দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার আজকের (ঢাকা, রবিবার, ২২ এপ্রিল ২০১৮) কলাম:

প্রবাহমান সংস্কৃতি

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

প্রথম পর্ব

সংস্কার এবং সংস্কৃতি সম্পূর্ণভাবে বিপরীতধর্মী। সংস্কার হচ্ছে বদ্ধমূল ধারণা বা বিশ্বাস, আর সংস্কৃতি হচ্ছে শিক্ষা বা চর্চা দ্বারা লব্ধ বিদ্যা, বুদ্ধি, কলা, নীতি, রুচি ইত্যাদির উৎকর্ষ সাধন। দেশ, কাল, পাত্র ভেদে সংস্কার ও সংস্কৃতির বিভেদ অনিবার্য। একজনের কাছে যা সংস্কার অন্যের কাছে তা সংস্কৃতি। সংস্কার ও সংস্কৃতি উভয় যেমন সহজাত তেমনি আবার গ্রহণ-বর্জনের মাধ্যমে সংস্কার সংস্কৃতিতে রূপান্তর হয়। চাঁদকে নিয়ে যত কাব্যই লেখা হোক না কেন, চাঁদের শুধু অবয়ব সংস্কৃতির লক্ষণ নয়, বরং চাঁদের আলোর বিচ্ছুরণই সংস্কৃতি। সূর্যেরও আলো আছে এবং এই আলোর আবশ্যকতা চাঁদের আলোর চেয়ে বেশি। কিন্তু এই আলো কমনীয় ও আবেদন সৃষ্টিকারী হিসেবে গৃহীত নয়। তাই মানুষ নিজে কোন সংস্কৃতি নয়, বিভিন্ন কলাকৌশলে নিজেকে গ্রহণীয় মাত্রায় উপস্থাপন করার যোগ্যতাই সংস্কৃতি।

বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ। বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে পালিত এই দিনটিকে সার্বজনীন উৎসবের দিন হিসেবে গণ্য করা হয়। অধিকাংশ বাঙালি এই দিনটিকে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন করলেও আমার কাছে সার্বজনীন বলে মনে হয় না। গ্রামাঞ্চলে হিন্দুর সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় বৈশাখী মেলা এখন আর আমাদের এলাকায় হয়ই না। তবে নতুন হালখাতায় বাকি থাকা, না থাকা নির্বিশেষে টাকা জমা দিয়ে জিলাপী দ্বারা আপ্যায়িত হওয়ার রীতিটি এখনও সর্বত্র পরিপালিত হয়। আমাদের শৈশবে দেখেছি, খোলা মাঠে, হাট-বাজারে, প্রশস্ত পুকুর পাড়ে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় থাকতো নানা রকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, মাটির পুতুল, পিঠা, আম কাটার ছোট ছোট ছুরি, বাঁশি আর থাকতো গ্রামীণ খেলাধুলার প্রতিযোগিতা। এখন বর্ষবরণের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কৃত হয়েছে। ফেসবুক আসার পর খুব সহজে ‘শুভ নববর্ষ’ জানানো ছাড়াও জাকারবার্গের সফটওয়্যারের বদৌলতে কারুকার্যখচিত রং-বেরঙের বহু ইমেজ বন্ধুরা বিলি করে বাঙলা নতুন বছরকে বরণ করে নেয়। কিন্তু অনেকে আবার বৈশাখের এইসব অনুষ্ঠানের ঘোরবিরোধী এবং তা নিয়ে প্রচুর কথাও হচ্ছে। দিন দিন পক্ষ, বিপক্ষ দুই দিকেই সমর্থন বাড়ছে। তবে রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতিভাবান কবির জন্ম বাঙালির ঘরে হয়েছে বলে এই দিনটির উদযাপনে একটি উপযোগী গান পাওয়া গেছে। কিন্তু তার গানের কথামতো কাজ হয় না; দুঃখ, কষ্ট, জরা, মৃত্যু, গ্লানি বারবার ফিরে আসে, আগুনে স্নান করে পৃথিবীও শুচি হয় না। একদিকে যেমন রবি ঠাকুরের গান গেয়ে ১৯৬৭ সন থেকে পহেলা বৈশাখের উৎসব শুরু করার জন্য অসংখ্য লোক রমনার বটমূলে জড় হচ্ছে, তেমনি প্রথম বৈশাখী উৎসবে ১৯৫১ সনে বক্তব্য প্রদানকারী মুনীর চৌধুরী, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা আর মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীকে ১৯৭১ সনে নির্মমভাবে হত্যা করার জন্য লোকেরও অভাব হয়নি।

