উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, রবিবার, ২০ জানুয়ারী ২০১৯

সৌদি মেয়ে রাহাফ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

সৌদি আরবের একটি প্রদেশের গভর্নরের ১৮ বছর বয়সী মেয়ে রাহাফ মুহাম্মদ আল-কুনুন সম্প্রতি ব্যাংকক বিমানবন্দরের একটি হোটেল কক্ষে নিজেকে অবরুদ্ধ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে সৌদি আরবে আর ফেরত না যাওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। রাহাফ তার বাবা, মা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কুয়েতে বেড়াতে এসে সবার অজান্তে কুয়েত এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে চড়ে অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ট্রানজিট যাত্রী হিসেবে ব্যাংকক বিমানবন্দরে নামার পর রাহাফ দেখতে পায় একটি লোক তার নাম লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। লোকটি আসলে সৌদি দূতাবাসের লোক। তাকে থাইল্যান্ডের ভিসা পাইয়ে দিতে সহযোগিতা করবে বলায় রাহাফ অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করার পূর্বপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত পরিহার করে থাইল্যান্ডে থেকে যাওয়ার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু লোকটি তার পাসপোর্ট নিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে তার পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়ে যায়। এ অবস্থায় থাইল্যান্ডের অভিবাসন কর্মকর্তারা রাহাফকে বিমানবন্দরে একটি হোটেলে আবদ্ধ করে রাখে। রাহাফও হোটেল কক্ষের দরজা বন্ধ করে কক্ষের ভেতর থেকে টেবিল-চেয়ার দিয়ে ঠেস দিয়ে তার কক্ষে আর কাউকে ঢুকতে দেয়নি। রাহাফ আরবি ও ইংরেজি দুই ভাষায় লেখা টুইটার বার্তায় পৃথিবীর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাহাফের বার্তা ভাইরাল হওয়ার পর জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার পাশে এসে দাঁড়ায়। জাতিসংঘ তাকে বৈধ শরণার্থী ঘোষণা করে অস্ট্রেলিয়াকে আশ্রয় দিতে অনুরোধ করে। অস্ট্রেলিয়া জাতিসংঘের অনুরোধ বিবেচনার আশ্বাস দিলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে বিলম্ব করছিল। কানাডাও রাহাফের অবস্থা প্রতি মুহূর্তে মনিটর করছিল। পরিশেষে মানবতাবাদী জাস্টিন ট্রুডো তাকে সানন্দে আশ্রয় দেওয়ার ঘোষণা দেন। রাহাফ ইতোমধ্যে কানাডায় পৌঁছেছে।

সৌদি আরব থেকে মেয়েদের পালানো নতুন কোন ঘটনা নয়; ইতঃপূর্বে আরও অনেক মেয়ে সৌদি আরব ত্যাগ করে বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। রাহাফের মতো ২৪ বছর বয়সী আরেক মেয়ে সালওয়া তার এক বোনকে নিয়ে সৌদি আরব থেকে পালিয়ে ক্যানাডায় আশ্রয় নিয়েছে অনেক আগে। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সালওয়া ও তার বোনের পাসপোর্ট তাদের বাবার অনুমতিক্রমে করা হলেও তা গচ্ছিত ছিল ভাইয়ের কাছে; ভাইয়ের কাছ থেকে এ পাসপোর্ট পেতে তাকে চুরির আশ্রয় নিতে হয়েছে। দেশ ছাড়ার ক্ষেত্রে অভিভাবকের অনুমতি সংগ্রহেও সালওয়া প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছিল। পরিবারে বাবা ও ভাইয়ের অভিভাবকত্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে ২০১৭ সনে আরেক মানবাধিকার কর্মী মরিয়ম আল-ওতাইবি তিন মাস জেল খেটেছে। সৌদি আরবের কঠোর শাসন ও বাড়ির পুরুষদের অভিভাবকত্বের অত্যাচার থেকে বাঁচার প্রত্যাশায় শাহাদ আল মুহাইমিদ তুরস্কে ছুটি কাটাতে গিয়ে ওখান থেকে সুইডেনে চলে যায়। শাহাদ স্পষ্ট করে বলেছে, সুইডেনে সে সৌদি আরবের মতো বিপুল অর্থের অধিকারী না হলেও এখানে সে স্বাধীনতা ভোগ করতে পারছে। ২০১৭ সনে ফিলিপিন্সে পালানো দিনাকে সৌদি আরবে ফেরত পাঠানোর পর তার ভাগ্যে কী ঘটেছে তা কেউ জানে না। সত্তরের দশকে সৌদির এক রাজকুমারী তার প্রেমিকের হাত ধরে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে দুজনকেই হত্যা করা হয়। পরিবারের অতিমাত্রার শাসন থেকে বেরিয়ে রাহাফ, সালওয়া ও তার বোন কানাডার মুক্ত বাতাসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আনন্দের কথা বলেছে।

