আজকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার কলাম।
বাংলাদেশ মাছে স্বয়ম্ভর
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ঢাকা, রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮
‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০১৮’ উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (ফাও)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ মৎস্য উৎপাদনকারী দেশে উন্নীত হয়েছে; কিছুদিন আগেও এই মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল চতুর্থ। মোট জিডিপি’র ৩.৫৭% এবং কৃষিজ জিডিপির ২৫.৩০% আসে মৎস্য খাত থেকে। দেশে ২০০৬-০৭, ২০০৮-০৯, ২০১২-১৩, ২০১৫-১৬, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাছ উৎপাদন হয়েছে যথাক্রমে ২৪.৯০ লাখ, ২৭.০১ লাখ, ৩৪.১০ লাখ, ৩৮.৭০ লাখ এবং ৪১.৩৪ লাখ টন। বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিগত দশ বছরে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ৬১ শতাংশ এবং রফতানি বেড়েছে ১৩৫ গুণ।
বিশ্বে মাছ উৎপাদনে চীনের অবস্থান শীর্ষে; পরবর্তী অবস্থানে রয়েছে ভারত। তৃতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। দেশে মাছের নিরূপিত চাহিদা ৩৭.৯২ লাখ টনের বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৪১.৩৪ লাখ টন। তাই মাছ সম্পদে আজ বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু আমাদের সৃষ্ট নিয়তি আমাদের মাঝে মাঝে পশ্চাতে ঠেলে দেয় বলে স্বয়ংসম্পূর্ণতার আত্মতৃপ্তি বেশি দিন স্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে কোন উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এলেও তা টেকসই করা কষ্টকর। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার জন্য আমাদের দেশে কোন অর্জনই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। আমাদের দেশে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন তাই খুবই সাময়িক। খাদ্যেও আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছিলাম, কিন্তু অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি পোষাতে গিয়ে লাখ লাখ টন চাল, গম আমদানি করতে হয়েছে। অথচ অস্ট্রেলিয়া বা আমেরিকার মতো পৃথিবীর বহু দেশে কোটি কোটি হেক্টর চাষযোগ্য উর্বর জমি অনাবাদি রেখে দেওয়া হয়েছে। ওই সব দেশে ওই সব জমি চাষের জন্য একদিকে যেমন প্রয়োজনীয় লোকবল নেই অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজনাতিরিক্ত খাদ্য উৎপাদনের আগ্রহ ও উৎসাহও নেই। এই দেশগুলোতে তাই স্বয়ম্ভরতা দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই হয়ে থাকে।
স্বাধীনতা অর্জনের পর বিগত সাতচল্লিশ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে তৃতীয় এবং মাছ উৎপাদনেও তৃতীয়। তবে কোন পণ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও দেশের সকলে তা সমানভাবে ভোগ করার সুযোগ পায় না। বহু লোকের পক্ষে দুবেলা ভাত জোটানো যেখানে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায় সেখানে আমিষের চাহিদা মেটানোর জন্য মাছ কেনার সামর্থ্য পাবে কোথায়? তবে সাম্প্রতিককালে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপকতা অধিক হারে দারিদ্র্যবিমোচন করায় লোকের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে; গরিব শ্রমজীবীরাও আজকাল সপ্তাহে দুয়েক দিন মাছ কিনে আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে। এছাড়াও বিগত দশ বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে আধুনিক প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ সম্প্রসারিত হওয়ার কারণে বহু গরিব, নিঃস্ব পরিবার মাছ চাষের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে জীবিকা নির্বাহ করতে সক্ষম হচ্ছে।
