নোট মুদ্রণে বাংলাদেশ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

দেশের টাকা ছাপানোর কারখানাটির অবস্থান গাজীপুরে। প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৮৯ সনে এবং এ বছরে এসে পূর্ণ হলো ৩০ বছর। এই প্রতিষ্ঠানটি উদ্বোধন করেছেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। এই প্রতিষ্ঠানটি কেপিআই এ-১ বিধায় নিরাপত্তা বিধানে কর্তৃপক্ষকে সর্বদা সতর্ক থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠার পর তাই নির্বাহী প্রধান হিসেবে আর্মি বা পুলিশের লোকদের নিয়োগ দেওয়া হতো। নিরাপত্তা নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানটি এত সংবেদনশীল যে, প্রতিষ্ঠানটির গেইটে কোন নামফলক রাখা হয়নি, মাত্র কয়েক বছর পূর্বে মেইন গেইটে নাম লেখা হয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক বা কারেন্সীনোট মুদ্রণের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিলো, প্রতিষ্ঠানের শুধু নিরাপত্তা বিধানের জন্য নয়। এই বিবেচনায় পরবর্তীতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন নির্বাহী পরিচালককে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী প্রধান করে প্রেষণে প্রেরণের ব্যবস্থা করে।

বিশ্বে স্বাধীন দেশের সংখ্যা দুই শতাধিক হলেও সারা পৃথিবীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে নোট মুদ্রণের ছাপাখানা আছে মাত্র ৬৫টি, যার মধ্যে বাংলাদেশের ‘টাকশাল’ একটি। দেশ হিসেবে ব্যাপারটা নিশ্চয় মর্যাদা ও গর্বের। প্রতিষ্ঠানটির নাম হচ্ছে, ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড’। ইংরেজি শব্দ ‘মিন্ট’-এর বাংলা হচ্ছে টাকশাল—যেখানে ধাতব মুদ্রা বা কয়েন বানানো হয়; কিন্তু সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে টাকা ছাপানো হলেও কোনো কয়েন তৈরি হয় না; তবুও সাধারণ মানুষগুলো এই প্রতিষ্ঠানটিকে ‘টাকশাল’ বলেই ডাকে। কম মূল্যমানের নোটগুলো অপেক্ষাকৃত বেশি হাত বদল হয় এবং এই নোটগুলো ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলেও বদলিয়ে নেওয়ার জটিলতায় কেউ ব্যাংকের দ্বারস্থ হয় না। এই সকল বিবেচনায় কম মূল্যমানের কাগজি নোটের পরিবর্তে ধাতু নির্মিত কয়েন বিদেশ থেকে আমদানী করে ইস্যু করা হয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের জনগণ কয়েন ব্যবহারে একেবারেই অভ্যস্ত নয় এবং কয়েন ব্যবহারের অপরিহার্যতা আমাদের দেশে এখনো সৃষ্টি হয়নি। তবে কয়েন বানানোর নিমিত্তে প্রকল্প পরিকল্পনায় রাখা একটি বিরাট জায়গা এখনো খালি রয়েছে। কিন্তু আর্থিকভাবে লাভ-লোকসান বিশ্লেষণে দেশের জন্য কয়েন উৎপাদন লাভজনক বিবেচিত না হওয়ায় আমাদের টাকশালে এখনো কয়েন তৈরির কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। কয়েন উৎপাদনের কোন কাঁচামাল আমাদের দেশে নেই, বিভিন্ন কাঁচামাল নির্ধারিত অনুপাতে সংমিশ্রণ করে ব্ল্যাঙ্ক তৈরি করার জন্য মেশিন সংস্থাপন কোনভাবেই লাভজনক নয়; আমরা শুধু ব্ল্যাঙ্কগুলো আমদানী করে কয়েনের নির্ধারিত আকারে কর্তন করতে পারতাম; কিন্তু কয়েনের জন্য অরিজিনেশন ইউনিট গড়ে তোলা অধিক ব্যয়সাপেক্ষ যা সর্বদা ব্যবহৃত হতো না। অন্যদিকে এক বছর বা দুই বছর কয়েন উৎপাদন করে হয়তো দশ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। ফলে বিদেশে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব না হলে কয়েন ফ্যাক্টরি অকেজো হয়ে পড়ে থাকবে। বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানীর মাধ্যমে দরপত্রে অংশগ্রহণ করে প্রতিযোগিতায় টেকার সম্ভাবনা নেই। যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী বিবেচ্য তা হচ্ছে, আমাদের দেশে কয়েন ব্যবহারের কোন ব্যবস্থা নেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ট্রাম, বাস, ট্রেনে যাতায়াত বা রাস্তার ধারে স্থাপিত কোন মেশিন থেকে কোন পানীয় কিনতে হলে অবশ্যই কয়েন প্রয়োজন; এক্ষেত্রে কাগজের নোট ভাঙ্গিয়ে কয়েন করে নিতে হয়। আমাদের দেশে এক সময় চার আনা বা পঁচিশ পয়সার একটি কয়েন দিয়ে বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত টেলিফোন সেট থেকে কথা বলা যেত, তাও এখন নেই। কেউ পকেটে কয়েন নিয়ে ঘর থেকে বের হন না। কয়েনের ব্যবহারে জনগণকে অভ্যস্ত করে তোলার অভিপ্রায়ে এক সময় এক ও পাঁচ টাকার কাগজী নোটের মুদ্রণ বন্ধ ছিলো; পরে দেখা গেল কাগজী নোটের অভাবে বিভিন্ন বাস কাউন্টার থেকে নিজেদের তৈরি করা টোকেন ব্যবহার করছে, তবুও কয়েন ব্যবহার করছে না। এই অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক পুনরায় নিম্ন মূল্যমানের কাগজী নোট ছাপানো শুরু করতে বাধ্য হয়।

