উপসম্পাদকীয়

বেপরোয়া গাড়িচালক

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

ঢাকা, রবিবার, ০৫ আগস্ট ২০১৮

রাজধানীসহ সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অপমৃত্যুর সংখ্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। অতি সম্প্রতি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম মীম তাদের ক্লাস শেষে দুপুর বেলায় বাসায় যাওয়ার পথে তাদের আরও ১৫-২০ জন সতীর্থসহ রেডিসন ব্লু হোটেলের বিপরীত পার্শ্বে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সম্মুখে এমইএস বাসস্ট্যান্ডে মিরপুর ফ্লাইওভারের মুখে দাঁড়িয়েছিল। ওই ফ্লাইওভারের মুখে আবদুল্লাহপুর থেকে মোহাম্মদপুর রুটে চলাচলকারী জাবালে নূর পরিবহনের দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাস থেকে যাত্রী উঠা-নামা করছিল।

পেছন থেকে একই পরিবহনের আরেকটি বাস দাঁড়িয়ে থাকা বাসটিকে দ্রুতগতিতে ওভারটেক করতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের ওপর বাসটিকে তুলে দেয়; এতে দুজন চাকার নিচে পিষ্ট হয়, অন্যরা বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হয়। বাসের রেষারেষিতে শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় গাড়ির মালিক, দুই বাস চালক এবং দুই হেলপারকে আটক করা হয়েছে।

আমাদের দেশের ড্রাইভারেরা অনেক বেশি দক্ষ; কয়েক সেন্টিমিটার গ্যাপে দুটি বাস যেভাবে রেষারেষি করে চালানো হয় তা পৃথিবীর অন্য কোন দেশের ড্রাইভারের পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না। কে কার আগে যাত্রী তুলবে এ নিয়ে বাসচালকদের মধ্যে চলে বেপরোয়া প্রতিযোগিতা। একই রুটে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে যাত্রী তোলার জন্য এমন প্রতিযোগিতা হরহামেশাই হয়ে থাকে। বাসগুলোর প্রতিযোগিতার চিহ্ন প্রতিটি বাসের গায়ে লেগে আছে। ঢাকা শহরে চলাচলকারী কোন বাসের বডি অক্ষত নেই; প্রতি মুহূর্তে একটির সঙ্গে আরেকটির ঘষা লাগছে। কোন রুটে কোন বাস যাত্রারম্ভের পর তাদের চাহিদা মতো যাত্রী না পেলে স্টপেজে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, একই রুটের অন্য আরেকটি বাস পেছনে দেখা গেলেই শুরু হয়ে যায় প্রতিযোগিতা। পরে আসা বাসটিকে যাত্রী উঠাতেও দেবে না, সামনে যাওয়ার পথও ছাড়বে না। প্রথম আসা বাসটি এমনভাবে মাথা বাঁকা করে পুরো রাস্তাজুড়ে রাখা হবে যাতে কোন যানবাহন সামনে যেতে না পারে। এখান থেকে শুরু হয় পুরো রাস্তাব্যাপী দুটি বাসের মরণপণ প্রতিযোগিতা; সামনের বাসটি সারা পথে রাস্তার মধ্যখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী উঠানামা করাবে। অন্যদিকে ঝুঁকি নিয়ে পেছনের বাসটি সামনে যাওয়ার চেষ্টা করবে। রাস্তার মধ্যখানে যাত্রী উঠানো বা নামানোর সময় সিএনজি বা মোটরসাইকেল বাম পাশ দিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যায়। ধীরগতিতে চলার মধ্যেই যাত্রীদের নামতে হয় বলে পাশে দিয়ে ছুটে যাওয়া সিএনজি বা মোটরসাইকেল খেয়াল করা যাত্রীর পক্ষে সম্ভব হয় না। বাসের হেলপার এসব ক্ষেত্রে বাম পা দিয়ে নামার পরামর্শ দিয়ে থাকে। এতে পাশে চলা মোটরসাইকেলের, সিএনজি, রিকশার ধাক্কা খেতে হয়, নতুবা চলন্ত গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে হাত-পা ভাঙার ঝুঁকি নিতে হয়। এই বিষয়গুলোর মধ্যে কোন নতুনত্ব নেই, এগুলো যাত্রীরা যেমন জানে, রাস্তায় গাড়ি চলার নিয়ম-কানুন প্রণেতা, নিয়ম বাস্তবায়নকারীরাও জানে।

