উপসম্পাদকীয়
সৌদি নারীদের একটি বিজয়
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
ঢাকা, রবিবার, ২৪ জুন ২০১৮
গত ২৬ সেপ্টেম্বর সৌদি আরব নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দিয়ে এক আদেশ জারি করেছে। তবে এ আদেশ কার্যকর হয়েছে আজ ২৪ জুন থেকে। সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান এক ফরমান জারি করে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এর ফলে সৌদি নারীরা কোন পুরুষ অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই গাড়ি চালানোর জন্য স্বতন্ত্র লাইসেন্স সংগ্রহ করতে পারবে। রাজকীয় আদেশ অনুযায়ী পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও গাড়ি চালানোর লাইসেন্স দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সৌদি প্রেস এজেন্সি। কোন আইনগত বাধা না থাকলেও সৌদি নারীদের এতদিন ড্রাইভিং লাইসেন্স দেওয়া হতো না এবং গাড়ি চালাতে দেখলে পুলিশ তাদের আটক করত। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি সংক্রান্ত এ সিদ্ধান্তকে অনেকের সঙ্গে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও স্বাগত জানিয়েছেন।
নারীদের জীবনযাপনে বিধিনিষেধ আরোপের ক্ষেত্রে সৌদি আরব অনেক বেশি রক্ষণশীল। সৌদি নারীরা মাহরাম ছাড়া একা কোথাও বের হতে পারে না, খেলাধুলায় অংশগ্রহণ নিতে পারে না, রক্তের সম্পর্ক ছাড়া অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারে না; ঘরের বাইরে বেশিরভাগ ভবনে নারী-পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথ রয়েছে, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, পার্ক, সমুদ্রসৈকতে নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা আলাদা স্থান রাখা আছে। অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া সৌদি মেয়েরা বাড়ি ভাড়া নিতে, গাড়ি কিনতে, কাজে যোগ দিতে পারে না। সৌদি নারীদের পাসপোর্ট পেতে পুরুষ অভিভাবকের লিখিত অনুমতির প্রয়োজন হয়। পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরোয়া পরিবেশে আলাদা বসার ব্যবস্থা না থাকলে কোন রেস্তোরাঁর সৌদি নারীরা খেতে যেতে পারে না। শুধু তাই নয়, সুন্নি মহিলা কোন শিয়া মুসলিমকে বিয়ে করতে পারে না। সৌদি রক্ষণশীল পরিবারের মেয়েরা শৈশব পার হলে তাদের চাচাত ভাইয়ের সামনে আসতে বা দেখা দিতে পারে না।
আমাদের নবী করিম (সা.)-এর আমলে নারীরা কিন্তু উট, গাধা ইত্যাদিতে চড়ে বিভিন্ন জায়গায় যেতে পারতেন। তাহলে চতুর্দিকে ঢাকা আধুনিক জামানায় তৈরি চার চাকার গাড়ি চালানো নিষেধ কেন? দেশটির মানবাধিকার সংগঠনগুলো অনেক দিন থেকেই এই অধিকার অর্জনের সংগ্রামে সক্রিয়। এই গাড়ি চালানো নিয়ে বহুদিন ধরে তর্ক-বিতর্ক হয়ে আসছে। অনেক ধর্মবেত্তার মতে, সঙ্গে একজন ‘মাহরাম’ (অভিভাবক) থাকলে একজন মুসলিম মহিলার তার প্রয়োজনে ড্রাইভিং করার ক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই। নারীদের মোটরগাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে ধর্মে কিছু বলা নেই। ধর্মের দিক থেকে কোন বাধা থাকলে শুধু সৌদি আরবে নয়, অন্যান্য মুসলিম দেশেও মেয়েদের গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা থাকতো। কিন্তু সৌদি আরব বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি ছিল না। এ জন্য অনেক নারীকে গাড়ি চালানোর অপরাধে গ্রেফতার বা হয়রানির শিকারও হতে হয়েছে।
