আজকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার সম্পাদকীয়
গৃহকর্মীরা যৌনদাসী নয়
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ঢাকা, রবিবার, ১৫ জুলাই ২০১৮
আমার মেয়ে ঐশী কারাতে শিখছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ পর্বে এসে কারাতে শেখার কারণ আমার জানা নেই। চারদিকে সন্ত্রাস, যৌন হয়রানি দেখে হয়তো তার মনে হয়েছে নিজেকে একটু শক্ত, সামর্থ্য করে তৈরি করে নেয়া দরকার। কিন্তু এত অরাজকতার মাঝে একা নিজেকে শক্ত, সামর্থ্য করে গড়ে তুলে কোন লাভ হবে বলে মনে হয় না। কারণ উপজাতিদের মাতৃতান্ত্রিক পরিবারে মেয়েদের প্রাধান্য ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র পুরুষদের অবাধ ও অপ্রতিরোধ্য আধিপত্য বিরাজ করছে। পুরুষদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় পৃথিবীর সব পুরুষ এক ও অভিন্ন; পাশ্চাত্য ইহজাগতিক শিক্ষায় মহিলাদের তবুও এখন একটু সম্মান দিয়ে থাকে। ভাত, কাপড়ের জোগান দিচ্ছে পুরুষ; হিন্দুদের বিয়ের অনুষ্ঠানে কনেকে উদ্দেশ্য করে এখনো বরকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ থেকে তোমার ভাত-কাপড়ের দায়িত্ব নিলাম’। এক সময় ছিল, পুরুষ পাশা বা অন্য খেলায় বাজিতে হেরে পণ হিসেবে নিজের স্ত্রীকে অন্যের হাতে তুলে দিয়েছে। যুদ্ধে স্বামী, বাবা, ভাইকে হারিয়ে স্ত্রী, মা, বোনকে গণিমতের মাল হয়ে ভাগ-বাটোয়ারার মাধ্যমে অন্যের শয্যাসঙ্গী হতে বাধ্য হয়েছে। রাজা-বাদশাহদের তুষ্টি করতে অনেক সময় মহিলাদের উপঢৌকন হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আইনগত অভিভাবক ছাড়া আজও কোন মহিলার কাছে কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে চায় না। এখনো অধিকাংশ সমাজে পরপর কন্যাসন্তানের জন্ম হলে বউকে তালাক দেওয়া হচ্ছে, কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার সব দায় যেন বউয়ের।
সৌদি রমণীদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ এত বেশি যে তাদের সামান্য ব্যত্যয়ে মহিলাদের কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। বেদুইন জীবনে অভ্যস্ত সৌদিরা তেল সম্পদের বদৌলতে অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যায়। ১৯৭৩ সনে ইসরাইলের সঙ্গে সিরিয়া ও মিশরের যুদ্ধের পর হঠাৎ তেলের দাম অনেকগুণ বেড়ে যায়। তেল বিক্রির টাকা অপচয় করেও নিঃশেষ করা সম্ভব না হওয়ায় অর্জিত অর্থ খরচের নতুন নতুন বিলাসিতা শুরু হলো। রাস্তা-ঘাট ও আকাশচুম্বী ভবন নির্মাণের শ্রমনির্ভর কাজগুলো করার জন্য আমাদের মতো গরিব দেশগুলো থেকে অল্প মজুরিতে শ্রমিক আমদানি করতে শুরু করলো। বহুবিবাহের প্রচলিত রীতি অনবচ্ছিন্ন থাকায় গৃহাভ্যন্তরে সুখবিলাস বেড়ে গেল। বিবাহিত স্ত্রীদের গৃহকর্মে আরাম দেওয়ার উদ্দেশ্য বিদেশ থেকে গৃহকর্মী সংগ্রহের প্রয়োজন অনুভূত হলো। প্রথম প্রথম শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপিন্সের মেয়েদের সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত করা