্মসচিবের আগমনের প্রতীক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে প্রায় তিন ঘণ্টা ফেরি আটকে রাখার কারণে মুমূর্ষু অবস্থায় থাকা স্কুলছাত্র তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় ফেসবুকে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সটি যখন ফেরিঘাটে পৌঁছায় তখন একটি ফেরি ঘাটেই ছিল। অ্যাম্বুলেন্সে থাকা তিতাসের মা ও বোন ঘাটের কর্মকর্তাদের ফেরি ছাড়তে শুধু অনুরোধ করেননি, তাদের পাও জড়িয়ে ধরেছিলেন। ফেরিতে কর্মরত পুলিশদের অনুরোধ করে কাজ না হওয়ায় ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও নাকি পুলিশের সহায়তা পাওয়া যায়নি। ঘাট ও ফেরির কর্মকর্তারা ফেরি না ছাড়ার ব্যাপারে অনড়; কথিত যুগ্মসচিবের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে ফেরি ঘাটে না থাকলে ঘাট ও ফেরি কর্মকর্তাদের নাজেহাল হতে হবে—এমন অভিজ্ঞতা তাদের আছে। সংশ্লিষ্ট জেলায় অবস্থান করে জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অমান্য করার ক্ষমতা কেউ দেখানোর সাহস করে না। জেলা প্রশাসক নিজের স্বার্থেই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুরোধ বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠেন; ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অধীনেই তাকে চাকরি করতে হবে। সঙ্গে বউ, শালী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজন থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে ঢাকার বাইরে নিজেদের ওজন প্রদর্শনের কসরত করে থাকেন। গল্পের আসরে শোনা—এক লোক নিজের দর বাড়ানোর জন্য কুমিল্লা শহরে শ্বশুরবাড়িতে যাওয়ার পথে সব ট্রাফিকের হুইসেল বাজানো ও স্যালুট নেয়ার ব্যবস্থা করে রাখে; শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও জামাইবাবুর আগমনবার্তা আনন্দসহকারে পাড়া-প্রতিবেশীকে তখন জানাতে থাকে।
যুগ্মসচিব, জেলা প্রশাসক এখন মায়াকান্না কাঁদছেন; তারা বলছেন, একজন মুমূর্ষু রোগীকে নিয়ে একটি অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড়িয়ে থাকলে তারা নিশ্চয়ই ফেরিটি ঘাটে বসিয়ে রাখতেন না। ষষ্ঠ শ্রেণির একজন ছাত্রের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মৃত্যু তাদের এমন মায়াকান্না দ্বারা আচ্ছাদন করা সম্ভব নয়। যুগ্মসচিব আসার পরপরই ফেরি স্টার্ট হয়েছে বিধায় তিতাসের জন্য ফেরি ছাড়তে দেরি হয়নি মর্মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আবার সাফাই গাইছেন। কিন্তু তার জন্য যে ফেরি ছাড়া তিন ঘণ্টা বিলম্বিত হলো তার দায় কে নেবে? মুমূর্ষু রোগী ফেরি ঘাটে আনার আগে নাকি তাদের অগ্রিম জানাতে হবে। তার কথা অনুযায়ী মনে হচ্ছে, হাসপাতালে রোগী নেয়ার পূর্বে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে। বিএনপি সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এয়ারভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ মাহমুদের সুরে তিনি তিতাসের মৃত্যু নিয়ে ঠাট্টা করে বললেন, ‘মারা তো আমরা সবাই যাব, সৃষ্টিকর্তা কখন কার মৃত্যু কোথায় লিখে রেখেছে কে জানে’।