মাত্র পঞ্চান্ন হাজার বর্গ মাইল আয়তনের বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটিরও বেশি। জনসংখ্যার চাপে নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর-জলাধার ভরাট হয়ে মাছ চাষের উপযোগী স্থানের সংখ্যা হ্রাস পেলেও আধুনিক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য উৎপাদন বিস্ময়করভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। আমাদের মৎস্যবিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নত জাতের মাছ চাষ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে মাছের উল্লেখযোগ্য উৎপাদন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে। বাংলাদেশে মিঠাপানির মাছে বৈচিত্র্য রয়েছে। কিন্তু মিঠাপানির কিছু প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট তাদের গবেষণার মাধ্যমে এই মাছগুলোকে বিলুপ্তির হাত হতে রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু চাষীরা কম বর্ধনশীল সুস্বাদু মাছের চেয়ে দ্রুতবর্ধনশীল হাইব্রিড মাছ উৎপাদনে অধিক মনোযোগী হওয়ায় অনেক দেশী মাছ এখনও দুষ্প্রাপ্য। ফলি মাছের দুষ্প্রাপ্যতায় এখন চিতল মাছ দিয়ে কোপ্তা বানানো হয়। তারা বাইম, মেনি, তেলেটাকি তো এখন আর দেখাই যায় না।
আমাদের বাল্যকালে মাছ এমন অঢেল ছিল যে, জমিতে মই দেওয়ার সময় দুইদিকে পানি সরে গেলে মইয়ের পশ্চাতে টাকি, পুঁটি, বাইন, কই ইত্যাদি মাছ ভেসে উঠতো। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর ধানী জমির আইলে চাঁই বসালে অফুরন্ত মাছে ভরে যেত। বিলের পানি ঘোলা করার সঙ্গে সঙ্গে চিংড়ি মাছ ভেসে উঠতো। খালে জাল ফেলে টেনে তোলার পর সারা জাল পুঁটি, টেংরা মাছে সাদা হয়ে যেত। দুহাত দিয়ে খালের পানিতে হাতড়ে মাছ ধরে ভাসমান হাঁড়ি-পাতিলে রাখার অফুরন্ত আনন্দ ছিল। গর্তের ভেতরে আন্দাজে হাত দিয়ে বাইন মাছ মনে করে রং-বেরঙের বহু সাপ ধরে খেলা করেছি। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে ঝড়-বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পর বাড়ির উঠানে কই, মাগুর, শিং, শৈল মাছ বাড়ির পুকুর থেকে উঠে আসতো; আমরা মেঘ-গর্জনের ভেতর চমকানো বিদ্যুতের আলোয় মাছগুলো কুড়িয়ে নিতাম। প্রতিটি বাড়িতে কয়েকজন লোক থাকতেন যারা কোঁচ জাতীয় সরঞ্জাম দিয়ে মাছ ধরার জন্য ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে পুকুর পাড়ে বক পাখির মতো ধীর পায়ে পরিভ্রমণ করতে ভালোবাসতেন। ঝিল বা ডোবাতে দল বেঁধে পলো দিয়ে মাছ ধরার উৎসব বহু বছর ধরে আর দেখা যায় না। অবশ্য এখন যত্রতত্র আর খাল-বিলও নেই। অধিক ফসল উৎপাদনে সার আর কীটনাশক ওষুধ ব্যবহার শুরুর পর থেকে এভাবে মাছ ধরা তিরোহিত হয়ে যায়।
এক সময় গ্রামে প্রতিটি বাড়ির আশপাশে একাধিক পুকুর থাকতো। বাড়ির সবাই এই পুকুরগুলোতে স্নান করত, মাছ ধরতো, আর পুকুরগুলোর পানি পান করত। ইংরেজরা কুমিল্লা জেলাকে বলতো ‘পুকুরের জেলা’। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে পুকুরের পাড় সমান করে ধানের বীজ ক্ষেত তৈরি শুরু হলো, পরবর্তীতে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো টাকা দিয়ে পুকুর ভরাট করে ইটের দালান তৈরি করা হয়। এখন গোসল করার জন্যও পুকুর নেই। ষোলো কোটি মানুষের বসতি গড়ে তোলার অপরিহার্যতায় সারাদেশে জলাশয় সংকুচিত হয়ে আসছে। কালের বিবর্তনে গ্রামের অনেক বাড়িতে যেমন পুকুর নেই, শহরেও তেমনি অসংখ্য খাল ভরাট হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রণীত কঠোর আইনের বাস্তবায়ন না থাকায় জলাশয়গুলোর ভরাট রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সুস্বাদু কই, শিং, মাগুর, শোল মাছের সর্বজনীন চাহিদার কারণে এই মাছগুলো জীয়ন মাছ হিসেবে এক সময় অতিথিদের জন্য প্রত্যেক বাড়িতে সংরক্ষণ করা হতো। এগুলো এক সময় নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুরসহ বাড়ির আশপাশে যে কোন জলাশয়ে পাওয়া যেত। কিন্তু হলুদ আভার সুস্বাদু দেশি শিং, মাগুর, কই মাছের ব্যাপক চাহিদাও মাছ চাষিদের বিশাল আকারের রাক্ষুসে আফ্রিকান মাগুর, থাই পাঙ্গাস, ভিয়েতনামের কই ইত্যাদি বিজাতীয় মাছ চাষ থেকে নির্বৃত্ত করতে পারছে না। কারণ বিজাতীয় হাইব্রিডের মাছের চাষ বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক। মুক্ত জলাশয়ের দেশি পাঙ্গাস মাছ এক সময়ের আভিজাত্যের প্রতীক হলেও এখন দুর্লভ; হাইব্রিডের থাই পাঙ্গাসে এখন আর সেই স্বাদ পাওয়া যায় না। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করে বেশি মাছ পাওয়া প্রত্যাশায় এখন প্রায় প্রতিটি পুকুরে বিদেশি প্রজাতির তেলাপিয়া চাষ হচ্ছে।