টাকশালে শুধু যে টাকাই ছাপানো হয় তা কিন্তু নয়। টাকা মুদ্রণের উদ্দেশ্যে স্থাপিত হলেও সরকারের বিভিন্ন নিরাপত্তা সামগ্রীও এখানে মুদ্রণ করা হয়; যেমন—অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সঞ্চয়পত্র, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, রাজস্ব স্ট্যাম্প, আদালতের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন নিরাপত্তামূলক সামগ্রী, স্মারক ডাকটিকিট, খাম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যাক্স লেবেল, ব্যাংকের চেক বই, প্রাইজবন্ড, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর জিএসপি ফরম, দেশের সকল শিক্ষা বোর্ডের বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার নম্বরপত্র ও সনদপত্র ইত্যাদি। এছাড়াও কোনো কোনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধে তাদের শিক্ষা সনদও মুদ্রণ করা হয়ে থাকে।

টাকা মুদ্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের আগ্রহ প্রচুর। প্রায় ছেষট্টি একর জায়গা নিয়ে দেশের টাকা তৈরির একমাত্র এই কারখানাটির চারিদিকে অজস্র গাছগাছালি এবং বৃক্ষশোভিত বলেই টাকশালের অভ্যন্তর সব সময় পাখির কলরবে মুখরিত থাকে। শুধু প্রাকৃতিক দিক থেকেই নয় টাকা মুদ্রণের একক ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়ায় কারণে প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে কিছুটা ভিন্নও। কিন্তু বহুস্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এই প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব কর্মী ও স্বয়ং প্রতিষ্ঠানটিকে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। প্রায় ৮০ জন জনবল নিয়ে পুলিশ ফোর্স প্রতিষ্ঠানের বাইরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে থাকে। এই প্রেসে প্রবেশ করতে হলে চারটি গেইটে নিরাপত্তাকর্মী ও পাহারারত পুলিশকে প্রয়োজনীয় তথ্য পরিবেশন করতে হয়। প্রেসের মূল ফটক ও ভেতরের হলগুলোতে কর্মচারী, কর্মকর্তাদের চলাচলে একসেস কন্ট্রোল ছাড়াও সকল কর্মকর্তা, কর্মচারী ও অনুমতিপ্রাপ্ত গ্রাহকদের ছাপাখানায় প্রবেশকালীন ম্যানুয়াল দেহতল্লাশির নিমিত্তে এবং ব্যক্তি ও মালামালের আগমন-নির্গমন নিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট তথ্য এন্ট্রি করার জন্য করপোরেশনের নিজস্ব শতাধিক নিরাপত্তাকর্মী রয়েছে। কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের প্রেসের অভ্যন্তরে চলাচলেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়ে থাকে। মুদ্রণসহ যে কোনো নিরাপত্তা সামগ্রী উৎপাদনে অনেকগুলো পর্যায়ে বিভিন্ন হলে কর্ম সম্পাদন সম্পন্ন করা হয়ে থাকে; নির্ধারিত কর্মচারী ও কর্মকর্তা ব্যতীত অন্যরা এক হল থেকে অন্য হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করতে পারে না। প্রতিটি হলের জন্য আলাদা আলাদা এন্ট্রি পাস ছাড়াও প্রতি হলের দরজায় নিরাপত্তাকর্মীরা অন্যদের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। উৎপাদন প্রক্রিয়ায়ও নিরাপত্তা বিধানের ব্যবস্থা রয়েছে। সংগৃহীত কাঁচামাল ও উৎপাদিত সামগ্রীর মধ্যে সমন্বয়নের পদ্ধতি এই প্রতিষ্ঠানে গুরুত্ব সহকারে পরিপালন করা হয়ে থাকে। সমন্বয়ন বা রিকনসিলিয়েশনে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকে। যতক্ষণ সংগৃহীত কাঁচামালের সঙ্গে উৎপাদিত পণ্য ও ওয়েস্টেজ বা অপচয়ের মিল হবে না ততক্ষণ হিসাবায়ন চলতে থাকে, হিসাব মিলে গেলে গ্রাহক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ওয়াস্টেজ ধ্বংস করা হয়। এমন নিরাপত্তা বিধান ও স্বচ্ছতার কারণে এই টাকশাল গ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্জনে সমর্থ হয়েছে।