১৯৯০ সনে সর্বপ্রথম এ নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে সৌদি আরবে মেয়েরা প্রতিবাদ জানায়। ২০১১ সনে গাড়ি চালানোর অপরাধে সৌদি আরবের নাগরিক শাইমা জাসতানিয়াকে চাবুক মারার নির্দেশ দেওয়া হয়; তবে প্রয়াত বাদশাহ আবদুল্লাহ পরে সে শাস্তি মওকুফ করে দেন। তার গাড়ি চালানোর ভিডিও প্রকাশের পর তাকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়, তাকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে অভিহিত করা হয়। তার বিরুদ্ধে মুসলমানদের ভুল পথে নেয়ার অভিযোগ তোলা হয় এবং যত ধরনের গালি আছে, তা তাকে শুনতে হয়। ২০১৩ সনে সৌদি নারীদের কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় সাইকেল ও মোটরসাইকেল চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে এক্ষেত্রে শর্ত ছিল, যিনি সাইকেল চালাবেন তাকে ইসলামি রীতিতে পুরো শরীর ঢেকে রাখতে হবে এবং ওই জায়গায় কোন পুরুষ অভিভাবকের উপস্থিতি অপরিহার্য।
ইরানের নারীরা গাড়ি চালানোর অধিকার ভোগ করলেও গাড়ি চালানোর সময় ঠিকমতো হিজাব করা বাধ্যতামূলক। গাড়ি চালানোর সময় হিজাবের সামান্যতম ব্যত্যয়ে বহু নারীকে দোষী সাব্যস্ত করে জরিমানা বা অন্যান্য শাস্তি দেওয়া হয়েছে। হিজাব খোলা বা ঢিলেঢালা দেখা গেলে পুলিশ অনেক রমণীর গাড়ি বাজেয়াপ্তও করেছে। ১৯৮৯ সনে একজন মালয়েশীয়ান মেয়ে গাড়ি চালিয়ে আমাকে বাংলাদেশ অ্যামবাসিতে পৌঁছে দিয়ে ঠাট্টা করে বলেছিল, ‘জিয়া, তোমার চার রিঙ্গিত বাঁচিয়ে দিলাম’।
নারীর গাড়ি চালানোকে সৌদি আরবে ‘হারাম’ বা ‘নিষিদ্ধ’ বলে মনে করা হতো। সৌদি পুরুষের ধারণা, নারীরা গাড়ি চালালে তারা বাইরের পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ পেয়ে যাবে। শেখ আবদুল্লাহ বিন বায ও শেখ উসাইমিন প্রমুখের মতে, নারীর গাড়ি চালানো কোরআন-হাদিস দ্বারা নিষিদ্ধ না হলেও গাড়ি চালানোর সময় পর্দাহীনতা, হঠাৎ অশ্লীলতা, অনিচ্ছাকৃত আরও কিছু বিষয় আছে যেগুলো নিষিদ্ধ। কাজেই গাড়ি চালানোও নারীদের জন্য নিষিদ্ধ। সৌদি আরবের সাবেক মুফতি এবং উলামা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল আজিজ বিন বাজের অভিমত হচ্ছে, ‘নারীদের জন্য গাড়ি চালানো জায়েজ নয়। কেননা এতে বেগানা পুরুষের সঙ্গে মিশ্রণ ঘটে। তাছাড়া ড্রাইভিং করতে গেলে হাত, মুখ অথবা শরীরের কোন অঙ্গ উন্মোচিত হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে পরপুরুষের সঙ্গে মেশা একটি বড় ধরনের ফেতনার কারণ।’ উলামা পরিষদের আরেকজন সদস্য শায়েখ মুহাম্মাদ বিন সালেহ আল উসাইমিনের মতে, ‘গাড়ি চালানোটা হারাম নয়, ফেতনার কারণে হারাম।’ উলমা পরিষদের আরেকজন সদস্য শায়েখ সালেহ আল-ফাওজান বলেন, ‘নারীদের গাড়ি চালানো এমন একটি ভয়ঙ্কর ফাসাদ, যার কারণে সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল দেশে নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া যায় না।’ এদের মতে, গাড়ি চালানো অপরাধ নয়, অপরাধ গাড়ি চালানোর সময় বোরকা খোলা, ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কথাবার্তা বলা।