দুজন কলেজ শিক্ষার্থীর অগ্রহণীয় মৃত্যুতে দুর্ঘটনার শেষ নয়; আরও দুর্ঘটনা শত শত যাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করেছিল। শত শত শিক্ষার্থী মুহূর্তে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং জাবালে নূরের বাসে বিক্ষুব্ধ জনতা আগুন ধরিয়ে দেয়, রাস্তায় নেমে সড়ক অবরোধ করে এবং অনেকগুলো বাস ভাঙচুর করে। পরের কয়েক দিন শুধু ঘটনাস্থলে নয়, ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে স্কুল, কলেজের ছাত্রছাত্রীরা সড়ক অবরোধ করে পুরো ঢাকা শহর প্রায় অচল করে ফেলে। এই চিত্র শুধু ২৯ তারিখ রোববারের নয় বা শুধু ঢাকা শহরের নয়—দেশের সর্বত্র প্রায় প্রতিদিনের। দেশের কোথাও না কোথাও প্রায় প্রতিদিন দুর্ঘটনা ঘটছে, বিক্ষুব্ধরা গাড়ি ভাঙছে বা পোড়াচ্ছে। এ ভাঙচুর আর পোড়ানোর মধ্যে যাত্রীরা আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে কেউ কেউ বাসের জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে হাত-পা ভাঙছে। যারা পোড়ায় বা ভাঙে তারা এত উত্তেজিত থাকে যে, যাত্রীদের নামার আগেই কাঁচের জানালায় ইট নিক্ষেপ করে, লাঠির বাড়ি মারা শুরু করে। যারা ভাঙে তাদের মা-বাবা, আত্মীয়-স্বজনও গাড়িতে থাকতে পারে। ১০ বছর আমি ঢাকা-গাজীপুর যাতায়াতে এমন বিপদে বহুবার পড়েছি। গাড়ি ভাঙা বা পোড়ানোর সময় মহিলা ও শিশু যাত্রীদের আর্তনাদ আমি বহুবার শুনেছি। তারপরও দল বেঁধে প্রেসার গ্রুপেরা এমন ভাঙচুর করে। কারণ বিক্ষুব্ধরা যুগ যুগ ধরে জেনে আসছে, গাড়ি না ভাঙলে বা গাড়িতে লাগানো প্রজ্জ্বলিত আগুন দূর থেকে দেখা না গেলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয় না। তাই তো রোববার ও পরবর্তী দিনগুলোর প্রতিবাদ, প্রতিরোধে সরকারের তরফ থেকে লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভার ও রুট পারমিট ছাড়া চলাচলকারী বাস ধরার নির্দেশনা বেরিয়ে এসেছে, রাস্তা-ঘাটে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় আইন প্রণয়ন হতে যাচ্ছে মর্মে ক্যামেরার সামনে এসে মন্ত্রিমহোদয়কে ঘোষণা দিতে হচ্ছে, বিআরটিএ-এর চেয়ারম্যান বিবৃতি দিয়ে মোবাইল কোর্ট বসিয়েছেন। এতদিন এসব কর্তৃপক্ষ কি ছিলেন না? তবে চালকের ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনা ঘটানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়নের জন্য এমন একটি অবস্থা সহায়ক হয়েছে। কারণ সরকারও এদের কাছে অসহায়। অতীতে কঠোর ট্রাফিক আইন প্রণয়নের প্রচেষ্টা গাড়ি চালকেরা ভণ্ডুল করে দিতে সক্ষম হয়েছিল। পুলিশ ও বিআরটিএ’র জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক হচ্ছে, ছাত্রছাত্রীরা গাড়ি ও ড্রাইভারের কাগজপত্র পরীক্ষা করেছে; অনেক ট্রাফিক সার্জেন্ট তার মোটরসাইকেলের কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখাতে পারেননি। ছাত্রছাত্রীদের শান্ত করতে, তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য উল্টাপথে বাণিজ্যমন্ত্রীর গাড়ি সঠিক পথে চলতে বাধ্য করা হয়েছে। লজ্জা দেওয়ার এমন একটি উদ্ভাবনী কাজের জন্য ছাত্রছাত্রীদের অভিনন্দন জানাতে হয়।