থাইল্যান্ডের বিমানবন্দরে আবদ্ধ থাকাকালীন টুইটার বার্তাগুলো পড়লে মনে হয়, রাহাফ সৌদি সমাজের অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি চায়, পুরুষের কর্তৃত্ব থেকে নিষ্কৃতি চায়, ব্যক্তি জীবনে চলাফেরায় স্বাধীনতা চায়, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার চায়। পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়া রাহাফ সৌদি সমাজে বিরাজমান নারীবিরোধী রীতিনীতির প্রতিও সংক্ষুব্ধ। সৌদি আরবের রীতিনীতি তাকে এত বেশি ক্ষুব্ধ করছে যে, সে ইসলাম ধর্মও ত্যাগ করার ঘোষণা দিয়েছে। রাহাফ স্পষ্ট করে বলেছে, তাকে সৌদি আরবে ফেরত পাঠানো হলে ইসলাম ধর্ম ত্যাগের কারণে তার পরিবারের লোকেরাই তাকে হত্যা করবে। এছাড়া সৌদি সরকারও তাকে ছাড়বে না। কোন ধর্মের কোন লোক ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করলে ইসলামের কট্টর সমর্থকেরা যারপরনাই খুশি হয়, কিন্তু কেউ ইসলাম ত্যাগ করলে তার জীবন কট্টরপন্থিদের হাতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্র যখন কট্টরপন্থিদের জেহাদি মনোভাবে তাড়িত হয় তখন ধর্মত্যাগীর জন্য তা হয়ে উঠে আরও ভয়ঙ্কর। সৌদি আরবে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মের মুখ্যত কোন অস্তিত্ব নেই। তাদের যুক্তি হচ্ছে, একমাত্র ইসলামই সত্য ধর্ম; কোন মুসলমানের তাই অন্য ধর্মের প্রতি প্রীতি থাকতে পারে না। তাদের অভিমত হচ্ছে, মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ইসলাম ধর্মে ফেরত আনা। তাই ইসলামে ধর্মান্তরিত ব্যক্তিদের সৌদি আরবে আর্থিক সহায়তা দেয়াসহ আলাদাভাবে পুরস্কৃত করা হয়; অন্যদিকে ইসলাম ধর্ম ত্যাগের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। অবশ্য রাষ্ট্রীয় বিচারের আগেই ইসলাম ধর্ম ত্যাগীরা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের দ্বারা অনার কিলিং-এর শিকার হয়।

সৌদি আরবে মুসলমান-অমুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমান আচরণ করা হয় না। সৌদি আরবে প্রবাসীদের যে আকামা দেওয়া হয় তার রং ভেদেও নাকি মুসলমান, অমুসলমান চিহ্নিত করা যায়—মুসলমানদের সবুজ, অমুসলমানদের জন্য লাল। সৌদি আরবে ধর্মভেদে কর প্রথাও নাকি ভিন্নতর। সৌদি আরবে বসবাসরত অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রকাশ্যে তাদের ধর্মের আচার অনুষ্ঠান করার অনুমতি নেই এবং তারা তাদের কোন উপাসনালয়ও সৌদি আরবে তৈরি করতে পারে না। একজন মুসলিম নারীকে কোন অমুসলিমের বিবাহ করা সৌদি আরবে সম্পূর্ণভাবে বেআইনি। কোন মুসলমান বিদেশিকে সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়ার ব্যাপারে ইদানীং শিথিল নীতি অনুসরণ করা হলেও কোন অমুসলিমকে কোনক্রমেই সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। সৌদি আরবে অমুসলমান নারীদেরও নাকি ‘আবায়া’ পরে ঘর থেকে বের হতে হয়। মেয়েরা পা পর্যন্ত পুরো শরীর ঢেকে রাখা যে ঢিলেঢালা আচ্ছাদন ব্যবহার করে তাকে আবায়া বলে। নাসারাদের দেশে সৌদি সরকার যখন ইসলাম প্রচার করে তখন কিন্তু নিজ দেশে অবলম্বিত রীতি, পদ্ধতির কথা মনে রাখে না। সৌদি আরবের টাকায় নাসারাদের দেশেও মসজিদ স্থাপিত হচ্ছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকেও প্রতিনিয়ত লোক ইসলাম ধর্মের প্রচারে নাসারাদের দেশে অবাধে যাচ্ছে। শব্দ দূষণ রোধে পাশ্চাত্য জগৎ সচেতন বিধায় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে লাউড স্পিকারে অন্যদের বিব্রত করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে থাকে সত্য, কিন্তু যে কোন লোক তার পছন্দমতো ধর্ম পালন করতে পারে, পারস্পরিক সম্মতিতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রাপ্তবয়স্ক যে কোন মেয়ে যে কোন ছেলেকে কারও অনুমতি ছাড়াই বিয়ে করতে পারে, নিজেদের উপাসনালয় গড়তে পারে। তবে স্কুল, কলেজগুলো ছাত্রছাত্রীদের ধর্মীয় নিশানা ব্যবহারের বিপক্ষে। ইসলামী জিহাদিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা ও আক্রমণ যত তীব্র হচ্ছে ধর্মীয় নিশানা ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে জনমত তত জোরালো হচ্ছে; মাঝে মাঝে ধর্মীয় নিশানা ব্যবহারকারীদের ওপর আক্রমণও হচ্ছে।

