উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা, রবিবার, ০৭ অক্টোবর ২০১৮
অভিশপ্ত মেয়ে সন্তান
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর ‘শিশু অধিকার দিবস’ পালিত হয়। কন্যাশিশুর প্রতি লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য দূরীকরণে মানবসমাজকে সচেতন করার অভিপ্রায়ে এই দিবসটি পালন করা হয়। আবার ১১ অক্টোবর ‘আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস’ বিশ্বজুড়ে রাষ্ট্রসমূহ প্রতি বছর পালন করে থাকে। কন্যাশিশুদের অধিকার সংরক্ষণে জাতিকে অধিকতর সক্রিয় করতে শিশু অধিকার সপ্তাহের দ্বিতীয় দিনকে বাংলাদেশ ‘জাতীয় কন্যাশিশু দিবস’ হিসেবে পালন করে থাকে। কন্যাশিশুদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ইত্যাদি নিশ্চিতকরণে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে এই দিবসটি প্রতি বছর পরিবার, রাষ্ট্র ও সমাজকে সচেতন করতে সহায়তা করে থাকে। এসব দিবস পালন করা সত্ত্বেও মেয়েদের স্বাধীনভাবে নিজের মতামত ব্যক্ত করার এখতিয়ার এখনও বহু পরিবার ও সমাজ মেনে নিতে পারে না। পুরুষেরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলেও কোন অপরাধ হয় না, কিন্তু কোন মেয়ে জোরে কথা বললে স্বামী, পরিবারের সদস্য, সমাজপতিরা ‘গেল গেল’ রবে তেড়ে আসে। অভিযুক্ত কোন মেয়ের জবাব, পাল্টা যুক্তি সমাজপতিদের ক্রোধান্বিত করে তোলে। সালিশে কোন মেয়ে প্রতিনিধির উপস্থিতি আজ অবধি লক্ষ্য করা যায় না। মেয়েদের মতামত নেয়ার কথা উচ্চারিত হওয়া মাত্রই এক হাজার পুরুষ কণ্ঠে ঘোষিত হবে, ‘মেয়েরা বুদ্ধিতে খাটো’।
মেয়েদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সন্ত্রাস, অপহরণ, ইভটিজিং এবং চলাফেরায় নিরাপত্তার অভাবের কারণে পরিবার ও সমাজে অনেকগুলো অশুভ চিন্তার উদ্ভব হয়েছে। মেয়েদের শিক্ষা গ্রহণ অর্থহীন বিবেচিত হতো বলে এক সময় ৮-৯ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হতো। পরবর্তীতে শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করা হলেও ইভটিজিং ও অপহরণের ভয়ে অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার প্রবণতা শুরু হয়। মা-বাবার ‘উত্তম’ ভাবনা হচ্ছে, অপহরণ হোক বা ধর্ষণ হোক তা যেন বাপের বাড়িতে না হয়ে স্বামীর বাড়িতে হয়। তাই প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মেয়েকে পাত্রস্থ করার চিন্তায় মা-বাবা দিশেহারা হয়ে ওঠেন। কম বয়সে বিয়ে দেওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, মেয়েরা অর্থ রোজগারে সাধারণত কোন ভূমিকা রাখে না। এসব কারণে পরিবারে পুত্রসন্তানের প্রতি আগ্রহ যত বেড়েছে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তত কমেছে। সমাজে পুরুষের গুরুত্ব বেশি বলে কন্যাশিশুর ভ্রূণ হত্যায় অনেকে বিদ্যমান আইনকে তোয়াক্কাও করে না। পেটে কন্যাসন্তানের অস্তিত্ব শনাক্ত হওয়ার পর গর্ভপাত করাতে গিয়ে অসংখ্য নারীর মৃত্যুও হয়েছে।
