উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ২৮ অক্টোবর ২০১৮
‘চরিত্রহীন’
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
সম্প্রতি একাত্তর টেলিভিশনের নিয়মিত সংবাদ বিশ্লেষণে ছিলেন সাংবাদিক মাসুদা ভাট্টি, সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্ত এবং বাইরে থেকে যুক্ত হন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। বিশ্লেষণ চলাকালীন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের অংশগ্রহণ নিয়ে মাসুদা ভাট্টি জানতে চান, ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ঐক্যফ্রন্টে জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছেন কি না। এ প্রশ্নে মইনুল হোসেন সাহেব ক্ষেপে যান; কারণ ২০০৫ সনে ছাত্র শিবিরের একটি অনুষ্ঠানে ব্যারিস্টার সাহেব নাকি যোগ দিয়ে জামায়াত-শিবির রাজনীতির গুণকীর্তন করেছিলেন। জামায়াত শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক অনেকের আছে; এতে তিনি এত বেশি ক্ষেপলেন কেন? সম্ভবত তার ধারণা হয়েছে, জামায়াত বা ছাত্র শিবির সম্পর্কিত প্রশ্ন গড়াতে থাকলে তার অতীতকালের সংশ্লিষ্টতায় ঐক্যফ্রন্টে ওজন কমে যেতে পারে বা সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হলে ভোট কমে যেতে পারে। এমন বেয়াড়া প্রশ্নে অপ্রস্তুত হওয়া খুব স্বাভাবিক; অপ্রস্তুত না হলে অসংলগ্ন, অশ্লীল, কটুকথা হঠাৎ মুখ থেকে বেরুবে কেন? মানুষ রেগে গেলে, ক্ষেপে গেলে বেসামাল হয়ে যাচ্ছেতাই বলে। জবাবে ব্যারিস্টার মইনুল তাই মাসুদা ভাট্টিকে ‘চরিত্রহীন’ বলে আখ্যায়িত করেন। মইনুল হোসেন সাহেব আরেকটি শব্দ প্রয়োগ করেছেন যা তার সীমাহীন ক্ষমতা ও অফুরন্ত প্রভাব নির্দেশক। শব্দটি হচ্ছে ‘দুঃসাহস’; এমন প্রশ্ন করার দুঃসাহস মাসুদা ভাট্টির কী করে হলো সে ব্যাপারে তিনি বিস্মিত। তার মতো এমন ক্ষমতাশালী ব্যক্তিকে চিন্তা-ভাবনা করে মাসুদা ভাট্টির প্রশ্ন করা সমীচীন ছিল। এমন দুঃসাহসের জন্য তিনি আবার মাসুদা ভাট্টিকে ধন্যবাদও দিয়েছেন। মাসুদা ভাট্টিকে তিনি ‘শিক্ষিত ভদ্রমহিলা’ হিসেবে প্রশ্ন করতে উপদেশও দিয়েছেন।
মইনুল হোসেনের এমন অশালীন বক্তব্যের তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করেছেন অনুষ্ঠান সঞ্চালক মিথিলা ফারজানা। এছাড়া মইনুল হোসেনকে রাজনৈতিকভাবে ‘চরিত্রহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও বলেছেন, মাসুদা ভাট্টির চরিত্র নয় বরং মইনুল হোসেনের চরিত্র নষ্ট এবং সেই চরিত্র হচ্ছে তার রাজনৈতিক চরিত্র। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে ‘বয়কট’ করার জন্য নারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি। তাকে প্রকাশ্যে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন ১০১ নারী সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। এ ঘটনায় ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেন বিভিন্ন গণমাধ্যমের কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক এবং ৫৫ সম্পাদক। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মাসুদা ভাট্টি মানহানির মামলা করেছেন। ‘জামায়াতের প্রতিনিধিত্ব করছেন কি না’—মাসুদা ভাট্টির এমন প্রশ্ন করার প্রেক্ষিতে মাসুদা ভাট্টিকে আবার আইনি নোটিস পাঠিয়েছেন এক আইনজীবী।
মাসুদা ভাট্টিকে চরিত্রহীন বলার জন্য শুধু যে মইনুল হোসেনের বিরুদ্ধে বক্তব্য এসেছে তা কিন্তু নয়, মাসুদা ভাট্টির বিপক্ষেও কড়া বক্তব্য এসেছে; নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে মাসুদা ভাট্টি চরিত্রহীন বলে মন্তব্য করেছেন তসলিমা নাসরিন।
