আজ ৩/২/২০১৯ তারিখ, রবিবার দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার লেখা উপসম্পাদকীয়টি বন্ধুদের জন্য পোস্ট করলাম।
দুর্নীতির মাত্রা বেড়ে গেল
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের পর্যালোচনায় ২০১৮ সনে বাংলাদেশে দুর্নীতি বাড়ার কারণে বাংলাদেশের অবস্থান আরও খারাপ হয়ে চার ধাপ পিছিয়ে ১৭তম স্থান থেকে ১৩তম স্থানে দাঁড়িয়েছে। দুর্নীতির ব্যাপকতা বিবেচনায় বাংলাদেশের চেয়ে যে দেশগুলোর অবস্থা আরও খারাপ সেই দেশগুলো হচ্ছে—সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, উত্তর কোরিয়া, সিরিয়া, লিবিয়া, ইয়েমেন ও আফগানিস্তান। সোমালিয়ার অবস্থান প্রায় প্রতি বছর সর্বনিম্ন থাকে। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পরপর পাঁচবার বাংলাদেশ সর্বনিম্ন স্থানে ছিল। দুর্নীতির রোধে প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্সের কথা বারবার বলে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন যে হারে বাড়ানো হয়েছে, তা বিশ্বে বিরল। … বেতন যেহেতু বেড়েছে তাই ঘুষ-দুর্নীতি সহ্য করা হবে না।’
আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় ঝানু নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করায় জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। জনগণের ধারণা, প্রবীণ রাজনীতিবিদেরা নিজেদের আওয়ামী লীগের জন্য অপরিহার্য ভেবে অহঙ্কারে বুঁদ হয়ে থাকেন। আগের মন্ত্রীরা সৎ ছিলেন কিনা তা মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে তাদের নেতৃত্বে পরিচালিত কোন মন্ত্রণালয়ে জনগণের ভোগান্তির কমতি ছিলো না। তবে আগের উপদেষ্টাদের পুনরায় বহাল করার কারণে সাধারণ জনগণ একটু হতাশও হয়েছে। আসলে জনগণের প্রত্যাশা ছিলো নতুনত্বের; গতিশীল ব্যবস্থাপনায় নতুনদের সমাবেশে একটি অচেনা-অজানা আবহের সৃষ্টির মাধ্যমে দুর্নীতি দূর হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে নতুন মন্ত্রীদের ব্যক্তিগত স্টাফের ব্যাপারে একটু সতর্ক থাকতে হবে। ব্যক্তিগত অনেক স্টাফের দাপট কোন নিয়ম-নীতি দিয়ে বেঁধে রাখার উপায় থাকে না। আর একটি বিষয় খেয়াল রাখা দরকার—চাকুরী, ব্যবসা না করা সত্ত্বেও তাদের বউরা যেন মন্ত্রী মহোদয়ের চেয়ে বেশী সম্পদের মালিক না হয়ে যান। আরও কিছু বিষয়ে তাদের মনে রাখা অপরিহার্য। নথিতে ত্বরিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার দক্ষতা ও ক্ষমতা দুর্নীতি রোধের সহায়ক। বহু কারণে নথি দীর্ঘদিন টেবিলে পড়ে থাকতে পারে; এর মধ্যে দুটি কারণ মুখ্য বলে আমার মনে হয়। এক—নথিতে উপস্থাপিত বিষয়টি সম্যকভাবে না বুঝতে পারা, দুই—দুর্নীতি করার উদ্দেশ্য নথি ধরে রাখা। সততা একটি মহৎ গুণ; কিন্তু সৎ হয়েও কাজের প্রতি অনীহা দেখানো আরও বেশী অসততার পরিচায়ক। অনেক সৎ লোক অফিস বাদ দিয়ে মসজিদে গিয়ে সময় কাটান। জবাবদিহিতা না থাকায় অধস্তন কর্মচারী বা কর্মকর্তারা কাজ সম্পাদনে নির্লিপ্ত থাকে। কাজের প্রতি অনীহার কারণে এবং দুর্নীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য নথি বা চিঠিপত্র লুকিয়ে ফেলা হয়। নথি না হারালেও একটি কমন কথা দুর্নীতিপরায়ণ কর্মচারী বা কর্মকর্তা বলে থাকে, 'আজ ব্যস্ত আছি, কাল আসুন'। সৌদি আরবে নাকি কাজের তদবিরে গেলে প্রায় সকল কর্মচারী বা কর্মকর্তা একটি কথা বলে থাকে, 'ইনশাল্লাহ হয়ে যাবে'; কিন্তু এই কাজ আর কখনো হয় না। শুধু রাজনৈতিক আশ্রয়, প্রশ্রয়ের কারণে সিবিএ নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হয় না। অনলাইনে দরপত্র দাখিলের ব্যবস্থা থাকায় টেন্ডারবাজি কিছুটা কমেছে, কিন্তু কার্যাদেশ পাওয়ার পর সন্ত্রাসীদের পার্সেন্টেজ না দিয়ে একমাত্র সেনাবাহিনীর পক্ষেই কাজ করা সম্ভব হয়।
