উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
পাকিস্তানের আসিয়া বিবি
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ধর্ম অবমাননার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বিবি আসিয়াকে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট বেকসুর খালাস দিয়ে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে সম্প্রতি। প্রতিবেশীরা আসিয়ার বিরুদ্ধে আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে কটূক্তি করার অভিযোগ এনে ব্লাসফেমি আইনের আওতায় মামলা করেছিল। অভিযুক্ত আসিয়াকে ২০১০ সনে নিম্ন আদালতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে বলা হয়েছে, ঠুনকো প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এ মামলা করা হয়েছে বলে বাদী পক্ষ তাদের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া উন্মত্ত জনতার মারধর ও হত্যার হুমকির মধ্যে আসিয়া বিবির কাছ থেকে ধর্ম অবমাননা করা হয়েছে মর্মে স্বীকৃতি আদায় করা হয়। রায়ে কোরআন এবং ইসলামের ইতিহাস থেকে প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, ইসলামে অমুসলিমদের সঙ্গে ভালো ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।
কোর্টের রায় মানার মানসিকতা কট্টর মাওলানা, মৌলভীদের কোনকালেই ছিল না, এখনও নেই। এই রায়ের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কট্টরপন্থিরা রাস্তায় জড় হয়ে তীব্র বিক্ষোভ করেছে। কট্টরপন্থি তেহরিক-ই-লাবিক পার্টির নেতা মুহাম্মদ আফজাল কাদরি রায় প্রদানকারী বিচারকদের হত্যা করার ফতোয়া দিয়েছেন। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য সেনাবাহিনীকেও আহ্বান জানিয়েছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে একটি ইন্টারেস্টিং বক্তব্য দিয়েছেন; তিনি স্পষ্ট উচ্চারণে উল্লেখ করেছেন, এ মোল্লা-মৌলভীরা ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে তাদের নিজস্ব ভোট-ব্যাংক বাড়ানোর দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত। নির্বাচনের আগে ইমরান খানের বিরুদ্ধেও এমন একটি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। তাই প্রধানমন্ত্রীর সুরও নরম; ধর্মের নামে প্রদত্ত এসব দেশদ্রোহী বক্তব্যের বিচার করার ক্ষমতা পাকিস্তান সরকারের নেই।
২০০৯ সনে লাহোরের কাছে একটি গ্রামে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী বিবি আসিয়া একজন মুসলিম নারীর কূপ থেকে তোলা বালতির পানি থেকে একটি কাপ ব্যবহার করে পানি পান করার পর জড় হওয়া সব মুসলিম মহিলাদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়; মুসলিম নারীদের অভিযোগ ছিল, খ্রিস্টান রমণী আসিয়া বালতির থেকে পানি পান করায় বালতির সব পানি অপবিত্র হয়ে গেছে। অমুসলিম নারীর এভাবে পানি পান করা থেকে ধর্ম নিয়ে বিতণ্ডা শুরু হয় এবং এক পর্যায়ে আসিয়া নাকি আমাদের নবী সম্পর্কে কটূক্তি করে বসে। নবীর বিরুদ্ধে অপবাদের সংবাদ শোনা মাত্রই কিছু মুসলমান পুরুষ আসিয়াকে মাঠে ধাওয়া করে ধরে ফেলে এবং তার চৌদ্দ বছর বয়সী মেয়ের সম্মুখে অমানুষিকভাবে পেটায়। চার সন্তানের জননী আসিয়া স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হলেও তিনি কখনই ধর্ম অবমাননা করেননি।
