বন্ধুরা, আমি অসুস্থ, অন্যদিকে আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। যিনি আমার লেখাগুলো ফেসবুকে পোস্ট করেন তার ছেলের আজ বৌভাত। তাই পত্রিকা থেকে নয়, টেকনিক জানি না, আমার যে লেখাটি আজ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে তা আমার লেখা থেকে দিয়ে দিলাম।

সংবাদ, ২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

রোববার, উপসম্পাদকীয়

গরুর গুঁতায় মৃত্যু

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

রাজধানীর পোস্তখোলায় হরিচরণ সাহা রোড এলাকায় কোরবানীর জন্য কিনে আনা গরুর গুঁতায় একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির মৃত্যু সংবাদ পড়লাম একুশ তারিখের সংবাদে। স্কুল জীবনে গরুর রচনা মুখস্থ করেনি এমন ছাত্র-ছাত্রী খুব কম। রচনা বইতে পড়েছি, গরু তৃণভোজী ও নিরীহ প্রাণী। এমন একটি নিরীহ প্রাণী হঠাৎ ক্ষেপে যাওয়ার কোন কারণ পত্রিকায় লেখা হয়নি। ধারণা করি, রাস্তায় চলাচলে মানুষকুলের প্রতি তার আগে থেকেই ক্ষোভ জন্মেছিলো। যেভাবে ট্রাক, লরি বা লঞ্চে দাঁড় করিয়ে শত শত মাইল রাস্তা পার করা হয় তার অসহনীয় কষ্টের প্রতিশোধ নিতে বোধ হয় এই গুঁতো। ট্রাকের দুর্বার গতিপথে খানাখন্দের প্রতিবন্ধকতায় যে ঝাঁকুনির সৃষ্টি হয় তা সামাল দিয়ে চালকের পক্ষেও সিটে সোজা হয়ে বসে থাকা সম্ভব হয় না। গরুগুলো বাঁশের তৈরি খুপরির মধ্যে কোনভাবেই পাগুলো স্থির রাখতে পারে না। গলার রশি কয়েক ইঞ্চি ঢিলা করে বাঁশের সাথে এমনভাবে বাঁধা থাকে ট্রাকের ঝাঁকুনিতে পা ফসকে গেলে গলায় ফাঁস পড়ে। একুশটা গরু নিয়ে একটি ট্রলার ডুবে গেলে সবগুলো গরুই শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি না পেয়ে পানিতে সংগ্রাম করতে করতে মরেছে। দূরদূরান্ত থেকে কোরবানীর গরু আনার আর কোন ভালো ব্যবস্থাও নেই। বাজার থেকে কেনার পর গন্তব্যস্থলে যাওয়ার সময় গরু নিয়ে রীতিমত যুদ্ধ করতে হয়—দুইজন সামনে রশি ধরে টানে, তিনজন পেছন থেকে ঠেলে। তারপরও না নড়লে পেটানো হয়।

আমরা যারা হালচাষ করেছি তারা সম্যকভাবে অবহিত যে, হালচাষে গরুর কষ্ট কত অসহনীয় হয়ে উঠে। পানির মধ্যে অনবচ্ছিন্নভাবে হালচাষ করলে গরুর খুরায় ক্ষত হয়ে যায়। তখনকার দিনে ডাক্তার এনে চিকিৎসা করার তাগিদ খুব বেশী লক্ষ্য করিনি। অন্যদিকে শক্ত মাটি কর্ষণে লাঙ্গল সোজা করে ধরে রাখা কারো পক্ষেই সম্ভব হতো না; এতে লাঙ্গলের ফলা গিয়ে বিঁধতো গরুর পায়ে। কিছুদিন পর ক্ষত হয়ে যেত, কৃষক তাদের জানা কিছু টোটকা চিকিৎসা দিতো; কখনো কাজ হতো, কখনো হতো না। ফলে এমন ক্ষত নিয়েই মনিবের কথামতো জমি কর্ষণে গরু বারমাস ব্যস্ত থাকতো। কাঁধে জোয়ালের অবিরত ঘর্ষণে যে ক্ষতের সৃষ্টি হতো তা গরুকে আমৃত্যু বহন করতে হতো। কারণ কাঁধে সৃষ্ট ক্ষত শুকানোর কোন সুযোগ ছিলো না। গরুর গাড়ীর গরুগুলোর এই ক্ষত অনেক বেশী দৃশ্যমান ছিলো। গ্রামের হাট, বাজারের পণ্য বোঝাই গরুর গাড়ীর চাকার ঘর্ঘর শব্দের তালে তালে গাড়োয়ান চিকন লাঠি দিয়ে গরুর পিঠে বাড়ি মারতো। দ্রুত গতি আনার জন্য গরুর লেজে মোচড় দেওয়ার অভ্যেস অনেকের ছিলো। এতে অনেক গরুর লেজ ভেঙে গিঁটের সমষ্টি হয়ে যেত। গাড়ী চালানো বা হালচাষের সময় গাড়োয়ান ও কৃষকেরা গরু তাড়ানোর কিছু অদ্ভুত শব্দ করত—এখন আর মনে নেই। হালচাষের মাঝপথে কৃষক বাড়ী থেকে আনা ভাত ক্ষেতের আইলে বসে খেয়ে নিত; কিন্তু হালের গরুর জন্য কোন খাবার থাকতো না।