হয়। কয়েক বছর যেতে না যেতেই শ্রীলঙ্কা, ফিলিপিন্স আর নারীদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে সম্মত হলো না। পরবর্তীতে ইন্দোনেশিয়া ও ভারত থেকে গৃহকর্মী নেয়া হলো। ভারত ও ইন্দোনেশিয়াও এখন আর মেয়েদের মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে রাজি নয়। এখন বিপুল সংখ্যায় মহিলাকর্মী বাংলাদেশ ও আফ্রিকা থেকে নেয়া হচ্ছে। কিন্তু কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় উল্লেখ করা হচ্ছে যে, সৌদি আরবে গৃহকর্মীদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন ছাড়াও যৌন হয়রানির মাত্রা এত বেশি বেড়ে গেছে যে, গৃহকর্মীদের ঐ দেশে থাকা আর সম্ভব হচ্ছে না।
আমাদের একটি সহজাত উপলব্ধি হচ্ছে, ধর্ম হচ্ছে নৈতিকতা আর মূল্যবোধের অন্যতম উৎস। ধর্মের যথাযথ চর্চা হচ্ছে না বলেই আমাদের দেশে মূল্যবোধের এত অবক্ষয় বলে অনেকে উচ্চ গলায় বলে থাকেন। সৌদি আরবে ধর্মের চর্চা এত বেশি যে, পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া সৌদি নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়া, ব্যবসা করা, ব্যাংকে হিসাব খোলা, মাঠে গিয়ে খেলা দেখা সম্পূর্ণ নিষেধ। সৌদি নারীদের ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা করতে যেতে হলেও পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি লাগে। সৌদি নারীদের চোখ ও হাত ছাড়া দেহের অন্য কোনো অংশ দেখা গেলে ধর্মীয় পুলিশ তাদের শাস্তি দেয়। সেনা শাসন শুরুর দিকে পাকিস্তানি সেনারাও আমাদের দেশে পুরুষদের লম্বা চুল কেটে দিত, মেয়েদের দেহের অনাবৃত অংশে আলকাতরা মেখে দিত। মেয়েদের বেলায় সৌদি আরব পাকিস্তানি সেনাদের চেয়ে আরও বেশি রক্ষণশীল। তাদের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মস্থল, সর্বত্র নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশপথ রয়েছে; এমনকি নিজের বাসা-বাড়িতে প্রবেশের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক পৃথক গেট রয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে রমণীরা সেখানে অনেকটা নাবালকের মতো। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে নারীদের সিদ্ধান্ত কখনো বিবেচনায় নেয়া হয় না। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে, জেল থেকে মুক্তি পেতেও সৌদি নারীদের অভিভাবকের সম্মতির প্রয়োজন হয়। সৌদি রমণীদের কালো বোরকা এবং হিজাব পরা বাধ্যতামূলক। ধর্মের এত সব বিধি-নিষেধ রক্ষণশীল সৌদি আরবে শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রে নয়, রাষ্ট্রীয় জীবনাচারেও প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। শরিয়া আইন অনুসরণে সৌদি আরবে জনসম্মুখে এখনো অভিযুক্তদের হাত ও কল্লা কাটা হয়। এতসব ধর্মীয় অনুশাসনে পরিচালিত সৌদি আরব মূল্যবোধের জন্য আমাদের আদর্শস্থানীয় হওয়ার কথা। কিন্তু ঐ দেশের পুরুষগুলোর লাম্পট্যের জন্য কোন দেশের গৃহকর্মী দীর্ঘদিন সৌদি আরবে অবস্থান করতে পারছে না; ধর্মীয় অনুশাসনে থাকা লোকগুলো গৃহকর্মীদের দেহ ভোগে মাতাল হয়ে যায়।