দিয়ার বাবা জাহাঙ্গীর ফকির একজন বাসচালক; তিনি শুধু বাস চালক নন, গাড়িচালকদের সংগঠনের নেতাও। মহাখালী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সড়কে একতা পরিবহন নামে একটি গাড়ি চালান তিনি। দিয়ার বাবা কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তার মেয়ের মৃত্যুর জন্য বাসচালককে দায়ী করেছেন। তার আরও অভিযোগ হচ্ছে, অনেকেই দক্ষ না হয়েই গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নামছে, গাড়ির মালিকও দক্ষতা বিচার না করে কম বেতনের চালকের হাতে দামি একটি গাড়ি তুলে দিচ্ছে। বাসের চাকার নিচে পড়ে তার মেয়েটির অকাল মৃত্যুতে গাড়িচালক বাবার এই উপলব্ধি। তিনি তো চালক সংগঠনের নেতা, এই দুর্ঘটনার আগে তাদের সংগঠন থেকে কি চালকদের কোনভাবে সতর্ক করা হয়েছিল বা অসৎ আচরণের জন্য কোন ড্রাইভারের বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছিল? গাড়িচালকদের সবাই কি যথাযথ পরীক্ষা দিয়ে লাইসেন্স নিয়েছেন? লাইসেন্স ইস্যু করে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি। আমার ক্লাসমেট আইয়ুবুর রহমান এ প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিল বলে লাইসেন্স ইস্যু নিয়ে তার কাছে অনেক কাহিনী শুনেছি। আইয়ুব শুধু সৎ নয়, সে একজন বিনয়ী ও নরম প্রকৃতির লোক। তার পক্ষে তাই ওই প্রতিষ্ঠানে বেশি দিন কাজ করা সম্ভব হয়নি। এ প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চস্বরে স্লোগানের মতো প্রচার করা হয়, ‘ঘুষ দেবেন না, দালালের খপ্পরে পড়বেন না’। অথচ এ প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে এত বদনাম রয়েছে যে, টাকা দেওয়া ছাড়া আবেদন ফরমটিও পাওয়া যায় না। এটা কোন প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বলা হলে সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসে, ‘ভাই, কোন প্রতিষ্ঠানটি ভালো?’ আমার এক আত্মীয় অস্ট্রেলিয়ায় লাইসেন্স পাওয়ার লক্ষ্যে গাড়ি চালানোর পরীক্ষায় বেল্ট না লাগিয়ে গাড়ি স্টার্ট দেয়াতে সঙ্গে সঙ্গে তাকে অকৃতকার্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

দুর্ঘটনা ঘটার পর পাশ্চাত্য দেশগুলোতে দায়ী পক্ষগুলো পুলিশকে খবর দিয়ে দুর্ঘটনাস্থলে পুলিশের অপেক্ষায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। পুলিশ আসার পর দুর্ঘটনার জন্য প্রকৃত দায়ীকে চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়।

