উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

বাঁকা কথায় উন্নয়ন মলিন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

বিগত ১০ বছর ধরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন। আইয়ুব খানের মতো এখনও তারা উন্নয়নের দশক উদযাপনের কোন পরিকল্পনা নিয়েছে বলে জানা যায়নি। তবে শেখ হাসিনার সরকার দেশের উন্নয়নে যতটুকু কাজ করেছে তার জন্য প্রশংসা অবশ্যই করা যায়; অবশ্য দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রশংসা করছেও। আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিভিন্ন মিডিয়া ছাড়াও প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদেরাও আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করে যাচ্ছেন। নোবেল বিজয়ী প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তো বিভিন্ন সামাজিক সূচকে ভারতের উপরে বাংলাদেশকে স্থান দিয়েই রেখেছেন। অন্যদিকে যে সব প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা, বিচার-বিশ্লেষণ করে থাকে সেই সব প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনেও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রভূত উন্নয়নের স্বীকৃতি রয়েছে।

অতি সম্প্রতি একটি নতুন ভিডিও সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে প্রচুর শেয়ার হচ্ছে। পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানকে সুইডেনের মডেলে উন্নীত করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। ইমরান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন পূর্বে ক্যাপিটাল টিভি নামে এক চ্যানেলের একটি টকশোতে অংশগ্রহণকারী তিন আলোচকের একজন পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট জাইগাম খান প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের উক্ত অতিশয়োক্তির প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন যে, সুইডেন নয়, পাকিস্তানকে ইমরান খান আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের স্তরে নিয়ে যেতে পারলেই পাকিস্তানের জনগণ খুশিতে আত্মহারা হবে। দেখা যাচ্ছে, আমাদের উন্নতি পাকিস্তানি বোদ্ধাদেরও প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

অনুন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশের নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কৃষি, শিল্প ও সেবা-অর্থনীতির মুখ্য এ তিনটি খাতেও বাংলাদেশের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। হাইওয়ে দুই লেন থেকে চার লেন, চার লেন থেকে ছয় লেনে প্রসারণ হচ্ছে। এছাড়াও দারিদ্র্যসীমার হ্রাস, হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিস্তৃতি, জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৭.৮৬ শতাংশ উন্নীত হওয়া, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রফতানিমুখী শিল্পের প্রসার, অপ্রচলিত পণ্যের উৎপাদন ও রফতানির সম্প্রসারণ ইত্যাদির সূচকগুলো বিচার করলেই বুঝা যায় দেশের কতটুকু উন্নতি হয়েছে। শেখ হাসিনার কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো মাতৃমৃত্যুহার কমাতে সহায়তা করে যাচ্ছে এবং এ ক্লিনিকগুলোর মাধ্যমে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের স্বীকৃতি বিশ্বের বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান থেকে ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে।

এত ব্যাপক উন্নতি হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের উন্নত দেশের পর্যায়ভুক্ত হতে অনেক দেরি; ছোট্ট একটি ভূখণ্ডে এত লোকের বসতি নিয়ে কখনও উন্নত দেশে পরিণত হবে বলে মনেও হয় না। উত্তরবঙ্গে এখন মঙ্গা না থাকলেও একমুঠো ভাতের জন্য এখনও সারা দেশে প্রচুর লোক আহাজারি করে বেড়াচ্ছে। এখনও জাকাতের কম দামের একটি শাড়ি বা লুঙ্গির জন্য বুভূক্ষু লোকের পায়ের তলায় পড়ে অন্য বুভূক্ষুরা প্রাণ হারায়। এখনও বঙ্গবন্ধু ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে দুই চামচ খিচুড়ির জন্য হাজার হাজার লোক খাবার বিতরণ উদ্বোধনের অপেক্ষায় একদৃষ্টিতে নেতার আগমনের অপেক্ষায় বসে থাকে। এখনও নদীভাঙনে সর্বহারা মানুষগুলো ভাসমান পরজীবী হয়ে ভিক্ষাবৃত্তি বেছে নিচ্ছে। তাই আমাদের আত্মতৃপ্ত না হয়ে আরও বহুদূর যেতে হবে।

