৩০ ডিসেম্বর আমাদের গণতান্ত্রিক নির্বাচন; জনগণের ভোট দিয়ে তিনশ’ সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার কথা। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় সহিংস ঘটনা মিডিয়ায় আসাতে জনগণের ভোট দেওয়া না দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু থাকলেও সব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অনুসৃত রীতি, পদ্ধতি এক নয়। তবে ভিন্নতা থাকলেও জনগণের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভোটে সরকার গঠনই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র। গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা উন্নয়নের সর্বোত্তম পন্থা বলে অনেকের বদ্ধমূল ধারণা; অবশ্য এটা শেখ হাসিনার সরকার বিগত ১০ বছরে প্রমাণও করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণতন্ত্রের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচুর কথা রয়েছে। বাম রাজনীতির সমর্থক গ্রামে আমার এক মামা বলতেন, পাশ্চাত্যের অনুসৃত গণতন্ত্রে চাওয়ার অধিকার থাকলেও পাওয়ার অধিকার নেই। মাছের বাজারে বড় রুই মাছটি দেখা ও দরদাম করার অধিকার ধনী, গরিব নির্বিশেষে সবার থাকলেও মাছটি পরিশেষে যাবে ধনী লোকের রান্নাঘরে। এছাড়াও আমাদের মতো দেশে গণতন্ত্রে বাক্স্বাধীনতার উচ্চকিত জয়গানে মৌলিক চাহিদার দাবি কখনও পূরণ হওয়ার সুযোগ পায় না বলেও তার বদ্ধমূল ধারণা ছিল।
গণতন্ত্রের শর্ত মোতাবেক নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভে সমর্থকেরাই সরকার গঠন করে থাকে। সিম্পল মেজরিটি অর্থাৎ অর্ধেকের চেয়ে এক ভোট বা একজন প্রতিনিধি বেশি হলেই সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন সম্ভব হয়। এক্ষেত্রে জনগণের মোট ভোটের আধিক্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয় না। কোন নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থীর মধ্যে পরাজিত চারজন প্রার্থীর প্রাপ্ত মোট ভোট বিজয়ী প্রার্থীর চেয়ে অনেক বেশি হলেও বিজয়ী প্রার্থী গণতান্ত্রিক নির্বাচনে সকলের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়ে যায়। একটি নির্বাচনী এলাকায় তিন লাখ ভোটারের মধ্যে একজন প্রার্থী ষাট বা সত্তর হাজার ভোট পেয়ে শুধু সর্বোচ্চ ভোট পাওয়ার কারণে ওই এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। তবে শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত সরকারই গণতান্ত্রিক সরকার নয়। হিটলার, মুসোলিনিরাও নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন; কিন্তু তাদের সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার বলা হয় না। তাই গণতান্ত্রিক সরকার হতে হলে নির্বাচনের পরও সরকার ও বিরোধী দলকে গণতান্ত্রিক আচরণ করতে হয়। আবার রাজনীতির বর্তমান জটিল মারপ্যাঁচে নির্বাচিত সরকারও কখনও কখনও বিশ্বের স্বীকৃতি পায় না। তাই ব্রাদারহুড নির্বাচনে জয়লাভ করেও বেশি দিন মিসরের ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, হামাস নির্বাচনে জয়লাভ করে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সরকার গঠন করলেও, পরে ফিলিস্তিনের সর্বত্র শাসনক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অথচ ভোটবিহীন রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র বিশ্বের মোড়লদের সমর্থনে নিশ্চিন্তে অনেক দেশে বহাল-তবিয়তে বিরাজ করছে।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা একেক দেশে একেক রকম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ হিলারি ক্লিনটনকে বেশি ভোট দিলেও গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মারপ্যাঁচে ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়ে গেলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট আল গোরের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ঘটনা ঘটেছিল। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের নির্বাচনেও এমন অসঙ্গতি দেখা যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ৩০.৮১% ভোট পেয়ে আসন পায় ১৪০টি, অন্যদিকে ৩০.০৮% ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ পায় ৮৮টি আসন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পপুলার ভোট হচ্ছে ৩,৩৮,৮৭,৪৫১ এবং বিএনপির ২,২৯,৬৩,৮৩৬; শতকরা হিসাবে আওয়ামী লীগ পেয়েছে ৪৯%, বিএনপি পেয়েছে প্রায় ৩৩%। কিন্তু পপুলার ভোটের হিসাবের সঙ্গে আসন প্রাপ্তির সঙ্গতি দেখা যায় না—আওয়ামী লীগের ২৩০ আসন, বিএনপির ৩০।