১৯৭১ সনে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও দেশে কিছুদিন পাকিস্তানি টাকার প্রচলন ছিল। তখন ঐ টাকাগুলোতে ‘বাংলাদেশ’ লেখা স্ট্যাম্প ব্যবহৃত হতো। পাকিস্তানি মুদ্রার পরিবর্তে বাংলাদেশের মুদ্রা হিসেবে টাকার প্রচলন শুরু হয় ৪ মার্চ ১৯৭২ সনে। টাকশালের টাকা ছাপানো শুরুর আগ পর্যন্ত ভারত, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি থেকে বাংলাদেশের নোট মুদ্রণ করে আনা হতো। সংগ্রহ নীতিমালা অনুসরণ করে একটি ভিন্ন দেশ থেকে নোট মুদ্রণ করে সময়মত আনা কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় আমাদের দেশেই নোট মুদ্রণের একটি ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। নোট মুদ্রণের জন্য একটি প্রেস স্থাপনের ব্যাপারে ১৯৮৩ সনে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ বা একনেকে সিদ্ধান্ত নেয়ার পর ১৯৮৯ সনে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয়; তবে উদ্বোধনের পূর্বে ১৯৮৮ সনেই পরীক্ষামূলকভাবে ১ টাকা ও ১০ টাকার নোট ছাপানো হয়েছিল। প্রথম দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রকল্প হিসেবেই এই প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেকের অনুমোদনের পর অর্থ-মন্ত্রণালয় নোট মুদ্রণের এই প্রকল্পটির বাস্তবায়নের দায়িত্ব দিয়ে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন করে। পরবর্তী সময়ে যৌথ মূলধন কোম্পানির অনুমোদন নিয়ে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে; যার নামকরণ করা হয় ‘দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন’। শুনেছি, ‘দ্য’ নির্দেশকটি তৎকালীন অর্থসচিব ড. আকবর আলী খানের দেওয়া।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন গ্রাহক প্রতিষ্ঠান সচরাচর বছরভিত্তিক তাদের প্রয়োজন মোতাবেক পণ্যের চাহিদা বা কার্যাদেশ প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী নোটের উৎপাদন ও সরবরাহ করা টাকশালের পক্ষে ইতঃপূর্বে কখনো সম্ভব হয়নি। ৩০ বছর পূর্বে সংস্থাপিত স্বল্প সংখ্যক মেশিন দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটানো টাকশালের পক্ষে সম্ভব ছিলো না; সম্প্রতি আরেকটি উৎপাদন লাইনের মেশিন সংস্থাপন হওয়ার পর নতুন মেশিনে উৎপাদন শুরু হয়েছে। মেশিনের স্বল্পতার জন্য কয়েকটি মূল্যমানের নোট একই সময়ে মুদ্রণ করা সম্ভব হয় না; একটি নোট সম্পন্ন করতে প্রায় ত্রিশটি পর্যায় অতিক্রম করতে হয়। নোট উৎপাদনের পরিমাণ নিয়মিত বাংলাদেশ ব্যাংককে অবহিত করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের বিভিন্ন অফিসের প্রয়োজনানুযায়ী বিভিন্ন মূল্যমানের নোটের চাহিদা জানালে টাকশালের ভল্ট থেকে তা সরবরাহ করা হয়ে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব স্বকীয়তায় ১৯৯২ সনে প্রকল্প থেকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব কিছুটা হ্রাস পায়; এই কর্তৃত্ব চলে যায় পরিচালক পর্ষদের হাতে। বর্তমানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে গঠিত সাত সদস্য বিশিষ্ট পরিচালক পর্ষদ এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। এই পরিচালক পর্ষদ প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী কর্তৃপক্ষ। অর্থ-মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ডাক বিভাগের প্রতিনিধিসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডেপুটি গভর্নর ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই পরিচালক পর্ষদের সদস্য। টাকশালের সমুদয় মূলধন বাংলাদেশ ব্যাংক যোগান দিয়েছে।

