পরীক্ষার হলে একটি মোবাইল নেয়ার জন্য ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের নবম শ্রেণির এক ছাত্রী অরিত্রীকে শিক্ষিকাদের তরফ থেকে গালমন্দ করা হয়েছে, অরিত্রীর বাবাকে স্কুলে ডেকে নিয়ে মেয়ের পরীক্ষায় নকল করার কাহিনী শোনানো হয়েছে। এগুলো প্রায় প্রতি স্কুলে করা হয়ে থাকে; কিন্তু করা হলেও পিতার সম্মুখে মেয়েকে মানসিক লাঞ্ছনা করা শিষ্টাচারবহির্ভূত। মা-বাবার অজান্তে অরিত্রীকে বেদম পেটানো হলেও অরিত্রী সম্ভবত কোন প্রতিবাদ করত না। সব স্কুলে না হলেও ভিকারুননিসা নূন স্কুলের মতো নামকরা একটি স্কুলে নকল করার গর্হিত অপরাধটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় অরিত্রী এমনিতেই গ্লানিতে ভুগছিল; টিসি দিয়ে দেওয়ার হুমকিতে অরিত্রী দিশেহারা হয়ে পড়ে। কারণ টিসি দেওয়ার পর আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও সহপাঠীরা এক লহমায় সত্যটা জেনে যাবে। তাই অরিত্রী অধ্যক্ষ, সহ-অধ্যক্ষসহ স্কুলের হর্তাকর্তাদের পা জড়িয়ে ধরে ক্ষমা ভিক্ষে করে অবশেষে সম্মানটুকু বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। জন্মদাতা বাবার পাও হয়তো এভাবে করুণ নয়নে কখনও জড়িয়ে ধরতে হয়নি, সেই বাবার উপস্থিতিতে পা ধরতে হয়েছে শিক্ষকের। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি; শিক্ষক ক্ষমা করেননি। অগত্যা আত্মহনন বেছে নিয়ে জীবনাবসানকে মুক্তির একমাত্র পথ বলে বিবেচনা করেছে অরিত্রী। তার যে ছোট বোনটি ভিকারুননিসা নূন স্কুলের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ছে তার জন্য এ স্কুল ও শিক্ষকেরা এখন থেকে যমালয় ও যমদূত হিসেবে বিবেচিত হবে।

পত্রিকায় দেখলাম, অরিত্রীর সম্মুখে তার বাবাকে অপমান করা হয়েছে। করাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। হয়তো বলা হয়েছে, ‘এমন মেয়ের জন্ম দিলেন কেন, যে দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ভিকারুননিসা নূন স্কুলের বদনাম বয়ে আনল; এমন মেয়ে আমার হলে গলা টিপেই মেরে ফেলতাম।’ বাবাও হয়তো ব্যর্থমনোরথ হয়ে অরিত্রীকে বলেছে, ‘মরতে পারিস না, তোর জন্য আজ আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল।’ কথাগুলো আমার কল্পনা; তবে সমাজে এমনই মানসিক শাসন লক্ষ্য করা যায়। সন্তান, বিশেষ করে মেয়ে সন্তানের কোন ভুল, ত্রুটিতে মা-বাবা রাগে-ক্ষোভে বলেই থাকে, ‘গলায় তোর রশিও জোটে না? গলায় কলসি দে।’ আবার গলায় কলসি দিলেও সমালোচনার কমতি হয় না। আত্মহত্যা করলে অনেকে বলতে থাকেন, ‘এই সামান্য কারণে মরতে হয় নাকি?’ আত্মহত্যার আগে এমন সমমর্মিতা চারপাশে থাকলে একটি আত্মহননও হতো কি না সন্দেহ। শিক্ষকদের লাঞ্ছনার পর নিশ্চয়ই অরিত্রীর পাশে কেউ অভয়বাণী নিয়ে তার মনের গ্লানি নিরসনে এগিয়ে আসেনি। মা-বাবা যদি বলতেন, ‘আমরা এমন নামকরা স্কুলের নিকুচি করি, অন্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীও লেখাপড়া করে, বাংলাদেশের সব মেয়ে ভিকারুননিসায় পড়ে না, তোকে অন্য স্কুলে ভর্তি করাব’—তাহলে বোধ হয় অরিত্রী মরত না। আত্মহত্যার কিছুক্ষণ আগে অরিত্রী নাকি তার মাকে জানায়, ‘মা, এ লজ্জা নিয়ে বাঁচতে চাই না।’

