উপসম্পাদকীয় (দৈনিক সংবাদ)

অল্পদর্শী-আবু জাফর শামসুদ্দীন

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

[ঢাকা, রবিবার, ২৬ আগস্ট ২০১৮]

আমি আমার আরেকটি লেখায় উল্লেখ করেছি যে, ‘সংবাদ’ আমার প্রিয় পত্রিকা। ছাত্র জীবনে এ পত্রিকাটি বহু আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের বাসায় দেখতাম—এখন খুব দেখি না। পত্রিকার সব লেখা সব পাঠকের কাছে সমান আদরণীয় নয়—কেউ খুন-জখমের সংবাদ পড়তে পছন্দ করেন, কেউ খেলার খবর প্রথম দেখেন, কেউ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কেউ সিনেমা জগত, কেউ সাহিত্যের পাতা, কেউ সম্পাদকীয় এবং কেউ শুধু হেডলাইন পড়ে সন্তুষ্টি পায়। আমার কাছে সর্বদা উপসম্পাদকীয় আকর্ষণীয়। এক সময় আমি ‘সংবাদ’ এবং ‘ইত্তেফাক’-এর উপসম্পাদকীয় পড়ার পর অন্য খবরগুলো পড়তাম। সংবাদে যারা উপসম্পাদকীয় লিখতেন তাদের মধ্যে মরহুম জহুর হোসেন চৌধুরী এবং মরহুম আবু জাফর শামসুদ্দীনের লেখা আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করত। জহুর হোসেন চৌধুরী লিখতেন ‘দরবার-ই-জহুর’ আর আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখতেন ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’। এদের দু’জনই সমাজতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিশ্বাসী ছিলেন। বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তার লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন ১৯৮৮ সালের ২৪ আগস্ট পৃথিবীর ছেড়ে চলে যান। তার প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানানোর আকুতি থেকে আজকের এ লেখা। আমি জীবনে তাকে কখনও দেখিনি। তবে তার ছেলে আহমেদ শামসুদ্দীন পারভেজ ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা আছে। পারভেজ ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার এক বছরের সিনিয়র, পড়তেন মৃত্তিকা বিজ্ঞান। কৃশকায় আবু জাফর শামসুদ্দীনের পক্ষে তার শরীরের সব শক্তি প্রয়োগ করে ফুটবলে একটি লাথি মারা সম্ভব না হলেও তার ছেলে পারভেজ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে সুপরিচিত ছিলেন এবং ‘ব্লু’ উপাধি পেয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ক্রিকেটার এবং মৃত্তিকা বিজ্ঞানের আমার আরেক বন্ধু ঝিল্লুসহ জাতীয় দলে বাস্কেটবল খেলোয়াড়।

আবু জাফর শামসুদ্দীন ১৯১১ সালে গাজীপুর জেলার দক্ষিণবাগ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আমাদের বয়সীরা গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেছি আরবি বর্ণ পাঠ দিয়ে; আমাদের আগেও একই ব্যবস্থাই ছিল। অন্যদিকে বাংলা বর্ণ শেখানো হতো গ্রামের কোন পণ্ডিতের টোল বা পাঠশালায়। আবু জাফর শামসুদ্দীন বাংলা বর্ণমালাসহ আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা রপ্ত করেন বাড়িতে তার বাবার কাছে। কঞ্চির কলম, মাটির হাঁড়ির নিচের কালি বা শিম পাতার রস দিয়ে বানানো কালির ব্যবহারের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। এমন কলম ও কালি আমাদের বাল্যকালেও ব্যাপক ব্যবহার হয়েছে। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের এক পণ্ডিতের পাঠশালায়; কিন্তু প্রভাতচন্দ্র গোপের গোয়ালঘরে প্রতিষ্ঠিত এ পাঠশালাটি দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়নি। সুদর্শন ভট্টাচার্যের প্রতিষ্ঠিত আরেকটি পাঠশালায় তিনি আবার ভর্তি হন, কিন্তু ভট্টাচার্যের পক্ষে পকেটের টাকা খরচ করে বেশি দিন পাঠশালাটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। তারপর তিনি তাদের আদি নিবাস ডেমরায় তার কাকার বাড়িতে অবস্থান করে একটি মিডল ইংলিশ স্কুলে তৃতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। তিনি কাকার বাড়ি ও ডেমরার স্কুল ছেড়ে দিয়ে পরে ডেমরায় একটি জুনিয়র মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। পরে ঢাকার হাই মাদ্রাসা পরীক্ষায় পাস করে তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে ভর্তি হন; কিন্তু তিনি কাউকে কিছু না বলে কলেজ ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ কলকাতা চলে যান এবং কলকাতা থেকে বাবাকে চিঠি লিখে বাড়িতে অর্থানটনের মধ্যে পড়ালেখা কনটিনিউ করা সমীচীন মনে করেননি বলে উল্লেখ করেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মাদ্রাসায় শেষ হলেও মাদ্রাসার বিশ্বাসনির্ভর ভাবনা অতিক্রম করে তিনি যুক্তিনির্ভর জীবন গড়ে নিয়েছিলেন। অবশ্য রাজনীতির মারপ্যাঁচে মগজ ধোলাইয়ের প্রচেষ্টা তখনকার মাদ্রাসা শিক্ষায় ছিলও না।

