উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ০৪ নভেম্বর ২০১৮
বহুবিবাহের পক্ষে ওকালতি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
সৌদি আরবের সিনিয়র মুফতি আবদুল্লাহ একটি টিভিতে লাইভ সাক্ষাৎকারে ফতোয়া দিয়েছেন, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও একাধিক বিয়ে না করলে পুরুষ গুনাহগার হবে। এমন ফতোয়া দেওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, অনেক মুসলিম সমাজে মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে না, মেয়েদের এমন দুর্দশায় পুরুষেরা একাধিক বিয়ে করার জন্য এগিয়ে না এলে মেয়েরা বিবাহিত জীবনের স্বাদ পাবে না। তাই গোনাহ থেকে বাঁচার জন্য, মুসলিম নারীদের পবিত্র ও নিরাপদ জীবনযাপনের ব্যবস্থা না করার জন্য কেয়ামতের দিন প্রশ্নের মুখোমুখি যাতে না হতে হয় সেজন্য পুরুষদের একাধিক বিয়ে করা অপরিহার্য। তার মতে বহুবিবাহের ব্যাপারে কোরআনে অনুপ্রেরণা আছে বলেই সাহাবিরা শুধু বহুবিবাহ করেননি, বহুবিবাহে উৎসাহও দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, বহুবিবাহ প্রথা ব্যাপক হারে না থাকায় প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত মেয়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সমাজে ব্যভিচার বাড়ছে; তাই কোন স্ত্রী স্বামীর পরবর্তী বিবাহে বাধা দিলে অন্য মেয়ের অভিশাপ প্রথম স্ত্রীর ওপর পড়বে। তিনি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আরও বলেন, একজন পুরুষের দেহে সর্বোচ্চ চারজন নারীর অধিকার থাকায় এক স্ত্রী বাকি তিন নারীর যৌন অধিকার হরণ করতে পারে না। তার মতে বহুবিবাহ হালাল এবং হালাল জিনিস মানবজাতির জন্য নিশ্চয়ই কল্যাণকর। তাই আবদার করে স্বামীকে বহুবিবাহ থেকে বিরত রাখা স্ত্রীর জন্য পাপ। সতিনের ঘর করার আগ্রহ না থাকলেও আল্লাহর নির্দেশ মেনে নেয়াই নারীদের ইমান পরীক্ষার সফলতা। সিনিয়র মুফতি আবদুল্লাহ এ ব্যাপারে বলেন যে, কোন নারী যদি এ বিধানকে অবজ্ঞা করে তবে তার ইমানের ব্যাপারে আশঙ্কা রয়েছে।
এক বা একাধিক স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও বারবার বিয়ে করাকে বহুবিবাহ বলে। মুসলিম আইনে কিছু শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বহুবিবাহের অনুমোদন রয়েছে। পবিত্র কোরআনে রয়েছে, ‘বিবাহ কর নারীদের মধ্য হতে নিজেদের পছন্দমতো দুই-দুই, তিন-তিন ও চার-চারজনকে; আর যদি আশঙ্কা কর যে, সুবিচার করতে পারবে না, তাহলে একজনকে কিংবা তোমাদের অধীনস্থ দাসীকে (কিংবা যে তোমাদের ডান হাতের অধিকারভুক্ত)’, সুরা: আন-নিসা: ৩। তবে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে সুরা নিসাতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘তোমরা যতই আগ্রহ রাখো না কেন, তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি সমান ব্যবহার করতে কখনও সক্ষম হবে না।’ তাই অনেক আলেমের মত হচ্ছে, এমন শর্তাদি মেনে একই সময় চারজন স্ত্রী রাখা খুব সহজ কাজ নয়। হযরত আলী (রা.)-এর দ্বিতীয় বিয়েতে হযরত মুহাম্মদ (সা.) অনুমতি না দেয়ায় প্রধান কারণ হিসেবে নবী করিম (সা.) যে উক্তিটি উল্লেখ করেন তা হচ্ছে, ‘আমার কন্যা আমার দেহেরই একটি অংশ। যেটা তার অপছন্দ, সেটা আমার অপছন্দ এবং তাকে যা দুঃখ দেয়, তা আমাকেও দুঃখ দেয়।’ এই প্রেক্ষিতে অনেকের অভিমত হচ্ছে, সব কন্যাই পিতার নিকট আদরণীয় এবং এজন্যই ইসলামে বহুবিবাহের অনুমোদন নেই। অন্যদিকে বহুবিবাহের পক্ষের আলেমেরা বলেন যে, মুসলমানদের চিরশত্রু আবু জেহেলের কন্যাকে ফাতিমার সতিন করতে চাননি বলেই হযরত আলী (রা.)