চরিত্রহীন বলতে কী বোঝায় তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, যারা অতি অসৎ, অতি লোভী, অতি কৃতঘ্ন, অতি নিষ্ঠুর, অতি স্বার্থান্ধ, অতি ছোটলোক তারাই চরিত্রহীন এবং মাসুদা ভাট্টির মধ্যে উল্লেখিত মন্দ বিশেষণগুলো বিরাজমান। মাসুদা ভাট্টির লন্ডনে অবস্থান নিশ্চিত করতে তসলিমা নাসরিন সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর অনুরোধে ব্রিটিশ সরকারকে লিখেন যে, মাসুদা ভাট্টি ‘আমার পাবলিশার ছিল, সে দেশে ফিরলে তাকে মেরে ফেলবে মৌলবাদীরা’। তসলিমা নাসরিনের অভিযোগ হচ্ছে, মাসুদা ভাট্টি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করে বরং তার আত্মজীবনী ‘ক’ প্রকাশিত হলে তার বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছেন। তসলিমা নাসরিনের বক্তব্য অনুযায়ী মাসুদা ভাট্টি ‘ক’ বইটি সম্পর্কে লিখেছেন যে, বইটি ‘ল্যাম্পপোস্টের নিচে বসে শরীরে ঘিনঘিনে ঘা ওলা রাস্তায় পড়ে থাকা এক বুড়ি বেশ্যার আত্মকথন’। তসলিমা নাসরিনের উপকারের জবাব এমন জঘন্য বক্তব্যে প্রকাশ করায় তসলিমা নাসরিন মাসুদা ভাট্টিকে চরিত্রহীন বলে উল্লেখ করেছেন।
মাসুদা ভাট্টির পক্ষে নানা বিবৃতি আসতে থাকায় তসলিমা নাসরিন সম্ভবত ঈর্ষান্বিত হয়ে মাসুদা ভাট্টির প্রতি আরও বেশি ক্রোধান্বিত হয়ে উঠেছেন। তসলিমা নাসরিন মাসুদা ভাট্টির চেয়ে লেখিকা হিসেবে গুণে-মানে অনেক বড় হওয়া সত্ত্বেও তার (তসলিমা নাসরিন) বিপদে তার পক্ষে এমনতর বিবৃতি না আসায় তিনি সম্পাদক, লেখক, বুদ্ধিজীবী সবাইকে দোষারোপ করেছেন। আমি তসলিমা নাসরিনের প্রায় সবগুলো বই পড়েছি; শফিক রেহমানের সাপ্তাহিক ‘যায়যায়দিনে’ তার কলাম আমি আগ্রহ সহকারে পড়তাম। তার ‘নির্বাচিত কলাম’ বইটি হারিয়ে যাওয়ায় দ্বিতীয়বার কিনেছি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এককালের ডেপুটি গভর্নর শাহ আবদুল হান্নানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘স্যার, তসলিমা নাসরিন তো ইসলামের কোরআন, হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে ধর্মের নানা ত্রুটি তুলে ধরছেন, এর বিপক্ষে আলেমদের কাছ থেকে হুমকি ছাড়া কোন লেখা আসছে না কেন?’ স্যারের উত্তর ছিল, ‘তসলিমা দুর্বল হাদিসগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করছে বেশি’। হাদিস সহি হলে আবার দুর্বল হয় কী করে তা তখন বুঝিনি, অবশ্য এখনও বুঝি না। তসলিমা নাসরিন সত্যি একজন সুপরিচিত লেখক, তার লেখার বিরুদ্ধাচরণ করার লোক যেমন আছে তেমনি গুণগ্রাহীও প্রচুর।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মাসুদা ভাট্টিও তসলিমা নাসরিনের অভিযোগের জবাবে স্বীকার করেছেন যে, তসলিমা নাসরিন তার পক্ষে ব্রিটেন সরকারকে চিঠি দিয়েছিলেন। তসলিমা নাসরিনের ‘ক’ বইয়ের সমালোচনায় মাসুদা ভাট্টি ব্যক্তিগত আক্রমণ করেননি বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বইয়ের সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘একজন ব্যক্তির সঙ্গে আরেকজন ব্যক্তির স্বেচ্ছা-সম্পর্কের দায় দু’পক্ষের সমান এবং তা প্রকাশের আগে অন্যপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন পড়ে—‘ক’ বইটি পাঠে আমার তা মনে হয়নি’। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ‘আজকে যে আমরা মেয়েরা অনায়াস-লেখা লিখতে পারছি তার মূলপথ আমাদের জন্য উন্মুক্ত করেছেন তসলিমা নাসরিন’।
আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ একজন কূটনৈতিক ছিলেন বলেই সম্ভবত তিনি প্রায় প্রতি মাসে বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজকর্মী, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক, আমলা, মন্ত্রী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের পরিচিতজনকে তার বাসার আঙিনায় আমন্ত্রণ করে গাল-গল্প, হাসি-ঠাট্টা, গান-বাজনার আয়োজন করে থাকেন। এসব অনুষ্ঠানে থাকে শুধু মুড়ি, চিঁড়া, খই, বরই, চিঁড়ার মোয়া এবং চা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বেয়াই খন্দকার মোশাররফ হোসেন একবার তার বাসা থেকে শীতকালীন পিঠা এনে পরিবেশন করেছিলেন। আমার মেজো ভাইয়ের আয়োজিত এমন কোন একটি অনুষ্ঠানে আমি মাসুদা ভাট্টিকে দেখি। মাসুদা ভাট্টিও একজন লেখক। তিনি প্রচুর কলাম লিখেছেন। তার লেখা অনেক গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ রয়েছে। তবে পত্রিকায় লেখা কলাম ব্যতীত তার অন্য কোন লেখা পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। মাসুদা ভাট্টির কলামগুলো আমার পছন্দ। ইদানীং তার কোন লেখা পত্রিকায় দেখিনি। তসলিমা নাসরিনের ‘ক’ বইয়ের সমালোচনা করে প্রায় ২০ বছর আগে মাসুদা ভাট্টি যে কলামটি লিখেছিলেন তা আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। মাসুদা ভাট্টি লিখেছিলেন, ক দিয়ে কাম হয়, ক দিয়ে আবার কলমও হয়। তসলিমা নাসরিনের উচিত ছিল ক দিয়ে কলম ধরা; কিন্তু তিনি ক দিয়ে কাম বর্ণনা করতে গিয়ে তার নিজের ব্যক্তিগত যৌন জীবনের সংবাদ সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন। তসলিমা নাসরিন মাসুদা ভাট্টির লেখা থেকে যে উদ্ধৃতি দিয়েছেন তা আমার পঠিত কলামে ছিল কি না—মনে নেই। কারণ ২০ বছর আগে কোন একটি পত্রিকায় কলামটি পড়েছি। মাসুদা ভাট্টির সমালোচনা পড়ে আমি তখন তসলিমা নাসরিনের পক্ষে মনে মনে মতামত গঠন করেছিলাম। কারণ তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে একমত যে, জীবনী মানে জীবনের সবকিছু অকপটে প্রকাশ করা। ভালোটা প্রকাশ করে মন্দটা ঢেকে রেখে লেখাটি আত্মজীবনী হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও অ্যাকাউন্টধারীদের কেউ কেউ তসলিমা নাসরিনের পক্ষে, আবার কেউ কেউ মাসুদা ভাট্টির পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেছেন। তসলিমা নাসরিনের পক্ষে যারা মতামত দিয়েছেন বা তসলিমার স্ট্যাটাস শেয়ার করেছেন তারা মূলত ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের পক্ষাবলম্বন করেছেন। অন্যদিকে মাসুদা ভাট্টির স্ট্যাটাস যারা শেয়ার করেছেন তারা মইনুল হোসেনের বিপক্ষে বলে মনে হয়েছে। এ পক্ষাবলম্বনের মধ্যে একটি ইন্টারেস্টিং বিষয় লক্ষ্য করলাম—এতদিন যারা তসলিমা নাসরিনের মুণ্ডুপাত করেছেন তারাই তার স্ট্যাটাসটা বেশি শেয়ার করেছেন। শত্রুর শত্রু কীভাবে মিত্র হয়ে যায় তা এবার ভালোভাবে উপলব্ধি করলাম। এমন একটি আবহে ব্যারিস্টার মইনুল হোসেনের সঙ্গে দৈনিক নিউ নেশনের সাবেক বিশেষ প্রতিনিধি রব মজুমদারের টেলিফোনে কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। মইনুল হোসেন কথোপকথনে বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্ব ধ্বংস করতেই ড. কামাল হোসেনকে ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে আনা হয়েছে। এই টেলিসংলাপ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় হঠাৎ গড়ে উঠা তার সমর্থক গোষ্ঠীর অবস্থা নড়বড় হয়ে গেছে।