সৌদি আরবের লোকেরা বহুবিবাহে অভ্যস্ত। সৌদি বাদশাহদের এক একজনের অসংখ্য বউ ও অগণিত সন্তান রয়েছে। শুধু যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমান এখনো এক বউ নিয়ে সন্তুষ্ট আছেন; বয়স বাড়লে তিনিও পূর্বপুরুষের মতো বহুবিবাহে আসক্ত হয়ে উঠবেন কি না কে জানে। এত বউ থাকা সত্ত্বেও এই মুসলমান বীর পুরুষদের গৃহকর্মী নিয়ে মাতামাতি করার কারণ কী? কারণ আধুনিক শিক্ষায় অর্জিত মূল্যবোধে এরা বলীয়ান নয়। ধর্মের বিধান মতে গৃহকর্মীদের সঙ্গে গৃহের পুরুষদের সাক্ষাৎ করার কোন সুযোগ থাকার কথা নয়; সাক্ষাৎ হলেও এদের পোশাক এমন নয় যে, গৃহের পুরুষদের কামোদ্দীপ্ত করে তোলে। আমাদের দেশে কিছু লোকের ধারণা, পুরুষদের যৌনাকর্ষণের প্রধান কারণ মেয়েদের পরিধেয় পোশাক। যৌনক্ষুধা মেটানোর জন্য কোন অজুহাতের প্রয়োজন যে হয় না তা বহু বছর পূর্বে ‘সংবাদ’ পত্রিকার উপসম্পাদকীয়তে পড়েছিলাম। উপসম্পাদকীয়টি লিখেছিলেন সম্ভবত মরহুম জহুর হোসেন চৌধুরী অথবা মরহুম আবু জাফর শামসুদ্দীন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বা প্রেসিডেন্ট হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের সময় মধ্যপ্রাচ্যে কাজ পাওয়ার সুবিধার্থে শ্রমিকদের আরবি ভাষা শিক্ষার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এই উদ্যোগের ব্যাপারে ঐ উপসম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘বম্বের মেয়েদের সঙ্গে যৌনক্ষুধা মেটাতে সৌদিদের যদি হিন্দি শেখার প্রয়োজন না হয়, আমাদের দেশের শ্রমিকদের আরবি ভাষা শিখে কাজ জোগাড় করতে হবে কেন; ভাষা শেখার প্রয়োজন হলে তারা কাজ করতে করতেই শিখে নেবে’।
অলিম্পিক খেলা থেকে একেবারেই বাদ পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হওয়ায় সৌদি আরবের নারীরা হিজাব পরে ২০১২ সনে প্রথমবারের মতো অলিম্পিকে অংশ নেয়। অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করার কারণে সৌদি আরবের অনেক ধর্মবেত্তা অংশগ্রহণকারীদের ‘পতিতা’ বলে অভিহিত করেছিলো। এমন রক্ষণশীল সমাজে বাংলাদেশ থেকে নেয়া নারী গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন ও হয়রানির চিত্র ভয়ানক। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খুবই কম। তাই ঘরের অভ্যন্তরে সংঘটিত নির্যাতন, যৌন হেনস্থা বা ধর্ষণের ঘটনা কোন মিডিয়ায় আসে না; কোন গৃহকর্মীর পক্ষে ঘর থেকে বাইরে গিয়ে পুলিশের নিকট নালিশ করাও সম্ভব হয় না। এছাড়া সাক্ষী রেখে তো এসব কাজ করা হয় না। ঐ দেশের মেয়েরাও ধর্ষণের অভিযোগ করে সাক্ষী জোগাড় করতে না পারায় কারণে তাদের দোররা খেতে হয়েছে। সৌদি নারীদের যেখানে কোন গুরুত্ব নেই সেখানে অন্য দেশের মিসকিন গৃহকর্মীর নালিশের গুরুত্ব থাকার প্রশ্নই আসে না। আশপাশে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন না থাকায় একটি বদ্ধ ঘরে ধর্ষিতা গৃহকর্মীরা অসহায় হয়ে পড়ে; চুপ করে নির্যাতন আর ধর্ষণের যাতনা ভোগ করতে থাকে। এমন কোন অপরাধ যদি বিদেশি কোন শ্রমিক করে তাহলে তার আর রক্ষা নেই, সোজা তলোয়ারের নিচে গর্দান বিছিয়ে দিতে হয়। বিদেশিদের জনসম্মুখে কতল করে বিশ্বের কাছে প্রমাণ করে যে, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মুসলিম দেশে আইনের শাসন বলবৎ আছে।