১৯৬৭ সন থেকে রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান হয়ে আসছে। পছন্দ হয় না বলে বোমা ফাটিয়ে বহুদিন পূর্বে একটি পক্ষ জানান দিয়েছে যে, এসব বেদাতি কাজ সহ্য করা হবে না। ১৯৮৯ সনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখের উৎসবে মঙ্গল শোভাযাত্রার সংযোজন। শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণকারী লোকজন বিভিন্ন রঙের মুখোশ পরে থাকে। পৃথিবীর বহু দেশের লোকজন তাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমন মুখোশ পরে থাকে। এই মুখোশ পরা নিয়ে একদিকে যেমন নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তেমনি অন্যদিকে এই মুখোশে হিন্দু সংস্কৃতির গন্ধ আবিষ্কার করছে অনেকে। এছাড়াও শোভাযাত্রায় বহন করা হয় বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। এই প্রতিকৃতি বহন নিয়ে অনেকের জোর আপত্তি। মুসলমানরা ঢাকঢোল পিটিয়ে গান-বাজনা আর আলপনা আঁকার মতো বিষয়গুলোর ব্যাপারে স্পর্শকাতর। এই মঙ্গল শোভাযাত্রা আবার জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

পহেলা বৈশাখের উৎসব পালনের বিপক্ষে ফেসবুকে অনেকগুলো লেখা পড়েছি। কারও কারও মতে, এইদিনের কার্যক্রম বাঙালি সংস্কৃতির অংশ নয়। কারও কারো মতে, একদিন উদযাপন করে সারা বছর বাঙালিপনা ভুলে থাকার লোকগুলো ভণ্ড। আরেক মতো হচ্ছে, এত টাকা ঐদিন খরচ না করে অভুক্ত লোকদের দিয়ে দেওয়া ভালো। কয়েকজন আবার বলেন, বৈশাখের অনুষ্ঠান অপসংস্কৃতি। কেউ কেউ বলেন, বৈশাখের এই উদযাপন ধর্মীয় মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আরেক দল বলে, এটা হিন্দুদের সংস্কৃতি। এই বক্তব্যটি বহুল কথিত। পান্তাভাত আর ইলিশ খাওয়ার আমোদ নিয়েও প্রচুর কটূক্তি করা হয়েছে। অভিযোগ করা হয়, যারা ধুমধাম করে বৈশাখী উৎসবে যোগ দেয় তারা বাংলা মাসগুলোর নামও জানে না। আঁকা আলপনা একবার বোধ হয় রাতের অন্ধকারে অজ্ঞাত লোকেরা আলকাতরা ঢেলে ঢেকে দিয়েছিল। অনেক বলেছেন, সারা বছর বাংলা সনের দিন, তারিখ ভুলে গিয়ে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালন করার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই। বাংলা সন তারিখ যে আমাদের মনে থাকে না তা সত্য। আমার ঘরে ক্যালেন্ডার নেই; প্রয়োজন হয় না বলে। ব্যবসা-বাণিজ্যে সন তারিখ দরকার। সারা পৃথিবীতে যোগাযোগের জন্য খ্রিস্টীয় সন তারিখ ব্যবহৃত হয়; দুটো সন-তারিখ ব্যবহারের নির্দেশনা শুধু চিঠিপত্রে পরিপালিত হয়। তবে গ্রামের লোকজন এখনও বাংলা সনের হিসেবে কাজ করে থাকেন।