কিন্তু আমাদের দেশে একটা দুর্ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে গাড়িচালক প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে সম্মুখে আরও কয়েকটি দুর্ঘটনা ঘটিয়ে হলেও তার নিজের পরিবহনটি নিয়ে অস্বাভাবিক গতিতে ছুটতে থাকে। এ সময় গাড়ির চালকেরা পুলিশের দেখা পেলে খুশি হয়; কারণ বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে পড়লে নিশ্চিত মৃত্যু। আমি এমন একটি ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি। ১৯৯০ সনের দিকে আমি বাংলাদেশ ব্যাংক বগুড়া অফিসে কর্মরত অবস্থায় জেলা কৃষি ঋণ কমিটির সভায় যোগদানের জন্য পাবনা থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত প্রতিটি জেলায় বাসে ভ্রমণ করতাম। একবার ঠাকুরগাঁও যাওয়ার পথে রংপুর বাসস্টেশনের কাছাকাছি রাস্তায় বসা একটি বাজারে আমাদের বাসের সঙ্গে ধাক্কা লেগে একজন লোক মাটিতে পড়ে যায়। বাসের ভেতরের সব যাত্রী চিৎকার করে বাস ড্রাইভারকে গাড়ি দ্রুতগতিতে চালিয়ে অকুস্থল ত্যাগের তাগাদা দিলেও কিছুটা প্রবীণ ড্রাইভার কিছুতেই গাড়ি চালালো না; বরং গাড়ি থামিয়ে পড়ে যাওয়া লোকটিকে হাসপাতালে নেয়ার অভিপ্রায় জানালো। গাড়ি থামিয়ে লোকটিকে গাড়িতে তোলার আগেই আশপাশের লোক জড় হয়ে ড্রাইভারকে মারা শুরু করে দিল। ড্রাইভারটি বাঁচেনি, বোকামির জন্য তাকে জনতার হাতে মরতে হয়েছিল।

সব ড্রাইভার এমন দয়াবান হয়ে জীবনের ঝুঁকি নেয় না। কিছু কিছু বাসের ড্রাইভার ও হেলপারেরা যে কত খারাপ তা আমার জীবনের একটি ঘটনা বললে স্পষ্ট হবে। একটি কোস্টার থেকে আগারগাঁও নামব বলে পাদানিতে দাঁড়িয়ে আছি, কোস্টার স্টপেজে থামছে না। কোস্টার কিছুটা স্লো করেছে এবং এই অবস্থায় আমাকে নামতে হবে; কারণ তারের রুটের আরেকটি বাস পেছনে আসছে। চলন্ত গাড়ি হতে নামছি না বলে হেলপার বিরক্ত হয়ে হঠাৎ ধাক্কা দিয়ে আমাকে নিচে ফেলে দিলো। আমি উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে গেলাম, কয়েক ইঞ্চির গ্যাপে পাশ দিয়ে কোস্টারের পেছনের দুটি চাকা চলে গেল। উঠে দেখলাম, কিছুদূরে কোস্টারটি দাঁড়িয়ে গেছে এবং কোস্টারের হেলপারকে কয়েকজন যুবক যাত্রী পেটাচ্ছে। আমি দৌড়ে গিয়ে কয়েকটি কিল-ঘুষি খেয়ে হেলপারকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিলাম।

অতি সম্প্রতি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ পঞ্চম সেমিস্টারের ছাত্র সাইদুর রহমান পায়েলের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বাকরুদ্ধ হয়ে যেতে হয়। গত ২১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে গভীর রাতে বাসটি নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় যানজটে থামলে পায়েল প্রকৃতির ডাকে বাস থেকে নিচে নামে। যানজট কমে গেলে বাসটি আবার চলতে শুরু করলে পায়েল ছুটে এসে চলন্ত বাসে উঠতে গিয়ে দরজার সঙ্গে ধাক্কা লেগে পড়ে যায়। হেলপার তাকে মাটিতে মরার মতো পড়ে থাকতে দেখে ধারণা করে যে, পায়েল মারা গেছে। এ অবস্থায় হেলপার, সুপারভাইজার, ড্রাইভার যুক্তি করে পায়েলকে ব্রিজ থেকে চ্যাংদোলা করে নদীতে ফেলে দেয়। গভীর রাত বলে বাসে কোন বাতি নেই, সবাই ঘুমাচ্ছে—ঘটনাটি কেউ জানতেও পারল না। প্রচার হলো পায়েল নিখোঁজ। দুই দিন পর মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর খাল থেকে পায়েলের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃতদেহের ময়নাতদন্ত ও সুরতহাল করে জানা গেল যে, পায়েলকে নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় সে জীবিত ছিল। তার পেটে প্রচুর পানি পাওয়া গেছে; তখন বেঁচে না থাকলে তার পেটে পানি ঢুকতো না। পায়েলের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি উদ্ঘাটিত হয় বাসের সুপারভাইজার জনির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকে আহত অবস্থায় ব্রিজের ওপর থেকে এভাবে নদীতে ফেলে দিয়ে মারার এমনতর পৈশাচিক ঘটনায় সব ড্রাইভারের প্রতি মানুষের ঘৃণা সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক।

