দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার আজকের (রোববার, ১৬ জুন ২০১৯) উপসম্পাদকীয়।

শেখ হাসিনা নির্ভরতা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বীকৃতি বিশ্বদরবার থেকেও এসেছে। হাসিনা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ঘোর সমালোচক ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিনও হাসিনার আমলে বাংলাদেশের বিপুল উন্নতির প্রশংসা করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে সর্বহারা, নিঃস্ব, হতদরিদ্র লোকদের বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনও।

বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলত গার্মেন্টস শিল্প ও প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকদের পাঠানো টাকার ওপর নির্ভরশীল। পোশাক রফতানি হ্রাস পেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে শুধু রফতানি আয় কমবে না, লাখ লাখ নারী বেকার হবে, হাজার হাজার পরিবার না খেয়ে মরবে, শত শত শিল্প শুধু ক্রেতার অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে এমন নির্ভরশীলতা শুধু অর্থনীতির ক্ষেত্রে নয়, রাজনীতির ক্ষেত্রেও দৃশ্যমান। বাংলাদেশের প্রশাসন, রাজনীতি, নীতি-নির্ধারণ, সিদ্ধান্ত সব কিছু শেখ হাসিনা নির্ভর। এ কথাটি সবাই বুঝে ও মানে; মানে বলেই সংসদে পাঁচ মিনিট সময় পাওয়া গেলে দুই মিনিট শেখ হাসিনার গুণকীর্তন করে নষ্ট করা হয়। এতে কোন আপত্তি নেই, আপত্তি হচ্ছে, পরবর্তী তিন মিনিটে গুছিয়ে নিজের কথাটি আর বলতে পারেন না অনেকে। কাজের দায়িত্বটা বিধিবিধান মোতাবেক নির্ধারণ করা থাকা সত্ত্বেও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব ক্ষেত্রে মন্ত্রী, আমলারা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে করছি’। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অবশ্যই মানতে হবে, কিন্তু প্রতিদিন মিডিয়ার সম্মুখে দাঁড়িয়ে যখন মন্ত্রী আমলারা একই কথা বারবার উচ্চারণ করেন তখন জনগণের অস্বস্তি লাগে।

৩৮ বছর আগে ১৯৮১ সনের মে মাসে শেখ হাসিনা বাংলাদেশ এসে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনার একক নেতৃত্বের ছায়াতলে সরকারের ক্ষমতাবানদের সবাই নিরাপদে আছেন; গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সব দায়-দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর ওপর ছেড়ে দিয়ে নির্ভার থাকার এই সুযোগটি কেউ ছাড়ছেন না। অবশ্য নেতৃত্ব দেওয়া ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহস, সততা ও জ্ঞান-গরিমার প্রয়োজন—এগুলো আবার সবার থাকে না। এগুলো শেখ হাসিনার রয়েছে; শত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি ত্বরিত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। সচিবালয়ে এমন ত্বরিত সিদ্ধান্ত হলে, দেশ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত হওয়া সত্ত্বেও, আরও এগিয়ে যেতে পারত। শেখ হাসিনার ওপর এমন নির্ভরতা বাড়তে থাকলে এক সময় হয়তো দেখা যাবে, প্রধানমন্ত্রীর কথা ছাড়া কেউ আর নড়ছেন না। এখন কোথাও ধর্ষণ হলে, দুর্ঘটনা ঘটলে, আগুন লাগলে, দাঙ্গা হলে, অনশন হলে, পানি না থাকলে, পানিতে ডুবে গেলে, লোডশেডিং হলে, মাদকব্যবসা বেড়ে গেলে, রাস্তা-বাঁধ ভেঙে গেলে, স্কুলঘরের ছাদ না থাকলে, পুল ভেঙে গেলে, কোটাপ্রথা বাতিলকরণে, ব্যাংকের সুদ কমানোর ক্ষেত্রে, যানজট নিরসনে সর্বত্র প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপস্থিতি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি কাজ সম্পাদনের ক্ষেত্রে আইন-কানুন, বিধি-বিধান, নীতি-পদ্ধতি রয়েছে এবং এগুলো অনুসরণ করেই সংশ্লিষ্ট সবাইকে কাজ করতে হয়। একজন অপরাধীকে ধরার জন্য আইন রয়েছে, থানা রয়েছে, পুলিশ রয়েছে—এসব ক্ষেত্রে সচিব, আইজি, মন্ত্রী কারও নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করার কথা নয়। আইনানুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করে অনেকে বসে থাকেন বলেই সব অপরাধের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। ত্বরিত ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষেত্রে দোদুল্যমানতা অপরাধের আলামত নষ্ট করতে সহায়তা করে, অপরাধীও নিষ্কৃতি পাওয়ার প্রাথমিক সুযোগটি পেয়ে যায়।

