আজকের (মঙ্গলবার, ১৯ জুন ২০১৮) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার কলাম:

উপসম্পাদকীয়

বাংলাদেশের প্রমীলা খেলোয়াড়

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

বাংলাদেশের ক্রিকেট খেলোয়াড় মেয়েরা ইতিহাস গড়ল। এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতকে ৩ উইকেটে হারিয়ে শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জিতে বাংলাদেশের মেয়েরা ক্রিকেট জগতে স্বীকৃত প্রবেশাধিকার পেলেও দ্বিপক্ষীয় সিরিজের বাইরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটাই বাংলাদেশের প্রথম শিরোপা লাভ। এশিয়া ক্রিকেট কাপের খেলা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ছয়টি টুর্নামেন্টেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ভারত। এবারও ভারতই ছিল ফেভারিট দল। ফাইনালে ভারতকে হারানোর আগে পাকিস্তানের মেয়ে ক্রিকেট দলকেও হারিয়েছে আমাদের মেয়েরা।

আমাদের শৈশব ও কৈশোরে প্রচলিত পুতুল খেলা, কড়ি খেলা, কানামাছি, কুতকুত, মার্বেল খেলা, লাটিম, লুডু, ষোলগুটি, এক্কাদোক্কা, রুমাল চুরি, যদু-মধু-রাম-শ্যাম, গৃহী-চোর-ডাকাত-পুলিশ, দাড়িয়াবান্ধা, গোল্লাছুট, ডাংগুলি ইত্যাদি সব খেলায় ছেলে-মেয়ে মিলেমিশে অংশগ্রহণ করতাম। মোবাইল, টেলিভিশন, ভিডিওগেমসহ বিনোদনের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ছেলে-মেয়েদের হাতে পৌঁছার পর গ্রামবাংলার এইসব ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ক্রমান্বয়ে হারিয়ে যাচ্ছে; অদূর ভবিষ্যতে উইকিপিডিয়া দেখে হারিয়ে যাওয়া খেলার তালিকা বের করতে হবে। এছাড়াও আগে বর্তমানকালের মতো পড়াশোনার এত চাপ ছিল না। স্কুল থেকে ঘরে ফিরে বিকেলে মধ্যাহ্নভোজ সেরে সব ছেলে-মেয়েই এক দৌড়ে পৌঁছে যেত বাড়ির পাশের খোলা মাঠে—দলবেঁধে খেলতো এসব খেলা। গ্রামের তুলনায় শহুরে বাচ্চাদের দুরন্তপনা বাসার ছোট্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে। অবশ্য গ্রামেও এখন আর আগের মতো ছেলে-মেয়েদের দুরন্তপনা দেখা যায় না। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাড়ির আশেপাশের খেলার উঁচু জমিগুলো লোকবসতিতে পূর্ণ হচ্ছে, এমনকি বাড়ির উঠোনও ভর্তি হচ্ছে ইটের দালানে।

এক সময় খেলাধুলাই ছিল গ্রামের মানুষের একমাত্র বিনোদন; এই খেলাধুলায় তারা খুঁজে নিত গ্রামীণ সংস্কৃতির ঐতিহ্য। চাঁদনি রাতে হাডুডু খেলার জন্য বোল বা ডাক দেওয়ার কাব্যিক আওয়াজ শুনে কোন যুবকের পক্ষে ঘরে থাকা সম্ভব হতো না। এ খেলায় বিবাহিত আর অবিবাহিতদের প্রতিযোগিতা ছিল চিত্তাকর্ষক। রাতজাগা শত শত মানুষের হর্ষধ্বনিতে আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে উঠতো। খেলা শেষে গায়ে কাদামাটি নিয়েই নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়িতো সবাই। মেয়েরা চড়ুইভাতি আর পুতুল খেলায় পারদর্শী হলেও ছেলেদের বিভিন্ন খেলায় মেয়েরাও অংশ নিত।