যুবরাজ মুহাম্মদ সালমান ক্ষমতা পাওয়ার পর সৌদি আরবে অনেক সংস্কার হলেও এখনও পরিবারে পুরুষ অভিভাবকত্ব ব্যবস্থা নারীদের স্বাধীনতা লাভের প্রধান অন্তরায়। পুরুষ অভিভাবকত্ব প্রথার কারণে একজন সৌদি নারী কখনও তার নিজের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো নিজে নিতে পারে না; তার পক্ষ হয়ে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে তার বাবা, ভাই, স্বামী কিংবা ছেলে। সৌদি আরবের আইনে মেয়েদের একা একা চলা নিষিদ্ধ, একজন পুরুষ অভিভাবক অবশ্যই তার সঙ্গে থাকতে হবে অথবা ঘর থেকে বেরুনোর পূর্বে পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে রাখতে হবে। এ অভিভাবকত্বের হস্তক্ষেপ শুধু নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে নয়, মুক্তি পাওয়ার পর জেলখানা ছেড়ে বেরিয়ে আসার জন্যও তার পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি নিতে হয়। সৌদি আরবে কোন কলেজের ছাত্রী তার পরিচয়পত্রে তার নিজস্ব ছবি রাখতে পারে না, ছবি লাগাতে হয় বাবা, ভাই, স্বামী অথবা তার আইনি অভিভাবকের। এসব কারণে সৌদি মেয়েরা সৌদি সমাজ ত্যাগে উন্মুখ হয়ে উঠেছে। একজন মানুষের মনের আনন্দে বাঁচার জন্য ধনসম্পদ যে একমাত্র অবলম্বন নয় তা সৌদি মেয়েদের নিজের জন্মস্থান ও পরিবারের সবাইকে ত্যাগ করে অপরিচিত ভিন্ন দেশে পাড়ি দেওয়া থেকে বোঝা যায়। প্রতিটি ক্ষেত্রে পুরুষের কর্তৃত্ব সৌদি মেয়েদের একদিকে যেমন অতিষ্ঠ করে তুলছে, অন্যদিকে পাশ্চাত্যের নারীর ব্যক্তি স্বাধীনতা সৌদি মেয়েদের আকৃষ্ট করে তুলছে। সীমাহীন ব্যক্তি স্বাধীনতায় পাশ্চাত্যের মেয়েরা অন্যের অধিকারে কোন সমস্যা না করে পছন্দ মতো পোশাক পরতে পারে, হাসতে পারে, কাঁদতে পারে, হাঁটতে পারে, দৌড়াতে পারে, সাইকেল চালাতে কোন অসুবিধা হয় না, সুইমিং কস্টিউম পরে সাঁতার কাটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, আইস স্কেটিং করতে কেউ বাধা দেয় না, গভীর রাতে একাকী রাস্তায় বের হলে কেউ সন্দেহ করে না বা কেউ সংক্ষিপ্ত পোশাকের অজুহাত তুলে ধর্ষণের অভিপ্রায়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে না। সৌদি আরব এমন স্বাধীনতার কথা চিন্তাও করতে পারে না; তাই ঘর পালানো মেয়েদের ধরে রাখতে পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর হবার পরামর্শ দিয়েছে এবং দেশে রেড এলার্ট জারি করা হয়েছে যেন এই ধরনের ঘটনার বিস্তার না ঘটে। এই পার্থক্যগুলো ইন্টারনেটে সৌদি মেয়েরা পড়ে সচেতন হচ্ছে, শুধু বিত্তবৈভব দিয়ে তাদের আর আবায়ার ভেতর আটকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

