উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

কূটনীতি: সীমা-পরিসীমা

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ইউরোপীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করবে না। তাদের বিশ্বাস বাংলাদেশ অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম। জাতীয় সংসদের নির্বাচন আসার সাথে সাথে বাংলাদেশে কূটনীতিকদের তৎপরতা বাড়িয়ে তোলা হয়। কূটনীতি সম্মানজনক পেশা বলে এখন মেধাবীরা এ পেশাকে প্রথম পছন্দ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে থাকে। কিন্তু ‘কূট’ শব্দাংশটি মূলত নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত হয়। শুধু মেধা দিয়ে কিন্তু কূটনীতি হয় না, চিকন বা বাঁকা বুদ্ধি না থাকলে কূটনীতিতে সফলতা আনা যায় না। রাজনীতিতে কূটবুদ্ধির প্রথম প্রয়োগ করেছিলেন গ্রিক সম্রাট আলেক্সান্ডারের ভারতবর্ষ অভিযানের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ের প্রথম মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্তের প্রধানমন্ত্রী এবং কূটনীতি বিশারদ চাণক্য বা কৌটিল্য। কৌটিল্য শব্দটির আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ক্রূরতা, কুটিলতা। তিনি তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপকও ছিলেন।

আধুনিক কূটনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ হচ্ছে ডিপ্লোম্যাসি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থাপনের নিমিত্তে সরকার বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে নীতি গ্রহণ করে তার বাস্তবায়নে কূটনৈতিকদের গৃহীত কার্যক্রমই কূটনীতি। ১৯৬১ সালের ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনীতিকেরা আলাদা কতগুলো সুবিধা ভোগ করে থাকেন। তারা যাতে কোন চাপ ছাড়া স্বাধীনভাবে অন্য দেশে অবস্থান করে দায়িত্ব পালন করতে পারেন সেজন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা কূটনৈতিক রক্ষাকবচ পেয়ে থাকেন। এ রক্ষাকবচের আওতায় তারা যে দেশে অবস্থান করেন সে দেশে কোন অপরাধ করার জন্য তাদের সেই দেশে গ্রেফতার বা বিচারের সম্মুখীন হতে হয় না।

এ রক্ষাকবচের আওতায় শুধু ব্যক্তি কূটনৈতিক নয়, কূটনীতিবিদের অফিস বাড়িঘরেও তল্লাশি চালানো যায় না। আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুসারে অন্য একটি দেশে কনস্যুলেট বা দূতাবাসের যে চত্বর থাকে সেখানে কূটনীতিক মিশনের নিজের দেশের আইন চলে। এ রক্ষাকবচের সুবিধা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বলেই লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে আশ্রয় নেয়া উইকিলিকস ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ জারি করা সত্ত্বেও লন্ডন পুলিশ তাকে গ্রেফতার করতে পারছে না। ২০১২ সাল হতে তিনি দূতাবাস থেকে বের হতে পারছেন না, বের হলেই তাকে পুলিশ গ্রেফতার করবে। তুরস্কের মাটিতে অবস্থিত সৌদি কনস্যুলেটে খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে জেনেও তুরস্ক তার মধ্যে তল্লাশি করতে পারেনি সৌদি আরবের অনুমতি ছাড়া।