আগের দিনে গরুর পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যেত। এখনকার মতো পঞ্চাশ বছর আগে জমিতে সারা বছর ফসল ফলানো হতো না। বছরে ছয় মাস জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো, জমির মধ্যে হাডুডু, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ফুটবল খেলার প্রতিযোগিতা হতো। এমন অনেক জমি ছিলো যেগুলোতে কখনোই চাষাবাদ হতো না। তখন ঐসব জমিতে চাষাবাদ লাভজনক বিবেচিত হতো না। এই পতিত জমিগুলো গরু চরানোর কাজে ব্যবহৃত হতো। গরু চরানোর ক্ষেত্রে জমির মালিকানা নিয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হতো না। এখন বছরে কমপক্ষে তিনবার ফসল উৎপাদন হয়; অদূর ভবিষ্যতে পাঁচ বা ছয়বারও হতে পারে। জনসংখ্যা যেভাবে অপ্রতিহত গতিতে বাড়ছে তাদের মুখের অন্ন যোগানোর জন্য জমি বাড়ছে না, বরং কমছে। এই বাস্তবতায় কৃষিবিজ্ঞানীরা স্বল্পতম সময়ে ফসল ফলানোর পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও গবেষণায় ব্যস্ত। গরুর খাদ্য এখন আর প্রাকৃতিকভাবে সহজলভ্য নয়, মানুষের খাদ্যকে প্রক্রিয়া করে গরুর খাদ্য তৈরি করা হচ্ছে; গরুকে গম, ভুট্টা সব খাওয়ানো হচ্ছে। গরু এক সময় কোন কোন দেশের মানসম্মানও বাঁচিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ গম আমদানীকে পরিহাস করে পুঁজিবাদী দেশগুলো প্রমাণ করতে চাইতো যে, সমাজতন্ত্র বা সাম্যবাদে দেশ ও জনগণের উন্নতি হয় না। রাশিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ হওয়া সত্ত্বেও অপেক্ষাকৃত কম লোকেরও খাদ্য উৎপাদনে ব্যর্থ। তখন রাশিয়াসহ সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর সাথে আমাদের মতো সমর্থকেরাও সমস্বরে উচ্চকণ্ঠে বলতাম, 'গমের এই আমদানী ভাই গরুর জন্য'।