-এর প্রস্তাবে নবী করিম (সা.) সম্মতি দেননি। শেষোক্ত আলেমদের অভিমত সঠিক বলে মনে হয়। কারণ বহুবিবাহে বিভিন্ন হাদিসে বরং উৎসাহিত করা হয়েছে। একটি হাদিসে আছে, ‘... বিবাহ কর। কেননা যিনি উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি (অর্থাৎ রাসূল সা.)—তার অধিক সংখ্যক স্ত্রী ছিল’ (সহীহ বোখারি শরিফ ৪৭০৩)। এছাড়া সুরা নিসায় সর্বোচ্চ চার স্ত্রী নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলেও ক্রীতদাসী বা যুদ্ধে হস্তগত কতজন নারীকে বিয়ে করা যাবে তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়নি। এছাড়া শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত মুত’আ বিবাহে স্ত্রীর কোন সংখ্যা নির্ধারণ করা নেই। মুত’আ বিবাহ হচ্ছে, চুক্তিভিত্তিক অতিবাহিত স্বল্পকালীন দাম্পত্য জীবন। আমাদের নবী করিম (সা.)-এর আমলেও সাহাবিরা বহুবিবাহে অভ্যস্ত ছিলেন। কোরআনে স্ত্রীর সংখ্যা চারে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়ার পর যাদের চারের অধিক স্ত্রী ছিল তাদের বাকিদের তালাক দিতে হয়েছিল।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সিনিয়র মুফতি আবদুল্লার বক্তব্য অনুযায়ী বহুবিবাহ অনেক মুসলিম দেশে প্রচলন থাকলেও মুসলিম দেশ তুরস্ক ১৯২৬ সালে পুরুষের বহুবিবাহ প্রথম নিষিদ্ধ করে। সেনেগাল, মরক্কো, তিউনিসিয়া প্রভৃতি দেশে বহুবিবাহ করার জন্য সরকারের কাছে রীতিমতো দরখাস্ত করে অনুমতি নিতে হয়; অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনুমতি পাওয়া যায় না। এছাড়াও মিসর, সুদান, আলজেরিয়া, জর্ডান, সিরিয়া, মরক্কো, ইরাক, লেবানন প্রভৃতি দেশে পুরুষের বহুবিবাহে স্ত্রী বাধা দেওয়ার অধিকার রাখে। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইরানে বর্তমান স্ত্রী বা স্ত্রীদের সম্মতি নিয়ে স্বামী একাধিক বিয়ে করতে পারে। তবে শুধু আইন দিয়ে বহু ক্ষেত্রে বহুবিবাহ রোধ করা সম্ভব হয় না। বহুবিবাহ রোধে আইন থাকলেও গরিব পরিবারে তা প্রয়োগ করা কঠিন। স্ত্রীর জীবনধারণের ব্যয় স্বামীর করুণার ওপর নির্ভরশীল বিধায় স্বামীকে পরবর্তী বিয়েতে অনুমতি না দিয়ে উপায় থাকে না; স্বামীর ঘরে সতিন এলেও থাকা-খাওয়ার নিশ্চয়তা থাকায় স্বামীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মতপ্রকাশের কথা স্ত্রী চিন্তাও করতে পারে না। বহুবিবাহে ধর্মীয় অনুমোদন থাকায় অনেক স্বামী রাষ্ট্রীয় আইনের প্রতি তোয়াক্কা করে না।
শরিয়া আইনের বিরোধী বলে আলেমদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের আমলে ১৯৬১ সনের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের মাধ্যমে বহুবিবাহের ক্ষেত্রে বিদ্যমান স্ত্রীর অনুমতি গ্রহণের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। আবার ১৯৭৪ সালের মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইনের অধীনে সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে সেই বিয়ে রেজিস্ট্রি করা যাবে না। স্ত্রী ও সালিসি পরিষদের অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় বাংলাদেশে বহুবিবাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ কোনভাবে স্ত্রীর অনুমতি পাওয়া গেলেও সালিসি পরিষদের অনুমতি পাওয়া যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। তবে স্ত্রী ও সালিসি পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিয়ে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বহু