রাস্তায় রোদ আর বৃষ্টির মধ্যে ট্রাফিক পুলিশদের কাজ করতে দেখলে আমার মায়া হয়। কাজ করতে গিয়ে প্রতি মুহূর্তে ড্রাইভারদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো থামাতে তাদের গলদঘর্ম হতে হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তির ড্রাইভারের হাঁকডাক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের চেয়েও বেশি। এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। আজ সোমবার হাতিরঝিলে পুলিশ প্লাজার সামনে একটি দামি গাড়ি উল্টাপথে চলার সময় ট্রাফিক সার্জেন্টকে ফটো তুলতে দেখলাম। হাতিরঝিলের অপর পাশে এসে দেখলাম, ‘সেনাবাহিনী’ লেখা একটি মাইক্রোবাস উল্টা দিকে যাচ্ছে। হাতিরঝিলে অহরহ গাড়ি, মোটরসাইকেল উল্টা দিকে চলে। ‘পাঠাও’ প্রবর্তন হওয়ার পর বেপরোয়া মোটরসাইকেল থেকে ফুটপাতে চলাচলকারী পথচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে এমন বেসামাল ড্রাইভারদের নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব বলে মনে হয় না। অবশ্য ট্রাফিক পুলিশদের অনেককে রেকার পাশে রেখে যানবাহনের অনিয়মকে নিয়ম করতে দেখা যায়। রেকার পাশে থাকলে অনিয়মকে নিয়ম করার গোপন সমঝোতায় নিয়ম ভঙ্গকারীকে একটু বেশি খরচ করতে হয়। অবৈধ প্রাপ্তির প্রতি বেশি মনোযোগ থাকে বলে এরা বাসের রেষারেষি খেয়াল করে না, বরং কারণে-অকারণে রাস্তার ওপর যানবাহন থামিয়ে যানজট সৃষ্টি করে। বাসের শুধু মাথা বাঁকা করা বন্ধ করতে পারলে ঢাকা শহরে অর্ধেক যানজট কমে যাবে। সত্য না হলেও গুজব আছে, আন্তঃজেলা ও শহরের অধিকাংশ বাসের মালিক অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ; তাই ড্রাইভারদের ড্যাম কেয়ার ভাব।

পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে সব পেশার লোকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে; শুধু রাজনীতিবিদদের নেই। এদের অনেকের বালকসুলভ ও অসংলগ্ন কথাবার্তা অনেক সময় জনগণের কানে শ্রুতিকটু মনে হয়। কথা বলতে না জানলে ইতিহাসের পাতায় আবর্জনা সৃষ্টি করার প্রয়োজন দেখি না। এরা কথা বলে আবার ঘনিষ্ঠ জনদের জিজ্ঞেস করে, ‘কেমন বললাম?’ সমস্বরে উত্তর আসে, ‘চমৎকার, মারভেলাস’। পৃথিবীর প্রায় দেশে কথা বলার জন্য মুখপাত্র থাকেন যিনি স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল কথাও গুছিয়ে বলেন এবং তা বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। দেশের সরকারপ্রধান বা অন্য কোন নেতাকে অন্য দেশের কারও সঙ্গে বৈঠকের পূর্বে মক রিহার্সেল করে যেতে হয়। বেফাঁস কথা মুখ থেকে একবার বেরিয়ে গেলে শত কসরত করেও তা আর ঢাকা যায় না। রাজনৈতিকদের কৃত্রিম হাসি, কান্না দুটোরই প্র্যাকটিস থাকতে হয়। অনুশীলন ঠিকমতো না হলে ভুলক্রমে হাসির জায়গায় কান্না, কান্নার জায়গায় হাসি দেখা দিতে পারে। আবার কাজী জাফরের মতো বুকে আঘাত করে অশ্রুবিহীন মাতম করলেও লোকজন হেসে দিতে পারে। সাংবাদিক এমন সুযোগের সদ্ব্যবহার করে নৌপরিবহনমন্ত্রীকে বলে ফেলে, ‘আপনার প্রশ্রয়ে দিন দিন চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন’।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com