আজকের (রবিবার, ১৩ মে ২০১৮) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার উপসম্পাদকীয়:

উন্নয়নশীল দেশ অনুন্নত মানুষ

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

আট বছর বয়সী এক মেয়েকে শুধু ধর্ষণ করা হয়নি, ধর্ষণের পর পাথর মেরে হত্যা করা হয়েছে। ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে যাযাবর মুসলিম সম্প্রদায়ের আট বছরের শিশু আসিফা বানুকে ধর্ষণ করার সংবাদ কয়েক মাস পূর্বে পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু এটা শুধু ধর্ষণ ছিল না, জম্মু ও কাশ্মীর থেকে মুসলমানদের তাড়ানোর একটা ফন্দিও। ইতোমধ্যে অনেক মুসলমান ওই এলাকা ত্যাগে বাধ্য হয়েছে। কারণ সাম্প্রদায়িক ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সমর্থকেরা পরিকল্পিতভাবে এ ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। পুলিশের অভিযোগপত্র ও ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, এ বছরের জানুয়ারিতে অপহৃত আসিফাকে খুনের আগে চেতনানাশক খাইয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি কর্মকর্তা ও দেবীস্থান মন্দিরের হেফাজতকারী সানজি রাম আসিফাকে অপহরণের জন্য তার ভাগ্নে ও একজন পুলিশ সদস্যকে নির্দেশ দেয়। অপহরণ করে এনে মন্দিরে এক সপ্তাহ আটক রেখে এক দল আসিফাকে ধর্ষণ করে। ধর্ষণের পর তাকে পরে গলা টিপে ও পাথর মেরে হত্যা করে। ভারতের আদালত সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার জন্য আটজনকে অভিযুক্ত করেছে।

এসব ধর্ষণ, হত্যা আদি যুগেও হয়েছিল, এখনও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু খুনি ও ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে সংঘবদ্ধ হয়ে যখন লোকজন কথা বলে তখন মানবতার অস্তিত্ব নিয়ে ভয় হয়। আদালত আটজনকে অভিযুক্ত করায় আসিফার পরিবারের সদস্যরা নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। আসিফার পক্ষ নিয়ে যে আইনজীবী লড়ছেন তাকেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। জম্মু বার অ্যাসোসিয়েশনও অভিযুক্ত ধর্ষক ও হত্যাকারীদের পক্ষে মিছিল করেছে; পুলিশের তদন্ত নিয়ে তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। পুলিশ ধর্ষক ও হত্যাকারীদের অভিযুক্ত করায় বার অ্যাসোসিয়েশন নাখোশ। আসিফার ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে আদালতে পুলিশের উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে ভারতের মিডিয়ার একাংশ শোরগোল তুলে বলছে যে, আসিফাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করা হয়নি। ঘটনাস্থল কাশ্মীরের কাঠুয়াতে ধর্ষকদের পক্ষে কিছু অমানুষের বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে। এসব বিবেচনা করে জম্মু ও কাশ্মীরে মামলা পরিচালনা নিরাপদ হবে না বিধায় মামলা অন্য কোন রাজ্যে সরিয়ে নেয়ার আবেদন করেছেন আসিফার বাবা।

ন্যায়-অন্যায় বিচার না করে কোন মানবসন্তান যখন ধর্মভিত্তিক মতাদর্শের লোকদের অন্ধভাবে সমর্থন দিতে থাকে তখন মানবতার বিপর্যয় হয় মারাত্মকভাবে। যে দেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতাসীন সে দেশে সরকার ও রাষ্ট্রের থাকে সম্প্রদায়গত প্রীতি। এ প্রীতি ধর্ম পরিপালনে নীতিনিষ্ঠ হওয়ার জন্য নয়; এ প্রীতি ধর্মের নামে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার অভিনব কৌশল। তাই তো আসিফাকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষ নিয়ে ‘হিন্দু একতা মঞ্চ’ নামে সংগঠনটি যে সমাবেশের আয়োজন করেছিল তাতে ভাষণ দিয়েছেন কাশ্মীরের শিল্পমন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ গঙ্গা এবং বনমন্ত্রী লাল সিং। এই দুই বিজেপি মন্ত্রী ধর্ষক এবং হত্যাকারীর মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। মন্ত্রী চন্দ্র প্রকাশ গঙ্গার বক্তব্য শুনে মনে হয়, ভারত আবার আদিম যুগে ফেরত গেছে। তিনি বলেন, ‘এ এক মেয়ের মৃত্যু নিয়ে কেন এত শোরগোল—এখানে এমন অনেক মেয়ে মারা যায়’। ভারতের রাজনৈতিক জীবনে মানবতা ও নীতিবোধের এ অধঃপতন পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশের ক্ষেত্রে কেমন যেন বেমানান মনে হয়।