জেলা প্রশাসকেরা এমনিতেই ব্যস্ত থাকেন; সরকারের যত কমিটি আছে জেলা পর্যায়ে প্রায় সব কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। এত সব কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা করে নিয়মিত নথির কাজ করা দুরূহ হয়ে পড়ে। আমি ১৯৮৯ সন থেকে ১৯৯২ সন পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে জেলা কৃষিঋণ কমিটিগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হয়ে যোগ দিতাম। কোন জেলায় একটি সভাও সময়মত হতো না। জেলা প্রশাসকের অন্যত্র অত্যধিক ব্যস্ততার জন্য কোন কোন সভা দুই বা তিন ঘণ্টা পর শুরু হতো। তবে কোন কোন জেলা প্রশাসক ইচ্ছে করে সভা দেরিতে শুরু করতেন; প্রায় তিন ঘণ্টা বসে থেকে অতিষ্ঠ হয়ে একদিন এক জেলা প্রশাসকের চেম্বারে ঢুকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, সভা হবে না?’ ‘সভা হবে, বসুন, অপেক্ষা করুন’— জেলা প্রশাসকের উত্তর। এভাবে লোকদের বসিয়ে রাখলে নাকি জেলা প্রশাসকদের গুরুত্ব বাড়ে, এ শিক্ষা তারা প্রশিক্ষণে পেয়েছেন। জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক, বগুড়া অফিসের জেনারেল ম্যানেজার যোগ না দেয়ায় বগুড়ার জেলা প্রশাসক সভার মধ্যে অভিযোগ করে বসেন। অভিযোগের কথা শুনে জেনারেল ম্যানেজার পরবর্তী সভা আরম্ভ হওয়ার পাঁচ মিনিট পূর্বে সভায় উপস্থিত হন এবং নির্ধারিত সময়ে জেলা প্রশাসক সভায় আগমন না করায় সভা শুরুর নির্ধারিত সময় থেকে আরও ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংকে ফেরত চলে আসেন। জেলা প্রশাসক আর কখনও জেনারেল ম্যানেজারের উপস্থিতি কামনা করেননি। জেলা প্রশাসকদের সবচেয়ে বেশি বিড়ম্বনায় পড়তে হয় যখন জেলায় ভিআইপিদের আগমন ঘটে। এ ভিআইপিদের প্রটোকল দিতে গিয়ে প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমও স্থবির হয়ে যায়।
সরকারের এটুআই প্রকল্পের যুগ্মসচিব আবদুস সবুর মন্ডল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা। অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের নিকট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের একটি আলাদা মর্যাদা আছে। তাই জেলা প্রশাসকও ভুল করেননি। ভিআইপিদের দাপটের কথা গল্পের আসরে রস করে শোনা যায়। এসব গল্প সর্বকালের। বরিশাল থেকে সদরঘাট অথবা সদরঘাট থেকে বরিশাল চলাচলকারী লঞ্চ, স্টিমারও নাকি ভিআইপিদের আগমনের অপেক্ষায় কয়েক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। যাত্রীদের অশ্লীল ভাষায় গালাগাল সংশ্লিষ্ট ভিআইপির কানে গেলে এর প্রতিকার হয়তো এতদিনে হয়ে যেত। ভিআইপি বা তার চেলাচামুণ্ডার সম্মুখে কেউ গালাগাল দেওয়ার সাহস করে না বলে এ অন্যায় কাজের প্রতিকারও হয় না। এরা জুমার নামাজেও দেরিতে মসজিদে উপস্থিত হন; কোন কোন সময় কারও মাধ্যমে অভিবাসন দীর্ঘায়িত করার সংবাদ ইমামের কানে পৌঁছে দেওয়া হয়। দেরিতে মসজিদে গিয়ে সব মুসল্লিকে ডিঙিয়ে সামনের কাতারে যাওয়ার আগ্রহটি দৃষ্টিকটু হলেও ভিআইপিরা তা কেয়ার করেন না। আগে থেকে সম্মুখে বসে থাকলে অনেক মুসল্লির নজরে আসেন না বলে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য এই ভিআইপিরা নামাজ শুরুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এসে সবার সালাম নিতে নিতে সামনের কাতারের দিকে নির্লিপ্তভাবে এগুতে থাকেন।
ভিআইপি’দের এমন সব আচরণ জনগণ পছন্দ করে না; করে না বলেই একজন আমলার তিন ঘণ্টা ফেরি আটক করে রাখার কারণে অ্যাম্বুলেন্সেই এক কিশোরের করুণ মৃত্যুকাহিনী সবাইকে হতবাক করেছে। কলেজজীবনে ফেনী-বিলোনিয়া রেললাইনের স্টেশনে এ দৃশ্যটি প্রায়ই দেখতাম—ট্রেন স্টেশনে প্রবেশের সময় স্টেশন মাস্টার গামছা একটা নিয়ে চাপাকলে সব যাত্রীর সম্মুখে গোসল করছেন, গোসল শেষ হওয়ার পর স্টেশন মাস্টার বাসায় গিয়ে রেডি হয়ে আসা পর্যন্ত ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতো। আমরাও অন্যায় করতাম; আমরা বিনা টিকিটে ভ্রমণ করতাম বলে চুপ থাকতাম।