গরিব বাবা-মায়ের পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম নিলে তাকে ‘অভিশাপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় কোন কন্যাসন্তানকে গভীর রাতে রাস্তায় গিয়ে ওষুধ আনতে পাঠানো সম্ভব নয়। শহুরে জীবনে দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত হৃদরোগে আক্রান্ত মা-বাবা কন্যাসন্তানের ওপর নির্ভর করে গভীর রাতে হাসপাতালে যাওয়ার সাহস করবে বলে মনে হয় না। তাই একটি ছেলে সন্তানের প্রত্যাশা শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে অধিকাংশ স্বামী করে থাকে। এই ছেলে সন্তানের প্রত্যাশায় পরপর অনেকজন কন্যাসন্তানের জন্ম হলেও ছেলে সন্তান না হওয়া পর্যন্ত স্বামী সন্তান উৎপাদনে অক্লান্ত থাকে। আরেকটি কুসংস্কার হচ্ছে, ঘরে বাতি জ্বালানোর জন্য ছেলে সন্তান লাগবেই। গরিব, দুঃখী মা-বাবার বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে, তাদের বৃদ্ধ বয়সে থাকা, খাওয়া ও আশ্রয় দেওয়ার ক্ষমতা রাখে শুধু ছেলে সন্তান। ছেলে চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী বা লম্পট হলেও কোন ক্ষতি নেই।
পরপর কন্যাসন্তানের জন্ম দেওয়ার জন্য স্ত্রীর অপরাধ বাড়তে থাকে। ধর্মে আছে, নারী হচ্ছে শস্যক্ষেত্র, বীজ বপন করে পুরুষ—তাহলে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য স্ত্রীকে কেন দায়ী করা হয় তা বোঝা মুশকিল। পরপর কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য স্ত্রীদের তালাক দেওয়া সাধারণ ঘটনা, পুরুষের মর্দানি প্রকাশের এমন সুযোগ হাতছাড়া করতে কেউ চায় না। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার অপরাধে স্বামীর অত্যাচার আর শাশুড়ির গঞ্জনা সহ্য করতে না পেরে বহু নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। কন্যা হিসেবে জন্ম নেয়াটাই যেন গরিব, নিঃস্ব পরিবারে পাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এরা পরের বাড়ির জন্য জন্মগ্রহণ করে বলে এদের প্রতি পরিবারের সব সদস্যের অবহেলা থাকে। শুধু শিক্ষার ক্ষেত্রে নয়, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও কন্যাসন্তানেরা এই অবহেলা ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকে। খাওয়ার সময় বাছাই করা ভালো মাছ বা মাংসের টুকরাটি দৃষ্টিকটুভাবে মা ছেলে সন্তানের পাতে তুলে দেন। অতি নিঃস্ব পরিবার হলে, কারও বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠানোর ক্ষেত্রে মা-বাবা প্রথমে কন্যাসন্তানের কথা বিবেচনা করে থাকেন।
অনাদরে, অবহেলায় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত অভিভাবকহীন পথশিশু ছেলেমেয়ে উভয়ের ভাগ্য নির্ধারিত হয় রাজপথে। কার্টুনশিল্পী রফিকুন নবী এদের নাম দিয়েছেন ‘টোকাই’। জীবনের নানাবিধ সুযোগ-সুবিধা, স্নেহ-মমতা ও আনন্দ থেকে বঞ্চিত এই টোকাইদের একজন হয়তো হয় সন্ত্রাসী, আরেকজন যৌনকর্মী। পথশিশু যদি ছেলে সন্তান হয় তাতে তার মাস্তান হওয়ার সুযোগ থাকে, সন্ত্রাসী হয়ে ছিনিয়ে খাবে অথবা পুলিশের গুলি খেয়ে মরবে। কিন্তু পথশিশু যদি মেয়ে হয় তাহলে তাকে পারিপার্শ্বিক অবস্থাই যৌনকর্মী বানাবে। সন্ত্রাসীকে মানুষ ভয়ে সম্মান করে, যৌনকর্মীকে ভোগকারী পুরুষও ঘৃণা করে।
পরিবার পুত্র চায়, সমাজ পুত্র চায়, ধর্মও পুত্র চায়। মা-বাবা জীবিত অবস্থায় যেমন পুত্রসন্তানে আগ্রহী তেমনি মৃত্যুর পর পুত্রের সেবা চায়। মরার পর মুখাগ্নি করার একমাত্র অধিকার পুত্রের। মরদেহের খাটিয়া কাঁধে নেয়া, কবর জেয়ারত করা, জানাজা পড়া আর কবরে শোয়ানোর জন্য পুত্রের প্রয়োজন। ধর্মের সমর্থন না থাকা সত্ত্বেও এই পুত্রের জন্য রমণীরা গর্ভাবস্থায় মাজার জিয়ারত করে, পীর-ফকিরের পানি পড়া খায়। ওয়াজের নামে প্রতিনিয়ত হুজুরেরা মেয়েদের অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে তাদের লাঞ্ছিত করে থাকে; বাবারা সেই ওয়াজে উপস্থিত থেকে গগনবিদারী মারহাবা ধ্বনি তুলে ঘরে থাকা স্ত্রী আর মেয়ের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত করার কাজে অংশীদার হয়।