ত্বরান্বিত উন্নয়নে বাংলাদেশে হতদরিদ্রের সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে। ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মাছের চাহিদাও বাড়ছে। ফলে প্রকৃতির নিয়মে বেড়ে উঠা মাছ আর চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। মাছও আগেকার দিনের মতো প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা-আপনি আর বড় হয় না; এখন ফসলের মতো চাষ করা হয়। চাহিদা পূরণে তাই দেশি ও হাইব্রিড উভয় জাতের কই, শিং, মাগুর, শোল, টেংরা, পুঁটি, পাবদা, পাঙ্গাস ইত্যাদি মাছের চাষ বেড়েছে। এই মাছ আগেকার দিনের মতো প্রাকৃতিক নিয়মে আপনা-আপনি আর বড় হয় না; এখন ফসলের মতো চাষ করা হয়। অন্যদিকে মাছ চাষের নতুন নতুন পদ্ধতির প্রয়োগ অধিক মাছ উৎপাদনেরও সহায়ক হচ্ছে। আমাদের দেশে এক সময় নদী কিনারায় বসবাসরত দরিদ্র মানুষ নদী থেকে শুধু মাছ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করত। কিন্তু এখন আর নদীতে পর্যাপ্ত মাছ নেই। তাই মানুষ নদীতেও ভাসমান খাঁচা তৈরি করে মাছ চাষ শুরু করেছে এবং এই চাষ প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতায় জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। চাষের জন্যই সারা বছর এখন সব মাছ বাজারে পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বিগত কয়েক দশক আগেও সমুদ্র থেকে মাছ আহরণে লোকজন খুব বেশি ছিল না, বিগত কয়েক বছর প্রচুর ইলিশ মাছ ধরা পড়ছে বলে ইদানীং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার অত্যাধুনিক সরঞ্জাম সংবলিত ট্রলারের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। ইলিশ ব্যতীত সামুদ্রিক মাছ রূপচাঁদা, কোরাল, লইট্যা, ছুরি ইত্যাদি মাছ সব লোকের নিকট সমাদৃতও ছিল না। সমুদ্রের একটি বিরাট এলাকা সম্প্রতি বাংলাদেশের অধিকারভুক্ত হওয়ায় মাছ আহরণের সম্ভাবনা বহুগুণে বেড়ে গেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা প্রতি বছর কৃষি ও মাছ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মাছ উৎপাদনের পরিসংখ্যান দিয়ে থাকে; মাছ চাষে বাংলাদেশের প্রভূত অগ্রগতিতে ওই প্রতিবেদনে প্রশংসা করা হয়েছে। দেশব্যাপী মৎস্যচাষের সম্প্রসারণ ও বিপুল মৎস্য উৎপাদনে সক্রিয় ভূমিকা রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৭ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মৎস্য অধিদপ্তরকে সম্মানজনক ‘এডওয়ার্ড সওমা’ পুরস্কারে ভূষিত করে। সুদানের মৎস্য সম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের কৌশল ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর আগ্রহ দেখিয়েছিলেন সুদানের রাষ্ট্রদূত।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের যে পরিমাণ নদী-নালা, হাওর-বিল আছে তাতে আমরা মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করতে পারি’। মাছের অবদান আমাদের মোট জাতীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য না হলেও এর মাধ্যমে আমিষের চাহিদা পূরণ হচ্ছে, নতুন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হচ্ছে, মাছ চাষের মাধ্যমে অসংখ্য পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে এবং এভাবে বাংলাদেশে দারিদ্র্যবিমোচন দ্রুততর হচ্ছে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com