কিছু নরাধম পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে ধরণীকে কলুষিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। এরা প্রেমপ্রীতি, ভালোবাসা বোঝে না, সম্মতি-অসম্মতির ধার ধারে না—এরা জোর খাটিয়ে ধর্ষণে আনন্দ পায়। সব যুগেই এ অসভ্য, বর্বর লোকগুলোকে দেখা যায়; যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতির ফলে এসব ঘটনা মুহূর্তেই এখন সবাই জেনে যায়, লুকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। অন্যদিকে ভুক্তভোগীও প্রতিবাদ করতে শিখেছে। সামাজিক লজ্জা এবং অপাঙ্ক্তেয় হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে ধর্ষকের বিরুদ্ধে কিছু কিছু মামলাও হচ্ছে। কিন্তু ধর্ষণের সংবাদে এখন আর খুব বেশি প্রতিক্রিয়া দেখি না। সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রতিদিন হত্যা, ধর্ষণ, সহিংসতা, নির্যাতনের খবর শুনতে শুনতে, পড়তে পড়তে সবার গা সওয়া হয়ে গেছে। তাই বোধ হয় ধর্ষণ, হত্যার খবর এখন আর সংবেদনশীল নয়। অন্যদিকে মানবসমাজ ধর্ম, গোত্র, বর্ণে বিভক্ত হয়ে পড়ায় এখন আর মানুষ নিগৃহীত হয় না—নিগৃহীত হয় হিন্দু, নিগৃহীত হয় মুসলমান, নিগৃহীত হয় খ্রিস্টান, নিগৃহীত হয় ইহুদি। এখন মানবাধিকার না বলে বলতে হবে, মুসলিম অধিকার, হিন্দু অধিকার, খ্রিস্টান অধিকার, ইহুদি অধিকার।

ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। ক্ষমতাসীন বিজেপি বিভিন্ন রাজ্যে ভোটের জন্য ধর্মীয় উসকানিমূলক বক্তব্য, বিবৃতি দিয়ে ধর্মে গোঁড়া লোকগুলোকে উত্তেজিত করে রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করে থাকে। ধর্মের কথা বলে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করা পৃথিবীর সবচেয়ে সহজ কাজ। প্রত্যেক ধার্মিক তার নিজের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করে থাকে। তাই নিজের ধর্মের অতি মূল্যায়ন হতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই কিছু লোক উত্তেজনা অনুভব করে; আবার নিজের ধর্মের বিপক্ষে কিছু শুনলে অনুভূতিতে লেগেছে বলেও উত্তেজিত হয়ে উঠে। যারা ধর্ম পালন করে না তারাও ধর্মের নামে সত্য-মিথ্যা কথায় প্রাণ দিতে পারে, প্রাণ নিতে পারে। এরা অনেক বেশি হিংস্র। এরা দেশটার সর্বত্র নিজের ধর্মের একচেটিয়া কর্তৃত্ব চায়; অন্য ধর্মের লোকেরা তাদের ভূমিতে জন্ম নেয়ায় অহর্নিশ তাদের গায়ে জ্বালা ধরে, গায়ের জ্বালা জিয়িয়ে রেখে অন্য ধর্মাবলম্বীদের তাড়ানোর ফন্দি করে। এদের একমাত্র প্রতিপক্ষ ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কতল করে এরা আনন্দ উপভোগ করে থাকে।

এ সাম্প্রদায়িক শক্তির প্রতিপক্ষ শুধু ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নয়; তাদের ধর্মে বিশ্বাসী কম ভক্তিওয়ালা লোকদেরও হেনেস্থা করে থাকে। দেশে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে তারা যা চাইবে তাই হতে হবে; তাদের বিশ্বাস দেশ তাদের, সমাজ তাদের, নীতি তাদের, আইন তাদের। একই ধর্মমতে বিশ্বাসী কেউ অন্য ধর্মাবলম্বী কোন নির্যাতিত লোকের পক্ষে কথা বললে তারা সমস্বরে বলে উঠে, ‘ওরা নাস্তিক’, ‘এরা ব্লগার’। এ গোঁড়া ধর্মান্ধরা স্ব স্ব স্বার্থে বাবা-মা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাইকে খুন করতে পারে। স্বার্থ যখন মুখ্য হয়ে উঠে তখন আর ধর্ম মুখ্য থাকে না। এরা বেশিরভাগ আচারনিষ্ঠ, ধর্মগত প্রাণ নয়। শুধু এক ধর্মাবলম্বীদের নিয়ে গঠিত দেশ পৃথিবীতে খুবই কম। ধর্মভিত্তিক দেশ গড়ে উঠলেই যে সম্প্রদায়গত বিভেদ দূর হয়ে যাবে তা কিন্তু নয়। একই ধর্মের মধ্যে আবার অনেক বিভেদ। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী না থাকলে ভিন্ন তরিকার লোকদের সঙ্গে দাঙ্গা করতে এদের দ্বিধা হবে না। তরিকার মধ্যেও আবার শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আছে। এই তরিকার লড়াই চলছে তুরস্কে, ইরাকে, সিরিয়ায়, ইয়েমেনে, সৌদি আরবে, পাকিস্তানে।