ঢাকা শহরে অধিকাংশ স্কুলে খেলার মাঠ নেই। যেসব স্কুলে মাঠ আছে সেইসব স্কুলের অধিকাংশ মাঠে মেয়েদের খেলাধুলার আয়োজন করা হয় না; অবশ্য আয়োজন করলেও যে মেয়েরা স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে অংশগ্রহণ করত তার কোন নিশ্চয়তা নেই। কারণ ধর্ম মেয়েদের খেলাধুলার পক্ষে নয়। অন্যদিকে মা-বাবারা সন্তানদের ক্যারিয়ার নিয়ে এত বেশি চিন্তিত থাকেন যে, পড়াশোনা ছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের খেলাধুলায় সংশ্লিষ্ট হওয়াটা সময়ের অপচয় মনে করা হয়। তাই স্কুলের পর যেটুকু সময় পাওয়া যায় তা ব্যয় করা হয় কোচিং-এ। তবুও সুযোগ পেলে কিছু কিছু মেয়ে মাঠে নামতে একটুও দ্বিধা করে না। এটা দেখা গেছে ২০১২ সালে আয়োজিত বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতায়। এই টুর্নামেন্টে ৬০ হাজার ৮০১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ লাখের বেশি মেয়ে শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

খেলাধুলার জগতে আসার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক বাধা পার হয়ে ক্রীড়াজগতে প্রবেশ করার পর যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা না পেলে আমাদের মেয়েদের এগুনো কঠিন হয়ে পড়বে। বিরূপ পরিবেশে এত যুদ্ধ করতে হলে মেয়েদের খেলাধুলায় মনোনিবেশ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। খেলাধুলায় উচ্চবিত্তের মেয়েদের আগ্রহ এখনো তেমন লক্ষ্য করা যায় না, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মেয়েরা আর্থিক দীনতা লাঘবের প্রত্যাশায় খেলাধুলায় অংশ নিচ্ছে। খেলাধুলায় নৈপুণ্য দেখিয়ে একটি চাকরি পাওয়ায় প্রত্যাশায় এই বিত্তের মেয়েরা কোন প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় খেলতে বেশি আগ্রহী।

আমাদের পরিবার ও সমাজ এখন মেয়েদের চাকরিজীবী হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে, কিন্তু খেলাকে মেয়েদের পেশা হিসেবে দেখতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত নয়। সমাজের কটূক্তি আর বিরূপ চাহনির জন্য মেয়ে সন্তানের মাঠের খেলায় অংশগ্রহণে মা-বাবাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। খেলাধুলায় নারীদের অংশগ্রহণের একটি বড় বাধা পরিধেয় পোশাক। খেলাধুলার উপযোগী পোশাক পরে খেললে আমাদের সমাজব্যবস্থা তা মানতে চাইবে না; সমাজের রক্তচক্ষুর ভয়ে খেলোয়াড়েরাও বিব্রতবোধ করে। তাই সামাজিক ও পারিবারিক প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে একজন মেয়ের প্রতিযোগিতামূলক ফুটবল বা ক্রিকেট খেলায় অংশগ্রহণ সব সময় সম্ভব হয়ে উঠে না। তবুও ক্রিকেট এখন ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সবার প্রিয়। ক্রিকেটে নিজ দলকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্য মেয়েরা এখন দল বেঁধে গ্যালারিতে যাচ্ছে। কিছু মেয়ে আবার বাধা-বিপত্তি মাড়িয়ে মাঠে নামছে, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করছে।

