আজকের (রোববার, ০৯ জুন ২০১৯) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়।
বাড়তি উৎপাদনের বিড়ম্বনা
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জুন ২, ২০১৯ তারিখের ‘সংবাদ’-এর সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘কৃষকদের ন্যায্য মূল্য ও ধানের মূল্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে সরকার ১০ থেকে ১৫ টন চাল রফতানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রফতানিতে উৎসাহ দিতে ব্যবসায়ীদের দেওয়া ২০ শতাংশ প্রণোদনাও বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। কিন্তু খাদ্যনীতি বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ইফপ্রি) বলেছে, বাংলাদেশ এখনও চাল রফতানির পর্যায় এসে পৌঁছেনি। ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের দিকে এগোতে হবে’।
বাংলাদেশ বর্তমানে ধান উৎপাদনে শুধু স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, এবার ২ কোটি ৭৮ লাখ টন বোরো ধানের বাম্পার ফলন ফলিয়েছে। উৎপাদিত উক্ত ধানের মধ্যে সরকার কৃষকের তরফ থেকে কিনবে মাত্র দেড় টন; তাই কৃষকদের বিক্রি করতে হবে খোলা বাজারে বা মিল মালিকদের কাছে। কিন্তু সরকার যেখানে কিনছে মণপ্রতি ১০৪০ টাকা দরে সেখানে খোলা বাজারে বা মিল মালিকদের কাছে প্রতি মণ ধানের দর উঠেছে সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা। ফলে উৎপাদনে কৃষকের খরচের টাকাও ধান বিক্রি করে উঠানো যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কৃষকেরা দাবি করছে, সরকারের প্রয়োজনীয় সব ধান কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি কেনা হোক। তবে কৃষকদের দাবি অনুযায়ী সরকার কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনতে আগ্রহী হলেও সব কৃষক ধান বিক্রি করতে পারবে বলে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ উৎপাদিত ধানের মাত্র ছয় শতাংশ সরকার কিনে মজুদ করবে। এছাড়াও বিক্রি করতে গেলেও কখনও কখনও কৃষকদের হয়রানির শিকার হতে হবে। যারা ক্রয়ের দায়িত্বে থাকেন তাদের কিছু ছাড় দেওয়া না হলে নানা উসিলায় বিশেষ করে ভেজা থাকার অজুহাতে কৃষকের ধান ফেরত দেওয়া হয়। অন্যদিকে কৃষকের ধান থাকলেও সব কৃষকের বিক্রির জন্য চাল থাকে না।
সরকার যে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনছে না তার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিদ্যমান গুদামগুলো চাল সংরক্ষণের জন্য উপযোগী হলেও ধান সংরক্ষণের জন্য নয়। এ অবস্থায় ধান কেনা হলে সরকারকে ক্রীত সব ধান বণ্টন বা বিক্রির পূর্বে অবশ্যই চালে রূপান্তর করতে হবে। ধান শুকানো, সিদ্ধ করা, মেশিনে চাল করার কোন নিজস্ব ব্যবস্থা সরকারের নেই; এ ক্ষেত্রে সরকারকে চাতাল বা মেশিন মালিকের কাছে ধরনা দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না। এ কারণে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সব ধান না কিনে সরকার নির্ধারিত বাকি ১১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল কিনবে মিল বা চাতালের মালিক ও চাল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। অন্যদিকে কৃষকের দরজায় গিয়ে গিয়ে ধান সংগ্রহের প্রয়োজনীয় লোকবলও সরকারের নেই। সরাসরি ধান কেনার ক্ষেত্রে আরেকটি সমস্যা হলো, সরকার নাকি প্রকৃত কৃষকদের সবাইকে চিনে না। সরকারের এমন সরল কথা মানুষ সহজভাবে নেয়নি; কারণ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের যে লোকেরা কৃষকদের সঙ্গে মাঠে কাজ করে তাদের মাধ্যমে প্রকৃত কৃষকের তালিকা সহজেই করা যায়। কৃষকের মাঝে যে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে তা দিয়েও কৃষক শনাক্ত করা সম্ভব। সরকার এখন চাল রফতানির কথা ভাবছে। অন্যদিকে চাল রফতানি করার জন্য ব্যবসায়ীরাও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে; কারণ এখনও তাদের গতবারের প্রয়োজনাতিরিক্ত আমদানি করা চালও বিক্রি শেষ হয়নি। বোরো মৌসুমের বাম্পার ফলনের বিক্রয়যোগ্য চালের পুরোটা বাজারে এলে তাদের মজুদ চালের দর কমে যাবে এবং এতে তাদের লোকসান গুনতে হবে।