২০১৬ সালের HIES অনুযায়ী, বাংলাদেশে চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ১২.৯ শতাংশ। এদের প্রার্থী হওয়া তো দূরের কথা, এরা প্রভাবিত না হয়ে ভোট দেওয়ার অধিকার ভোগ করে কি না সন্দেহ। অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত লোকদের পক্ষে বর্তমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে সম্ভব নয়। নির্বাচনী ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের তদারকি ফলপ্রসূ প্রভাব ফেলতে এখনও পারেনি। নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছে জনগণের পাহাড়সম প্রত্যাশা পরে পূরণ হওয়ার নয় বলে তাৎক্ষণিক প্রাপ্তি ভোটারদের ভোট প্রদানে স্বাভাবিকভাবেই প্রভাবিত করে থাকে। তাই নীতিনিষ্ঠ, জনদরদি, ন্যায়পরায়ণ বা সৎ প্রার্থীর কদর নেই জনগণের কাছে। ভোটের আগে বা পরে খরচ করলে হবে না, ভোটের সময়ও খরচ করতে হয়। দলীয় কর্মীদের মধ্যে উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতেও হরেক রকমের ব্যয়ে কার্পণ্য করলে চলে না। ভোটারদের নামে দলীয় কর্মীরাও প্রার্থী থেকে টাকা আদায়ে কসুর করে না। তাই স্থানীয় বা জাতীয় নির্বাচনে ব্যবসায়ী ধনী ব্যক্তিদের জয়জয়কার। রাজনৈতিক দলগুলোও ভোটারদের মনোভাব জেনে ধনবান লোকদের মনোনয়ন দিয়ে থাকে। আমাদের এবারের নির্বাচনে ৫২.১৭% প্রার্থী ব্যবসায়ী। নির্বাচনে টাকা খরচ মুখ্য বলে প্রার্থীর জ্ঞান-গরিমা না থাকলেও তাতে কোন অসুবিধা হয় না। একটু বাধা আসে দলের স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের তরফ থেকে; এ নেতারা সারা বছর জীবন উৎসর্গ করে দলের আদর্শ, উদ্দেশ্য প্রচারে। কিন্তু ভোট এলে টাকার খেলায় এরা হেরে যায়, মনোনয়ন পায় না।
নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং নির্বাচনকালীন ভোট প্রার্থীরা দুটি জায়গায় অকাতরে দান করে ভোট নিশ্চিত করার চেষ্টা করে থাকেন—এক মসজিদ ও মন্দির, দুই মাদ্রাসা। এদেশে মাদ্রাসার এত ব্যাপ্তির অন্যতম কারণ গণতান্ত্রিক ভোট। এ অর্থগ্রহণে পাক-নাপাক বিচার করা হয় না। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ অর্থ নেয়ার সময় ভোট দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দুই হাত তোলে দোয়াও করে। এরা সব প্রার্থী থেকেই মাদ্রাসার উন্নয়নে টাকা নেয় এবং সব প্রার্থীর জয় কামনা করে মোনাজাত করে। প্রার্থীরাও মোনাজাতে শরিক হন। মাদ্রাসার জন্য অর্থের জোগান দিলেও মাদ্রাসার ভেতরে লেখাপড়ার খোঁজ কোন প্রার্থী বা জনপ্রতিনিধি পরে নিয়েছেন বলে জানা যায় না। এসব প্রার্থী এতিমখানায়ও দান করেন; তবে তা করা হয় জনসভায় মাইকে ঘোষণার মাধ্যমে। এতিমখানার এতিমরা আমৃত্যু এতিম থেকে যায়। এরা এতিম শুধু মা-বাবার মৃত্যুর জন্য নয়, এরা এতিম এ কারণেই যে, ধনীদের দেওয়া খাবারের আশায় এদের বসে থাকতে হয় বলে। এতিমদের কখনও নিঃস্ব অবস্থা থেকে বের হয়ে আসার কোন পথ রাখা হয় না। আমরা মক্তবে যা শিখেছি সেই শিক্ষার মধ্যেই তাদের জীবনাচার গড়ে উঠে। এদের শিক্ষক খুব শিক্ষিত নয়, এদের পোশাক নির্ধারিত—পায়জামা, পাঞ্জাবি, টুপি। অথচ এতিমখানায় যারা দান করেন তাদের সন্তানেরা এ পোশাক পরে না। সরকারও এদের স্কুল-কলেজের শিক্ষায় শিক্ষিত করার তাগিদ অনুভব করে না। ফলে গণতান্ত্রিক ভোটের টাকায় এদের জীবনাচারে কোন পরিবর্তন আসে না, ভোটের সময় শুধু ভালো-মন্দ খেতে পায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনকালীন রাজনৈতিক দলগুলো ঘোষণা দিয়ে চাঁদা তোলে। যে প্রার্থী যত বেশি টাকা আদায় করতে পারে সেই প্রার্থীর