খাবারের আকাল হলে এই নিরীহ প্রাণীটিও মাঝে মাঝে বিদ্রোহ করে। গরুর গলায় প্যাঁচানো একটি নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের রশির সাথে একটি খুঁটি বাঁধা থাকতো; খুঁটিটি মাটিতে পোঁতা হলে গরু বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে নির্দিষ্ট স্থানের ঘাস খেতো। কিছুক্ষণ পর মালিক বা রাখাল এসে খুঁটিটি মাটি থেকে তুলে ঘাসে আবৃত আরেকটি স্থানে পুঁতে দিত। কিন্তু এই পরিবর্তন দীর্ঘক্ষণ না হলে অনেক সময় শক্তিশালী গরুগুলো রশি ছিঁড়ে বা খুঁটি তুলে অন্যের শস্য ক্ষেতে চলে যেত। কোন কোন রাখাল ছিলো দুষ্ট প্রকৃতির; ইচ্ছে করে খুঁটিটি পুঁততো নরম মাটিতে যাতে গরু অন্যের জমির ফসল খেতে পারে। অনেক সময় ক্ষেতের মালিক ছুটে এসে গরু পেটানো শুরু করত এবং ধরতে পারলে খোয়াড়ে পুরতো। খোয়াড় হচ্ছে, গরু, ছাগলের জেলখানা। এই জেলখানা নিলামে উঠতো, যে বেশী অর্থ দেবে তাকে সাধারণত এক বছরের জন্য এই জেলখানার মালিকানা স্বত্ব স্থানীয় প্রশাসন থেকে দেওয়া হতো। কোন গরু, ছাগল খোয়াড়ে দেওয়া হলে মালিককে স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক ধার্যকৃত অর্থ পরিশোধ করে গরু, ছাগলকে ছাড়িয়ে আনতে হতো। এই খোয়াড় নিয়ে সালিশ, দরবারও বসতো, মারামারি হতো। খোয়াড়ে কয়েকদিন থাকলে গরু, ছাগলের খাবারের পয়সাও খোয়াড় মালিক আদায় করত। নিরীহ প্রাণী বলে গরুর কোন বোধ-বুদ্ধি নেই—ঘাস এবং ফসলের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে পারে না। খোয়াড় থেকে ছাড়িয়ে আনতে পয়সা খরচ হওয়ার কারণে মালিকের সব রাগ পড়তো গরু, ছাগলের উপর; বাড়ীতে এনে গাছের সাথে বেঁধে শক্ত লাঠি দিয়ে পেটানো হতো।

গরুর লড়াই গ্রামের মানুষের নিকট ছিলো উপভোগ্য। এমন লড়াইয়ের সংবাদ ঢোল পিটিয়ে আগেই সবাইকে জানানোর রেওয়াজ ছিলো। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সর্ব মহলে ষাঁড়ের লড়াই জনপ্রিয় ছিলো। লড়াইতে জিততে মালিক তার গরুকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতো। নিজের খাবার যোগাড় করা কষ্টসাধ্য হলেও তার লড়াকু ষাঁড়টির জন্য পুষ্টিকর খাবার বরাদ্দ রাখতো। গরুর মালিক একজন হলেও গরুর সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হতো। লড়াইয়ে নির্বাচিত ষাঁড় দুইটি ভিন্ন গ্রামের হলে মানুষ গ্রাম ভিত্তিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে যেত। লড়াইয়ে হারজিত নিয়ে সমর্থক গোষ্ঠীর মধ্যে মারামারিও হতো। তবে অধিকাংশ লড়াই শেষ হতো আনন্দ সহকারে। যে ষাঁড় লড়াইয়ে জিততো তার গলায় অনেকগুলো ফুলের মালা পড়তো। সমর্থক গোষ্ঠীর লোকেরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে বিজয়ী গরুটি নিয়ে নিজের গ্রামের সবাইকে ঘুরে ঘুরে খুশীর খবরটি জানাত। প্রতিটি বাড়ী থেকে এই আনন্দ মিছিলে লোক এসে যোগ দিত, রমণীরা উঁকি মেরে দূর থেকে আনন্দ মিছিলে শরীক হতো।

গরু দুধ দেয়—দুধ দেওয়ার উপকারিতা 'গরুর রচনায়' আমরা ইনিয়ে-বিনিয়ে লিখতাম। গ্রামে তখন শিশু এবং প্রবীণদের একমাত্র পুষ্টিকর খাদ্য ছিলো গরুর দুধ। তখন মানুষ বিশ্বাস করত, দীর্ঘায়ু লাভে গরুর দুধের কোন বিকল্প নেই। মায়ের বুকের দুধ পর্যাপ্ত না থাকলে গরুর দুধই তখন শিশুর একমাত্র খাবার হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু এই দুধের হকদার গরুর বাচ্চা। মানুষ প্রতারক; গাভী এবং মাসুম বাছুরের সাথে ছলচাতুরী করে সব দুধ নিজের জন্য দোহন করে নিঙড়ে নেয়। বাছুরকে দুধ খেতে সুযোগ দিয়েই মায়ের দুধ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হয়। গাভী বাছুরের জন্য দুধ ছাড়ে, অথচ দোহন করে মানুষ। এই প্রতারণার জন্য শাস্তির বিধান থাকা আবশ্যক। মানব সমাজে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে উপদেশ বর্ষণ করা হয়—মায়ের দুধের বিকল্প নেই। অথচ বাছুরকে এই উপদেশ দানকারী মানুষগুলো তার মায়ের দুধ থেকে প্রতারণা করে বঞ্চিত করে।