মা-বাবার কাছে পুত্র, কন্যা উভয় সন্তান সমান প্রিয় হওয়ার কথা; কিন্তু গরিব পরিবারে তা হয় না। তাই সীতাকে পাওয়া যায় লাঙলের ফলায় ফাঁক হওয়া জমিনের গর্তে। এক সময় আরবদেশেও মেয়ে সন্তানদের জীবিত কবর দেওয়া হতো। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পূর্বের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে এক সাহাবা উল্লেখ করেছেন যে, ‘আমি যখন আমার মেয়েকে জীবিতাবস্থায় মাটিচাপা দিচ্ছিলাম তখন আমার মেয়েটা নিজের হাতে আমার দাড়ির বালু সরিয়ে দিচ্ছিল’। মানুষের আচরণ বড় অদ্ভুত, নারী-দেবীর কাছে নতজানু হয়ে নারীরাই পুত্রসন্তান কামনা করে থাকে। দুই কন্যাসন্তানের বদৌলতে মা-বাবার বেহেস্তে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পুরুষ নারীকে তাদের চেয়ে অধিক উচ্চস্থানে দেখতে পছন্দ করে না। কোন নারী বিদ্যা, বুদ্ধিতে এগিয়ে গেলে ‘নরকের দ্বার’ উপাধি দ্বারা তাদের গতিরোধ করা হয়।
রোমান সভ্যতা, চীন সভ্যতা, গ্রিক সভ্যতা নিয়ে ইতিহাসে অহংকার করা হলেও এ সব সভ্যতায়ও কন্যাসন্তানের মর্যাদা ছিল সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট। প্রায় সব ধর্মে নারী হচ্ছে যুদ্ধলব্ধ লুটের মালামাল, যুদ্ধে মৃত সৈনিকের নিরপরাধ স্ত্রী হয়ে যায় গণিমতের মাল, স্বামীর মৃতদেহের সৎকার হওয়ার আগেই ভাগ-বাটোয়ারায় স্বামীর ঘাতকের সঙ্গে ফুলশয্যায় বাসর রাত কাটাতে হয়। ইসলাম মেয়েদের মর্যাদা দিলেও সৌদি আরবের পৌরসভা নির্বাচনে ২০১৫ সনে মেয়েরা প্রথম ভোটাধিকার পায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্যের অনেক দেশও মেয়েদের ভোটাধিকার ১৯০৭ সনের আগে দেয়নি। সুইজারল্যান্ডে নারীরা ভোট দেবার অধিকার পেয়েছে ১৯৭১ সনে। কিছু ব্যতিক্রম পরিবার বাদ দিলে বেশিরভাগ পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য নারীর জীবন হয়ে উঠে দুর্বিষহ। শেখ হাসিনার সরকার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায়ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছে। এখনও নারীরা পুরুষদের ভোট দিলেও অনেক পুরুষ নারীদের ভোট দিতে কুণ্ঠাবোধ করে। তাই সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতার পরিবর্তন ব্যতীত নারীদের সত্যিকার ক্ষমতায়ন শুধু রাষ্ট্রের আইন দ্বারা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। ইন্দিরা গান্ধী, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া, ড. শিরীন শারমিন, রওশন এরশাদের মতো দুয়েকজন নয়, হাজার হাজার, লাখ লাখ এমন নারীর সৃষ্টি না হলে জাতি বা সমাজে নারীর উচ্চ-অবস্থান নিশ্চিত হবে না। বিদ্যমান সব প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে পুরুষের সমকক্ষ হতে নারীদের শুধু ঘোষিত ‘দিবস’-এ সুজনদের লিখিত কথামালা শুনে তৃপ্ত থাকলে চলবে না, প্রতিবাদ করার জন্য নিজেদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com