সক্ষমতা তত বেশি। বড় বড় ব্যবসায়ীরা নির্বাচনে চাঁদা দিয়ে নিজের সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে জেতানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করে। সবাই জানে এ চাঁদা তাদের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ। এরা সরকারের সিদ্ধান্তে প্রভাব খাটাতে পারে। আমেরিকায় ইহুদি গ্রুপ প্রার্থীর হার-জিতের প্রধান নিয়ামক। সব প্রার্থীই তাই নির্বাচনের আগে-পরে ইসরাইলের পক্ষে কথা বলে থাকে। অন্যান্য পেশা-গোষ্ঠীও অনুরূপভাবে সরকারের কোন কোন সিদ্ধান্তে প্রবল প্রভাব বিস্তার করে থাকে। আমেরিকায় প্রতি বছর অস্ত্রধারীর গুলি ছোড়ার খামখেয়ালিপনায় অসংখ্য লোক, ছাত্রছাত্রী অকাতরে প্রাণ হারায়। আমেরিকায় আলু-পটোলের মতো অস্ত্র কিনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনী অস্ত্র রাখার অধিকার স্বীকার করে; তবে অস্ত্র কেনা ও রাখার ওপর ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য আইনে বিধিনিষেধ রয়েছে। এ সুযোগে অস্ত্র ব্যবসায়ীরা মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করার সুযোগ পায়। মার্কিন সরকারের ওপরে সর্বোচ্চ মাত্রায় প্রভাব বিস্তারে সক্ষম লবিগুলির একটি হচ্ছে এ অস্ত্র ব্যবসায়ী।
আমাদের দেশেও নির্বাচনের সময় ব্যবসায়ীরা গণতান্ত্রিক দল ও দলের প্রার্থীকে চাঁদা দিয়ে থাকে; তবে আমেরিকার মতো ঘোষণা দিয়ে নয়, গোপনে। কোন কোন ব্যবসায়ী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিশালী সব দলকেই চাঁদা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন আবার মাস্তান ও সন্ত্রাসীও তৈরি করে। কারণ আমাদের দেশে নির্বাচনে সন্ত্রাসীদের ভূমিকা সাধারণ জনতার চেয়ে অনেক বেশি। এরা নির্বাচনের পরও দলের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে পারে। সারা বছর জনগণ এদের হাতে জিম্মি থাকে। ফজলুল কাদের চৌধুরীর মতো সব দলেরই ‘শুকুজ্জা’ প্রয়োজন। এলাকাতে এরা যত সালাম পায় তত সালাম কোন সজ্জন, শিক্ষিত ভদ্রলোকও পায় না। এদের মা-বাবা, ভাইবোনেরাও সমাজে বেশ সম্মানিত। এরা সংখ্যায় বেশি না হলেও এরা সংগঠিত এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকে। গতকাল পাড়ার এক গলিতে কিছু কিশোর রাস্তায় মিছিলে কাকে কাকে কীভাবে মেরেছে তা বলে হাসাহাসি করছিল; না শোনার ভান করে দ্রুত তাদের পাশ দিয়ে চলে যাই। নির্বাচনে দলের প্রার্থীরা এদের ভালো করেই চিনে, জানে; গণতান্ত্রিক ভোটে এদের অপরিহার্যতায় আমাদের মতো ভোটারের চেয়ে তাদের কদর বেশি। অতিষ্ঠ জনগণ তাই সন্ত্রাসীর অস্বাভাবিক মৃত্যুতে মিষ্টি বিতরণ করে, সামরিক শাসনে সন্ত্রাসী, লবিস্টদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থায় জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংসদে ভোট দেওয়ার বিধি-বিধান না থাকায় সংসদে নীতি প্রণয়ন বা সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনপ্রতিনিধিদেরও যে খুব বেশি ক্ষমতা আছে তা মনে হয় না। অবশ্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বাধীন মত প্রকাশের স্বাধীনতা দেয়াও দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আইয়ুব খান আর ফাতেমা জিন্নাহর নির্বাচনে বিডি মেম্বারদের যেভাবে কেনাবেচা দেখেছি, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দু’দিন পূর্বে যেভাবে এ মেম্বারেরা স্বেচ্ছায় গুম হয়ে গিয়েছিলেন তার অভিজ্ঞতায় সম্ভবত সংবিধানে সত্তর অনুচ্ছেদ দিয়ে সংসদ সদস্যদের স্বাধীনভাবে ভোট প্রয়োগের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোতে জনপ্রতিনিধিরা মাঝে মাঝে দলের বিপক্ষে ভোট দিয়ে দল ও দলীয় প্রধানের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে; কিন্তু আমাদের মতো দেশে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর চাপ সৃষ্টি করার কোন আইন, পদ্ধতি, সাহস, ক্ষমতা কোন জনপ্রতিনিধির নেই; নেই বলেই আমাদের মতো দেশে জনগণের কাছে রাজতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র আর গণতন্ত্র একাকার।