প্রবল তৃষ্ণায় একজন প্রতিবেশী একজন মুসলমানের বালতি থেকে কাপ দিয়ে পানি পান করতে পারবে না এমন শিক্ষা নিশ্চয়ই ইসলাম ধর্ম দেয়নি। এক সময় এ ছোঁয়াচে রোগ ছিল হিন্দুদের মধ্যে। এই ছোঁয়াচের বাতিকের জন্য অনেক দুষ্ট ছেলে ইচ্ছে করে তাদের কলসি ছুঁয়ে দিত। এতে লঙ্কাকাণ্ড বেঁধে যেত, মাটির কলসি তাৎক্ষণিক ভেঙে ফেলা হতো। মুসলমানদের মধ্যে সাধারণত এ ছোঁয়াচে রোগ নেই, থাকার কথাও নয়। ধনী-গরিব, নফর-বাদশাহ সবাই মিলে একই রান্না খায়, একই কাতারে প্রার্থনা করে বলেই তো দলে দলে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা মুসলমান হয়েছিল এবং শ্রীচৈতন্যের আবির্ভাব না হলে নিম্নবর্ণের হিন্দু বলে কেউ থাকতো কি না সন্দেহ। এমন উদার ইসলাম ধর্মে তৃষ্ণার্ত একজন অমুসলমানের পানি পানে সব পানি নোংরা হয়ে যাওয়ার আপত্তি থেকে প্রতীয়মান হয়, ধর্ম এখনও বাহ্যিক, হৃদয়ে প্রোথিত হয়নি।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এ সুযোগে পাকিস্তানের ধর্মভিত্তিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে ধর্মের অবমাননার দোহাই দিয়ে মাঝে মাঝে উত্তেজনার সৃষ্টি করে থাকে। এমন উত্তেজনা সৃষ্টিতে ব্লাসফেমি আইনটি বেশ কার্যকরী। পাকিস্তানিরা কত উন্মাদ তার প্রমাণ পাওয়া যায় পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রথম সারির নেতা এবং পাঞ্জাব প্রদেশের গভর্নর সালমান তাসিরের হত্যাকাণ্ডে। তিনি প্রকৃত ঘটনা জানার জন্য ফাঁসির আসামি আসিয়ার সঙ্গে জেলখানায় দেখা করেন; দেখা করার পর তার মনে হয়েছিল যে, নিরক্ষর আসিয়া নবীর বিরুদ্ধে অবমাননামূলক কিছু বলেনি; তাই তিনি আসিয়া বিবির ফাঁসির রায়ের বিরোধিতা করেছিলেন। আসিয়াকে ক্ষমা ও ব্লাসফেমি আইন সংশোধন করার পক্ষে কথা বলায় ২০১১ সনে তার দেহরক্ষী মুমতাজ কাদরি তাকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করেছিল। এটা একজন লোকের অন্ধ আবেগ থেকে হতে পারে; কারণ লেখাপড়ার অভাবে অন্যের বক্তৃতা শুনে যারা উত্তেজিত হয়ে ধর্মের নামে অধর্ম করে তাদের অধিকাংশই সহিসালামতে ধর্মকর্ম করে না। এদের নিকট ধর্ম পালন মুখ্য নয়, নাঙ্গা তলোয়ারের ভয় দেখিয়ে এরা ধর্ম রক্ষা করাই পবিত্র দায়িত্ব মনে করে। তাই হত্যাকারী দেহরক্ষী মুমতাজ কাদরিকে মাথায় ফুল ছিটিয়ে আদালতে বীরের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল; পরবর্তীতে তাকে ফাঁসি দেওয়া হলেও পাকিস্তানের কট্টরপন্থি ইসলামী দলগুলো তাকে তাদের নায়কে পরিণত করেছে; ইসলামাবাদের উপকণ্ঠে মুমতাজ কাদরির সমাধিসৌধকে তীর্থস্থানে পরিণত করেছে।
মানবাধিকার কর্মীরা ব্লাসফেমি আইনের বিরোধিতা করলেও তাদের বিরোধিতা হালে পানি পাচ্ছে না; কারণ ব্লাসফেমি আইনের পক্ষে পাকিস্তানের জনগণের একটি শক্ত অবস্থান রয়েছে। এ শক্ত ভিত্তির কারণে পাকিস্তানে ব্লাসফেমি আইনে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করা হয়। এ আইনে বেশি সাজা পেয়েছে সংখ্যালঘু আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মানুষ। বহু খ্রিস্টানও এ আইনে সাজা ভোগ করেছে। ব্লাসফেমি আইনে পাকিস্তানে আজ পর্যন্ত কারও ফাঁসি না হলেও অভিযুক্তদের খুন করা হয়েছে। কোরআন অবমাননার অভিযোগে এক খ্রিস্টান দম্পতিকে পিটিয়ে হত্যা করে তাদের দেহ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হয়। ব্লাসফেমি আইনের আওতায় বন্দী এক ব্যক্তিকে পুলিশ কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। বিচার চলাকালীন খুন করা হয়েছে অনেক অভিযুক্তকে; বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার ধৈর্য খুনিদের ছিল না। দুঃখজনক হচ্ছে, ব্লাসফেমি মামলার অনেক আসামি খুন হয়েছে পাকিস্তানের পুলিশের হাতে। অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত না হওয়ায় পরও খালাস পাওয়া আসামিকে হত্যা করা হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট বিচারককে। আসিয়া বিবির আইনজীবীকে ইতোমধ্যে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফাঁসির আদেশ সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হওয়ার