একেবারেই দুর্নীতি নেই এমন একটি দেশ পৃথিবীর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। আমার মেজ ভাই জাকার্তায় বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকুরিরত অবস্থায় আমাকে লিখেছিলেন যে, ইন্দোনেশিয়ায় ঘুষ নিয়ে রশিদও দেওয়া হয়। আমাদের দেশে রশিদ দেওয়ার রেওয়াজ না থাকলেও ঘুষ গ্রহণে কোন লজ্জা-শরম নেই। স্বজনপ্রীতিও এক ধরনের দুর্নীতি। আমাদের দেশে স্বজনপ্রীতিকে সাধারণত দুর্নীতি মনে করা হয় না। ড. আহমেদ শরীফ সুপারিশকেও দুর্নীতি মনে করতেন। তিনি বলতেন, যাদের প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর লোক আছে তারা অনৈতিকভাবে কাজ আদায়ে সুপারিশ করিয়ে থাকে; যাদের এমন ক্ষমতাশালী লোক নেই তারা অগত্যা ঘুষ দেয়। এক সময় একটি শ্লোগান প্রচারিত ছিলো—পিস্তল ঠেকিয়ে সন্ত্রাসীদের টাকা নেয়া আর ফাইল ঠেকিয়ে আমলাদের টাকা নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।
কোন এক বছর টিআইবি'র রিপোর্টে পুলিশদের সবচেয়ে বেশী দুর্নীতিগ্রস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিলো। সারা দেশে দুর্নীতির যে বিস্তৃতি তাতে পুলিশের দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। প্রয়াত শিক্ষাবিদ আবুল ফজল বলেছেন, মানুষ পরকালের দোজখের যমের চেয়ে ইহকালের থানার দারোগাকে বেশী ভয় পায়। আমাদের দেশে একদিন থানায় বা কিছুদিন জেল হাজতে থাকার চেয়ে দোজখে থাকা অনেক সুখকর। পুলিশ থানায় ও ডিবি অফিসে নিয়ে টাকার জন্য ধরে নেয়া ব্যক্তিদের যেভাবে নির্বিচারে পেটায় তা ব্রিটিশ আমলে সত্য ঘটনার উপর লেখা এক অজ্ঞাতনামা লেখকের 'মিয়াজান দারোগার একরারনামা' বইটিতে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, টিআইবি'র প্রতিবেদন প্রকাশের পর সেই প্রতিবেদনকে শুধু অস্বীকার করা হয় না, সব সরকারের আমলে চ্যালেঞ্জও করা হয়। বিএনপি'র শাসনামলে টিআইবি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেওয়া হয়েছিলো। টিআইবি'র সর্বশেষ প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির ধারণা সূচক তৈরির পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুই দিন আগে তথ্যমন্ত্রীও টিআইবি'র প্রতিবেদনকে ধোলাই করেছেন। এই অস্বীকৃতি ও চ্যালেঞ্জ সংস্কৃতি দুর্নীতির মূলোৎপাটনের সহায়ক হতে পারে না। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দলীয়করণের মহাব্যাধিতে আক্রান্ত থাকার কারণে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা অনেক সময় সম্ভব হয় না। মিডিয়ায় মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলে দুর্নীতি কমার কথা; কিন্তু মিডিয়ার রিপোর্টারদের অনেকের চরিত্র হচ্ছে, ব্ল্যাকমেইলিং করে অবৈধ আয় করা। বিগত বছরগুলোতে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী প্রশ্ন ফাঁসের কথা স্বীকার করতে চাননি। নিজেদের অপরাধ ঢাকার জন্য প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী প্রধানসহ সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী একজোট। কিছুদিন আগে দুর্নীতির জন্য দুদক জাতীয় রাজস্ব বিভাগের আয়কর বিভাগের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে সাথে