আবু জাফর শামসুদ্দীনের বাবা ও দাদা দু’জনেই ছিলেন মসজিদের ইমাম। মাদ্রাসায় লেখাপড়া করলেও আবু জাফর শামসুদ্দীন ছিলেন আগাগোড়া ধর্মনিরপেক্ষ। রক্ষণশীল আলেম পরিবারে বিয়ে করলেও তিনি তার স্ত্রীকে বোরকামুক্ত করেছিলেন। স্ত্রীকে বোরকা মুক্ত করায় আলেম শ্বশুর মনে মনে অসন্তুষ্ট হলেও ‘স্ত্রীর ওপর যেহেতু স্বামীর একচ্ছত্রাধিপত্য, সুতরাং মুখে কখনও প্রতিবাদ করেননি।’ মাদ্রাসায় পড়ার কারণে তার জীবনে দুটি লাভ হয়েছিল; এক—ধর্মের নামে যারা অধর্ম করে বেড়াত তাদের মুখোশ ধর্ম দিয়ে উন্মোচন করতে পেরেছিলেন, দুই—মাদ্রাসায় শিক্ষা লাভের সুবাদে মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানের বিরুদ্ধাচরণের জন্য উত্থাপিত অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়েছিলেন। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার পর তিনি প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তায় লিখেছিলেন, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করায় ধার্মিক মুসলমানের কোন লাভ হয়নি, লাভ হয়েছে মানুষ পাচারকারীর; ইসলামে মানুষ বেচাকেনা নিষিদ্ধ নয় বলে এখন ভারতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেয়েদের যারা বিক্রি করে দিচ্ছে তাদের বিচার করার কোন নৈতিক শক্তি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের থাকে না। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তানের বিপক্ষে কাজ করার অভিযোগ উত্থাপিত হলে আবু জাফর শামসুদ্দীনসহ আরও কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পাকিস্তানি সেনা অফিসে দেখা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কয়েক স্তরের জিজ্ঞাসাবাদে তার মাদ্রাসা শিক্ষার সন্ধান পেয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিশ্বাস জন্মায় যে, মাদ্রাসায় পড়ুয়া কোন লোক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যেতে পারে না।

দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন রেডিওতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রতি তার আনুগত্য থাকার কথাটি জনগণকে জানানোর পাশাপাশি ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করে বিবৃতি প্রদান করেন; এ সম্পর্কে আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন, ‘আবুল কালাম শামসুদ্দীনের বয়স ৭৫-৭৬ বছর। এ ভাঁড়ামি এবং ভাড়াটিয়াগিরি না করেও কি পারতেন না? স্বাভাবিকভাবেও তার মৃত্যু যে কোনো দিন ঘটতে পারে। এ হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা। বেশ্যাবৃত্তি!’ অন্যদিকে পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষের চাপে দেশের কয়েকজন লেখক ও বুদ্ধিজীবীকে ‘আওয়ামী মিসক্রিয়েন্টদের’ ভয়ে ঢাকা ত্যাগ করে পরে শান্তি স্থাপিত হওয়ায় ঢাকায় ফেরত আসা সম্পর্কিত যে বিবৃতি দিতে হয় তাতে অধ্যাপক কবীর চৌধুরী সই না করায় তিনি তার সাহসিকতার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। আবু জাফর শামসুদ্দীন আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘যারা প্রাণভয়ে ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের অনেককেই জামায়াতে ইসলামীর বদর বাহিনী, আল শামস বাহিনী রেহাই দেয়নি।’