দেশের সব অর্জনের জন্য সবাই শেখ হাসিনাকে কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদের মতো বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে শেখ হাসিনারও ভিশন ও মিশন রয়েছে; একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী সৎ ও আন্তরিক হলে সে দেশের উন্নয়ন করা যে সম্ভব তা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় গুণ, গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তার দৃঢ় অবস্থান। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্বীকৃতি বিশ্বদরবার থেকেও এসেছে। হাসিনা সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের ঘোর সমালোচক ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিনও হাসিনার আমলে বাংলাদেশের বিপুল উন্নতির প্রশংসা করেছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে সর্বহারা, নিঃস্ব, হতদরিদ্র লোকদের বাঁচিয়ে রাখার প্রচেষ্টার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেনও।

গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় দলের ভেতর ভিন্ন মত থাকলেও তা জনসম্মুখে বলা নিষিদ্ধ। অবশ্য ভেতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও ভিন্ন মত পোষণ করার মতো সততা ও সাহস সবার থাকে না। সবার আমলনামা লিপিবদ্ধ করে রাখার জন্য বহু সংস্থার অসংখ্য লোক গলদঘর্ম; মাথাচাড়া দিলেই পতন অবশ্যম্ভাবী। তাই আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রে একজনের নির্দেশই শিরোধার্য; আমাদের দেশ বলি কেন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কথা না শোনায় হোয়াইট হাউজের অনেককে বিদায় নিতে হয়েছে। অবশ্য গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতায় শীর্ষ ব্যক্তির ইমেজ না থাকলে দলের কাফেলা নিয়ে এগুনোও কঠিন। দেশে এত দুর্নীতি; কিন্তু অধিকাংশ সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে শেখ হাসিনা সৎ। জনগণ বিশ্বাস করে, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকলে দেশের উন্নয়ন হবেই। তার এ ইমেজ কাজে লাগিয়ে দলের বহু লোক পুলসিরাতের পুল পার হচ্ছেন। বিদেশে এই ইমেজ ছিল বঙ্গবন্ধুর; বাংলাদেশের নাম না জানলেও বিদেশে এক সময় বঙ্গবন্ধুর নামে সাধারণ বাঙালিরা পরিচিতি পেত। একাত্তরের পর বহুদিন বাঙালিরা বিদেশে ‘মুজিব কান্ট্রি’র ‘মুজিবের লোক’ বলে গণ্য হতেন।

সামষ্টিক অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক বিচারে বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো। এই ভালো হওয়ার পেছনে হাসিনার নেতৃত্বের কথা সবাই অকপটে স্বীকার করছে। মাথাপিছু আয় অনেক বেড়েছে। মাথাপিছু গড় আয় বৃদ্ধি দ্বারা বিরাজমান আয় ও ব্যয় বৈষম্য দূর না হলেও আমরা বুঝতে পারি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; অধিকাংশ মানুষ পূর্বের মতো দীর্ঘদিন পুষ্টিহীনতায় ভুগছে না, স্বাস্থ্যসেবা নেয়ার কিছুটা সামর্থ্য হয়েছে; আগের মতো অনাহারে থাকলে বা চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হলে মানুষের গড় আয়ু বাড়তো না। বিগত ১০ বছর ধরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি পৃথিবীর খুব কম দেশেরই হয়েছে। বাংলাদেশে বিগত দশ বছরে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে, আরও বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে, আমদানি-রফতানি বেড়েছে, চাষের জমি কমলেও খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে, মাছ ও সবজি উৎপাদন বেড়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি। এমন আরও বহু খাত রয়েছে যাতে বিগত ১০ বছরে উন্নতির ছোঁয়া লেগেছে।