গৃহকর্মীদের সঙ্গে দাসীর মতো ব্যবহার করাটা সৌদিদের দীর্ঘদিনের সংস্কার; কারণ ধর্মে ক্রীতদাসীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করা হয়নি। কিন্তু গৃহদাসীরা ধর্মে বর্ণিত ক্রীতদাসী নয়; তাই যৌনদাসী হিসেবে বিবেচনা করে সৌদিদের ধর্ষণ মেনে নেয়া যায় না। বাংলাদেশি গৃহকর্মীরা শত নির্যাতনেও প্রতিবাদ করতে অভ্যস্ত নয়; সম্ভব হলে পালিয়ে আত্মীয়-স্বজন বা বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরত আসার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু অন্য দেশের গৃহকর্মীরা তত শান্ত স্বভাবের নয়; অত্যাচার, নির্যাতন এবং ক্রমাগত ধর্ষণ সহ্য করতে না পেরে দুয়েকজন সৌদিকে খুন করে শিরশ্ছেদের শিকার হয়েছে। শুধু অপ্রতিরোধ্য নির্যাতন আর ধর্ষণের কারণে শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স সৌদি আরবে গৃহকর্মী প্রেরণ বন্ধ করে দিয়েছে।
সৌদি রমণীরাও গৃহকর্মীর উপর সমানতালে অত্যাচার, নির্যাতন করে থাকে। শক্ত লাঠি দিয়ে পেটানো, গরম কিছু দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। কাজে সামান্য ভুলের জন্য বেতন কেটে রাখা, দেশে ফোন করতে না দেওয়া, অসহ্য নির্যাতনে পালানোর চেষ্টা করলে চুরির অভিযোগ দিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। বাংলাদেশের এক গৃহকর্মী বাংলাদেশে ফেরত এসে যা বলেছে তা হলো, ‘আমি তো দেহ ব্যবসা করতে যাই নাই। আমি তো গেছি কামের জন্য, কাম করমু, ভাত খামু, পয়সা ইনকাম কইরা পোলাপান মানুষ করমু’। বাংলাদেশ থেকে দুই লক্ষ নারী শ্রমিক নিয়োগকর্তার খরচে নেয়ার ব্যাপারে সৌদি আরব সম্মত হয়। কিছু গৃহকর্মীকে পাঠানোর পর চল্লিশ হাজার নারী গৃহকর্মীকে সৌদি আরব ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। এর জন্য গৃহকর্মীদের কাজ করতে অস্বীকৃতি এবং ভাষাগত সমস্যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওখানে যাওয়ার পর কাজে অস্বীকৃতি জানানোটা সঙ্গতিপূর্ণ মনে হয় না। তবে এক্ষেত্রে ধর্ষণসহ অন্যান্য শারীরিক নির্যাতনই গৃহকর্মীদের কাজে অনীহা প্রকাশের মুখ্য কারণ বলে মনে হয়।
কয়েক দিন যাবৎ পত্র-পত্রিকায় গৃহকর্মীদের সঙ্গে সৌদি পরিবারের নৃশংস নির্যাতনের নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশের গৃহকর্মীদের ফেরত আনার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। গৃহকর্মীদের ফেরত আনা বা আর কোন গৃহকর্মী না পাঠানোর সিদ্ধান্ত বাস্তবসম্মত হবে বলে মনে হয় না। আমাদের দেশেও বিপুলসংখ্যক গৃহকর্মী রয়েছে এবং তারা মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর মতো অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। সম্প্রতি বার বছরের গৃহকর্মী শাওনকে চিকন রড দিয়ে পেটানো