উপসম্পাদকীয়
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ঢাকা, রবিবার, ১২ আগস্ট ২০১৮
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’—এই স্লোগানে প্রকম্পিত করে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা রাজধানীর রাজপথে কয়েকদিন তাদের নয়টি দাবি পূরণের জন্য আন্দোলন করেছে। কাঁচা হাতে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে ট্রাফিক জ্যামের সৃষ্টি করেছে; প্রথম দু’দিন জনসাধারণ হাসিমুখে তাদের এমন কর্মকাণ্ডে আনন্দ পেয়েছে, তাদের উৎসাহ দিয়েছে। তারা ড্রাইভারের লাইসেন্স পরীক্ষা করেছে, গাড়ির ফিটনেস, গাড়ির রুট পারমিট যাচাই করেছে। কিন্তু এগুলো তো কোন দুর্ঘটনার জন্য একমাত্র দায়ী নয়। অনেকে বলেছে, বিআরটিএ-এর সৃষ্টির পর থেকে পরীক্ষা দিয়ে সচরাচর কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স পায় না, পরীক্ষা না দিয়ে ঘুষ দিলে লাইসেন্স পাওয়া সহজ; টাকা ঢাললে নাকি অচল গাড়িরও রুট পারমিট, ফিটনেস সার্টিফিকেট জোগাড় করা যায়। রাস্তায় গর্ত থাকলে, হাইওয়েতে ধীর গতির গাড়ি থাকলে, পথচারীর অনিয়ন্ত্রিত চলাফেরায়ও দুর্ঘটনা হয়। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের গাড়ির পারমিট বা তাদের ড্রাইভারের লাইসেন্স থাকা, না থাকা একই কথা। কারণ এই সকল ড্রাইভার রাস্তায় দায়িত্বরত পুলিশদের দুই পয়সার পাত্তা কখনো দেয়নি, এখনো দেয় না, হয়তো ভবিষ্যতেও দেবে না। অন্যদিকে বাস, ট্রাকের মালিক পুলিশ বা আর্মির কেউ হলে শত অনিয়মেও গাড়ি কোথাও আটক করা যায় না। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে কত টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে, কেন রুট পারমিট নেই, আঠার বছরের কম বয়সীরা কীভাবে গাড়ি চালাচ্ছে, এত অনিয়ম কেন বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে কারো নজরে এলো না ইত্যাদি বিষয়ে বিআরটিএ, পুলিশ, ড্রাইভার, বাসের মালিকদের জিজ্ঞেস করে উত্তর পাওয়ার একটা সুযোগ ছাত্রছাত্রীরা এই আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছে। তবে দুদিন পর আবার আগের মতো হয়ে গেলে আশ্চর্য হবো না।
বিস্তর অনিয়মের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সম্যকভাবে অবগত থাকলেও ঘুণে ধরা এই সমাজে তা নিয়ম হিসেবেই গণ্য হয়েছে বহু বছর পূর্ব থেকে। ট্রাফিক পুলিশ, বিআরটিএ-এর নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে এ পর্যন্ত হাজার হাজার প্রতিবেদন ও কলাম যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা হয়েছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে; কিন্তু কারো হুঁশ হয়নি, দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়নি। বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা আওয়ামী লীগের স্ব-স্ব আমলের পলিসি প্রণেতারা কি পত্রিকা পড়া বা টেলিভিশন দেখার গরজ বোধ করেননি? পলিসি প্রণেতাদের পত্রিকা পড়ার অভ্যেস এমনিতে কম, অবশ্য সময়ও পান না। পড়লেও কোন আমলে এগুলোর প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করা হয়নি। অদ্ভুত লাগে তখন যখন বিরাজমান অনিয়মের জন্য দায়ী তিনটি রাজনৈতিক দল যারা ক্ষমতায় ছিল বা আছে তারা সকলে এই আন্দোলনে একাত্মতা ঘোষণা করেছে; কিন্তু তারা তাদের ব্যর্থতা ও অপারগতার