ভুল-ত্রুটি, বিচ্যুতির বিরুদ্ধে গঞ্জনা হবেই, এর জন্য আত্মহত্যা কোন সমাধান নয়। তবে অরিত্রীর প্রতি এখন যে সহানুভূতি তা আত্মহত্যা না হলে হতো না। অরিত্রীর মতো আমরা সবাই এত সংবেদনশীল নই বলেই আমরা এখনও বেঁচে আছি। অন্যায়, অসত্য, নির্যাতন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বললে রাস্তায় রাস্তায় অপমানিত হতে হবে। চোখ বুজে রাস্তায় চলি। অপমানের প্রতিকারে অসহায়ত্ব আমাদের জীবন সংহারে প্ররোচিত করে থাকে। তবে অরিত্রীর মতো অপমান, লাঞ্ছনায় আত্মহত্যা করার প্রবণতা নেই বলেই সমাজে আমাদের মতো নিরীহরাসহ নামকরা স্কুলগুলোর ছাত্রছাত্রীরা এখনও দিব্যি জীবিত আছে। নামকরা অধিকাংশ স্কুলের শিক্ষকেরা নিজেদের দেবতুল্য ভাবে, মিডিয়ায় তাদের গুণগান গাওয়া হয়, প্রভাবশালী লোকেরা বিনয় সহকারে তাদের সঙ্গে কথা বলে থাকেন; কারণ তাদের সন্তানেরা তাদের তত্ত্বাবধানে লেখাপড়া করে থাকে। ক্ষমতাবান কিছু লোকের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণে এরা ক্ষমতা প্রয়োগে মাত্রাজ্ঞানের ধার ধারেন না। এইসব স্কুলের পিয়ন, দারোয়ানগুলোও অভিভাবকদের সঙ্গে কথাবার্তায় অভব্য হয়ে উঠে। এসব স্কুলের শিক্ষকদের কিছু জিজ্ঞেস করা যায় না, কিছু জানতে চাইলে সাক্ষাৎকার পেতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সুপারিশ লাগে। আমার ছেলে অর্ণব এবং মেয়ে ঐশী দু’জনই আইডিয়াল স্কুলে পড়েছে। আমার বাড়ির কাছে না হলে ওই স্কুলে পড়ানোর কোন ইচ্ছে আমার ছিল না। এ স্কুলের প্রধান শিক্ষক মরহুম ফয়জুর রহমান ছিলেন একজন হিটলার; অভিভাবকেরা কম-বেশি সবাই তার প্রশংসায় গদগদ ছিলেন। তার স্কুলের বিরুদ্ধে তাকে কিছু বলা যেত না, সেনাবাহিনীর সুশৃঙ্খল জীবনাচার ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দিতেন। চুল সামান্য বড় হওয়ার কারণে ডাস্টারে মাথায় বাড়ি দিয়ে আমার ছেলে অর্ণবকে এ প্রধান শিক্ষক একরোখা বানিয়ে ছেড়েছেন; এমন একরোখা হয়েছিল যে, ওই শিক্ষকের চুল সম্পর্কিত নীতির প্রতিবাদে মেয়েদের মতো লম্বা চুল নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার মনাশ ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে। একই স্কুলে আমার মেয়ে ঐশী প্রখর রোদে খেলাধুলা করার সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললে পয়সা খরচের অজুহাতে আমাদের একটি ফোন করার তাগিদ অনুভব করেননি। পরদিন প্রতিবাদ করতে স্কুলে গিয়েছিলাম, দারোয়ান ঢুকতেই দেয়নি। ফোনে একজন শিক্ষককে বিষয়টি বলা হলে তিনি আমার মেয়েকে টিসি নিয়ে অন্য স্কুলে চলে যেতে পরামর্শ দেন।

অরিত্রীর প্রতি প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপালের খারাপ আচরণ এবং অরিত্রীর আত্মহত্যায় ভিকারুননিসা নূন স্কুলের ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকেরা ক্ষেপেছেন, স্কুল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করছেন, মিডিয়ায় জোর গলায় দায়ী শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের অপসারণ ও বিচার দাবি করছেন। বিভিন্ন মিডিয়ায় অনেক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে এই স্কুলের শিক্ষকদের আচার-আচরণ ও অভিভাবকদের উদ্দেশ করে ছাত্রছাত্রীদের কটূক্তি করার অভিযোগ তুলে ধরছেন। কিন্তু শিক্ষকের শাস্তি দাবি করা একটি জাতির জন্য লজ্জাকর। কেন শিক্ষকেরা এমন রূঢ় আচরণ করে থাকেন? ছাত্রছাত্রীদের নৈতিক শক্তি ও মূল্যবোধে বলীয়ান হওয়ার পরামর্শ দিয়ে একই শিক্ষক যখন অন্য সময় অপরিশীলিত ভাষায় ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেন তখন তা অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে না। অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত নয় বলেই আজকাল কোন শিক্ষার্থী ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ নামক রচনায় ‘শিক্ষক হব’ এ কথাটি ঘুণাক্ষরেও বলে না। অবশ্য এর জন্য শিক্ষকদের খারাপ আচরণই একমাত্র দায়ী নয়, অন্য পেশায় যে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও দাপট দেখা যায় শিক্ষকতায় তা নেই। আমার মনে হয়েছে, আজকাল কোথাও চাকরি না পেয়ে লোকজন বাধ্য হয়ে স্কুল, কলেজে চাকরি করতে আসে। ফলে এ পেশার প্রতি তাদের শ্রদ্ধা ও দায়বদ্ধতা থাকে না। অনেক শিক্ষক মনে করেন, শিক্ষার্থীরা তাকে যত ভয় পাবে তিনি তত ভালো শিক্ষক। অভিভাবকেরাও তাই ভাবেন; তাই আগের দিনে শিক্ষকের হাতে শিক্ষার্থীকে তুলে দিয়ে অভিভাবক বলতেন, ‘দিয়ে গেলাম—মাংস আপনার, হাড্ডি আমার।’ শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকদের অনভিপ্রেত আচরণে প্রতিবাদ করে না, পরীক্ষায় কম নম্বর দিয়ে জব্দ করার ভয় থাকে। অভিভাবকেরাও লেখাপড়া চায় না, চায় পরীক্ষায় ভালো নম্বর।

স্কুলের ম্যানেজিং কমিটিও এমন দুর্বিষহ পরিবেশের জন্য কম দায়ী নয়। এসব নামিদামি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য হওয়ার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেভাবে প্রচার-প্রচারণা করা হয় তা কৌতূহলোদ্দীপক। সারা জীবনে হয়তো দশটি বই পড়েননি, নিয়মিত খবরের কাগজও পড়েন না এমন লোকগুলোও ম্যানেজিং কমিটিতে ঢোকার জন্য অজস্র অর্থ ব্যয় করে থাকেন। আমি একনাগাড়ে প্রায় সাত বছর রাজধানীর একটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান, আরেকটি স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য এবং আরেকটি স্কুলের প্রায় আট বছর পৃষ্ঠপোষক ছিলাম। অধিকাংশ ম্যানেজিং কমিটি লেখাপড়ার বিষয়গুলো এড়িয়ে আর্থিক বিষয়গুলোর ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করে থাকে; প্রধান শিক্ষক আর্থিক ও প্রশাসনিক কাজে এত ব্যস্ত থাকেন যে, ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়া তদারকি করার সময় পান না। অধিকাংশ শিক্ষকের অভিমত হচ্ছে, বেত ছাড়া ছাত্রছাত্রীদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তাদের কথা, আগের দিন ভালো ছিল, আগের দিনে পেটানো হতো বলে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়ায় মনোযোগী ছিল, বড়দের মান্য করত, শিক্ষকদের কথা শুনত। এখন বেত মারা নিষিদ্ধ বলে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকদের কেয়ার করে না। কিশোর ও তরুণদের প্রায় সবই খারাপ—এ কথাটি আমরা প্রবীণেরা