গরুর প্রতি মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে তা কল্পনাও করা যায় না। আমার এক কাকার এক শক্তিশালী ষাঁড় ছিলো; আমরা ভয়ে ওর কাছে যেতাম না। কাকাও শক্তিশালী। কাকা তার এই ষাঁড়ের প্রতি অত্যধিক যত্নশীল ছিলেন, নিজের হাতে ঘাস, খড় কেটে খাওয়াতেন, প্রতিদিন গোসল করাতেন। একদিন কোন কারণে মাঠে কাকাকে ষাঁড়টি তার শিঙের উপর তুলে দূরে ছুঁড়ে দিয়ে দৌড় দেয়। কাকা বহু কষ্টে ষাঁড়টি ধরে এনে গাছের সাথে রশি দিয়ে বেঁধে বাঁশের শক্ত লাঠি দিয়ে অনবরত পিটিয়েছেন, ষাঁড়টির চিৎকারে আশেপাশের শত শত লোক জড় হয়ে যায়, তবুও কাকার রাগ কমে না, প্রথম লাঠি ভেঙে গেলে দ্বিতীয় আরেকটি লাঠি দিয়ে মারতে থাকেন। কেউ গরুটিকে বাঁচাতে আসেনি। এই মারের পর গরুটি বেশী দিন বাঁচেনি।

সম্ভবত গত বছর ফেসবুকে গরু কোরবানীর একটি নিষ্ঠুর খেলা লক্ষ্য করেছিলাম। কম বয়সী এক মাদ্রাসার ছেলের হাতে কোরবানীর গরুর জবাইটা ঠিকমতো না হওয়াতে লাফ দিয়ে গলাকাটা গরুটি প্রাণ বাঁচাতে দৌড় দেয়। ওখানে উপস্থিত ছেলে, মেয়ে, যুবক, প্রবীণেরা হাসতে হাসতে গরুটির পেছনে পেছনে ছুটতে থাকে। কিছু দূর গেলে শক্ত সামর্থ্য এক যুবক একটি লাঠি দিয়ে গরুটির মাথায় সজোরে আঘাত করে, গরুটি মাটিতে পড়ে যায়। ছুরি হাতে মাদ্রাসা পড়ুয়া ছেলেটি গরুটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ছুরি চালাতে থাকে, আস্তে আস্তে গরুটি নিস্তেজ হয়ে যায়। এমন একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন আবু জাফর শামসুদ্দীন তার 'আত্মস্মৃতি' বইটিতে। তাদের কোরবানীর গরুটির জবাই গভীর না হওয়ায় হঠাৎ গরুটি লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়, জবাইয়ের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট ছিলো তারা আবার জোরপূর্বক শুইয়ে দ্বিতীয়বার জবাই করলো, কিন্তু এবারও জবাই ঠিকমতো না হওয়ায় গরুটি দাঁড়িয়ে যায় এবং তৃতীয়বার জবাই করার পর গরুটি নিস্তেজ হয়। এমন আনাড়ির কার্যক্রমে কোরবানীতে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা প্রায়ই হয়।

