উপসম্পাদকীয়, দৈনিক সংবাদ।
গণপরিবহনে যৌন নির্যাতন
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
[ঢাকা, রবিবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮]
কয়েকদিন আগে ড্রাইভার ও হেলপার মিলে টাঙ্গাইল বাসস্ট্যান্ডে ঘুরতে থাকা এক প্রতিবন্ধী নারীকে গাড়িতে তুলে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্বপার পাথাইলকান্দি বাসস্ট্যান্ডে নিয়ে আসে; সব বাসযাত্রী নেমে গেলেও ২৮ বছরের মানসিক প্রতিবন্ধী ওই নারী নামেনি। ফাঁকা বাসে ওই নারীকে পালাক্রমে বাসচালক, সুপারভাইজার ও হেলপার ধর্ষণ করে। মেয়ের কান্না শুনে পুলিশ হেলপারকে তাৎক্ষণিক গ্রেফতার করে, পরবর্তীতে সুপারভাইজারকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে।
টাঙ্গাইলে গণপরিবহনে বাস ড্রাইভার, হেলপার দ্বারা ধর্ষণের অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ২৬ জুলাই টাঙ্গাইলের ভৌমিক গণপরিবহনে গার্মেন্ট কর্মী শিউলির ওপর যাত্রীবেশী বাসকর্মীরা যৌন হেনস্থা শুরু করলে জানালা দিয়ে লাফ মেরে সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়ে তিনি প্রাণ দিয়েছেন। ‘তুরাগ’ পরিবহনে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে যৌন হয়রানি করা হয়েছে কিছুদিন আগে। উত্তরা ইউনিভার্সিটির এ ছাত্রী বাড্ডা লিংক রোড থেকে তুরাগ বাসে ওঠেন উত্তরা যাওয়ার জন্য। তিনি মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত আসনেই বসেছিলেন। যাত্রী বিভিন্ন স্টপেজে নেমে গেলেও বাসে নতুন কোন যাত্রী না তোলায় সন্দেহ হয় ওই ছাত্রীর। বাসটি প্রায় খালি হয়ে গেলে কন্ডাক্টর ছাত্রীকে বাসের পেছনের সিটে বসতে বলে। এতে সন্দেহ আরও বেড়ে যাওয়ায় ওই ছাত্রী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বসুন্ধরা এলাকায় চলন্ত বাস থেকে লাফিয়ে নেমে পড়ে। বিষয়টি জানার পর উত্তরা ইউনিভার্সিটির তার সতীর্থরা একটি অভিনব পদ্ধতিতে প্রতিবাদ করে; তারা গতানুগতিক ধারায় রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, ভাঙচুর বা বাসে আগুন লাগায়নি, কোন সহিংসতার পথে যায়নি, অর্ধশত তুরাগ বাস আটক করে তারা চালকের কাছ থেকে চাবি নিয়ে নেয়। এতেই পুলিশ নড়েচড়ে বসে এবং সংশ্লিষ্ট বাসের চালক, চালকের সহকারী ও সুপারভাইজারকে আটক করে। আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ উত্তরায় থাকেন বলে আমাকে প্রায়ই ‘তুরাগ’ পরিবহনে যাতায়াত করতে হয়। এখন তুরাগে উঠলেই যৌন হয়রানির ঘটনাটি মনে উদয় হয়; ড্রাইভার আর কন্ডাক্টরের দিকে দ্বিতীয়বার তাকাই।
ঢাকা শহরে গণপরিবহনে নারী যাত্রীরা বাসচালক বা তার সহকারী দ্বারা যৌন হয়রানির শিকার বহুবার হয়েছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থী তার মা’সহ আবদুল্লাহপুর থেকে রামপুরায় আসার পর ড্রাইভার বাসের লাইটগুলো বন্ধ করে দেয়। রামপুরায় স্টপেজে আসার পর তার মা নেমে গেলেও ছাত্রীটিকে নামতে না দিয়ে কন্ডাক্টর তার হাত চেপে ধরে এবং বাসও ছেড়ে দেয়। বাসের পেছনে বসা কয়েকজন বলে উঠে, ‘মাইয়াটারে ধর’। ছাত্রীটি অসহায় অবস্থায় তার হাতের টিফিন বক্স দিয়ে কন্ডাক্টরকে আঘাত করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস থেকে লাফ দেয়। এই ছাত্রী ফেসবুকে লিখেছে, ‘কালকের খবরের কাগজে আমিও হয়তো একটা কলাম হয়ে যেতাম। আমার রক্ত-মাংসের শরীরটার জন্য। কিছু জানোয়ারের জন্য। যে দেশে একটা মেয়ে তার মায়ের সঙ্গেও সুরক্ষিত নয়, সেই দেশ আর যাই হোক স্বাধীন নয়’।