প্রায়ই বলে থাকি। আমার ধারণা, এই কিশোর ও তরুণেরাই একদিন প্রবীণ হয়ে আমাদের মতো স্মৃতিচারণায় তাদের জমানার তরুণদের দায়ী করে নানা সমালোচনা করবে। এ বয়সে দুষ্টুমি করা যে স্বাভাবিক তা অনেক শিক্ষক মানতে চান না। আমি যে তিনটি স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলাম সেই তিনটি স্কুলের মধ্যে ছাত্রদের আচরণে কোন পার্থক্য দেখিনি; বাথরুমে হ্যান্ড শাওয়ার বা বদনা কখনো অক্ষত দেখিনি। লাফ দিয়ে বাথরুমের লুকিং গ্লাস ভেঙে ফেলা, দরজা ফুটো করে দেওয়া, ইটের টুকরো দিয়ে দেয়ালে লেখা, পানির কল মোচড় দিয়ে বাঁকা করা, বিদ্যুতের সুইচ নষ্ট করে দেওয়া, ঢিল মেরে লাইট ভেঙে ফেলা কিছু ছাত্রের নিত্যদিনের কাজ ছিল। বাথরুমে সিসিটিভি লাগানো যেত না বলে এসব দুষ্ট ছাত্রদের শনাক্ত করা যেত না। এসব কাজের জন্য শিক্ষকেরা বেত উঠিয়ে দেয়াকে দায়ী করে থাকেন।

আমাদের দেশে আইন করে স্কুলে শারীরিক শাস্তি দেওয়া বন্ধ করা হলেও এখনো শিক্ষক দ্বারা শিক্ষার্থী নির্যাতনের কাহিনী প্রায়ই শোনা যায়। এলোপাতাড়ি বেত্রাঘাতে শিক্ষার্থীদের শরীরে ক্ষত হওয়ার নির্মম কাহিনী পত্রিকায় বহুবার ছাপা হয়েছে। আমাদের সময়ের মতো লম্বা বেত নিয়ে শিক্ষকরা এখন ক্লাসে না ঢুকলেও ছাত্রছাত্রী পেটানোর জন্য শিক্ষকেরা বর্তমানে শিক্ষা উপকরণ স্কেল, ডাস্টার ইত্যাদি হরহামেশাই ব্যবহার করেন। অঙ্ক কষতে গিয়ে ভুল করার অপরাধে এক ছাত্র তার বাম চোখ হারিয়েছে কাঁটাতার পেঁচানো বেত্রাঘাতে। সতীর্থের স্কেল চুরির অপবাদে এক শিশু শিক্ষার্থীকে সহকারী প্রধান শিক্ষক ও দফতরি মিলে বেদম প্রহার করে চুল কেটে দেওয়ার ঘটনাও পত্রিকায় দেখেছি। অমানুষিক বেত্রাঘাতে কত ছাত্রছাত্রী যে হাসপাতালে গিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। নির্দিষ্ট শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ার কারণে ছাত্রছাত্রীদের খেসারত দিতে হয় ওই শিক্ষকের ক্লাসে; বিভিন্ন উসিলায় তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। এক শিক্ষকের ছুড়ে মারা ডাস্টার মুখে আঘাত করার পর এক ছাত্রীর মুখটা আজীবনের জন্য বাঁকা হয়ে যায়। পিটিয়ে পা ভেঙে দেওয়া, জুতা ও পা ধোয়া পানি খাওয়ানো, ইট হাতে নিয়ে প্রখর রোদে মাঠে দাঁড় করিয়ে রাখার শাস্তি মাদ্রাসাগুলোতে হরহামেশাই ঘটে থাকে। এতিমখানা ও হাফেজিয়া মাদ্রাসাগুলোতে পড়তে আসা নিঃস্ব পরিবারের সন্তানদের ওপর নির্যাতন হলে খোঁজ নেয়ারও কেউ থাকে না। আমাদের সমাজে যে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা বৃদ্ধি পেয়েছে এটি তারই একটি নমুনা।

শিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। আমার আব্বা ১৯২৬ সনে একটি মাইনর স্কুল প্রতিষ্ঠা করে তাতে আজীবন শিক্ষকতা করেছেন। আমাদের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে সবাই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। তাই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিচারের স্লোগান উঠলে নিজেরা লজ্জা পাই। বিভিন্ন পেশার লোকেরা শিক্ষার আলো পেয়েছেন শিক্ষকদের কাছ থেকেই। শিক্ষকেরা যা শিক্ষা দেন তা যদি আদর্শ হয় তাহলে এত