বিপুল লোকের বসতিতে ভরা বাংলাদেশের সংস্কৃতি নানা ঘাত-প্রতিঘাতে আবর্তিত। আমাদের আনন্দ, উৎসব খুবই সীমিত; হাতিরঝিলে শুক্রবার বা কোন উৎসবের দিনে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। রাস্তায় ওয়াসার কাজ করার সময়ও অসংখ্য লোক আগ্রহ নিয়ে ময়লা পরিষ্কারের বিশ্রী দৃশ্য দাঁড়িয়ে অবলোকন করে। গ্রামে এক সময় নিয়মিত যাত্রা হতো, এখন হয় না। না হওয়ার প্রধান কারণ ধর্মীয় বাধা-বিপত্তি এবং ঘরে ঘরে টেলিভিশনের উপস্থিতি। মানুষের রুচির পরিবর্তন হয়েছে—এখন যাত্রার চেয়ে টেলিভিশনের নাটকে বেশি আনন্দ পায়। আগে ফসল তোলার সঙ্গে সঙ্গে ফসলের মাঠে ওয়াজ মাহফিল হতো; এখন হয় রাস্তার ওপর, বদ্ধ ঘরে। এখন চাঁদা তোলা ফসল দিয়ে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা হয় না, এখন মানুষের হাতে প্রচুর নগদ টাকা, তোলা ফসল বিক্রি করে শিক্ষকের বেতন পরিশোধের প্রয়োজন হয় না।

অনুষ্ঠানের ধরন ও রুচির যতই পরিবর্তন হোক না কেন এখনও আমরা উৎসব করার একটা উছিলা খুঁজি। তাই পহেলা বৈশাখের তাৎপর্যের চেয়ে বাঙালির কাছে এর উৎসবটাই মুখ্য। আমরা প্রয়োজনে খ্রিস্টীয় সন ব্যবহার করব আর আনন্দের জন্য বাংলা সন উদযাপন করব। এতে কোন সমস্যা দেখি না। ব্যবহারিক ক্ষেত্রে দুটি সনের হিসাব মনে রাখা সম্ভব হয় না। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর মতো ১৭টি ভাষা আয়ত্ত করা সহজ নয়, দরকারও নেই। অনেকে বলেন, বাংলা সন এত প্রিয় হলে একুশে ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ৮ ফাল্গুন বলি না কেন; বলি না এই কারণেই যে, একুশে ফেব্রুয়ারি শুধু একটি মাসের একটি দিন নয়, একুশ এখন একটি প্রতীক বা সিম্বল। সিম্বল বা প্রতীকের কোন একক ভাষা নেই, প্রতীক সব ভাষার প্রতিনিধিত্ব করে থাকে। হিজরী সনও বাঙালির নয়, কিন্তু বাঙালিদের অনেকে এই সনেরও হিসাব রাখে। হিজরী চন্দ্র বছর না হয়ে সূর্য বছর হলে আরও বেশি গুরুত্ব পেত, হয়তো সম্রাট আকবর বাঙলা বছর প্রবর্তনের চেষ্টাও করতেন না। চন্দ্র বছরের হিসাব ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা নয় বলে খাজনা আদায়ের জন্য সময় মেলাতে গিয়ে একটি বিরাট গ্যাপের সম্মুখীন হতে হতো। চন্দ্র বছরের হিসাবের হেরফেরে শস্য মৌসুমে খাজনা না নিয়ে কৃষকের আকালে তা আদায় করতে হতো বলে বাঙলা সনের প্রচলন করতে হয়েছে সম্রাট আকবরকে।