উন্নয়নের বিপরীত চিত্রও আছে। তবে সব কিছুর জন্য শুধু সরকারই দায়ী নয়, নিজেদের জ্ঞান-গরিমায়, ভদ্রতা-শিষ্টতায় সৃষ্টির সেরা মানুষগুলো এখনও আত্মোন্নতি করতে পারেনি। সুশাসনের অভাবকেও অনেকে এর জন্য দায়ী করে থাকেন। মাদরাসার শিক্ষক, স্কুলশিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বাস-ড্রাইভার, বাস-হেলপার যে যেখানে পারছে ধর্ষণের উৎসবে মেতে উঠেছে। সন্তান পিটাচ্ছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে, সমাজের বলবান লোকেরা মোবাইল, কলা, মুলা, লতা, পাতা ইত্যাদি চুরির সন্দেহে গাছের সঙ্গে বেঁধে বড় বড় লাঠি দিয়ে শিশু বা মহিলাকে সর্বশক্তি দিয়ে পেটাচ্ছে, চারিপাশে দাঁড়িয়ে লোকজন লাঠি পেটানোর দৃশ্য নির্বিকার চিত্তে দেখতে থাকে—কারও কোন প্রতিক্রিয়া হয় না। চায়ের কাপ ভাঙার জন্য বা লুকিয়ে তরকারি খাওয়ার জন্য অথবা অতি পরিশ্রমে অবেলায় ঘুমিয়ে পড়ার জন্য গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রী গৃহকর্মীকে গরম খুন্তির সেকা দিচ্ছে। সরকারের নির্দেশনায় স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের পেটানো কিছুটা কমলেও মাদরাসায় ছাত্রছাত্রী পেটানোর মহোৎসব বহাল তবিয়তে চলছে; মাদরাসার শিক্ষকদের ছাত্রছাত্রীদের মারার দৃশ্য দেখলে এদের মানুষ মনে হয় না, মনে হয় জল্লাদ, কসাই। কৃষক তার উৎপাদিত ধান-চালের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না, সন্তানের জন্য বাপ দুধ চুরি করছে, দেশে প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে না বলে কাজের সন্ধানে ইউরোপের পথে সমুদ্রে ডুবে বাঙালি মরছে, ভুল চিকিৎসায় রোগী মরছে, ভেজাল পণ্যে দেশ সয়লাব হচ্ছে, বৈধ অবৈধ সব অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি—ঢাকা শহরে ৫০টি খাল কখন কীভাবে ভরাট হয়ে গেল কেউ কিছু জানে না, ১০ তলার অনুমোদিত ভবন কীভাবে ২০ তলা হয়ে যায় তা জানার অধিকার কারও নেই, দুই ফুট রাস্তার পাশে কীভাবে বহুতল ভবন নির্মিত হয় তা রাজউক জানে আগুন লাগলে, পদ্মা সেতুর দুপাশে কুঁড়েঘর তুলে সরকারের অধিগ্রহণের টাকা লুটপাটের অভিসন্ধির খবর জানাজানি হয় দুদকের পরিদর্শনের পর। পানির জন্য ঢাকা শহরের কোথাও কোথাও কারবালার প্রান্তর হয়ে গেলেও ওয়াসার কর্তার কোন মাথাব্যথা নেই। কৃষক ন্যায্য মূল্য না পেয়ে তার নিজের ধান জমিতে পোড়াচ্ছে, সন্তানের জন্য বাপ দুধ চুরি করছে, বেকারত্ব আর অভাবের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে মা, ছেলে, মেয়ে সবাই মিলে একত্রে আত্মহত্যা করছে, কাজের সন্ধানে ইউরোপে যেতে গিয়ে একসঙ্গে ৪৭ জন সমুদ্রে তলিয়ে গেছে, চক দিয়ে দুধ, রং দিয়ে শরবত, ফরমালিন দিয়ে ফল পাকানো, মরা মোরগ আর গরুর মাংস ও পচাবাসি খাবার দিয়ে হোটেল চালানো হচ্ছে, মজুতদারি আর ওজনে জালিয়াতি করে ব্যবসায়ীরা লাভবান হচ্ছে; এক কথায় দুর্নীতির মহোৎসব চলছে। এসবের মাঝে পুরো জাতির অবস্থান যেখানে তলানিতে সেখানে বিশ্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে কিছু শিক্ষিত লোক খামোকা মাতম করছে।

এতগুলো নেতিবাচক বিষয়ের মধ্যেও দেশের জনগণ এখনও শেখ হাসিনার ওপর আস্থা হারায়নি। শেখ হাসিনার যে ইমেজ ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে তাতে তার ওপর নির্ভর করা যায়। তাই তো পেশাজীবীদের অনশন ভাঙার ক্ষেত্রেও আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস চায়, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে রাস্তায় নামা ছাত্র, ছাত্রীরাও প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস ছাড়া রাস্তা ছাড়তে সম্মত হয় না, কোটাপ্রথার বিরোধীদের আন্দোলনও থামে প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে। দেশের জনগণের আর কারও প্রতি কোন আস্থা নেই—সবার ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর গোচরে আনা গেলে যে কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব। মন্ত্রী, আমলা এবং জনগণের এমন নির্ভরতার ভার প্রধানমন্ত্রী একা বয়ে বেড়াচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, জনগণ বিশ্বাস করে শুধু আপনার দৃঢ় নেতৃত্বের জন্য সম্ভব হয়েছে বাংলাদেশের এই অগ্রগতি, তাই বাকি সমস্যাগুলোর সমাধানেরও আপনাকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com