চোর, ডাকাত, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীর সৃষ্টি হয় কীভাবে? বিচারক, প্রশাসক, সাংবাদিক, শিক্ষক, প্রকৌশলী, রাজনীতিবিদ, ডাক্তার—সবার বিরুদ্ধে শুধু অভিযোগ; যারা অভিযোগ করেন তারাও সততায় যুধিষ্ঠির নন। তাই বলে সমাজ বিনির্মাণে যারা কারিগর তারা তো উৎকর্ষ আচার-আচরণে অনুসরণীয় হবেন না কেন? সত্য, তাদেরও অভাব, অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষকদের চরিত্র নষ্ট করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দফতর, অধিদফতর অনেকটা দায়ী। এসব প্রতিষ্ঠানে স্কুল, কলেজ থেকে শিক্ষক এনে প্রশাসনিক কাজে বসানো হয়; এই সব প্রতিষ্ঠানে কোন কাজ ঘুষ ছাড়া হয় বলে মনে হয় না। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখেছি, স্কুলের কোন একটি কাজ এসব প্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক নিয়মে নিষ্পন্ন হয়নি; এর ফলে সব স্কুলের শিক্ষকেরা দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান।

শিক্ষকের নিত্য অভাব, অনটনও তাদের আচরণ রূঢ় হওয়ার অন্যতম কারণ। অনেক শিক্ষক তার ব্যক্তিগত হতাশা, রাগ বা ক্ষোভের বহির্প্রকাশ ঘটিয়ে থাকেন শিক্ষার্থীদের নির্যাতন করে। তবে রাগ, ক্ষোভের মুখ্য কারণ হচ্ছে শিক্ষকদের লেখাপড়া না করার বদভ্যাস। অনেকে স্কুলে প্রস্তুতি নিয়ে যান না, মূর্তির মতো স্টেজে দাঁড়িয়ে থেকে রিডিং পড়তে থাকেন। এমন একঘেয়েমি পাঠদানে ছাত্রছাত্রীদের মনোযোগ থাকে না। শিক্ষক ক্লাসে দেরি করে গেলে ছাত্রছাত্রীরা হইচই করবেই। অনেক শিক্ষক ক্লাসে গিয়ে প্রায় দশ মিনিট ধরে রোল কল করতে থাকেন। তারপর সহজ, সরল বিষয়টি ক্লাসে উপস্থাপন করে কঠিন বিষয়টি হোমওয়ার্ক হিসেবে নির্বাচন করে দেন। বাসায় শিক্ষিত অভিভাবক না থাকলে এই কঠিন হোমওয়ার্কের জন্য বাধ্য হয়ে প্রাইভেট পড়তে হয়। এটা সব স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষকের একটি কৌশল। ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টিকে অনেক শিক্ষক ‘লাই’ দেওয়া ভাবেন। শিক্ষার্থীরা কম জানে বলেই তো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে—এ সহজ বিষয়টি অনেক শিক্ষক বুঝতে চান না। বয়সের কারণেই এরা স্কুল ফাঁকি দেবে, দুষ্টুমি করবে, মনোযোগী হবে না। লেখাপড়ার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলার দায়িত্ব মনোবিজ্ঞানীর মতো শিক্ষককেই নিতে হবে। প্রতিটি ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের দাগি আসামি মনে করে নিষ্ঠুর আচরণ করলে স্কুল, কলেজগুলো জেলখানা হয়ে উঠবে। ভয়-ভীতিহীন আনন্দঘন পরিবেশে পাঠদান আকর্ষণীয় ও অর্থপূর্ণ হতে পারে। শ্রেণীকক্ষে শিক্ষার্থীদের কাছে গিয়ে বা চারপাশে ঘুরে ঘুরে পড়ানো হলে শিক্ষার্থীরা অমনোযোগী হওয়ার সুযোগ পায় না। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করে বা শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ আকৃষ্ট করা সম্ভব। শিক্ষকেরা অবহেলিত হলেও এখনও আদর্শ ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের শিক্ষার্থীরা দেবতাতুল্য মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করে থাকে।