আগেও তাকে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবিতে মিছিল হয়েছে, ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফাঁসি না হলে তাকে ছেড়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হত্যা করা হবে। নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন হবে বলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের দিন আসিয়াকে কোর্টে আনার সাহস করেনি সরকার। নিরপরাধ স্বামী ও পাঁচ সন্তানের মৃত্যুর আশঙ্কাও তাড়া করছে আসিয়াকে। ব্লাসফেমি আইনে অভিযুক্তদের যারা হত্যা করছে বা হত্যা করার প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ করছে তাদের শাস্তি প্রদানের কোন তাগিদ লক্ষ্য করা যায় না। সম্প্রতি আফগানিস্তানে কোরআন পোড়ানোর অভিযোগ এনে মারমুখী জনতা ফারকুন্দা নামে ২৭ বছরের যে যুবতীকে পিটিয়ে মেরে ফেলে সেই মহিলা আদতে কোরআন পোড়ায়নি। পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক কাঠমোল্লার তাবিজ-কবজ ও পানি-পড়া দিয়ে ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে ফারকুন্দা প্রতিবাদ করায় সেই মোল্লা এবং মোল্লার সমর্থক গোষ্ঠী ফারকুন্দাকে একটি বাড়ির ছাদে মারধর করে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে গাড়িচাপা দেওয়া হয় এবং আধমরা অবস্থায় তাকে জ্বালিয়ে দেয় উন্মত্ত জনতা। উত্তর পাঞ্জাবে একজন মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোরআনের পাতা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলেছে এ অভিযোগে গ্রেফতার হলে শত শত উগ্র জনতা পুলিশি হেফাজত থেকে তাকে কেড়ে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে।
যারা সৃষ্টিকর্তা ও তার প্রতিনিধিদের সমালোচনা করবে, নিন্দা করবে তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য ব্লাসফেমি আইন। ব্লাসফেমি আইনের মতো শাস্তির বিধান ডেনমার্কে দণ্ডবিধিতে থাকলেও ১৯৩৮ সনের পরে আর কখনও প্রয়োগ করা হয়নি। ইংল্যান্ডে ১৬৯৭ সনে এ আইনটি চালু হয়েছিল এবং সে বছরেই স্কটল্যান্ডের মাত্র কুড়ি বছরের তরুণ টমাস আইকেনহেডকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তার অপরাধ ছিল তিনি ওল্ড টেস্টামেন্টের সত্যতা ও যীশুর অলৌকিক শক্তিকে অস্বীকার করেছিলেন। ভারতবর্ষ শাসন করার সময় ব্রিটিশেরা সৃষ্টিকর্তা ও নবীদের বিরুদ্ধে নিন্দা করার অপরাধে শাস্তি প্রদানের নিমিত্তে যে আইনটি করেছিল তা এখন ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বহাল তবিয়তে আছে। ব্রিটিশ আমলে তৈরি ব্লাসফেমি আইনটি আরও পরিবর্ধিত করে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেন পাকিস্তানের সামরিক শাসক জিয়াউল হক।
মানুষের বাক্স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব করে বলে এ আইনটি পাশ্চাত্যের বহু দেশ বাতিল করেছে অথবা নিষ্ক্রিয় রেখেছে। তাই আগের মতো পৃথিবীর বহু দেশে এখন ব্লাসফেমি কোন অপরাধ বা দোষের নয়। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম দেশে এই আইনটি রয়েছে এবং তা প্রয়োগও করা হয়। অথচ এই আইনটির উদ্ভব হয় প্রায় দেড় হাজার বছর আগে রোমে। রোমের রাজারা গির্জার পুরোহিতদের সহায়তায় রাজ্য শাসন করত; জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনগণের প্রতিবাদকে নিষ্ঠুরভাবে দমন করার জন্যে ব্লাসফেমি আইন প্রবর্তন করা অপরিহার্য ছিল। জনগণের প্রতি যাজকদের এই মর্মে নির্দেশনা ছিল যে, রাজা হলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং তারা যা বলেন তা ঈশ্বরেরই কথা; সুতরাং রাজার আইন মানে ঈশ্বরের আইন। সুতরাং রাজার আইন অমান্য করা মানে