আমাদের দেশে নির্বাচন এলে বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা নিজেরা যেমন তৎপর হয়ে উঠেন, তেমনি আবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তাদের সক্রিয় করে তোলে। গরিব দেশ বলে আমাদের বাংলাদেশে বিদেশি কূটনৈতিকদের প্রকাশ্য কর্ম-তৎপরতা অতীতেও দেখা গেছে, এখনও চলছে, ভবিষ্যতেও চলবে। যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের নেতারা কূটনীতিকদের বেশি দৌড়াদৌড়ি পছন্দ করেন না; কিন্তু বিরোধী দলে থাকলে তারাই আবার কূটনীতিকদের কাছে ধর্ণা দেন। সার্বভৌম ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে আমাদের মতো দেশের পক্ষে অন্য প্রভাবশালী দেশকে অগ্রাহ্য করার অহংবোধ এখন অচল। একটি সার্বভৌম দেশের সরকার তাদের সব কাজকে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দিষ্ট ডেস্কের মুখপাত্র তো প্রায়ই সংশ্লিষ্ট দেশ সম্পর্কে বিবৃতি, রিপোর্ট দিয়ে থাকেন। অবশ্য কিছু হস্তক্ষেপের প্রয়োজনও আছে, নতুবা স্বৈরশাসকদের লাগামহীন অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ করা কোনভাবেই সম্ভব হবে না। রোহিঙ্গা নির্যাতনে জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের আলোচনা, সমালোচনারও তোয়াক্কা করছে না মায়ানমার। তবে কোন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আরেকটি দেশ কতটুকু হস্তক্ষেপ করবে তা নির্ভর করে দুটি দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর। কোন দেশ সম্পর্কে প্রকাশ্যে মতামত দেওয়া থেকে আরেকটি দেশ তখনই সম্পূর্ণ বিরত থাকে, যখন দেশ দুটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য ও পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিন্ন মত পোষণ করে থাকে। এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো মিসরের সামরিক সরকারকে সমর্থন করছে। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনের পর পৃথিবীর বহু দেশ স্বীকৃতি দিলেও চীন এবং সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। পঁচাত্তরে পটপরিবর্তনে তাদের স্বার্থের অনুকূল পরিবেশ, পরিস্থিতির উদ্ভব হওয়ার পর চীন ও সৌদি আরব বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রকাশ্যে নেতিবাচক মতামত দিতে পারে শুধু সেই দেশগুলোই, যারা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকে প্রভাব বিস্তার করতে পারে; যাদের অসহযোগিতায় ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট দেশের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হবে। মালদ্বীপের আবদুল্লাহ ইয়েমিন চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এতদিন দেশ শাসন করেছেন, প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল শীতল। মালদ্বীপের সাম্প্রতিক নির্বাচনে তাই দুটি দেশই কড়া নজর রেখেছিল।

শুধু অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী না হওয়ার কারণে বা সামরিক শক্তি অন্যের মধ্যে ভীতি সৃষ্টিতে অক্ষম বলে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কোন মতামত গোপনে বা প্রকাশ্যে দেওয়ার অধিকার রাখে না অথবা মতামত দিলে তা কোন গুরুত্ব বহন করে না। আবার এ দুটি ক্ষেত্রে সবল হলে অন্য দেশের মতামত গ্রাহ্য করারও প্রয়োজন হয় না। সর্বোপরি অর্থনৈতিক ভিত শক্ত থাকার পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক রাখলে আন্তর্জাতিক অনেক চাপ থেকে মুক্ত থাকা সম্ভব। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে গভীর সম্পর্কের কারণে সৌদি আরব কানাডার মতো দেশকেও কেয়ার করছে না। সৌদি নারী অধিকার কর্মীদের মুক্তি চাওয়ায় সৌদি আরব যেভাবে কানাডাকে ধমক দিয়ে ক্ষমা চাইতে বলেছে, তা কূটনীতিতে বিরল; অথচ সৌদি আরবের এমন দাবির বিরুদ্ধে একটি দেশও কিছু বলেছে বলে শুনিনি। কানাডার বিরুদ্ধে সৌদি আরবের গৃহীত একতরফা ব্যবস্থাদি কানাডা নীরবে হজম করতেও বাধ্য হয়েছে।

সারা বছর বিদেশি কূটনীতিকেরা আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আমলা, সাবেক কূটনীতিকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের দাওয়াত করে খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে মতবিনিময় করে কথা বের করে নেয় এবং ভবিষ্যতের প্রয়োজনে সম্পর্ক গড়ে তোলে। রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় সব কূটনীতিক গলফ খেলতেন বা দেখতে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মাঠে চলে যেতেন। অন্যদিকে নির্বাচন এলে রাজনৈতিক নেতা বিশেষ করে বিরোধী দলের নেতারা নিজের গরজে দাওয়াত ছাড়াও তাদের কাছে ধর্ণা দেন। বিরোধী দল জানে, শত শত দিন রাস্তায় বিক্ষোভ করার চেয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আমেরিকার রাষ্ট্রদূতের কাছ থেকে তাদের দাবির পক্ষে একটি বক্তব্য আদায় করা গেলে তা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষেত্রে অধিকতর কার্যকর। সরকারি দল কূটনীতিকদের সক্রিয়তাকে প্রকাশ্যে পাত্তা না দিলেও ভেতরে ভেতরে উন্নয়ন সহযোগী বিদেশি দূতদের বক্তব্য মূল্যায়ন করে থাকে বলে আমার বিশ্বাস।