ধর্মীয় কারণে কোরবানী ছাড়াও মানুষ পশু জবাই করে থাকে, কারণ মানুষের প্রিয় খাবার মাংস। উদ্ভিদের মধ্যেও প্রাণ আছে, তাই সবজী খেলেও প্রাণের বধ হয়। তবে উদ্ভিদের প্রাণ বাঁচানোর আকুতি দেখা যায় না বলে এক্ষেত্রে মানুষের নিষ্ঠুরতা প্রতিপন্ন হয় না। সবজীর মধ্যেও প্রচুর প্রোটিন রয়েছে; তাই মানুষের বাঁচার জন্য মাছ, মাংস অপরিহার্য নয়। প্রাণী ভেদে পাঁচনক্রিয়ার যতই পার্থক্য থাকুক না কেন, সবজী খেয়েই বৃহদাকার হাতি বেঁচে থাকে। পৃথিবীর বহু লোক আমিষ স্পর্শ করে না। কেঁচোর মতো মানুষ যদি মাটিকে খাদ্য হিসেবে বেছে নিত বা মানুষ যদি পাথর খেয়ে বাঁচতে পারতো তাহলে মানুষের হাতে এত প্রাণীর নিধন হতো না। প্রতিদিন মোরগ, জ্যান্ত মাছ বটি দিয়ে আমরা কাটি। ওরাও বাঁচার চেষ্টা করে। কোন প্রাণীই মরতে চায় না। আজরাইল যখন আমাদের জান কবজ করেন তখন তা অন্য কেউ দেখতে পায় না। মরার করুণ দৃশ্য কোনভাবেই দর্শনীয় নয়। সিনেমায় কোন মারামারি, দাঙ্গা-হাঙ্গামার দৃশ্য থাকলে সিনেমা শুরুর পূর্বেই সতর্ক করা হয়। শিশুদের কোরবানির জবাইয়ের দৃশ্যে উপস্থিত রাখা কতটুকু যৌক্তিক তা মনোবিজ্ঞানীরা ভালো বলতে পারবেন। সৌদি আরবে অপরাধীর গর্দানে জল্লাদের কোপ জনসম্মুখে হলেও হাজীদের কোরবান যত্রতত্র করতে দেওয়া হয় না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে গরু, ছাগল, মহিষ জবাইয়ের সুনির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে গরু-ছাগল জবাইয়ের নিমিত্তে ছয় শতাধিক স্থান নির্ধারণ করে জনগণকে জানানো হয়েছিলো; সৈয়দ আবুল মকসুদের অভিমত হচ্ছে, কোরবানির জন্য ক্রীত বড় গরুটি গড় হরিবলে কোরবানি করতে অনেকে সম্মত হয়নি।

ফেসবুকে কুকুরের একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখেছিলাম, ডাঙ্গায় রাখা একটি মাছকে বাঁচানোর জন্য একটি কুকুর মাছের উপর পানি দিচ্ছিলো। অনেক হাঁসকে দেখেছি, মাছকে আধার খাওয়াতে। বিড়াল মাছকে আদর করছে—এমন দৃশ্যও আমাকে বাঁচার অনুপ্রেরণা দেয়। একটি হরিণের বাচ্চাকে অন্য শিকারির হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টারত বাঘের না খেয়ে মরার দশা হয়েছিলো। কারণ অন্য বাঘ বা সিংহের আক্রমণ থেকে বাচ্চা হরিণটিকে রক্ষা করতে গিয়ে তার নিজের শিকার করা বন্ধ রাখতে হয়েছিলো। এগুলো হয়তো ব্যতিক্রম—তবে ব্যতিক্রমই আজ আমার লেখার উপজীব্য। এখনো গ্রামের দরিদ্র মহিলারা তাদের পালিত আদরের গরুটি পেটের দায়ে বিক্রি করতে বাধ্য হলেও বিক্রির পর তাদের চোখ আপনা-আপনি ভিজে যায়। আমার পরিচিত শ্রাবণী নামে এক মেয়ে রাত তিনটায় তাদের কোরবানীর গরুটিকে গলা জড়িয়ে ধরে কেঁদেছে, তার ধারণা গরুটিও কেঁদেছে। বোধ হয় শ্রাবণীর কথার কিছুটা সত্যতা আছে—বহু গরুর চোখ অশ্রুসিক্ত মনে হয়। কম কষ্ট দিয়ে জবাই করার আইন-কানুন, নিয়ম-রীতি, আদালতের নির্দেশনা বহু দেশে রয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সেক্রেফাইসটা পরিশেষে গরু, ছাগলই করে থাকে, মানুষ নয়। তাই জবাইটা নির্জন, নিভৃতে, কম কষ্ট দিয়ে হোক—এই বাসনাটি আস্তে আস্তে জাগ্রত হলেই আমাদের শিশুরাও কোমল স্বভাবের অধিকারী হবে বলে মনে হয়।

লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক

zeauddinahmed@gmail.com