‘চরিত্রহীন’ শব্দটি পুরুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না হয়ে শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে কেন প্রয়োগ করা হয় তা স্পষ্ট; পুরুষের আধিপত্য পাশ্চাত্য সভ্য সমাজেও বিলীন হয়নি। হিলারি ক্লিন্টন মেয়ে বলেই নাকি তাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে পুরুষকুল জিততে দেয়নি। নারী কিছু বললেই মুখরা হয়ে যায়। সমাজ নারীর ভুলভ্রান্তি এক রত্তিও ক্ষমা করে না। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তার একটি উপন্যাসের নাম করেছেন ‘চরিত্রহীন’; এ উপন্যাসে পুরুষ, নারী অনেকগুলো চরিত্র আছে, কিন্তু চরিত্রহীন রূপে চিত্রায়িত করা হয়েছে মেয়ে চরিত্রগুলোকে। সমাজের প্রণীত নীতি ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধ জীবন ও জীবিকা গ্রহণ করে শ্রীকান্ত উপন্যাসের রাজলক্ষ্মী সমাজের দৃষ্টিতে পাপী, চরিত্রহীন। কিন্তু সমাজের জন্য প্রদত্ত রাজলক্ষ্মীর অর্থ ও শ্রম সমাজ গ্রহণ করে দ্বিধাহীন চিত্তে। শ্রীকান্তও সমাজ লালিত মূল্যবোধ অতিক্রম করতে পারেনি; তাই শ্রীকান্ত বলে, ‘লক্ষ্মী, তোমার জন্য আমি সব ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু সম্ভ্রম ত্যাগ করি কী করে?’ শরৎচন্দ্রের ‘গৃহদাহ’ উপন্যাসে সুরেশের লাম্পট্যের কারণে অচলার সতীত্ব নষ্ট হলো, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের পরীক্ষায় প্রশ্ন ছিলো, ‘অচলা সতী কি না’। সুরেশ চরিত্রহীন কি না এমন বিশ্লেষণের কোন প্রশ্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রেও থাকে না। সমাজের প্রতিনিধিত্বকারী পুরুষ চরিত্র সুরেশ তাই অচলাকে বলতে পারে, ‘তুমি অসূর্যম্পশ্যা হিন্দু ঘরের কুলবধূ নও, এটুকুতে তোমার জাত যাবে না’।
যারা জনপ্রতিনিধি ছিলেন, আবারও হতে চান তারা যদি কোন মেয়েকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে চরিত্রহীন বলেন তা মেনে নেয়া কষ্টকর। উদ্ভ্রান্ত ট্রাম্পও তার বিরুদ্ধে যৌনাচারের অভিযোগকারী কোন মেয়েকে চরিত্রহীন বলেননি। মইনুল সাহেব একজন পাবলিক ফিগার, জনগণের উল্টাপাল্টা কথা তাকে শুনতে হবে। শুনতে না চাইলে ব্যারিস্টারি পেশা বা অন্য কোন পেশায় তিনি নিরিবিলি নিমগ্ন থাকতে পারেন, কেউ বিরক্ত করবে না। একটি মেয়ে একটু ব্যতিক্রম হলো—ছেলে বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে বসে আড্ডা দিলে, সিগারেট ফুঁকলে, ছোট ছাঁটে চুল রাখলে, জিন্স প্যান্ট পরলে, চলাফেরায় একটু উচ্ছ্বাস দেখালে মেয়েটি হয়ে যায় খারাপ আর চরিত্রহীন। লক্ষ্মণ সীতার রক্ষাকবচ হিসেবে যে বৃত্ত এঁকে দিয়েছিলেন তার বাইরে পা দিয়েই সীতা রাবণের হাতে অপহৃত হয়েছিলেন; সব মানবসমাজে মেয়েদের জন্য এমন বৃত্ত পরিবার, সমাজ, ধর্ম এঁকে রেখেছে, এই বৃত্ত ভাঙলেই শুনতে হবে ‘তুমি চরিত্রহীন’। পুরুষেরা অপরাধ করে হয় চোর, বদমাশ, সন্ত্রাসী, মাস্তান—কোনভাবেই চরিত্রহীন নয়। মেয়েরা খারাপ মানেই চরিত্রহীন। বেশ্যালয়ে বসবাসকারী যদি বেশ্যা হয়, রোজ বেশ্যালয়ে যারা যায় তারা বেশ্যা নয় কেন? এগুলোর উত্তর চাইলেই সুশীল নামধারী সমাজপতিরাও নারীদের চরিত্রহীন বলতে কুণ্ঠাবোধ করে না। তসলিমা নাসরিনের মতো সাহসী হয়ে কেউ নিজের জীবনের মন্দ দিকগুলো লিখে প্রকাশ করে না বলে আমরা সবাই ‘ফুলের মতো পবিত্র’, নতুবা সমাজের দুঃসাহসী অনেকেই চরিত্রহীন।
[লেখক: সাবেক নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক ও সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশন]
zeauddinahmed@gmail.com