উপজাতি ব্যতীত মানবসমাজের সর্বত্র নারীদের অবমূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। শারীরিক শক্তিতে বলীয়ান না হওয়ার কারণে এদের সর্বত্র শারীরিকভাবেও নির্যাতনের শিকার হতে হয়। বর্তমান সমাজে মেয়েদের অগ্রগতি দেখে ধর্মীয় অনুশাসনের নিগড়ে বাঁধার প্রচেষ্টার কমতিও নেই। সব বাধা-বিপত্তি মেয়েদের ক্ষেত্রে। পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকলে এত বাধা-বিপত্তির প্রয়োজন থাকে না। কিছু পুরুষের ধারণা, রমণীদের মেধা কখনো পুরুষের সমান হতে পারে না; তাই এদের গাড়ি চালাতে দিলে দুর্ঘটনা ঘটাবে। দুর্ঘটনা অহরহ হচ্ছে এবং তা ঘটাচ্ছে পুরুষ চালকেরা। তাই নারীদের মেধা না থাকা বা দুর্ঘটনা ঘটানোর আশঙ্কা সত্যকে আড়াল করার জন্যই করা হয়ে থাকে। তাদের ভেতরের মনোভাব হচ্ছে, গাড়ি চালানো হারাম, নাজায়েজ, ফেতনা ইত্যাদি। তবে পরিবর্তন হতে থাকলে সব ব্যাখ্যা পরিবর্তনের পক্ষে উচ্চারিত হতে থাকে। সৌদি আরবের মতো রক্ষণশীল দেশেও গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে মেয়েদের ‘বোকা’ বলাতে সমস্যা হয়েছে। সৌদি আরবের আসির অঞ্চলের ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান শেখ সাদ আল হাজারি ‘নারীরা বোকা এবং গাড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট বুদ্ধি তাদের নেই’ বলাতে ওই অঞ্চলের গভর্নর তাকে ধর্মীয় কর্তৃপক্ষের প্রধান থেকে বাদ দিয়েছেন।
অনেকের ধারণা, সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর নিষেধাজ্ঞা শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আসেনি, এসেছে সামাজিক রক্ষণশীল মনোভাব থেকে। সৌদিরা মেয়েদের বেলায় এত বেশি রক্ষণশীল যে, এখনও তারা মেয়েদের নাম পরিবারের বাইরে প্রকাশ হতে দেয় না; মেয়েদের নাম বাইরের কারও জানাটা পরিবারের জন্য অপমানজনক মনে করা হয়। নারীর গাড়ি চালানো নিষেধ করে কোন আইন সৌদি আরবে না থাকলেও সমাজের গোঁড়ামির কারণে অধিকাংশ মানুষ মনে করে, নারী গাড়ি চালানো শুরু করলে সমাজের সব বিধিনিষেধ অমান্য করবে। অতি রক্ষণশীল সৌদি সমাজের অধিকাংশ মানুষ মনে করে, নারীকে একা থাকতে
দিলে সে পাপের পথে পা বাড়াবে। একটু বেশি প্রসাধনী ব্যবহার সৌদি আরবের নারীদের জন্য এখনও স্বপ্নের মতো।
সৌদি আরব ব্যতিক্রম হলেও ক্রমান্বয়ে নারীরা তাদের স্বাধীনতা আদায় করবে। তাই গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বোচ্চ উলামা পরিষদ ‘হাইয়াতু কিবারিল উলামা’-এর সদস্যগণ বলেন, সুস্পষ্ট কোন দলিল না থাকায় ‘প্রতিটি জিনিসের আসল হলো বৈধতা’, আর এই নীতির ভিত্তিতে নারীদের গাড়ি চালানোতে কোন সমস্যা নেই। মানবজাতির বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আইন-কানুন, বিধি-নিষেধ শিথিল হচ্ছে। ইন্টারনেটের বদৌলতে পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রভূত অগ্রগতির কারণে ঘরে বসে নিজের মতামত গঠনের মতো তথ্য প্রতিটি মেয়ে-পুরুষ অতি সহজে পেয়ে যাচ্ছে। বিপ্লব-বিদ্রোহ দানা বাঁধার আগেই আইনের বাঁধন শিথিল করা ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য প্রয়োজন। সৌদি যুবরাজের দূরদর্শী এ সিদ্ধান্তে সৌদি রমণীদের বিজয় হলেও অনেক বাঙালি গাড়ি-চালক চাকরি হারাতে পারে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com