ও ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে অত্যাচারের কাহিনী পত্রিকায় এসেছে; নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য তাকে বাথরুমের জানালা দিয়ে বের হয়ে পাইপ বেয়ে এগার তলা থেকে নামতে হয়েছে। বাংলাদেশের নায়ক-নায়িকা, সাংবাদিক, খেলোয়াড়, শিক্ষক, চাকরিজীবী, ধর্মবিশ্বাসী, নাস্তিক, ব্যবসায়ী সকল শ্রেণির লোক গৃহকর্মী পেটায়। সৌদি আরবের লোকেরা ক্রীতদাসীতে অভ্যস্ত বলে গৃহকর্মীদের একটু বেশি পেটায়। তাই সৌদিদের নির্যাতনের কাহিনী শুনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লাভ নেই।
গার্মেন্ট শিল্প স্থাপন ও প্রসারের পর মেয়েরা স্বাধীনভাবে কিছুটা আত্মসম্মান নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। কোন মা-বাবাই চায় না তাদের শিশু, কিশোর বয়সের সন্তানদের অপরিচিত একটি সংসারে পাঠিয়ে তার মজুরি দিয়ে সংসার নির্বাহ করতে। অন্ন জোগানে অক্ষম হয়ে বাধ্য হয়ে সন্তানদের অন্যের গৃহে কাজ করার জন্য প্রেরণ করে থাকে। বছরে একবারও এই সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার সামর্থ্য মা-বাবার হয় না। গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী দয়াময় হলে গৃহকর্মীদের জীবনটা কিছুটা সহনীয় হয়; কিন্তু এরা নির্যাতনকারী হলে গৃহকর্মীদের অবস্থা সৌদি আরবের মতো দুঃসহনীয় হয়ে উঠে। আমাদের দেশেও গরম খুন্তির খোঁচা দিয়ে গৃহকর্মীদের নির্যাতনের বহু খবর পত্রিকায় দেখা যায়। এসব নির্যাতন কালেভদ্রে প্রকাশ পায়; অত্যাচার, নির্যাতনে গৃহকর্মীর আর্তনাদে আশপাশের কেউ খবর রাখে না, আশপাশের লোকেরা মনে করে গৃহকর্মীদের রক্ষা করা তাদের কাজ নয়। গৃহকর্মীরাও একেবারেই অসহায়, নালিশ করার বা নালিশ শোনার কেউ নেই। গৃহকর্ত্রীর সন্তানেরাও অনেক সময় গৃহকর্মীদের ওপর অত্যাচার করে থাকে; গৃহকর্মীদের তা নীরবে সহ্য করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। কম বয়সী সন্তানদের অন্যের গৃহে কাজ করে যাতে নির্যাতনের শিকার হতে না হয় সেজন্য মা’রা মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে আগ্রহী হয়। গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতন বাংলাদেশেও হয়; তাই মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মী পাঠানো বন্ধ করা ঠিক হবে না। দেশের লোকসংখ্যা যেভাবে দিনদিন বাড়ছে অচিরে মাথা গোঁজার জন্য কোন ভূমিও পাওয়া যাবে না। ভাষা না জানা, সৌদি আরবের ভিন্নতর পরিবেশ, পরিস্থিতি ও খাদ্যাভ্যাস, গৃহকাতরতাই গৃহকর্মীদের সৌদি আরব থেকে ফেরত আসার কারণ বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী সংসদে বক্তব্য প্রদানকালে উল্লেখ করেছেন। ‘সংবাদ’-এর সম্পাদকীয় কলামে মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যে গৃহকর্মীদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া যায় সে বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে দর-কষাকষি করতে হবে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com