আশার কথা হচ্ছে, পৃথিবীর সর্বত্র অসাম্প্রদায়িক লোকেরও অভাব নেই। কিন্তু এদের সংঘবদ্ধ জোট খুব বেশি নেই; এদের কথাবার্তায় ধর্ম না থাকায় সাধারণ মানুষের কাছে এদের আবেদন কোনরূপ অনুরণন সৃষ্টি করে না। তবুও তারা প্রতিবাদ করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয়, সরকারের কাছে আবেদন, নিবেদন করে। জম্মু ও কাশ্মীরের আট বছরের শিশু আসিফা বানুকে গণধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে সারা ভারতের অসাম্প্রদায়িক লোকগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করছে, রাস্তায় নেমে এসেছিল কলকাতার মানুষ। কয়েক দিন ধরে কলকাতার স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আসিফা বানু ধর্ষণ-হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে রাত-দিন বিক্ষোভ করেছে। সন্ধ্যায় ছাত্রছাত্রীদের মোমবাতি মিছিলে স্থানীয় বাসিন্দারাও যোগ দিয়েছিল। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রথমদিকে নীরবতা পালন করে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীদের ভেতরে ভেতরে সাহস যুগিয়েছেন। পরবর্তীতে হয়তো তার খেয়াল হয়েছে যে, তিনি শুধু শিবসেনার লোক নন, ভারতের প্রধানমন্ত্রীও। তাই তিনি ঘোষণা দিলেন, আসিফা হত্যার ন্যায়বিচার হবে। তার এই ঘোষণার পর জম্মু ও কাশ্মীরের মাহবুবা মুফতি সরকার থেকে ধর্ষণ ও হত্যাকারীদের সমর্থনদাতা বিজেপির উক্ত দুই মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। অন্যদিকে বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া থেকে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘কোন আইনজীবীকে দোষী পাওয়া গেলে আজীবনের জন্য তার লাইসেন্স বাতিল করা হবে’।

নায়ক-নায়িকা ও ক্রিকেটাররা এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন। গৌতম গম্ভীর, শহিদ আফ্রিদি, অমিতাভ বচ্চন, শাহরুখ খান, সালমান খান, প্রিয়াঙ্কা চোপড়া, স্বরা ভাস্কর, সোনম কাপুর, কারিনা কাপুর, হেমা মালিনীসহ আরও অনেকে জম্মু-কাশ্মীরের আট বছরের শিশু আসিফার গণধর্ষণ ও খুনের প্রতিবাদে ঘৃণা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। আসিফা হত্যা ও ধর্ষণের প্রতিবাদে মোমবাতি মিছিলের নেতৃত্ব দেন কংগ্রেসের প্রধান রাহুল গান্ধী। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস শিশু আসিফা বানুর অপহরণ, ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে রোমহর্ষক আখ্যায়িত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

আসিফাকে পাথর মেরে হত্যা থেকেই প্রতিপন্ন হয়, শুধু ধর্মের কারণেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড। এমন একটি রোমহর্ষক ঘটনার পরও অভিযুক্তদের মুক্তি দাবি এবং ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের তা সমর্থন করায় স্পষ্ট হয়, নষ্ট মানুষের শরীর, মন সব ধর্মের গোঁড়ামি দ্বারা আবৃত। অসাম্প্রদায়িক লোকেরা প্রতিবাদ করলেও এই প্রতিবাদ ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব জাহিরের অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য আকাঙ্ক্ষা জাহিরের খরস্রোতে বাঁধ সৃষ্টি করতে কখনোই পারে না। কারণ ধর্মীয় উচ্ছ্বাস অপ্রতিরোধ্য।

সম্প্রদায়গত অতি প্রীতির জন্য একজন মানুষের মানবিক গুণ ঢাকা পড়ে যায়। আমরা এক সময় মোহাম্মদ আলী ক্লে-কে পছন্দ করতাম মুসলমান বলে, তিনি যে বিশ্বের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা তা আমাদের নিকট মুখ্য ছিল না। ঠিক তেমনি গুণাগুণ বিচার না করে একজন হিন্দু আরেকজন হিন্দুকে, একজন খ্রিস্টান আরেকজন খ্রিস্টানকে, একজন ইহুদি আরেকজন ইহুদিকে শুধু সম্প্রদায়গত কারণে পছন্দ করে, সমর্থন করে এবং পক্ষাবলম্বন করে। মানুষের মধ্যে এত বিভেদ থাকায় মানবতা বিপর্যস্ত হচ্ছে। তাই আসিফার ধর্ষক ও খুনিরা ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী, এমপিদের জোরালো সমর্থন পায়। যে দুজন মন্ত্রী এখন পদত্যাগে বাধ্য হয়েছে আগামী নির্বাচনে তারা হয়তো আরও বেশি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসবেন; যেমন হয়েছেন ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

(গত সপ্তাহের কলামে তৈমুর লংকে সম্রাট বাবরের বাবা উল্লেখ করেছিলাম, হবে প্রপিতামহ)

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com