আওয়ামী লীগের আমলে যে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন হয়েছে তা নেতাদের অসংলগ্ন বক্তব্যে ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হয়। হাসি আর কান্নার আবহের পার্থক্য না বুঝে আওয়ামী লীগ সরকারের একজন অভিজ্ঞ ও প্রবীণ মন্ত্রীর কথা স্কুল, কলেজের সব ছাত্রছাত্রীকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে কিছুদিন আগে রাস্তায় নামিয়েছিল। মৃত্যুর শোকাবহ পরিবেশে ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’ বলে বিএনপির একজন মন্ত্রীকে নাস্তানাবুদ হতে হয়েছিল। আসলে ব্যঙ্গ করে কথা বলা কেউ পছন্দ করে বলে মনে হয় না। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা খোঁচা দিয়ে কথা বলতে অভ্যস্ত। কাউকে হেয় করে, উপহাস করে বা ব্যঙ্গ করে কথা বললে জনগণ তা সহজভাবে গ্রহণ করে না। স্তুতিকার বা মোসাহেবদের বাহবা পেয়ে লাগামহীন বক্তব্য যত বেশি হবে তত সচেতন মানুষ বিরক্ত হবে। প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে গিয়ে বা কথা বলার সময় শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে সতর্ক না হলে সমূহ বিপদ।

আওয়ামী লীগ থেকে বলা হয়, নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ীই হবে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই হবে ইত্যাদি। কথাগুলো জনগণের মধ্যে কোন আলোড়ন সৃষ্টি করে বলে মনে হয় না। এমন কথা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে আওয়ামী লীগের আন্দোলনের সময় ক্ষমতাসীন বিএনপিও বলেছিল। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে কয়েকটি নির্বাচন হলেও পরাজিত আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কখনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়েছে বলে স্বীকার করেনি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রত্যেকটি নির্বাচন কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার চায়—অদ্ভুত আচরণ। আমি আইন এবং সংবিধান সম্পর্কে খুব কম জানি। এ ব্যাপারে পত্রিকায় যা পড়েছি তাতে মনে হয়েছে, আদালতের রায় মোতাবেক জনপ্রতিনিধি ব্যতীত দেশ শাসন করা আইনবিরুদ্ধ। অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার যে নামেই ডাকা হোক না কেন সেই সরকারে জনপ্রতিনিধির উপস্থিতি অপরিহার্য। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সম্ভবত পরবর্তী দুটি নির্বাচন সংসদের অনুমোদন সাপেক্ষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে মর্মে মতামত দিয়েছিলেন। সংসদ এ ব্যাপারে অনুমোদন দেয়নি। আমার কাছে একটি বিষয় পরিষ্কার নয়; সংবিধানের মৌলিক নীতি অনুযায়ী জনপ্রতিনিধি ছাড়া যদি কোন সরকারের আইনগত বৈধতা না থাকে তাহলে দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যায় কী করে?

শব্দ ও বাক্য ব্যবহারে জ্ঞানী ও কৌশলী হলে কঠিন কথাও উপভোগ্য হয়ে উঠে। আওয়ামী লীগের এক শাসনামলে সংসদে লোডশেডিং নিয়ে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীকে কঠিন কঠিন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। বিরোধী দলের একজন সাংসদ ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে ক্ষোভের সঙ্গে এ দুর্বিষহ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার সময়সূচি জানতে চান। তখন বিদ্যুতের যে পরিমাণ ঘাটতি ছিল তা শিগগিরই নিরসন করা আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্যগণ দিনরাত জনগণের সঙ্গে সময় কাটান, বাসায়ও লোকজনের ভিড় লেগে থাকে। অবিরত বিদ্যুৎ থাকলে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় পরিশ্রান্ত সংসদ সদস্যরা বিছানায় গিয়েই ঘুমিয়ে পড়েন; নিজের স্ত্রীর সঙ্গে দুটি কথা বলারও সুযোগ থাকে না। কিন্তু লোডশেডিং হলে মাননীয় সংসদ সদস্য ও আমার ভাবীদের ঘুম আসে না—এ অবস্থায় হাতপাখা নিয়ে মাননীয় সংসদ সদস্য কিছুক্ষণ ভাবীকে, ভাবী কিছুক্ষণ সংসদ সদস্য মহোদয়কে বাতাস করেন। তাড়াতাড়ি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে এ মধুর সম্পর্ক থাকবে না, এ জন্য আমি আরও কিছুদিন সময় চেয়ে নিচ্ছি’। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংসদে প্রদত্ত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য আমার মনঃপূত হয়েছিল। কিছুদিন আগে সংসদে বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে তার ইফতার পার্টিতে সময়মত যোগদান করতে না পারায় রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামের জন্য সরকারকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রধানমন্ত্রী দাঁড়িয়ে জবাবে বলেন, ‘মাননীয় স্পিকার, বিরোধী দলের নেতার স্বামী এরশাদ সাহেব কিন্তু ইফতার পার্টিতে যথাসময়ে এসেছেন। বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ যদি স্বামীসহ একই গাড়িতে আসতেন তাহলে সময়মত ইফতার পার্টিতে যোগ দিতে পারতেন, অন্যদিকে স্বামী-স্ত্রী দুজনে একটি গাড়ি ব্যবহার করলে মিলমহব্বতও বাড়তো, ট্রাফিক জ্যামও কম হতো’ (স্মৃতি থেকে লেখা বলে হুবহু নয়)। এভাবে হিউমারের মাধ্যমে অকাট্য সত্য তুলে ধরা হলে সৌজন্যবোধের প্রকাশ ঘটে, মনোমালিন্যও কম হয়।