বিয়ে অবৈধ নয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রাচীন কাল থেকেই বহুবিবাহ প্রচলিত আছে। হিন্দু ধর্মে বহুবিবাহের অনুমোদন না থাকলেও এক সময় শুধু কুল রক্ষার জন্য ব্রাহ্মণের হাতে মেয়েদের তুলে দেওয়া হতো। একজন কুলীন ব্রাহ্মণকে এত বেশি বিয়ে করতে হতো যে, কোনভাবেই তিনি বউয়ের নাম, চেহারা ও শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা মনে রাখতে পারতেন না। তাই তাকে তার সব শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা একটি খাতায় লিখে রাখতে হতো এবং ঠিকানা দেখে দেখে তিনি শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে যেতেন। সন্তান উৎপাদনের খায়েশ বা সামর্থ্য না থাকলেও এই জামাই ব্রাহ্মণ শুধু সালামির জন্য শ্বশুরবাড়িতে যেতে পছন্দ করতেন। এমনও গল্প প্রচলিত আছে, মৃত্যুপথযাত্রী ব্রাহ্মণের সঙ্গে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে কুল রক্ষা করা হয়েছে। ভারত-পাকিস্তান সীমান্তের কাছে রাজস্থানের মুসলিম অধ্যুষিত দেরাসর গ্রামের প্রত্যেক পুরুষকেই বাধ্যতামূলক দু’বার করে বিয়ে করতে হয়। বহুবিবাহ আরবদের প্রচলিত রীতি; ইসলাম প্রবর্তনের বহু পূর্ব থেকেই বহুবিবাহের রীতি চলে আসছে। সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিরা শুধু দু-চারটা নয়, শতাধিক বিয়ে করতেন। বাপ-দাদাদের বহুবিবাহ দেখে দেখে আরবের নবপ্রজন্মের কিছু যুবক বহুবিবাহে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। বহুবিবাহের কারণে সৌদি রাজপরিবারে পনেরো হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছে; এরমধ্যে শুধু দুই হাজার সদস্য রাজক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। প্রথম বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ ত্রিশটি বিয়ে করেছিলেন; তার সন্তান সংখ্যা ছিল ১১৫ জন। পরবর্তী বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের ছিল ১৯ সন্তান। অবিরত বিয়ে করা আর সন্তান উৎপাদনের ক্ষেত্রে অনেক আধুনিক এরাবিয়ানেরও কোন লজ্জাবোধও নেই।
বহুবিবাহ সৌদি আরবের সমাজ ব্যবস্থার একটি গৃহীত নীতি হওয়া সত্ত্বেও সিনিয়র মুফতি আবদুল্লাহ বহুবিবাহের পক্ষে হঠাৎ নতুন করে ওকালতি করতে গেলেন কেন? কারণ তিনি লক্ষ্য করছেন যে, বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে একাধিক বিয়ের প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। আধুনিক শিক্ষার প্রতি আগ্রহ যত বাড়ছে বহুবিবাহের প্রতি আগ্রহ তত কমছে। একাধিক স্ত্রীকে নিয়ে অনুষ্ঠানে যাওয়া বা ভ্রমণে বের হওয়ার কারণে পরিচিতি পর্বে আজকাল পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত যুবকরা বিব্রতবোধ করে। রাজা, বাদশাহর ছেলেরা আজকাল পাশ্চাত্যে লেখাপড়ার সুযোগে বিভিন্ন উন্নত সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে বহুবিবাহের কদর্য দিকটি উপলব্ধি করতে পেরেছে। এছাড়াও আরবের রীতি অনুযায়ী প্রতি বিয়েতে কনে পক্ষকে বিপুল পরিমাণ মোহরানার অর্থ দিতে হয় বলে ভিনদেশী মেয়েদের বিয়ে করতে আরবের যুবকেরা আগ্রহী হয়ে উঠেছে এবং ভিনদেশী মেয়েদের সংস্কৃতির প্রভাবে বহুবিবাহের প্রবণতা হ্রাস পাচ্ছে। আরব মেয়েদের সবাই এখন আর ঘরকুনো নয়, বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। সতিনের সঙ্গে ঘর করার চেয়ে অনেকে এখন একা থাকাই শ্রেয় মনে করছে। অনেক পুরুষও এখন এক বউ বা এক সংসারে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। সৌদি আরবের বর্তমান যুবরাজ মুহাম্মদ সালমানও এখন পর্যন্ত এক বউ নিয়ে সন্তুষ্ট রয়েছেন। এই আধুনিক যুগে একাধিক বউ নিয়ে ঘর করা অনেকের নিকট বিকৃত মানসিকতার পরিচয় বহন করে।