জন্য লজ্জিত হয় না, ক্ষমা চায় না। ছাত্র, যুবকদের বিরুদ্ধেও অনেকের অন্য একটি অভিযোগ রয়েছে। কিছু কিছু ছাত্র, যুবকের আঁকাবাঁকা করে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে বিকট শব্দে মোটরকার বা মোটরসাইকেল চালানো দেখলে পঞ্চাশ গজ দূর থেকেও ভয় করে। তবে এই আন্দোলন আমাদের সৎ হতে সচেতন করেছে, নিয়ম মানতে শিক্ষা দিয়েছে। এই আন্দোলন থেকে শিক্ষা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা এখন আর কোন ঘুষখোরকে শ্বশুর বা শাশুড়ি করার ক্ষেত্রে মা-বাবার অযাচিত চাপের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে, এই প্রত্যাশা আমরা নিশ্চয়ই করতে পারি। মা বা বাবার বৈধ আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সঙ্গতি আছে কি না তার খোঁজ নেয়ার শিক্ষাও আমরা এই আন্দোলন থেকে শিখেছি।
ছাত্র-ছাত্রীদের বিজয়ের টোপর পরিয়ে বিদায় দেওয়ার পক্ষে ছিল সবাই। কারণ নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনে তাদের মা-বাবা, অভিভাবক, সরকার, বিরোধী দল, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন ছিল। এমনকি যিনি ঘুষ দেন বা যিনি ঘুষ নেন তিনিও যানবাহনের বেপরোয়া গতি ও ট্রাফিকের দৃষ্টিকটু অব্যবস্থাপনায় ছিলেন ত্যক্ত-বিরক্ত। কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের যৌক্তিক, নির্মল ও স্বতঃস্ফূর্ত এই আন্দোলনে কুটিল রাজনীতির অনুপ্রবেশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছে। কুটিল রাজনীতির কারণে কিছু ছাত্র ব্যান্ডেজ বেঁধে ব্যান্ডেজের নিচে লিপস্টিক রেখে কৃত্রিম রক্তের আমেজ এনেছে, মরক্কোতে সংঘটিত নির্যাতিত মেয়ের ছবি পোস্ট করে নিজের সাথীদের ধর্ষণ হওয়ার কাহিনী প্রচার করেছে।
দুটি ঘটনা আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং বুমেরাং হয়ে আঘাত করেছে বলে আমার ধারণা। খুন আর ধর্ষণের গুজব প্রচারিত হওয়ায় মা-বাবা ও অভিভাবকরা ভীত হয়ে তাদের সন্তানদের রাস্তায় পাঠানোর ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায়। অন্যদিকে দলীয় কর্মীর সঙ্গে বিএনপি’র নেতা আমীর খসরু মাহমুদের টেলিফোনে গোপনীয় আলাপ প্রকাশিত হওয়ায় বিএনপি, জামায়াত বিরোধী আন্দোলন সমর্থনকারীরাও তাদের সমর্থন তুলে নেয়; সরকারও অনুপ্রবেশকারীর তত্ত্বতালাশ করা শুরু করে। খুন ও ধর্ষণের মিথ্যা খবর ছড়িয়ে দিয়ে এমন একটি আন্দোলনকে যারা এলোমেলো করে দিলো তাদের চিহ্নিত করতে ছাত্রছাত্রীদের দায়িত্ব নেয়া উচিত ছিল, তাদের নয়টি দাবির সঙ্গে এই অসৎ ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার আরেকটি দাবি অন্তর্ভুক্ত হতে পারতো। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা খুন আর ধর্ষণের গুজবে আবেগ তাড়িত হয়ে নিজেদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের রাজপথ ছেড়ে আওয়ামী লীগ অফিসে গিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে গেল। এই গুজবে ছাত্রছাত্রীরা মার খেয়ে রক্তাক্ত হয়েছে; অনেকের শরীর থেকে রক্ত ঝরতে সবাই দেখেছে। আওয়ামী লীগ কর্মীরাও মার খেয়ে আহত হয়েছে। তারপরও জনগণ এবং মিডিয়া ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে ছিল, ছাত্রলীগের বিপক্ষে বলেছে। কারণ ছাত্রলীগের ইমেজ সংকট রয়েছে; কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে তাদের ভূমিকায় তাদের ইমেজ তলানিতে নেমেছে। তাদের বিরুদ্ধে এখন সত্য-মিথ্যা সবই জনগণের নিকট একাকার। একবার আস্থা হারালে তা পুনরুদ্ধার করা কঠিন, আস্থাহীনতায় প্রিয়জনের কাছেও সত্য কথায় সংশয়ের সৃষ্টি করে। পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলের সমর্থন পেয়েও ছাত্রছাত্রীরা ফেসবুক নির্ভর হয়ে পড়লো, ফেসবুক ব্যতীত অন্য কোন মিডিয়াকে বিশ্বাস করলো না। ফেসবুক নির্ভর হওয়ার কারণে ছাত্র-ছাত্রীরা যুক্তি বিবর্জিত আবেগে খুন আর ধর্ষণের গুজবে বিশ্বাস স্থাপন করলেও কোন ভিকটিমের নাম বলতে পারল না; যেমন পারেনি হেফাজতে ইসলাম তাদের আন্দোলনে মারা যাওয়া হাজার হাজার লোকের নাম, ঠিকানা। কোটা আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে ছাত্রলীগের আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে দলনিরপেক্ষ লন্ডন প্রবাসী আমার এক ভাগ্নি এবং গাজীপুরবাসী আওয়ামী ঘরানার এক টিনেজ ছাত্রী বিশ্বাস করেছে—ছাত্রলীগ চারজনকে মেরে গুম করে ফেলেছে, তাদের মা-বাবা, অভিভাবকরা ছাত্রলীগের ভয়ে চুপ করে থাকতে বাধ্য হয়েছে, ভিকটিমের অনুপস্থিতি টের পেতে পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুদের দেরি হবে অথবা কখনো পাবে কি না সন্দেহ। তাদের বিশ্বাস দৃঢ় হওয়ার আরেকটি কারণ, গুজবে বর্ণিত খুন আর ধর্ষণের কারণে সংঘটিত সংঘর্ষের ছবি তুলতে যাওয়া বিভিন্ন মিডিয়ার ফটোগ্রাফারদের মার খাওয়া। আওয়ামী লীগ কর্মীদের উচিত ছিল, আন্দোলনে থাকা ছাত্রদের দিয়ে বিবৃতি না দিয়ে অফিসের ভেতরে বিভিন্ন মিডিয়ার পেশাজীবী ক্যামেরাম্যান নিয়ে লাইভ ভিডিও জনগণকে দেখানো। তবে শত শত ব্যক্তিগত মোবাইল ক্যামেরা বন্ধ রাখার ক্ষমতা যে আজকাল কোন শক্তির নেই—এই বাস্তবতাটি কেউ বুঝতে নারাজ ছিল। কিন্তু তাদের বিবেচনা করা সমীচীন ছিল যে, যেসব মিডিয়া বলেছে খুন ও ধর্ষণের এই গুজব মিথ্যা, সেসব মিডিয়া কিন্তু কেউ বলেনি যে, পুলিশের ছত্রছায়ায় ছাত্রলীগের হামলা মিথ্যা। এছাড়াও প্রায় প্রতিটি পত্রিকা আক্রমণে থাকা ছাত্রলীগের ছবি ছাপিয়েছে; অন্যদিকে ছাত্র-ছাত্রীদের পক্ষ থেকে আক্রমণ করার তেমন কোন ছবি প্রচার হয়নি। উপরন্তু ছাত্রছাত্রীদের রক্তাক্ত ছবি ছাপা হলেও অধিকাংশ পত্রিকা আহত বা রক্তাক্ত ছাত্রলীগ কর্মীদের ছবি ছাপেনি। এতদসত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা পত্রিকার সংবাদে আস্থা না রেখে ফেসবুকের গুজব নির্ভর হয়ে পড়ে।
গুজব যে কত ভয়ঙ্কর হতে পারে তা অতীতে সংঘটিত বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণ অনুসন্ধান করলেই অনুধাবন করা যাবে। ১৯৬৪ সালে গুজব রটে যে, কাশ্মীরে ‘হযরতবাল মসজিদ’-এ রক্ষিত হযরত মুহম্মদ (স.)-এর চুলগাছি হিন্দুরা চুরি করেছে। এই গুজবকে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী আবদুস সবুর খান চুল চুরির জন্য হিন্দুদের দায়ী করে খুলনার দৌলতপুরে আয়োজিত এক জনসভায় উত্তেজনা সৃষ্টি করলে জনসভার হাজার হাজার মুসলমান হিন্দুদের খুন, ধর্ষণ, বাড়ি লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে; অথচ হযরতের চুলগাছি মসজিদেই ছিল, কেউ চুরি করেনি। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত আরেকটি গুজবও অনেক লোকের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সাঈদীকে চাঁদে দেখার মিথ্যা গুজব মসজিদের মাইকে ব্যাপক প্রচারে দেশের কয়েকটি এলাকার উত্তেজিত কিছু মানুষ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ফটোশপের কারসাজিতে চাঁদের ভেতর সাঈদীর ছবি ঢুকিয়ে দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া শুরু হলো। এমন ছবি দেখে বিচার-বিবেচনাহীন ও মূর্খ কিছু লোক গুজব বিশ্বাস করলো। এমন আজগুবি বিশ্বাসে ঈমান থাকবে না বলে আলেমদের চিৎকারেও গুজবে বিশ্বাসীরা কান দিলো না।
ছাত্র-ছাত্রীদের এই আন্দোলনের সত্য-মিথ্যার পোস্টে ফেসবুকে কয়েকদিন ঝড় তোলা হয়েছে। হিটলারের প্রচার সচিব যোসেফ গয়েবলস সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করতে একই বক্তব্যের বারবার প্রচারের তত্ত্ব দিয়েছিলেন; গয়েবলসকে লোকে এখন ঘৃণা করলেও তার তত্ত্ব কিন্তু প্রয়োজনে সবাই মেনে চলে বা কাজে লাগায়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রচনা লিখে ‘রণাঙ্গনে পাকিস্তান’ বইটি স্কুল থেকে পুরস্কার পেয়েছিলাম; বইটি গুল বা গুজবে ভরা। ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সাদা পোশাক ও পাগড়ি পরা জিন জাতীয় কোন একটা প্রাণী নাকি যুদ্ধ করে ভারতীয় সেনাদের হারাতে সাহায্য করেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের সাম্প্রতিক এই আন্দোলনেও যার যার সমর্থন অনুযায়ী বক্তব্য, ভিডিও ক্লিপ সংবলিত পোস্ট ফেসবুকে দিয়েছে, শেয়ার করেছে। এক্ষেত্রেও দেখা গেছে, সমর্থনের বিপরীত যুক্তিসঙ্গত মতকেও ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করার জন্য অনেকে গোঁড়ামি করেছে। ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন সংশ্লিষ্ট ফেসবুকের কিছু মন্তব্য পাঠকদের জন্য নির্বাচন করেছি।
আল জাজিরায় দৃক গ্যালারির প্রধান শহিদুল আলমের বিভ্রান্তিমূলক সাক্ষাৎকার এবং সরকারকে না জানিয়ে মোহাম্মদপুরে সুজনদের সঙ্গে আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের নিমন্ত্রণ গ্রহণ ও রাস্তায় আন্দোলনে নাজেহাল হওয়ায় মধ্যে দুরভিসন্ধি থাকার সম্ভাবনার উল্লেখ করে একজন লিখেছেন, ‘একটা ছবি দেখলাম পুলিশের সামনে হেলমেট পরে একদল ছেলেপেলে কাদের যেন দৌড়ানি দিচ্ছে। এই ছবিটা ইন্টারেস্টিং। কারণ ছাত্রদলের বা শিবিরের ছেলেপেলে পুলিশের সঙ্গে এক কাতারে দৌড়ে অন্যদের মারধর করবে—এইটা হবার কোন কারণ দেখি না। সরকার যদি দাবি করে এরা শিবির বা ছাত্রদল ছিল, তার মানে পুলিশের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আর যদি সেই দাবি না করে তার মানে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রলীগই হামলা করছিল।’ তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, আল-জাজিরায় পালটা ইন্টারভিউ দিয়ে শহিদুল আলমের বক্তব্যকে খণ্ডন করা যেত। এসব ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের দীনতা দেখে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে আওয়ামী লীগকে আরও মনোযোগী হতে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি সমাপ্তি টেনেছেন এভাবে, ‘তোমাদের (ছাত্র-ছাত্রীদের) আন্দোলনে নানা সময় বাধার সৃষ্টি করা ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, শিবির, ইসলামী ছাত্রমৈত্রী, আমেরিকান সরকার, পাকিস্তান সরকার, নির্বাচনে জামানত হারানো সুশীল বুদ্ধিজীবী কাউকেই তোমরা একবিন্দু ছাড় দিবে না—এই কামনাই করি’। সম্ভবত পুলিশের পক্ষ থেকে একজন লিখেছেন, ‘ঘরটা পরিষ্কার করো, বাবা-মাকে প্রমিজ করাও—তারা যেন ঘুষ না খায়, হারাম না খায়, ঘুষের টাকা দিয়ে যেন না পড়ায়, তোমার এক মুঠো ভাতও যেন ঘুষের টাকায় না হয়।’ একজন লিখেছেন, ‘এই ছাত্ররাই পাশ করে বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম চয়েজ দিবে পুলিশ ক্যাডার, আর ৩০ লাখ টাকা দিয়ে সাধারণ এসআই পোস্টে ঢুকার জন্য জোর তদবির করবে।’ আরেকজনের মন্তব্য, ‘বাচ্চাদের নিষ্পাপ এই আন্দোলনকে ঘোলা করে সেখানে মাছ শিকারের স্বপ্ন দেখছে বিএনপি জামায়াত।’ একটি মন্তব্য ছিল এমন, ‘আওয়ামী লীগ অফিসে খুন বা ধর্ষণ হয়নি মর্মে ছাত্রদের দিয়ে বিবৃতি দেয়াটা একটা নাটক, ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের মিথ্যা বিবৃতি দিতে যে বাধ্য করেছে তা বিবৃতিদাতা ছাত্র দু’জনের চোখে-মুখে ফুটে উঠা ভীতির চিহ্ন দেখলেই বুঝা যায়।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘আন্দোলন সেখান থেকেই শুরু করো যেখানে প্রাইভেট না পড়লে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সাবজেক্টে পাস করা কঠিন হয়ে যায়।’ আরেকজন জানতে চেয়েছে, আন্দোলনকারীদের মধ্যে কতজন ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে। আরেকজন লিখেছেন, ‘ফেসবুক এখন গুজব, মিথ্যা, বিভ্রান্তিমূলক, উদ্দেশ্যমূলক খবরের প্রধান উৎস। সমাজে হানাহানি, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সবকিছুর মূলে এখন ফেসবুক। রামু, নাসিরনগর এবং অভয়নগরের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির কারণ ফেসবুকে মিথ্যা গুজব রটানো।’
আমার ধারণা, জনসংখ্যার আধিক্যের জন্য কোন সমস্যারই সমাধান সম্ভব হচ্ছে না। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক বলেছিলেন, ‘ফুটপাত একদিনেই মুক্ত করা সম্ভব, কিন্তু তাতে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই বেড়ে যাবে।’ লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, এদেশে যারাই অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তারাই আবার দুর্নীতি করে। শুধু পরিবহন সেক্টরে নয়, প্রতিটি সেক্টরে বেহাল অবস্থা। সেবা প্রদানকারী অফিসে গিয়েও জনসাধারণ নিজের সমস্যা সম্পর্কিত কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে না। সব গোপন। যত গোপন করা হবে, আইন, নিয়ম-নীতি যত কড়াকড়ি হবে দুর্নীতি তত বাড়বে। তিনটি কারণে অফিসের নথি স্থবির হয়ে যায়—এক. সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার মুরোদ না থাকা; দুই. ঘুষের বিষয়টি ফয়সালা না হওয়া পর্যন্ত নথি ফেলে রাখা; তিন. সংশ্লিষ্ট সকলের জ্ঞাতে কোন কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে সিদ্ধান্ত বিলম্বিত করা। নির্বাহী প্রধান দক্ষ ও ঘুষখোর না হলে প্রথম দুটি বাধা দূরীভূত করে অনিয়ম কিছুটা কমানো সম্ভব। অফিসগুলোতে সত্য লুকানোর প্রয়াস না থাকলে গুজব কম হবে। তবে সংগোপনে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সক্ষমতা না থাকলে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ আর ‘উই নিড রিউমার’—এই দুয়ের মধ্যে কোন পার্থক্য থাকবে না।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com