ঈশ্বরকে অবিশ্বাস ও অমান্য করা এবং এমন অমার্জনীয় অপরাধের শাস্তি হলো মৃত্যুদণ্ড। কোপারনিকাসের যে বইটিতে ‘পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে’ লেখা হয়েছিল সেই বইটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল ব্লাসফেমি আইনে। বাইবেলের বিরুদ্ধে গিয়ে একই কথা প্রচার করার অপরাধে ধর্মযাজকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে ইতালির বিজ্ঞানী জিওর্দানো ব্রুনোকে ব্লাসফেমি আইনে দোষী সাব্যস্ত করে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে। একইভাবে হত্যা করা হয় ফরাসি বিপ্লবের কন্যা ‘জোয়ান অব আর্ক’কে।
ধর্ম এবং নবীর বিরুদ্ধে বললে ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের অনুভূতিতে আঘাত লাগে। সত্যিকার অর্থে যে কোন মত বা আদর্শের বিরুদ্ধাচরণ করলে মত বা আদর্শধারীরা তা অনেক সময় মেনে নিতে পারেন না। নারীদের সমঅধিকারের আইন বাতিল করার কথা যারা বলে তারাও নারীর সমঅধিকারে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে আহত করে। আহমদিয়া সম্প্রদায়কে অমুসলিম ঘোষণা কি তাদের অনুভূতিতে আঘাত করে না? যে কোন ধর্মের আচার-আচরণের বিপক্ষে বললে তা সংশ্লিষ্ট ধর্ম বিশ্বাসীদের নিশ্চয়ই আহত করে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী যখন মুসলিম সমাজে গিয়ে ইসলাম ধর্মের প্রশংসা করেন তখন কি প্রধানমন্ত্রীর ধর্মাবলম্বীরা মর্মাহত হন না? নিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির প্রবক্তারা মুক্ত বাজার অর্থনীতির কথা শুনলে আহত হন। কার্ল মার্কস ‘পুঁজি’ বইটি লিখে পুঁজিবাদীদের আহত করেছিলেন। এখন ধর্মের ব্যাপারে কিছু লোক যেভাবে সর্বদা উত্তেজিত হয়ে থাকেন ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের সূচনালগ্নে তেমন উত্তেজনা থাকলে ইসলাম এদেশে কায়েম হতো কি না সন্দেহ। এদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় তলোয়ারের চেয়ে সুফিদের অবদান অনেক বেশি। ইদানীংকালের মতো এ উপমহাদেশের মানুষ এত অসহিষ্ণু ছিল না। বর্তমানকালের রাষ্ট্রীয় সেবকসংঘ যে ভারতে রামরাজ্য প্রতিষ্ঠায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে সেই ভারতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্যে রামকে ‘তস্কর’ বানিয়ে রাক্ষস রাবণকে একজন বীর দেশপ্রেমিক বানিয়েছেন।
আর এখন সংসদে ব্লাসফেমি আইন সংশোধন করার প্রস্তাব উত্থাপন করায় হত্যার হুমকি থেকে বাঁচানোর জন্য পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য শেরি রেহমানকে পাকিস্তান সরকার যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত করে পাঠিয়ে দিয়েছে। ধর্মে জোর-জবরদস্তি নেই—কোরআনের এই বাণী উচ্চারণ করে আমরা যদি আবার নাঙ্গা তলোয়ার নিয়ে অনুভূতিতে আঘাত লাগার কথা বলে অন্যকে খুন করি তা নিশ্চয়ই ধর্মের ইমেজ রক্ষায় সহায়ক নয়। ধর্ম নিয়ে ভয়ঙ্কর মাতামাতি দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, এখানকার লোকেরা আগেকার দিনের তুলনায় বেশি ধার্মিক; বরং ধর্মচর্চা বা ধর্মপ্রীতির নামে ধর্মকে এখন কলঙ্কিত করা হচ্ছে। শুধু ধর্মগ্রন্থ এবং নবী-রাসুলদের নিয়ে নয়, যে কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে বাক্স্বাধীনতার নামে অশালীন ভাষায় গালাগালি করা, কটূক্তি করাও জঘন্য অপরাধ এবং সভ্য আচরণবিরোধী। তাই বলে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা করলেও যদি অনুভূতিতে আঘাত লাগার কথা বলে শাস্তি দেওয়া হয় তবে তা হবে অন্ধকারকে শক্তি দিয়ে ঢেকে রাখার প্রয়াস।
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন]
zeauddinahmed@gmail.com