সাথে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান দুদকের লোক লোকবলের দুর্নীতির প্রতি ইঙ্গিত করেন। সেবা খাতে এক সময় দুর্নীতির ব্যাপকতার কোন রাখঢাক ছিলো না। এখন পানি এবং বিদ্যুতের মিটার মাঝে মাঝে নষ্ট করে দিয়ে নতুন মিটার বসানোর একটা দুরভিসন্ধি পরিলক্ষিত হয়। ব্যাংকের ইমেজ যেভাবে নষ্ট হয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা আদৌ সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির বদনামটা এখনো গেল না; অসুস্থ অবস্থায় মানুষ অসহায় বলে বেশী উচ্চবাচ্য করতে পারে না। কোন কোন প্রতিষ্ঠান কোন পণ্য ক্রয় না করেই লক্ষ লক্ষ টাকা ভুয়া সরবরাহকারীর অনুকূলে পরিশোধ করে বলে অভিযোগ রয়েছে; কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব তা আমার মাথায় আসে না। ক্রীত পণ্যের কি ইনভেন্টরি হয় না? বড় বড় কর্মকর্তারা এর সাথে সংশ্লিষ্ট না হলে এমন ডাকাতি কখনো সম্ভব হতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট প্রশস্তের রাস্তা সম্মুখে না থাকলে কোন বাড়ী নির্মাণের প্ল্যান অনুমোদন হওয়ার কথা নয়; দুজন লোক পাশাপাশি হাঁটতে পারে না এমন প্রশস্তের রাস্তার পাশে হাজার হাজার বাড়ী ঢাকা শহরে রয়েছে। ৫০টির বেশী খাল ঢাকা শহরে ছিলো, বেশীরভাগ কীভাবে লোকচক্ষুর অন্তরালে ভরাট হয়ে গেল কেউ জানে না। এসব বিষয় মনিটরিং করার লোক নিশ্চয়ই প্রতিমাসে বেতন পান। জবাবদিহিতা নেই। জাল সার্টিফিকেট দিয়ে চিকিৎসক আমাদের জীবন নিয়ে খেলা করছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি করে দোকানদার আমাদের মৃত্যুদুয়ারে পাঠাচ্ছে, ঘুষের ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে ড্রাইভার রাস্তায় মানুষ হত্যা করছে, জাল সনদে শিক্ষক শিক্ষা দিচ্ছে, নকল পুলিশ সেজে গ্রেফতারের ভয় দেখিয়ে বাটপার নিরীহ ভদ্রলোকদের নিকট থেকে টাকা আদায় করছে, আন্ডার ইনভয়েসিং, ওভারইনভয়েসিং করে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে, ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে বিনা শুল্কে আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি না করে দেশীয় বাজারে বিক্রি করে কিছু ব্যবসায়ী অধিক লাভবান হচ্ছে, অল্প মজুরীতে শ্রমিক ও কাঁচামাল সহজলভ্য হওয়া সত্ত্বেও রাস্তাঘাট ও সেতুর নির্মাণ ব্যয় বাংলাদেশে সর্বাধিক কেন তার কৈফিয়ত কাউকে দিতে হয় না। সরকারি খাতের এমন অযোগ্যতা ও দুর্নীতি প্রাইভেট সেক্টরকেও পেছনদিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত দুর্নীতি কমানো সম্ভব হবে না। সম্প্রতি দুদক লক্ষণীয়ভাবে সক্রিয় হয়েছে। তাদের প্রতি যে ভয় তা যেন সৎ লোকদের হেনস্থা করার জন্য না হয়। সৎ, সাহসী, দক্ষ, বিচক্ষণ ও ত্বরিতকর্মা কর্মচারী, কর্মকর্তারা কাজ করেন বলে ভুল হতে পারে, ব্যক্তিগত লাভ সংশ্লিষ্ট না থাকলে খুঁচিয়ে ভুল বের করে এমন লোকদের অপরাধী বানানো হলে এরা কাজে আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। সবার ধারণা, নিরপরাধী হলে আদালত থেকে নিশ্চয়ই নিষ্কৃতি পাবে; কিন্তু সরকারি খরচে পরিচালিত মামলার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে ব্যক্তিগত টাকা খরচ করে নিষ্কৃতি পেতে বাপের সম্পত্তি ও বউয়ের স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করেও কুলানো সম্ভব নয়।
দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও
দুর্নীতি প্রায়ই নেই এমন দেশও রয়েছে এবং এমন দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সুইডেন, ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড, ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস; আর দুর্নীতি তুলনামূলকভাবে খুবই কম এমন দেশের মধ্যে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, কানাডা, জার্মানি, লুক্সেমবার্গ, যুক্তরাজ্য। বিভিন্ন অপরাধ ও দুর্নীতির কারণে আমাদের জেলখানাগুলো যেখানে কয়েদিতে উপচে পড়ছে, সেখানে নেদারল্যান্ডসের জেলখানাগুলো কয়েদির অভাবে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। আরব বিশ্বের মিশর, লেবানন, জর্ডান, আলজেরিয়া, মরক্কো, ফিলিস্তিন, সুদান ও তিউনিসিয়া প্রভৃতি দেশে দুর্নীতি দিনদিন বাড়ছে। সামান্য চুরির জন্যও সৌদি আরবে জনসম্মুখে হাতের কব্জি কেটে ফেলা হয়; কিন্তু দুর্নীতির মূলোৎপাটন করা সম্ভব হয়নি। কিছুদিন আগেও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে দুর্নীতির জন্য গ্রেফতার করা হয়েছিলো। জেলখানায় কিছুদিন কাটানোর পর অপরাধীরা সংশোধন হওয়ার কারণে পৃথিবীর অনেক কারাগার পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশসহ মুসলিম দেশগুলোর কারাগারগুলো কারা কর্তৃপক্ষের একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠে বলে অল্প অপরাধী জেল খেটে বাইরে এসে ভয়ঙ্কর অপরাধী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আমাদের দেশে আবার জেলখানাগুলো অপরাধের অভয়ারণ্য বলে এই জেলখানা থেকে দেশের সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীদের পরিচালনা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওখানে টাকা খরচ করলে নাকি স্বর্গসুখ পাওয়া যায়, আর টাকা না দিলে দোজখ। বঙ্গবন্ধুর বন্দী জীবনের বর্ণনায় জেলখানার ভেতরের অনেক গূঢ় রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। জেল হাজতে আমার এক সহকর্মীকে অনেকদিন আগে দেখতে গিয়েছিলাম; দেখলাম, চিকন তার দিয়ে বেঁধে একজন বাইরে থেকে জানালার সরু পথে আরেক কয়েদিকে অনেকগুলো পাঁচশত টাকার নোট দিচ্ছে। প্রহরী পুলিশ মৃদু আপত্তি করলে ঐ লোকের উত্তর, 'টাকা তো আপনাদের চাহিদা মেটাতেই ভেতরে দেওয়া হচ্ছে, বাধা দেন ক্যান'। পুলিশের কারসাজিতে বহু লোক বিনা অপরাধে জেল খেটেছে; আবার অপরাধী আদালতের আদেশ জাল করে জেলখানা থেকে বেরিয়েও গেছে।
দুর্নীতিবাজরা সমাজের ঘৃণিত ব্যক্তি না হলে দুর্নীতি আইন করে দূরীভূত করা কঠিন। যে লোক দুর্নীতি করে তাকে মসজিদে সবাই জায়গা করে দেয় সামনের কাতারে যাওয়ার জন্য; পরে এসেও সামনের কাতারে যাওয়ার তার একটিই গুণ—তিনি ধনবান ও প্রভাবশালী। সমাজ এদের অতিমূল্যায়ন বন্ধ না করলে দুর্নীতি যে খারাপ তা উপলব্ধি হবে না; কঠোর আইন যা করতে পারবে না, সমাজের ঘৃণা তার চেয়ে অনেক বেশী করতে পারবে। দুর্নীতি দূর করতে প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি বন্ধ করতে পারে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। এটা করতে হলে সবার আগে নেতৃত্বকে সৎ হতে হবে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন জনপ্রশাসনকে ধ্বংস করে ফেলেছে। হারাম রুজি দিয়ে হালাল খাওয়ার প্রতিযোগিতা শুধু মুসলমানদের মধ্যেই দেখা যায়। দুঃখজনক হচ্ছে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধর্মের অনুসারী হয়েও কোন একটি মুসলিম দেশ আজও ইহুদি, নাসারাদের দুর্নীতিমুক্ত দেশ ডেনমার্ক, নিউজিল্যান্ড, সুইডেন হতে পারল না।
লেখক বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
zeauddinahmed@gmail.com