ভারতে ট্রেনের ভেতরে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করেছেন এক কংগ্রেস নেতার স্ত্রী তার নিজের লেখা বইতে। ভারতের দিল্লি শহরে আড়াই কোটি মানুষের বাস। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবসতির এ শহরে ২০১২ সনে নির্ভয়া (ভারতে এমন ভিকটিমের নাম প্রকাশ নিষিদ্ধ, তবে কোন একটি পত্রিকায় নির্ভয়ার আসল নাম জ্যোতি সিংহ লিখলে লেখককে পুলিশের নিকট জবাবদিহি করতে হয়, জ্যোতির মা নাম প্রকাশে সম্মতি দেয়ায় লেখক মুক্তি পান) নামের ২৩ বছরের এক মেডিকেল ছাত্রীকে চলন্ত বাসে গণধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। নির্ভয়ার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। বাসের ড্রাইভার ও কন্ডাক্টররাও যে যাত্রীদের সঙ্গে সময় এবং সুযোগ বুঝে ধর্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে পারে তা নির্ভয়ার খুনের পর সবাই উপলব্ধি করতে পারল। বাসের ড্রাইভার, সুপারভাইজার, কনডাক্টর দ্বারা বাংলাদেশি মেয়ে রূপার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডেও এমন একটি আলোড়ন হয়েছিল। বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে তরুণী রূপাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে মধুপুর এলাকার জঙ্গলে ফেলে দেওয়া হয়। পরিচয় উদ্ধার করতে না পারায় প্রথমে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবেই দাফন করা হয়; গণমাধ্যমে বেওয়ারিশ লাশ দাফনের খবর প্রকাশের পর থানায় রক্ষিত রূপার ছবি দেখে তার ভাই ভিকটিমকে শনাক্ত করে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিচারের রায় ছয় মাসের মধ্যে দেওয়া হয়েছে; এত দ্রুত বিচারের রায় সাধারণত হয় না। অভিযুক্ত চারজনকে মৃত্যুদণ্ড ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের যথোপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হলেও এর দ্বারা বাকি দুর্বৃত্তদের অপরাধ কর্ম থেকে নির্বৃত্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে হয় না। কারণ এর পরও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে, হচ্ছে।
বাংলাদেশের উল্লিখিত ঘটনাগুলো থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, শুধু ধর্ষণের উদ্দেশ্যেই ছাত্রীদের বাস ড্রাইভার ও তার সহকারীরা টার্গেট করেছিল। কারণ এদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়ার মতো আর তেমন কিছুই ছিল না। এছাড়াও যৌন হয়রানির আরও অনেক ঘটনা গণপরিবহনে ঘটেছে। ঢাকার দারুস সালামে চলন্ত বাসে যৌন হয়রানির অভিযোগে চালক ও কন্ডাক্টরের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী মামলা করে। ঢাকা শহরের খিলগাঁওয়ে এক গৃহবধূকে মাইক্রোবাসে যৌন নির্যাতনের পর ওই মাইক্রোবাসে চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোডে মাইক্রোবাসের ভেতরে এক গারো তরুণীকে গণধর্ষণ করা হয়। রাজধানীর অদূরে সোনারগাঁয়ে বাসের মধ্যে এক তরুণীকে ধর্ষণ করে বাসচালক ও তার সহকারী। আশুলিয়ার বাস কাউন্টারে ট্রাংক থেকে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়; তদন্তের পর জানা যায়, তরুণীকে বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করে ট্রাংকের ভেতর রাখা হয়। ঢাকা শহরের বিভিন্ন পরিবহনে যৌন হয়রানির উল্লিখিত কয়েকটি ঘটনা ছাড়াও দেশব্যাপী বাস, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ ইত্যাদি যানবাহনে অহরহ মেয়ে যাত্রীদের যৌন হয়রানি করা হয়।