সৌদি আরবে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ স্বাভাবিক সামাজিক প্রথা হিসেবে বিবেচিত হওয়া সত্ত্বেও সেখানে বিবাহযোগ্য আইবুড়ি মেয়ের সংখ্যা বেশি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, স্বীয় গোত্রের বাইরে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তোলাকে পুরুষ অভিভাবকেরা অপরাধ বিবেচনা করে থাকে। সময়মতো মেয়েদের বিয়ে না হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, সৌদি আরবে দেনমোহরের পরিমাণ অনেক বেশি এবং এ দেনমোহর নির্ধারণ করে মেয়ের বাবা। ফলে ছেলেরা কম টাকা খরচ করে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বউ নির্বাচন করতে বেশি আগ্রহী। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার প্রত্যাশায় এ মর্মে একটি আইন হয়েছে যে, সরকারি চাকরি পেতে হলে ছেলেদের সৌদি মেয়ে বিয়ে করতে হবে। এতেও খুব বেশি কাজ না হওয়ায় ছেলেদের বিয়ের খরচ নির্বাহে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ছেলেরা এতেও সৌদি মেয়ে বিয়ে করার ক্ষেত্রে খুব আগ্রহী হচ্ছে না। মেয়েরাও সৌদি পুরুষের প্রতি আগ্রহী নয়। কারণ সৌদি মেয়েরা সৌদি পুরুষদের স্বামী হিসেবে যতটুকু পায় তার চেয়ে বেশি পায় কর্তৃত্ব ফলানোর অভিভাবক রূপে। বহু বিবাহের বাতিক থাকায় স্বামীদের প্রতি সৌদি মেয়েদের আস্থা ও বিশ্বাস কম। স্বামীদের দেওয়া তালাক কার্যকর হওয়ার সংবাদও স্ত্রীরা পেত না, সম্প্রতি প্রণীত আইনের বদৌলতে স্ত্রীরা একটি এসএমএসের মাধ্যমে তালাক কার্যকর হওয়ার খবর পেয়ে থাকে। এতসব অনাচারের কারণে সৌদি মেয়েরা দেশের বাইরের ছেলেদের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং ঘর থেকে পালিয়ে যাবার প্রবণতা সৌদি মেয়েদের মধ্যে প্রবলভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষের যুক্তি হচ্ছে—কোরআন, হাদিসের নির্দেশনা মেনেই সৌদিরা নারীদের ওপর পুরুষদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ‘পুরুষেরা নারীদের ওপর কর্তৃত্বশীল (কারও কারও ব্যাখ্যায় অভিভাবকত্ব) এ জন্য যে, আল্লাহ একের ওপর অন্যের বৈশিষ্ট্য দান করেছেন এবং এ জন্য যে, তারা তাদের অর্থ ব্যয় করে। সে মতে নেককার স্ত্রীলোকগণ হয় অনুগতা এবং আল্লাহ যা হেফাযতযোগ্য করে দিয়েছেন লোকচক্ষুর অন্তরালেও তার হেফাযত করে। আর যাদের মধ্যে অবাধ্যতার আশঙ্কা কর তাদের সদুপদেশ দাও, তাদের শয্যা ত্যাগ কর এবং প্রহার কর। যদি তাতে তারা বাধ্য হয়ে যায়, তবে আর তাদের জন্য অন্য কোন পথ অনুসন্ধান করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সবার ওপর শ্রেষ্ঠ (সূরা নিসা—৪: ৩৪)।’ তাই মনে হয়, সৌদি আরব সঠিক পথই অনুসরণ করছে; পুরুষের কর্তৃত্বের বিপক্ষে বলার কোনো অধিকার কারও নেই। তবুও ইসলাম পূর্ব যুগে মেয়েদের যে স্বাধীনতা ছিল সেই স্বাধীনতাটুকু সৌদি মেয়েরা ফেরত পাওয়ার প্রত্যাশা করছে; ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের পূর্বে মেয়েদের অধিকার ও স্বাধীনতা যে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি ছিল তা মহানবী মুহাম্মদ (স.)-এর প্রথম স্ত্রীর জীবন কাহিনী পড়লেই সৌদি মেয়েরা জানতে পারছে। স্টালিন আর মাও সেতুং-এর মতো কঠোর আইনের বেড়াজালে মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বেশিদিন চাপিয়ে রাখা সৌদি আরবের পক্ষে সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। ৯৫ শতাংশ মরুভূমি নিয়ে গঠিত সৌদি আরবে মিঠা পানির চেয়ে তেলের পরিমাণ বেশি বলে অঢেল সম্পদের একটা অহংকার তাদের আছে; এ তেল নিঃশেষ হয়ে গেলে মেয়েদের ওপর পুরুষদের অতি আধিপত্য আপনা-আপনি খসে পড়তে পারে।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com