ইংল্যান্ডে ১৮৮৭ সনে প্রথম মেয়েদের ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় একশত বছর পর ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে নারী ক্রিকেটের শুরু। পাকিস্তান আমলেও মেয়েদের ক্রিকেট দল ছিল, কিন্তু তার ধারাবাহিকতায় স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে মেয়েদের ক্রিকেট খেলা শুরু হয়নি। এর মুখ্য কারণ হচ্ছে, পাকিস্তান আমলে মেয়েদের যে ক্রিকেট দল ছিল সেই দলের প্রায় সকল সদস্য ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানের। এতদসত্ত্বেও ২০১৪ সালে পাকিস্তান নারী ক্রিকেট দলকে হারিয়েছে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। ২০০৬ সালে বিসিবি’র একটি ট্রেনিং ক্যাম্প থেকে অর্জিত কৌশল ও অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে ২০০৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এসিসি উইমেন্স ট্রফিতে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল সংযুক্ত আরব আমিরাতকে মাত্র ৯ রানে অল আউট করে এবং সিঙ্গাপুর, চীন, হংকং, নেপালকে হারিয়ে ট্রফি জিতে নেয়। এর চার বছর পর ২০১১ সালে ওয়ানডে স্ট্যাটাস পায় বাংলাদেশের মেয়েরা।

শুটিং-এ মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেয়ে সাবরিনা সুলতানা কমনওয়েলথ, সাফ ও ইন্দো-বাংলায় সোনা জিতেছেন। সাউথ এশিয়ান গেইমসে ভারোত্তোলনে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত এবং মাহফুজা খাতুন শিলা সাঁতারে স্বর্ণপদক জিতেছে। দাবা খেলায় রানী হামিদের নাম আমরা সবাই জানি। ব্যাডমিন্টন খেলায় আমাদের দেশে নারীদের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। জাতীয় টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় ১৬ বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে লিনুর নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

ফুটবল খেলায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ও চমৎকার পারফরমেন্স সম্প্রতি দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হয়েছে। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে আমাদের কিশোরীরা অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় গৌরব অর্জন করেছে। ফুটবল খেলায় ময়মনসিংহের কলসিন্দুর গ্রামের কিশোরীদের হঠাৎ আবির্ভাব ফুটবল খেলায় প্রমীলা ফুটবলারদের চমৎকার ছন্দ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় ও সমাজজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের সমঅধিকারে নিশ্চয়তা বিধান করেছে বাংলাদেশের সংবিধান।

ধর্মান্ধ সমাজ ও পরিবার সর্বদাই মেয়েদের স্বাধীনতায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রাখে। মেয়েদের চলাফেরায় নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব হলে সৃষ্ট এসব বাধায় মেয়েদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখা সম্ভব হবে না। নারীরা খেলাধুলার সঙ্গে জড়িত থাকলে বাল্যবিবাহ রোধ করা সম্ভব। এর মাধ্যমে শিক্ষার হার, নেতৃত্বগুণ বাড়ানো ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটানো যাবে।

একজন নারীর মস্তিষ্ক তার সমবয়সী একজন পুরুষের তুলনায় অধিক পরিপক্ব। তবুও ধর্মের অজুহাত দিয়ে মেয়েদের ঘরের চার কোণায় আবদ্ধ করে রাখার প্রয়াস আমাদের দেশে প্রায় সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। সমাজের ধারণা এমন—ছেলেরা ফুটবল, ক্রিকেট সব খেলবে, মেয়েরা রান্নার কলাকৌশল আয়ত্ত করবে, খেলতে চাইলে পুতুল খেলবে। সমাজব্যবস্থায় মেয়েদের মানসগঠন এমনভাবে তৈরি হতে থাকে যে, কিছু করতে গেলেই মনের কোণে উদিত হয় সমাজের ভয়। কিন্তু সমাজের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ে থাকলে কখনো সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটানো সম্ভব হয় না। সমাজের বেড়াজাল না ভেঙে কেউ কোনদিন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। সমাজব্যবস্থা কখনোই কোন নতুন সৃষ্টির অনুকূলে থাকে না। সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে লড়ে যেই নারীরা খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পেরেছে তারাই আজ দেশের জন্য আন্তর্জাতিক সুনাম হাতের মুঠোয় করে দেশে ফিরেছে।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com