বিরোধী দল শুধু বিদেশি রাষ্ট্রদূতের ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না; প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন লাভে তারা বিদেশে লবিস্টও নিয়োগ করে থাকে। পাশ্চাত্য হচ্ছে বেনিয়ার জাত, তারা টাকা আয়ে হারাম-হালাল বুঝে না। আমাদের দেশে লবি করা এক ধরনের অনৈতিক কাজ; কিন্তু আমেরিকায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে লবিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে সে দেশের নীতিপ্রণেতাদের প্রভাবিত করা আইনসম্মত। নির্বাচন সন্নিকটে বিধায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের বিএনপির পক্ষে প্রভাবিত করতে তারা সম্প্রতি আমেরিকায় দুটি প্রতিষ্ঠানকে লবিস্ট হিসেবে নিয়োজিত করেছে, জাতিসংঘেও গিয়েছে।

ভারতের সন্তুষ্টি-অসন্তুষ্টি নিয়ে দেখি সরকারি এবং বিরোধী উভয় দল মাথা ঘামায়। চীনও আজকাল আর্থিক সহায়তা প্রদানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী ফেরত নিতে মায়ানমারের এত গড়িমসির পেছনে চীন বাংলাদেশের ওপর পরোক্ষভাবে চাপ দিচ্ছে না তো? রাষ্ট্রদূতেরা তাদের দেশের রাজনৈতিক অভিলাষ অনুযায়ী আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রাখে। ভারতের সাথে যে দলের সম্পর্ক ভালো সেই দলের সাথে চীনের বা পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো থাকার কথা নয়। অন্যদিকে যারা চীন বা পাকিস্তানের খয়ের খাঁ তাদের ভারত বিশ্বস্ত ভাবতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বর্তমানে চীন, ভারত, পাকিস্তান—এই তিন রাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। হিলারি ক্লিনটন হেরে যাওয়ায় আওয়ামী লীগ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে; তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতিগতির পূর্বাভাস দেওয়া সহজ নয়; নিজে সুস্থ থেকে তিনি সারা পৃথিবীকে অসুস্থ করে তুলেছেন। জঙ্গি দমনে আওয়ামী লীগ কঠোর হওয়ায় পাশ্চাত্যে তাদের কদর বেড়েছে। তবুও পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের কথা বলবে, সুশাসনের প্রতিষ্ঠা চাইবে, ফেয়ার নির্বাচনের জন্য চাপ দেবে। মধ্যপ্রাচ্যে আওয়ামী লীগ কখনও সুবিধা করতে পারেনি; কিন্তু এখন সৌদি আরবের কূটনীতিতে ভিন্নমাত্রার আবহ যোগ হয়েছে। সৌদি আরবের সাথে অন্য দেশের সম্পর্ক নির্ধারণে শুধু ধর্ম নিয়ামক হিসেবে এখন আর বিবেচিত হচ্ছে বলে মনে হয় না। সম্পর্ক স্থাপনে ধর্ম নিয়ামক হলে সৌদি আরব ইসরাইলের সাথে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ইরানকে শাসাতো না। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে শেখ হাসিনার সরকার পাশ্চাত্য ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে একটি ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিএনপির মহাসচিব দেখা করে আসার পর জাতিসংঘ বাংলাদেশের শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি পূর্ণ সংহতি ও সহযোগিতা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে। এসব সমীকরণে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে আমাদের রাজনীতিতে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যেও পারস্পরিক চাণক্যনীতি চলবে।

কর্মরত দেশে একজন কূটনীতিক সেই দেশের সব ধরনের অপরাধ আইনের আওতামুক্ত থাকবেন; তাই তার বিরুদ্ধে কোন প্রশাসনিক বা বিচারিক ব্যবস্থা সেই দেশে নেয়া যায় না বলে কিছু কিছু কূটনীতিক দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজও করে থাকেন। একজন কূটনীতিক তার দেশের প্রতিনিধিত্ব করেন বলে কূটনীতিকের বক্তব্যকে তার দেশের বক্তব্য বলে বিবেচনা করা হয়। তাই কূটনীতিকের মর্যাদাপূর্ণ ইমেজ বা ভাবমূর্তি গুরুত্বপূর্ণ।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com