মানুষ যে সব কথাবার্তা বলছে তা নাকি হুবহু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে; কিন্তু একজনের কথা আরেকজনের কথার সঙ্গে মিশে যাওয়াতে বৈজ্ঞানিকেরা চেষ্টা করেও যে কোন একজনের কথা নির্দিষ্ট করে আলাদা করতে পারছেন না। মানুষ যদি শুধু প্রয়োজনীয় কথা বলতো তাহলে বাতাসে কথার জ্যাম হতো না—সক্রেটিস, প্লেটো, অ্যারিস্টটলসহ সব জ্ঞানীগুণীদের কথা আলাদা করে অডিও রেকর্ডিং করে জগৎবাসীকে শোনানো যেত। কিন্তু আজেবাজে ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তায় ট্রাফিক জ্যাম সৃষ্টি হওয়াতে বিখ্যাত ব্যক্তিদের কথা আলাদা করা যাচ্ছে না, আমরাও অতীতের জ্ঞানীগুণীদের কথা শোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কথা আলাদা করা গেলে নেতাদের প্রদত্ত বক্তব্য পরবর্তীতে অস্বীকার করার প্রবণতাও রোধ করা যেত। ঊনসত্তরে গণআন্দোলনের একটি জনপ্রিয় স্লোগান, ‘জ্বালাও জ্বালাও আগুন জ্বালাও’—এমন উত্তেজনাকর স্লোগান সম্পর্কে পরবর্তীতে মাওলানা ভাসানীকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘আমি তো মানুষের মনে আগুন জ্বালাতে বলেছিলাম, মানুষের ঘরবাড়িতে আগুন লাগাতে বলিনি’। রাজনৈতিক নেতার কথা পরিবর্তনের ব্যাপারে ভাসানীর এ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। বক্তব্য অস্বীকার করা যায় বলে মাইকের সামনে কেউ কথা বলার সুযোগ ফেলে তাকে আর থামানো যায় না; সঞ্চালক বারবার চিরকুট পাঠায় বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার অনুরোধ করে; কিন্তু নিয়োগকর্তা বা দলীয় প্রধান স্টেজে থাকলে ক্রেন দিয়েও তাকে থামানো যায় না। সংসদেও এমনটি দেখা যায়—বাজেট আলোচনায় বাজেটের ধারেকাছেও বক্তব্য থাকে না, থাকে শুধু স্তুতি। স্তুতি করার মধ্যেও আর্ট থাকা বাঞ্ছনীয়, কিন্তু সংসদে যে স্তুতি করা হয় তা শুধু একই কথার পুনরাবৃত্তি। বোবার নাকি শত্রু নেই। তাই অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি শোনেন বেশি, বলেন কম। মহাত্মা গান্ধী সপ্তাহে একদিন মৌনব্রত পালন করতেন—অতি জরুরি বিষয় হলে কাগজে লিখে মতবিনিময় করতেন। তাই বোবাদের ব্যাপারে আমাদের জানার আগ্রহ বেশি।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com