অনেকে বলেন, যে সন আমাদের কাজে লাগে না, যে অনুষ্ঠান আমাদের কোন প্রয়োজন মেটায় না তার ঘটা করে পালন তাৎপর্যহীন। কিন্তু সবকিছু প্রয়োজনের নিরিখে মাপা যায় না। আমরা সব কিছু শুধু প্রয়োজন মেটানোর জন্য করি না। ড. আহমেদ শরীফ বলতেন, ইহজাগতিক প্রয়োজন বেশি হলে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে, আর পরকাল মুখ্য হলে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিয়ে মাদরাসা, মক্তবের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। পাশ্চাত্য ইহকালের গুরুত্ব দেয় বলে জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করে। প্রাচ্যের চীন, কোরিয়া, ভিয়েতনাম, জাপানের লোকজনও পাশ্চাত্যের মতো ঘড়ির কাঁটা ধরে জীবনকে সাজায়। আমরা যারা পরকালের ওপর গুরুত্ব দেই তারা ইহকালের জীবন উপভোগে তত যত্নবান নই। দুটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন থাকলেও প্রয়োজন মেটানোর পদ্ধতি ভিন্ন। বিড়াল কালো, কি সাদা তা বিবেচ্য নয়, বিড়াল ইঁদুর মারে কি না তাই মুখ্য—চীনের প্রয়োজনীয়তাভিত্তিক এই বচনও কিন্তু স্থায়ী হয়নি। অর্থাৎ শুধু প্রয়োজন, উপযোগিতা ইত্যাদি দিয়ে বৈশাখী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ পরিমাপ করা যথার্থ নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, হাঁটার জন্য পায়ের মাপে একহাত (সম্ভবত তিনি এক বিঘাত বলেছেন) প্রশস্ত জায়গার প্রয়োজন, কিন্তু শুধু একহাতের ওপর আমরা হাঁটতে পারি না (শারীরিক নৈপুণ্য প্রদর্শক ব্যতীত)। টাই না পরলে গরমকালে শার্টের কলারটার প্রয়োজন হয় না। বসবাসের জন্য বসতবাড়ি দরকার, স্থাপত্যবিদকে দিয়ে টাকা খরচ করে বসতবাড়ির সৌন্দর্য সৃষ্টির প্রয়োজন থাকার কথা নয়। মনের খাদ্য দেহের পুষ্টি দ্বারা নিরূপণ করা যায় না বলেই মানুষ অনেকের মুখে উচ্চারিত ‘অপ্রয়োজনীয়’ সংস্কৃতিরও লালন-পালন করে থাকে। গানের শিল্পী আব্বাসউদ্দীনের হারমোনিয়াম নিয়ে গান গাওয়ার সময় কিছু মুসলমান বাধা দেন; আব্বাসউদ্দীন তাদের বলেছিলেন, ‘ভাই, লবণ ছাড়া পান্তাভাত যেমন, হারমোনিয়াম ছাড়ার গানের আমেজ তেমন’। তাই আনন্দের সৃষ্টি ও উপভোগের ক্ষেত্রে প্রয়োজন, অপ্রয়োজনের সীমারেখা টানা কঠিন।

মোতাহের হোসেন চৌধুরী তার ‘সংস্কৃতি কথা’ প্রবন্ধগ্রন্থে লিখেছেন, ‘ধর্ম হচ্ছে অশিক্ষিত লোকের সংস্কৃতি’। বর্তমান প্রেক্ষাপটে উক্তিটি যথার্থ বলে মনে হয় না। এখন বহু শিক্ষিত ব্যক্তি ও পরিবার ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি দ্বারা লালিত। ‘অশিক্ষিত’ বলতে তিনি অন্য কিছু বুঝিয়েছেন কি না আমার জানা নেই। তবে ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার একটা সযত্ন প্রয়াস সবকালে, সব দেশে, সব মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু অদ্যাবধি সম্পূর্ণ ধর্মভিত্তিক সংস্কৃতি কোন একটি একক ভূখণ্ড বা নির্দিষ্ট জাতিতে লক্ষ্য করা যায়নি। ভারতে যেমন উলুধ্বনি দেয়, কয়েকটি মুসলিম দেশেও তা দেওয়া হয়। ইন্দোনেশিয়ায় তো হিন্দু পুরাণের দেব-দেবীর নামে অনেক জাতীয় সংস্থার নামকরণ করা হয়েছে। তাদের বিমান সংস্থার নাম গারুদা; মহাভারতের একটি চরিত্রের নাম গরুড়। কশ্যপের স্ত্রী বিনতা স্বামীর বরে জন্ম দেন গরুড়কে; গরুড় জন্ম নিয়েই আকাশে পাড়ি দেয় বলেই এই নামটি মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া তাদের বিমানের জন্য বেছে নিয়েছে।

আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিল না পেলেই আমরা বলি অপসংস্কৃতি। আমরা কথায় কথায় বলি, ভারত ও পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতির চর্চায় কিশোর-কিশোরীরা উচ্ছন্নে যাচ্ছে; আজন্ম লালিত মূল্যবোধ হাবুডুবু খাচ্ছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের সিরিয়ালগুলোর অধিকাংশ আমার নিকট বিরক্তিকর মনে হলেও আমার স্ত্রীর কাছে খুবই প্রিয়। আমার ছেলে অর্ণব তার মাকে বলে, ‘শুধু দুটি ভারতীয় চ্যানেলের টিভি থাকলে একশ’ চ্যানেলের টিভি এত দাম দিয়ে কিনতে হতো না’। কিন্তু তাই বলে কোন সংস্কৃতিকেই অপসংস্কৃতির অভিধায় অভিহিত করা যুক্তিসম্মত নয়। একজনের কাছে যা সংস্কৃতি অন্যের নিকট তা সংস্কৃতি মনে নাও হতে পারে। আদি মানুষের সংস্কৃতি আর সভ্য জগতের সংস্কৃতি এক হবে না। আফ্রিকার বহু উপজাতির মেয়েরা তাদের ঊর্ধ্বাঙ্গ কাপড় দিয়ে ঢাকে না। আমাদের পার্বত্য এলাকার এমন পোশাকের মেয়েদের দিকে অনভ্যস্ত বাঙালি তাকিয়ে থাকে বলে পার্বত্য অঞ্চলে বাঙালির বসতি স্থাপনে বিরোধের উৎপত্তি। তাই ভিন্নতর চালচলন, ভিন্ন খাবার, ভিন্ন পরিধেয় পোশাকে কাউকে দেখে তাদের সংস্কৃতিকে অপসংস্কৃতি বলা যথার্থ নয়। অন্যদিকে একই জাতিসত্তার মানুষের শহুরে সংস্কৃতি আর গ্রামীণ সংস্কৃতি এক নয়। আমার মায়ের সংস্কৃতি আর আমার সংস্কৃতি এক নয়; আমার সংস্কৃতি আর আমার ছেলের সংস্কৃতি ভিন্নতর। আমার মা যেভাবে কথাবার্তা বলতেন আমার কথাবার্তা তা থেকে ভিন্নতর। নিম্নবিত্তের লোকজন যারা লেখাপড়া করার সুযোগ পায়নি, যারা সভ্য সমাজের সঙ্গে উঠাবসার সাহস রাখে না তাদের শব্দ করে ভাত খেতে গিয়ে পাশের লোক বিরক্ত হচ্ছে কি না সে ব্যাপারে মাথা ঘামায় না, জোরে কাশি দিতে, সবার সামনে টুথপিক দিয়ে দাঁত খোঁচাতে, দাঁতে আটকে থাকা খাবার আঙ্গুলের ডগায় খোঁচা দিয়ে মুখে এনে পুনরায় সবার সামনে চিবানো, ভাত খাওয়ার পর সবার সম্মুখে গলা খাকার দিয়ে হাত-মুখ ধোয়া বা মুখে হাত না রেখে হাঁচি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের একটুও সংকোচ হয় না; কারণ তাদের ধারণা এটাই স্বাভাবিক আচরণ। কিন্তু আমি বাসায় একটু জোরে কথা বললে সঙ্গে সঙ্গে আমার মেয়ে ঐশী আপত্তি করে বসে। আমাদের ছাত্রজীবনে পড়ার জন্য কোন আলাদা কক্ষ ছিল না, কারো থাকলেও রুমের দরজা বন্ধ রাখার কথা কেউ চিন্তাও করেনি। এখন আমার সন্তানের কক্ষে ঢুকতে হলে দরজায় টোকা দিয়ে অনুমতি নিতে হয়। বৈশাখী উৎসব পালনেও অঞ্চলভেদে ভিন্নতা রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার ছোট ছোট জাতিসত্তাগুলো ভিন্ন আঙ্গিকে এই উৎসব উদযাপন করে থাকে, তাদের ‘বৈসাবি’ উৎসবে ধর্মীয় আচারেরও সংশ্লেষ রয়েছে।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com