১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ইসরায়েল ইহুদিদের বহুবিবাহে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ১৯৫৮ সালে অনুমোদিত হিন্দু বিবাহ-বিধি অনুযায়ী হিন্দুদের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখা অবৈধ করা হয়েছে। খ্রিস্টান ধর্মে বহুবিবাহ নিষিদ্ধ। কিন্তু ড. জাকির নায়েক মনে করেন, ইহুদি, হিন্দু, খ্রিস্টানদের ধর্মে বহুবিবাহের অনুমোদন ও নজির রয়েছে; তার মতে যে সব দেশে এ তিন ধর্মের পুরুষেরা বহুবিবাহ করতে পারছে না তার কারণ সংশ্লিষ্ট দেশে বহুবিবাহ আইনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ, ধর্মের কারণে নয়। তার মতে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে খ্রিস্টানদের চার্চ স্ত্রীর সংখ্যা ‘এক’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দিয়েছে। ইহুদিবাদের তালমুদীয় বিধান অনুযায়ী আব্রাহামের তিনজন স্ত্রী ছিল এবং সলোমনের ছিল শতাধিক স্ত্রী। রামায়ণের অযোধ্যার রাজা দশরথের একাধিক স্ত্রী ছিল। বহুবিবাহ নিয়ে ড. জাকির নায়েকের ব্যাখ্যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ধর্মের ধর্মবেত্তাদের আবার মতভেদ রয়েছে; তারা ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন যে, ড. জাকির নায়েকের বক্তব্য সঠিক নয়।
ধর্মের নির্দেশনা রক্ষার্থে পুরুষের বহুবিবাহের অপরিহার্যতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সিনিয়র মুফতি যে ফতোয়া দিয়েছেন সে ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে ভিন্ন মতও রয়েছে। যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন ফতোয়া নিয়ে আলেমদের মধ্যে শুধু মতভেদ নয়, রেষারেষিও হয়েছে। ফতোয়া কোন সাধারণ আলেম দিতে পারেন না; মুফতিরাই শুধু ফতোয়া দিতে পারেন। সৌদি আরবের বাদশাহর আদেশ অনুযায়ী সিনিয়র মুফতি ছাড়া কেউ সৌদি আরবে কোনো ফতোয়া বা ইসলাম ধর্মের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। নানা বিভ্রান্তি এড়ানোর স্বার্থে শুধু ওলেমা পরিষদ কর্তৃক নির্ধারিত ব্যক্তি ফতোয়া দেওয়ার অধিকারী। আবদুল আজিজ ইবনে বায ১৯৯৩ সন থেকে তার মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সৌদি আরবের প্রধান মুফতির পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তার ফতোয়া নিয়েও সৌদি আরবের ভেতর এবং বাইরে বিতর্কের সৃষ্টি করেছিল। ‘পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে’—এ তত্ত্বের বিরুদ্ধে তিনি ফতোয়া দিয়েছিলেন। তার একটি উল্লেখযোগ্য ফতোয়া হচ্ছে, ‘পৃথিবী সমতল’। মক্কা ও মদিনার দুই পবিত্র মসজিদে অমুসলিম সৈন্যদের অবস্থানের পক্ষে তার দেওয়া ফতোয়াও প্রচণ্ড বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামিক পণ্ডিতদের প্রদত্ত এমন অনেক ফতোয়া ইসলাম অনুসারীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে থাকে। এজন্য ২০০১ সনে আমাদের হাইকোর্ট ফতোয়াকে অবৈধ ও আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত বলে ঘোষণা করে। এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল হলে ২০১২ সালে আপিলের রায়ে ফতোয়াকে নয়, ফতোয়ার নামে বিচারবহির্ভূত কার্যক্রম ও শাস্তিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ফতোয়া প্রদানকে রহিত করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও হয়েছে। কারণ আল্লাহ কোরআনে বলছেন, ‘তোমরা কোন কিছু না জানলে জানা ব্যক্তির কাছে থেকে জেনে নিও (আম্বিয়া: ২৩)।’ যখন কোন ব্যক্তি সরাসরি কোরআন ও হাদিস কিংবা ফিকহের আলোকে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান বের করতে অপারগ হন তখন তিনি মুফতির কাছে এই বিষয়ের সমাধান চান এবং মুফতি যে সিদ্ধান্ত দেন তাই ফতোয়া। আমাদের আজকের বিবেচ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ একজন সিনিয়র মুফতি।
কেয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে একটি হচ্ছে, মেয়েদের সংখ্যা এত বেড়ে যাবে যে, একজন পুরুষকে ৫০ জন মহিলার দেখাশোনা করতে হবে (সহীহ্ বোখারি শরিফ ৪৮৫৫)। এ বিষয়টি সিনিয়র মুফতি আবদুল্লাহ আর ড. জাকির নায়েক উভয়ে বলেছেন। বহুবিবাহের পক্ষে জাকির নায়েক এবং সিনিয়র মুফতি আবদুল্লাহ দু’জনই প্রায় একই অভিমত পোষণ করছেন। তাদের উভয়ের মত হচ্ছে, পৃথিবীতে নারীদের সংখ্যাধিক্যের কারণে অবৈধ যৌনাচার রোধে পুরুষের বহুবিবাহ অপরিহার্য। মুফতি আবদুল্লাহর মতো ড. জাকির নায়েকের যুক্তি হচ্ছে, ছেলে শিশুর তুলনায় মেয়ে শিশুর মৃত্যুহার কম এবং যুদ্ধে পুরুষেরা বেশি মরছে বলে পৃথিবীতে মেয়ের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি। জাকির নায়েক তার একাধিক লেকচারে বলছেন, পৃথিবীতে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি বলে একজন পুরুষ এক নারী নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে লাখ লাখ নারীকে সারা জীবন অবিবাহিত থাকতে হবে এবং এর ফলে অবিবাহিতা নারীরা ‘জনগণের সম্পত্তিতে’ পর্যবসিত হবে। ড. জাকির নায়েক এ বিষয়ে সঠিক তথ্য তুলে ধরেছেন বলে মনে হয় না। কারণ কোন কোন দেশে নারীর সংখ্যা বেশি, কোন কোন দেশে পুরুষের সংখ্যা বেশি, আবার কোন কোন দেশে নারী-পুরুষ প্রায় সমান সমান। অন্যদিকে তাদের কথা সত্য হলেও পুরুষের সংখ্যা নিশ্চয়ই নারীর চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ বা চারগুণ বেশি নয়। তাই প্রতিজন পুরুষের একাধিক বিয়ে করার পক্ষে তাদের বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত নয়। পুরুষের সংখ্যা বেশি বা সমান থাকার ব্যাপারেও তিনি সজাগ ও সচেতন। এক্ষেত্রে জাকির নায়েক তার ব্যাখ্যায় বলেছেন, যে সব দেশে পুরুষের সংখ্যা নারীদের চেয়ে বেশি বা সমান সেই সব দেশে অবশ্যই মেয়ে-ভ্রূণের গর্ভপাত ঘটানো হয়। তার এই বক্তব্যটি নেতিবাচক হলেও সঠিক বলে পৃথিবীতে মেয়ের সংখ্যা বেশি নয়। এছাড়াও আজকাল যুদ্ধ-বিগ্রহে মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে সমানতালে লড়াই করে মরছে, ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাচ্ছে, বিয়ে করার প্রবণতা কমছে আর সমকামীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, অনুন্নত দেশে মেয়ে সন্তানের ভ্রূণ শনাক্ত করে তা নষ্ট করা হচ্ছে। তাই সংখ্যা-সাম্য বজায় রাখা এখন আর খুব জটিল কাজ নয়। বিভিন্ন দেশে আলেমদের বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও বহুবিবাহ বন্ধ করার যে সব আইন হয়েছে তা প্রত্যেকটি দেশের সচেতন মহিলাদের সমন্বিত আন্দোলনে সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে পুরুষের বহুবিবাহে ধর্মের অনুপ্রেরণা থাকলেও অধিকাংশ নারী অন্য নারীর সঙ্গে তার স্বামীকে ভাগাভাগি করার রুচি এখন আর লালন করে না।
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন]
zeauddinahmed@gmail.com