সমাজের অনাচার, অত্যাচার, নির্যাতন, ভণ্ডামির বিরুদ্ধে আবু জাফর শামসুদ্দীন কেমন সোচ্চার ছিলেন তা একটি ঘটনা বর্ণনা করলে স্পষ্ট হবে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন বহাল হলে শুক্রবারে জুমার নামাজে নামাজির সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। এখনও রোজার মাসে প্রথম কয়েকদিন তারাবি নামাজ ও কয়েক শুক্রবারে ঢাকার বিভিন্ন রাজপথ বন্ধ করে জুমার নামাজ আদায় করা হয়। আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের প্রথম দিকে এমন একটি জুমার নামাজে এক উন্মাদিনী নামাজের লাইনে ঢুকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার দুর্বল শরীরে পড়তে লাগল মুসল্লিদের শত শত কিল, ঘুষি, লাথি। এ দৃশ্য দেখে আবু জাফর শামসুদ্দীন লিখেছেন, ‘মুসল্লি সব। কিন্তু ওইসব মুসল্লির হাজারকরা ন’শত নিরানব্বই জনকে হয়তো প্রাত্যহিক জীবনে চৌর্যবৃত্তি, মিথ্যাচার, চোরাবাজারি, ঘুষখোরি এবং অন্যান্য অসামাজিক কাজে লিপ্ত পাওয়া যাবে।’

‘অল্পদর্শী’ নামে কলাম লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর প্রতিষ্ঠিত দৈনিক ছোলতান পত্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন। পুরোনো বাসি খবর নিয়ে প্রকাশিত এ পত্রিকাটির প্রতি রুচিবান পাঠকদের কোন আকর্ষণ ছিল না। পরে তিনি দৈনিক আজাদ, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক পূর্বদেশ, ডেইলি অবজার্ভার ও দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। এছাড়া তিনি বহু বছর অনুবাদক হিসেবে কাজ করেছেন বাংলা একাডেমিতে। জীবনের শেষ পর্যায়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অল্পদর্শী নামে দৈনিক সংবাদে ‘বৈহাসিকের পার্শ্বচিন্তা’ শিরোনামে প্রতি সপ্তাহে উপসম্পাদকীয় লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়ে সরকারি অফিসে করণিক হিসেবেও কয়েক বছর কাজ করেছেন। রাজনীতির অঙ্গনে তার পদচারণা তাকে ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস লেখায় উদ্বুদ্ধ করেছে। রূপকের আশ্রয় নিয়ে তিনি সমাজের অনাচার ও শাসকের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লক্ষ্যভেদী আক্রমণ করেছেন তার উপসম্পাদকীয়গুলোতে। আজাদ পত্রিকার চাকরি চলে গেলে ধান ও পাট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত তিনশ’ টাকা দিয়ে ব্যবসা করার কথা ভাবতে থাকেন। এ অবস্থার তার এক বন্ধু তার প্রকাশনা সংস্থা ‘কিতাবিস্তান’ কেনার প্রস্তাব দেন; কিন্তু এর মূল্য পাঁচ হাজার টাকা দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় আরেক বন্ধুসহ কিতাবিস্তান পরিচালনা শুরু করেন। কিন্তু ১৯৫৪ সালে স্কুল-কলেজের পাঠ্যবই প্রণয়নের দায়িত্ব সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়ার পর কিতাবিস্তান চালানো তার পক্ষে সম্ভব ছিল না।

ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল লেখক আবু জাফর শামসুদ্দীন একদিকে সাংবাদিকতায় জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, অন্যদিকে উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, ভ্রমণ কাহিনী, স্মৃতিকথা লিখে কথাসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তার প্রথম উপন্যাস ‘পরিত্যক্ত স্বামী’। তার রচিত ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’, ‘সংকর সংকীর্তন’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’ বাংলার সাহিত্যের অনন্য গ্রন্থ। ‘ভাওয়াল গড়ের উপাখ্যান’ উনিশ শতকের শেষার্ধে ওয়াহাবী-ফরায়েজী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ের পটভূমিতে লিখিত। এগারশ’ পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বৃহদাকার উপন্যাস ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’য় ১৯১১ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত বাঙালির আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের চিত্রায়ন হয়েছে। তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘দেয়াল’। তিনি অনেকগুলো ছোটগল্প, কয়েকটি জীবনী, আত্মজীবনী, নাটক, ভ্রমণকাহিনী এবং স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। জীবনঘনিষ্ঠ চালচিত্র ফুটিয়ে তোলার পাশাপাশি তিনি তার রাজনৈতিক আদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়ে ইতিহাস সমৃদ্ধ কাহিনীর অপূর্ব সমন্বয় করতে পেরেছেন তার সৃষ্টিকর্মে। তার ‘আত্মস্মৃতি’ সমসাময়িক কালের রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থা নিয়ে বিধৃত এক অসামান্য গ্রন্থ। তার এ আত্মজীবনী পড়লে তার আমলের রাজনীতি ও সামাজিক পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করা সম্ভব হয়। তিনি কয়েকটি গল্পে রঙ্গব্যঙ্গের ছোঁয়া দিয়ে সমাজ ও রাজনীতিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ইতিহাসের আঙ্গিকে মানুষের জীবন সংগ্রামের বাঙ্ময় সজীব চিত্র তার অনেকগুলো সৃষ্টিতে পরিলক্ষিত হয়। সামাজিক সাম্যতায় বিশ্বাসী ছিলেন বলে শোষণ, শাসনের কূটকৌশল শাণিত ভঙ্গিতে পাঠকের কাছে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। তার রচিত কিছু বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হওয়ায় প্রতীয়মান হয়, সাহিত্যের অঙ্গনায় তার পদচারণা পৃথিবীর অন্য ভাষী পাঠক মহলেও সমাদৃত হয়েছে। তবে তার আদর্শিক লড়াই কখনো সাহিত্যের আঙ্গিককে ক্ষুণ্ণ করেনি। বাংলা সাহিত্যে তার লেখনীশক্তির স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া হয়। সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তাকে একুশে পদকও দেওয়া হয়। এছাড়া তিনি অনেক পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছিলেন।

ক্ষয়িষ্ণু অভিজাত পরিবারে আবু জাফর শামসুদ্দীনের জন্ম বলে তার বাবার সচ্ছল আর্থিক অবস্থা ছিল না। তিনি লিখেছেন, ‘আমার জন্মকালে পারিবারিক বিষয়-সম্পত্তি বলতে কিছু ছিল না—কোনক্রমে সংসার চলত।’ তার দাদা ছিলেন একজন মৌলভী; তাদের পরিবারে ওয়াহাবী আন্দোলনের প্রভাব পড়েছিল বলে আবু জাফর শামসুদ্দীন এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন। তাদের পরিবার ছিল মূলত কৃষিনির্ভর। কৃষির উৎপাদন দ্বারা কোন রকমে তাদের সংসার চলত। সাংবাদিক থাকাকালীন, প্রকাশনা সংস্থা চালানোর সময় তার অভাব কখনও কাটেনি। তাকে অনেক সময় দশটি টাকা হাওলাত নিতে শহরময় চষে বেড়াতে হয়েছে।

ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক, সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী আবু জাফর শামসুদ্দীন মৌলবাদ ও সংকীর্ণতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। আবু জাফর শামসুদ্দীন তার রাজনৈতিক জীবনের প্রথমদিকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্রনাথ রায় বা এমএন রায়ের ‘রেডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির’ সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন। পরে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠিত হলে তিনি এ দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হন এবং তিনি এ দলের ঢাকা জেলা কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। তার উক্তি থেকেই তার লালিত মতাদর্শ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায়, ‘ধর্মনিষ্ঠ গোঁড়া মুসলিম নিম্ন মধ্যবিত্ত পল্লী পরিবারে আমার জন্ম, শিক্ষা মাদ্রাসায়; মি. জিন্নাহর ধর্ম-সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতি তত্ত্ব এবং তার ভিত্তিতে ভারত বিভাগের প্রস্তাব আমাকে কখনও আকৃষ্ট করতে পারেনি, সৃষ্টি করতে পারেনি প্রবর্তনা।’

বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী আবু জাফর শামসুদ্দীন পরিণত বয়সেই মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু তার মতো মানুষের অভাব কখনও পূরণীয় নয়। এমন লোকদের সার্থকতা হচ্ছে, এদের শরীরী মৃত্যু হলেও তারা তাদের সৃষ্টির মাধ্যমে অমর হয়ে সবার মাঝে বিরাজ করেন। কীর্তিমান এ গুণী মানুষের মৃত্যুদিন স্মরণ করে জানাচ্ছি আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com