দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত আমার আজকের (সোমবার, ১৬ এপ্রিল ২০১৮) কলাম:
কোটার মুণ্ডুপাত!
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশে ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন, বিক্ষোভ করেছে। শুরুতে কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা এই আন্দোলনে থাকলেও পরবর্তী সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা সম্পৃক্ত হয়েছিল। এই বিক্ষোভে কোন রাজনৈতিক ইস্যু ছিল না। কিন্তু আন্দোলনকারীরা খুবই বুদ্ধিমান। তারা জানে সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে দাবি আদায় কঠিন হতে পারে; তাই ছাত্রলীগের কর্মী ও সমর্থকেরা মিছিলের অগ্রভাগে অবস্থান করে বঙ্গবন্ধুর ছবি বহন করেছে আর স্লোগান দিয়েছে, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’। মিছিলে যে অন্য মতাদর্শের ছাত্র-ছাত্রী ছিল না তা কিন্তু নয়; দাবি আদায় মুখ্য ছিল বলে তারা তাদের নেতা-নেত্রীর ছবি বহন করেনি বা তাদের মতাদর্শের স্লোগানও দেয়নি। তাই এই আন্দোলনের পেছনে অন্য রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্র থাকার বা রাজাকারের অভিযোগ গ্রাহ্য হয়নি। তবে খোঁচা দিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য কিন্তু থেমে থাকেনি। কোটা ব্যবস্থা বাতিল করার ঘোষণায় বিরোধী দলের নেতারা সরকারের পরাজয় হয়েছে বলে পুলক বোধ করছেন।
মেধা ও যোগ্যতা অবশ্যই মূল্যায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এক লেখায় দেখলাম, প্রায় ২৫৮ জায়গায় এই কোটা ব্যবস্থা রয়েছে। সংসদে মহিলা কোটা নিয়ে মহিলা পরিষদসহ অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি নানা কথা বলেছেন। এই কোটা মহিলাদের জন্য সম্মানজনক নয় বলেও অনেকে মন্তব্য করে মহিলাদের রাজনৈতিক দল থেকে মনোনয়ন দিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত করে আনার দাবিও করেছেন। কিন্তু কোন রাজনৈতিক দল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মহিলা মনোনয়ন দিয়ে ঝুঁকি নিতে চায় না। তাই বিনা নির্বাচনে বিশেষ সুবিধায় কোটা মেনে মহিলাদের সাংসদ থাকার সুযোগ থেকেই গেল। যে সকল ছাত্র-ছাত্রী বিক্ষোভ করেছে তারা সবাই মেধাভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে কি না আমার জানা নেই; কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির ক্ষেত্রেও কোটা আছে বলে জানতাম। স্বাধীনতার পর থেকেই কোটা চালু রয়েছে; এই কোটায় চাকরি পাওয়া পিতা-মাতার কোন সন্তান আন্দোলন করেছে কি না তাও কেউ জানে বলে মনে হয় না।
লিঙ্গবৈষম্য দূর করার জন্য প্রতিটি সরকার প্রচেষ্টা নিয়েছে; এই লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে মহিলাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। এই অগ্রাধিকার দেওয়া না হলে অফিস-আদালতে এত মহিলা চাকরিজীবী দেখা যেত না। বাসা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও মহিলা চাকরিজীবীকে কয়েক বছরের জ্যেষ্ঠতা দেওয়া হয়। ফুটপাতে চলার সময়ও মহিলাদের বামপাশে রেখে হাঁটার নিয়ম পশ্চিমারা পালন করে থাকে। রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির সম্ভাব্য প্রথম আঘাত যেন পুরুষের গায়ে লাগে সেজন্য পুরুষেরা ডানপাশে থাকে। কোটা মানে অগ্রাধিকার ভোগ করা। এ প্রসঙ্গে একটি গল্প বলি। চেয়ার একটি, বসার লোক দুজন—একজন শিশু, অন্যজন এক মধ্যবয়সী লোক। সুযোগ পেয়েই শিশুটি দৌড়তে চেয়ারে বসে পড়ল। তৃতীয় বয়স্ক ব্যক্তি শিশুটিকে ধমক দিয়ে বললো, ‘এই বাচ্চা, দেখো না মুরব্বি দাঁড়িয়ে আছে?’ শিশুটির উত্তর, ‘জি দেখেছি, উনি একজন শক্ত সামর্থ্য লোক, আমি তার তুলনায় দুর্বল, চেয়ারটি আমারই প্রাপ্য’। এ কারণেই কিছু চেয়ার দুর্বলদের জন্য সংরক্ষিত রাখতে হয়। এমন চেয়ার দেখা যায় শৌচাগার, বাস, ট্রেন প্রভৃতি যানবাহনে। পশ্চিমা দেশে দোকানে বাজার করতে গেলেও প্রতিবন্ধীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কর্মকর্তা ব্যতীত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদে আপাতদৃষ্টে কোন মেধা কোটা নেই। কর্মকর্তা পদে চুয়াল্লিশ পারসেন্ট মেধাবীদের জন্য সংরক্ষিত। বাকি অংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা, জেলা কোটা, মহিলা কোটা, উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কোটা, প্রতিবন্ধী কোটা। সবগুলো কোটার মধ্যে মেধা কোটা সবচেয়ে বেশি, তারপর মুক্তিযোদ্ধা কোটা। অন্যান্য কোটা সংস্কারের সুযোগ কম, কারণ এগুলোর অংশ কম; পাঁচ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য, প্রতিবন্ধীর জন্য এক শতাংশ। তাই সবার ধারণা, ছাত্র-ছাত্রীরা মুক্তিযোদ্ধা কোটা সংস্কারের দাবি করছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা আবার জেলা কোটার ভিত্তিতে নিরূপিত হয়; তবে এই জেলা কোটা নিরূপণে অনেক নমনীয়তা রয়েছে। এই কোটা পূরণে কিছুটা জটিলতাও রয়েছে। এখন মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ছাড়াও নাতি-নাতনিও বিবেচিত হয়। সম্ভবত এখানেই ক্ষোভ। অনেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে বাজে মন্তব্যও করেছে। অনেকে তাদের জন্য সংরক্ষিত কোটা বাতিল করে অন্য যে কোন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। অনেকের দৃষ্টি শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রতি নিবদ্ধ থাকায় মতিয়া চৌধুরী সম্ভবত ‘রাজাকার’-এর কোটা বৃদ্ধির আন্দোলন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
অনেকের ধারণা কোটার মাধ্যমে যারা চাকরিতে আসছে তাদের মেধা না থাকাতে দেশ ও সমাজ যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমার ধারণা সব কোটার প্রার্থীই কমবেশি মেধাবী। কারণ কোটা বণ্টন করা হয় লিখিত, মৌখিক ইত্যাদি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে। অনুত্তীর্ণ কোন প্রার্থীর জন্য কোটা থাকে না। তবে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের নম্বর প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কিছুটা পার্থক্য থাকে। এমন পার্থক্য বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষায় গ্রেডিং পদ্ধতিতেও রয়েছে। গ্রেডিং পদ্ধতিতে কাছাকাছি মেধাবীদের মধ্যে সমতা আনার এই পদ্ধতির বিরুদ্ধে জোরালো কোন আন্দোলন দেখিনি। জিপিএ-৫—এই গ্রেডে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ নম্বরের পার্থক্য অনেক; গোল্ডেন ফাইভ-এর আইনগত কোন স্বীকৃতি থাকার কথা নয়। তাই নির্বাচিত প্রার্থীদের নিয়ে প্রণীত তালিকায় প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে কম মেধাবী বা বেশি মেধাবী বলার সুযোগ কম। এসব পরীক্ষায় ভাগ্যও একটা ফ্যাক্টর। আমি করণিকের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি, কিন্তু প্রায় একই সময় তিনটি প্রতিষ্ঠানে