বাংলাদেশে নয়টি মূল্যমানের কাগজি নোট রয়েছে; অবশ্য বর্তমানে এক টাকা মূল্যমানের কাগজি নোট আর মুদ্রণ হয় না। বাকি নোটগুলো গাজীপুরে অবস্থিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনে ছাপা হয়ে থাকে। এছাড়া সবগুলো স্মারকনোটও এই টাকশালেই মুদ্রিত। উচ্চ মূল্যমানের নোটগুলো জাল হয় বলে এই নোটগুলোর নকল রোধে অধিক নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্যের সংযোজন করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজাইন এডভাইজরি কমিটি নোটের যে ডিজাইন করে তা দিয়ে মাস্টার প্লেইট তৈরি করা যায় না, বিদেশ থেকে ডিজাইন ও মাস্টার প্লেইট তৈরি করে আনতে হয়। আমাদের মুদ্রণ জগতের বর্ণ, শব্দ, বাক্য, ছবি, ডিজাইন সব কিছু ডট বা বিন্দুর সমন্বয়ে সৃষ্ট। অন্যান্য লেখা, ডিজাইনে ডট পদ্ধতি ব্যবহৃত হলেও কাগজের নোটে ব্যবহৃত হয় লাইন পদ্ধতি। একটি স্থানে অধিক ডট দেওয়া গেলে তা লাইন পদ্ধতির ডিজাইন বা লিখন হয়ে যায়। আমাদের সাধারণ মুদ্রণে প্রতি ইঞ্চিতে দেড় বা দুই হাজার ডট ব্যবহৃত হয়; অন্যদিকে নোটে প্রতি ইঞ্চিতে সর্বোচ্চ দশ বা বার হাজার ডট ব্যবহৃত হয়। এই পদ্ধতির ডিজাইন ও মাস্টার প্লেট করার কোন সফটওয়্যার, যন্ত্রপাতি এবং কারিগরি জ্ঞান না থাকায় জালকারীরা হুবহু আসল নোট তৈরি করতে সমর্থ হয় না; আতশী কাচ বা ম্যাগনিফায়িং গ্লাস দিয়ে নকল নোট পর্যবেক্ষণ করলে ডিজাইন ও লেখায় ডট পরিলক্ষিত হবে, কিন্তু আমাদের আসল নোটগুলো এই আতশী কাচ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলে ডট নয়, অনবচ্ছিন্ন অভঙ্গুর লাইন দেখতে পাওয়া যাবে। একবার মাস্টার প্লেইট করার পর এই ইউনিটের কোন কাজ থাকে না বলে উচ্চ মূল্যের মেশিনপত্র দিয়ে টাকশালে এই শাখাটি গড়ে তোলা হয়নি।

আমি ২০০৭ থেকে ২০১৭ সন পর্যন্ত টাকশালে ছিলাম। টাকশালের প্রায় ১০০০ কর্মচারী, কর্মকর্তার নিরলস পরিশ্রমে যে নতুন কচকচে নোট উৎপাদন হয় সেই নতুন নোটে তাদের বেতন হয় না বলে একটু আক্ষেপ তাদের মধ্যে লক্ষ্য করেছি। যে টাকা তারা তৈরি করে সেই টাকা ভুলক্রমে বাসা থেকে অফিসে প্রবেশের সময় তাদের সাথে পাওয়া গেলে তার জন্যও তাদের শাস্তি ভোগ করতে হয়। অধিকাংশ কর্মচারী, কর্মকর্তাকে অতিকালীন কাজসহ পুরো দিনটি পরিবারের সদস্যদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে হয়; কারণ উৎপাদন এলাকায় মোবাইল ফোন নেয়া নিষিদ্ধ। টাকশাল এ বছর ৩০ বছর পূর্ণ করেছে। সময়ের হিসেবে যা হয়তো খুবই কম সময়। তবে এই ৩০ বছরের মধ্যে আমি ১০টি বছর টাকশালে টাকা ও অন্যান্য নিরাপত্তা সামগ্রী উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। তাই নির্জন নিরিবিলি পরিবেশে কর্মচারী, কর্মকর্তা ও তাদের পোষ্যদের সাথে এক পরিবারভুক্ত হয়ে সময় কাটানোর জন্য টাকশালের ঐ চাকুরী জীবনটুকু নিজের কাছে কিছুটা আলাদা মনে হয়। এছাড়া এই সময়েই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যুক্ত থেকে পার্থিব জগতে মানুষের সবচেয়ে প্রিয় 'টাকা' মুদ্রণের সুযোগ পেয়েছি। তবে টাকা তৈরির অভিজ্ঞতা কোন কাজে লাগে না বলে অবসর জীবনে নিষ্কর্মা বনে গেছি।

লেখক: সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবং সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।