বাসচালক ও তার সহকারীদের দ্বারা নারী যাত্রীদের ওপর যেভাবে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটছে তার সুনির্দিষ্ট কারণ কেউ অনুসন্ধান করতে পেয়েছে বলে মনে হয় না। আমি একটি কারণের প্রতি সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। রূপ ভিন্ন হলেও আদি যুগ থেকেই স্বীকৃত পতিতালয় ও সেক্স ওয়ার্কার ছিল। কলকাতার একটি সিনেমায় দেখেছিলাম, পতিতালয়ে যাওয়ার সময় পত্নীরা স্বামীকে সাজিয়ে দিয়ে গায়ে ও পোশাকে সুগন্ধি মাখিয়ে দিচ্ছে। কিছু কিছু মানুষের স্বভাবজাত আচরণের মতো অনেক ড্রাইভার দীর্ঘ যাত্রাপথে পতিতালয়ে গিয়ে বিশ্রাম নিতে অভ্যস্ত ছিল; এদের অনেকে গাড়ি পার্কিং-এ রেখে নিয়মিত পতিতালয়ে যেত। পৃথিবীর সব নৌ ও সমুদ্রবন্দরে পতিতালয় রয়েছে; সমুদ্রে দীর্ঘদিন অবস্থানের পর নৌ ক্রুরা যে কোন দেশে নদী ও সমুদ্র তীরবর্তী পতিতালয়ে সহজে যেতে পারে। আমাদের দেশেও কয়েকটি পতিতালয় ছিল; এগুলোতে বিভিন্ন শ্রেণির লোক ছাড়াও অবসাদগ্রস্ত অনেক গাড়িচালক ও তাদের সহকারীদের গতায়াত ছিল। হোটেল ভাড়া না নিয়ে তারা পতিতালয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ারও সুযোগ পেত। ধার্মিক হওয়ার ব্রত নিয়ে, মহান ব্যক্তি সাজার এবং পতিতালয়ের জমি দখল করার কুমতলবে কিছু প্রভাবশালী লোক এ পতিতালয়গুলোর উচ্ছেদ করে। পতিতালয় উচ্ছেদের কারণেই কি গণপরিবহনের কিছু ড্রাইভার ও তাদের সহকর্মীরা এত দুঃসাহসী ও দুর্বৃত্ত হয়ে উঠেছে? আমি কোন মনোবিজ্ঞানী বা সমাজ বিশ্লেষক নই; আমার এটি একটি উপলব্ধিজাত ধারণা। নতুবা কিছু মানুষ এভাবে সর্বত্র ধর্ষক হয়ে উঠছে কেন? পতিতালয় থাকলেও রাস্তা-ঘাটে ধর্ষকের অভাব হবে না; কারণ কিছু লোক মেয়েদের সম্মতি-অসম্মতির ধার ধারে না, চেতনানাশক ওষুধ খাইয়ে নিথর দেহেও এরা ধর্ষণ করে আনন্দ পায়। তবে এত অন্যায়-অবিচার, ধর্ষণ, খুনে একটি মুখ্য কারণ হচ্ছে, ছোট্ট একটি ভূখণ্ডে জনসংখ্যার আধিক্য।
গণপরিবহনে যৌন হয়রানির ভয়াবহ রূপ অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেও বিদ্যমান। মিসরে ৮২ ভাগ নারী পরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। এছাড়া মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পেরু, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, পাপুয়া নিউগিনি, ফিজি প্রভৃতি দেশেও গণপরিবহনে নারীদের যৌন হয়রানি করা হয়ে থাকে। অবাধ যৌনাচারে অভিযুক্ত ইউরোপ বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গণপরিবহনে যৌন হয়রানি নেই। আমাদের মতো দেশে নারী-পুরুষের মেলামেশায় প্রতিবন্ধকতা থাকায় সুযোগ পেলেই তা যৌন হয়রানির কাজে লাগানোর জন্য কিছু পুরুষ উন্মাদ হয়ে ওঠে, তারা মনে করে এমন সুযোগ জীবনে নাও আসতে পারে।
লোকলজ্জা আর সমাজে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে মুখ বুজে সয়ে গেলে যৌন হয়রানি কখনোই তিরোহিত হবে না; প্রতিবাদ করেই এর প্রতিকার করতে হবে। ভারতের একটি বাসে যৌন হয়রানির শিকার দুই বোনের তাৎক্ষণিক অভিযুক্ত তিন যুবককে বাসে সবার সামনে বেল্ট দিয়ে পিটানোর ভিডিও দেখেছি ফেসবুকে। বাংলাদেশের গণপরিবহনে উপর্যুপরি যৌন নিপীড়নের ঘটনা ঘটতে থাকায় নীরবে ও সরবে কিছু প্রতিবাদ হচ্ছে। কানিজ ফাতেমা নামে এক কলেজছাত্রী সাহস করে একটি পোস্টার নিয়ে ঢাকার রাজপথে নীরবে দাঁড়িয়ে গণপরিবহনে যৌন নির্যাতনের শুধু প্রতিবাদ নয়, শত শত রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠনের নীরবতায় লাখ নিনাদে শোরগোল তুলেছে। প্রখর রোদে একাকী দাঁড়িয়ে এভাবে প্রতিবাদ করার তার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল নাগরিক সমাজকে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানো। ধর্ষণের প্রতিবাদে উত্তরায় একাই রাস্তায় নেমেছিলেন আফসানা কিশোয়ার লোচন নামে আরেকজন নারী। কিছু লোক এ ধরনের প্রতিবাদের প্রশংসা করলেও অনেকে বিরূপ মন্তব্যও ছুঁড়ে দিয়েছে। অনেকে একাকী দাঁড়ানো মেয়েদের দেখে তাদের চরিত্র নিয়েও মন্তব্য করেছে। তবে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ হচ্ছে। নারী সংগঠনগুলোও এ ধরনের ঘটনায় প্রতিবাদ করছে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com