ঢাকা শহরে ট্র্যাফিক জ্যাম নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে নাকাল হয়নি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ট্র্যাফিক জ্যামে পড়ে কত মুমূর্ষু রোগীর অকালমৃত্যু হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। এমন ট্রাফিক জ্যাম থেকে ঢাকা শহরকে মুক্ত করার নিমিত্তে বর্তমান সরকার নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে; সবগুলো উদ্যোগ বাস্তবায়নের পর ঢাকার যানজটের অবস্থা কেমন হবে তা এক্ষুণি বলে দেওয়া যাবে না। ব্যাংকক শহরে শত শত ফ্লাইওভার এবং মেট্রোরেলের বিস্তৃত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও এখনও সেখানে রাস্তায় গাড়ি নামলে তা কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। রাজধানী ঢাকারও এমন একটি অবস্থায় যখন ভিআইপিরা চলাচল করেন তখনকার দুঃসহ পরিবেশ আরও অসহনীয় হয়ে উঠে। সারা পৃথিবীতে জঙ্গিদের আক্রমণ রোধে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে মারার চেষ্টা বহুবার করা হয়েছে; তাই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য অতিরিক্ত সতর্কতা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তার রাস্তায় বেরুনোর অনেক অনেক পূর্ব থেকে সব গাড়ির চলাচল বন্ধ রাখার প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা দ্বিতীয়বার পর্যালোচনার দাবি রাখে। এছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ রাখার বিষয়টি পরিহার করা যায় কিনা তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। একজন ভিআইপি’র একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগদান করার চেয়ে একজন পুলিশের দ্রুততার সঙ্গে অপরাধ রোধ করা অধিকতর কাম্য, একজন মন্ত্রীর সেমিনারে বক্তব্য রাখার চেয়ে একটি অ্যাম্বুলেন্সের ঝড়ের গতিতে হাসপাতালে পৌঁছানো অতি জরুরি, একজন মন্ত্রীর রাস্তায় নেমে কাজ তদারকির চেয়ে একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ির জন্য রাস্তা পরিষ্কার রাখা অধিকতর গ্রহণযোগ্য। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ যাওয়া ও বিদেশ থেকে আসার সময় নেতা, মন্ত্রীদের বিমানবন্দরে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার রীতি কবে চালু হয়েছে তা মনে করতে পারছি না, হুঁশ হওয়ার পর থেকেই দেখছি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ইচ্ছে করলে এ রীতি বাদ দিতে পারেন। কারণ জনগণের কষ্ট লাঘবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ঘরে বসেই করে থাকেন। ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেনের প্রস্তাবের বাস্তবায়ন সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রী রিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরি করতে বলেছেন। সাইকেলের জন্য আলাদা লেন পৃথিবীর বহু দেশে রয়েছে; আমাদের দেশেও সাইকেলের জন্য আলাদা লেনের দাবি আছে। যারা রাস্তায় চলতে চলতে মোবাইল চালায় তাদের জন্যও অনেক দেশে আলাদা লেন আছে। ফুটপাতসহ কোথাও কোথাও রাস্তা দখল করে ব্যবসা করতে বাধ্য হচ্ছে বাস্তুচ্যুত কিছু মানুষ। মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, এদের উঠিয়ে দিলে চুরি, ডাকাতি, মাদকব্যবসা, খুন, হত্যা বহুগুণে বেড়ে যাবে। সব সমস্যার মূলে রয়েছে প্রয়োজন অতিরিক্ত মানুষ। এক্ষেত্রে সরকারের কোন দৃশ্যমান কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায় না। প্রধানমন্ত্রী আর প্রেসিডেন্ট ব্যতীত অন্য কেউ ভিআইপি নয় বলা হলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ করা কঠিন। রাস্তায় চলাচলকারী অনেকগুলো গাড়ির হর্নও ভিআইপি—ওই সকল হর্ন বাজলে আমরা সবাই সতর্ক হয়ে যাই।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com