আমাদের দেশে কৃষকদের মধ্যে প্রায় সবাই প্রান্তিক চাষি, দিনে এনে দিনে খায়। কৃষক শুধু নিজের খাবারের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে থাকেন, সামান্য উদ্বৃত্ত অংশ বিক্রি করে সংসারের অন্য খরচাদি নির্বাহ করে থাকেন। ধান লাগানোর সময় ব্যাংকঋণ পাওয়া গেলেও ধান কাটার সময় কৃষকদের হাতে কোন টাকা থাকে না। উপরন্তু প্রায় ক্ষেত্রে কৃষকের ঋণ নেয়ার সময়ই পুরাতন ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করে নেয়া হয় বলে কৃষক প্রয়োজনীয় টাকা কোন সময়ই পায় না। নগদ টাকার অভাবে ফসল তোলার সময় তাই কৃষকেরা দিশেহারা হয়ে যায়। কয়েকজন কৃষক এমন দিশেহারা অবস্থায় এবার প্রতিবাদস্বরূপ নিজের ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন, এতে নাকি তাদের লাভ হয়েছে। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান একবার বলেছিলেন, আদমজী পাটকল না চালালে সরকারের লাভ হয়, চালালে লোকসান। এখন কৃষক বলছে, চাষাবাদ না করলে কৃষকের লাভ, করলে লোকসান। ধানক্ষেতে আগুন দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকা অস্বাভাবিক নয়; তবে এমন প্রতিবাদে রাজনৈতিক ইন্ধন থাকাটা অপরাধও নয়। ধাক্কা না দিলে নিজ থেকে কোন সরকারই নড়ে না। পাশ্চাত্যে কৃষকেরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষাবাদ করেন বলে শিল্পপতিদের মতো সরকারের ওপর চাপ রাখতেও সমর্থ হন। এইসব দেশে নাকি চাল-গমের দাম ঠিক রাখতে উদ্বৃত্ত চাল ও গম সাগরে ফেলা দেওয়া হয়; কথাটি সত্য না হলেও ওইসব দেশে হাজার হাজার হেক্টর জমি অনাবাদি রেখে দেওয়া হয়, লাভ না হলে কৃষক উৎপাদনে যায় না।
দেশে ধানের জমির পরিমাণ প্রতি বছর দশমিক ৪০ শতাংশ হারে কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। ফিলিপিন্সে যে ইরি ধানের (ইরি হচ্ছে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের নাম) জন্ম তা আজ বাংলাদেশে পরিবর্তিত উদ্ভাবনে নতুনত্ব পেয়েছে। বন্যা, খরা, জিংকসমৃদ্ধ, লবণাক্ততা ও দুর্যোগ সহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদান অসামান্য। গত অর্থবছরে চালের উৎপাদন ছিল ৩ কোটি ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টন। ধান উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান এখন চতুর্থ, মাছ ও সবজি উৎপাদনে তৃতীয়। কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমে শুধু যে ধান, গম ও ভুট্টার উৎপাদন বেড়েছে তা নয়, উৎপাদনের হার বা গড় উৎপাদনশীলতাও বেড়েছে অনেক। স্বাধীনতার পূর্বে যেখানে এক হেক্টর জমিতে দুই টন চাল উৎপাদিত হতো এখন প্রতি হেক্টরে উৎপাদন হচ্ছে চার টনেরও বেশি। এখন বাংলাদেশ আলু রফতানি করে, অথচ এক দশক আগেও বাংলাদেশকে আলু আমদানি করতে হতো। খাদ্যনিরাপত্তা অর্জনে অনেকগুলো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে এ স্বয়ম্ভরতা টেকসই হচ্ছে না। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বিপরীতে ক্রমহ্রাসমান কৃষিজমি, ফসলি জমিতে পোকামাকড়ের আক্রমণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত ইত্যাদি সম্পূর্ণ মোকাবিলা করা সম্ভব নয় বলেই টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মুক্তবাজার অর্থনীতির সবক মতো সরকার উৎপাদন ও বিপণনে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখলেও সরাসরি নিজে উৎপাদনে যায় না এবং বাজারে পণ্যের মূল্য নির্ধারণে হস্তক্ষেপও করে না। কোন কৃষক উৎপাদনে যাবে কি যাবে না তার নির্ধারক উদ্যোক্তা নিজেই। তবে মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এক সময় কৃষিতে ভর্তুকি দিত, এখন দেয় কিনা জানি না। ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন নিজেদের উৎপাদিত পণ্যের বিপণন সহজ করার জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির ওপর অধিক হারে ট্যাক্স বসাচ্ছেন; এক্ষেত্রে চীন, ভারত, কানাডা, ইউরোপ কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। ২০০৮ সালেও গৃহায়ণ খাতে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে ডুবন্ত ব্যাংকগুলোকে ভাসিয়ে রাখতে আমেরিকান সরকার শত শত কোটি টাকা ঢেলেছিল। আমাদের অর্থনীতি পুরোপুরি মুক্তবাজার অর্থনীতির সবকে চলে না; কিছুটা নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতি অনুসরণের কারণে সরকার ভর্তুকি দিয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রেখেছে। সরকার সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ব্যাংককে প্রায় প্রতি বছরই মূলধনের জোগান দিয়ে থাকে; সরকার বিদ্যুতে ভর্তুকি দিচ্ছে, জ্বালানি তেলে দিচ্ছে, রফতানিকারকদের প্রণোদনার নামে কোটি কোটি টাকা দিয়ে রফতানি বৃদ্ধির বাহবা নিচ্ছে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জমি ও আর্থিক দীনতার কারণে আমাদের দেশে কৃষিতে সম্পূর্ণ যন্ত্রায়ন সম্ভব হয়নি বলে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে কৃষিকাজ পরিচালিত হচ্ছে না। অল্প জমি ও স্বল্প পুঁজির কৃষকদের প্রতি তাই সরকারের একটা দায়বদ্ধতা রয়েছে। এ দায়বদ্ধতা থেকেই কৃষি উপকরণে সরকার ভর্তুকি দিচ্ছে। মুক্তবাজার অর্থনীতির প্রবক্তারা যদি নিজেদের পণ্য রক্ষায় সংরক্ষণবাদী হতে পারে, বাংলাদেশ কৃষির ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিতে পারবে না কেন?
অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খাদ্য-রাজনীতির প্রভাব ব্যাপকতর। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এক সময় পিএল-৪৮০-এর আওতায় খাদ্য সহায়তার নামে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল দেশগুলোর ওপর কর্তৃত্ব করত। কিউবার কাছে চটের বস্তা বিক্রি করার অজুহাত তুলে আমেরিকা এই পিএল-৪৮০-এর আওতায় বাংলাদেশের জন্য পাঠানো গম মাঝ দরিয়া থেকে ফেরত নিয়ে নেয়; এ অবস্থায় তাৎক্ষণিক চাল বা গম সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না বলে চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ ভয়াবহ আকার ধারণ করে। খাবার নিয়ে রাজনীতি অতীতেও হয়েছে, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের কোন অর্জন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে টেকসই হয় না; গত বছর হাওর অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ফসলহানি হওয়ার কারণে ৩৯ লাখ টন চাল আমদানি হয়েছিল। স্পর্শকাতর রাজনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য পর্যাপ্ত চালের উৎপাদন ও মজুদ তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মধ্যস্বত্বভোগীদের পরিহার করা সম্ভব নয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের আগমনে পণ্যের মূল্য বাড়লেও কর্মসংস্থান বাড়ে। ধান কাটাসহ বিক্রির উপযোগী করার সংশ্লিষ্ট খরচ বহনের আর্থিক সামর্থ্য কৃষকের না থাকায় যে কোন দামে ধান বিক্রি অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক্ষেত্রে সহজ শর্ত ও নামমাত্র সুদে ব্যাংক লোন দেওয়া সম্ভব হলে ধান বিক্রির অসম প্রতিযোগিতা বন্ধ হতো। কৃষিতে ভর্তুকি অব্যাহত রেখে কৃষকদের কাছে থেকে আরও অধিক পরিমাণে ধান, চাল কেনার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। আমরা যদি ডুবোজাহাজ কিনতে পারি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারি, পদ্মা সেতু বানাতে পারি, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করতে পারি—ধান, চাল সংরক্ষণের জন্য আমরা কেন প্রতি জেলা, উপজেলা বা ইউনিয়নে পর্যাপ্ত সংখ্যায় গুদাম তৈরি করতে পারব না? এক মৌসুমে ধান বেশি হয়েছে বলে ভর্তুকি দিয়ে হলেও চাল বিদেশে বিক্রি করতে হবে কেন? প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরের মৌসুমে ধান উৎপাদন ব্যাহত হলে তা কভার করার মতো মজুদ থাকা বর্তমান সরকারের রাজনীতির স্বার্থেই অপরিহার্য।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
eauddinahmed@gmail.com