প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার জন্য নির্বাচিত হয়েছিলাম। নেতাজি সুভাষ বসুকে আইসিএস পরীক্ষায় পরপর তিনটি প্রশ্ন করা হলে একটি প্রশ্নেরও উত্তর দিতে পারেননি। ‘তুমি দেখি কিছুই জান না’—ভাইভা বোর্ডের চেয়ারম্যানের এমন মন্তব্যে সুভাষ বসু বলেছিলেন, ‘আমি বহুকিছু জানি, সম্ভবত আপনাদের করা এই তিনটি প্রশ্ন ব্যতীত’। তাই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে বেশি নম্বর পেলেই মেধাবী হওয়া যায় না। সমুদ্রসম জ্ঞানের পরিধিতে একটু সাঁতার কেটে মেধাবী দাবি করা কতটুকু সঙ্গত তা কম বিচার্য নয়। বিভিন্ন কোটায় অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীদের মধ্য থেকেও মেধাবীদের বাছাই করা হয়; তবে এক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা হয় নির্দিষ্ট কোটার নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে।
মেধা কোটায় দুর্নীতি করার সুযোগ বেশি। মেধা কোটায় নম্বর প্রাপ্তির ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নিরূপিত হয়। ঘুষ নিয়ে বা সুপারিশে একজন প্রার্থীকে প্রথম করা গেলে মেধা কোটায় তার চাকরি প্রাপ্তি নিশ্চিত হয়। কিন্তু অন্যান্য কোটা ব্যবস্থায় প্রথম হলেও চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। বাংলাদেশে সুপারিশের অত্যাচার মারাত্মক; সুপারিশের মাত্রা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে বেশি। তাই দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর দলপ্রীতির প্রয়োগ এই মেধা কোটায় একটু বেশি। কিন্তু এই সুপারিশ কোন কাজে লাগে না যদি না প্রার্থীর জেলার পর্যাপ্ত কোটা থাকে। কোটার মাত্রা কমবেশি হয় জেলার লোকসংখ্যার ভিত্তিতে। দেশের সব অঞ্চলের জনগণকে সরকারি চাকরিতে অনুপ্রবেশের সুযোগ সৃষ্টি এবং সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জেলার জনসংখ্যার অনুপাতে চাকরিতে নিয়োগে জেলা কোটা নিরূপিত হয়।
সারা পৃথিবীতে বৈষম্য দূর করতে কোটা পদ্ধতি চালু আছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তাদের দেশের অনগ্রসর অংশকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে এই মর্মে নির্দেশনা দিয়েছিল যে, কোনভাবেই সংরক্ষিত আসন বা কোটা ৫০%-এর বেশি হবে না। এছাড়াও পৃথিবীর বহু দেশই কোটা প্রথাকে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, মালয়েশিয়া, লেবানন, ফিজি, জর্ডান, পাকিস্তান, কসভোসহ আরও অনেক দেশের সংবিধান অনগ্রসর মানুষদের জন্য সংরক্ষিত কোটা নিশ্চিত করেছে বলে একজনের লেখায় দেখলাম। যারা কোটা ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন তারাও কোটা প্রথা বিলুপ্তির পক্ষে। তাদের যুক্তি এই কোটা ব্যবস্থা অনির্দিষ্টকালের জন্য চলতে পারে না। কিন্তু যে আমেরিকা সারা পৃথিবী থেকে মেধা কিনে নেয় তারাও রেড ইন্ডিয়ানদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করে রেখেছে।
কোটা বাতিলের মতো কোটা রক্ষারও একটি আন্দোলন হতে পারে। সম্ভবত লজ্জার জন্য পারছে না। কোটা প্রথা সংরক্ষণের জন্য মুক্তিযোদ্ধা বা অনগ্রসর অঞ্চলের ছাত্র-ছাত্রীরা রাস্তায় নামলেই মেধাবীরা ব্যঙ্গ করে বলবে, ‘ওরা মেধাশূন্য’। সমাজের অবকাঠামোর ভিন্নতা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের অক্ষমতায় দেশের অনেক অঞ্চলের মানুষ সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত। এদের সমাজের মূলস্রোতে মেশানোর তাগিদে টেনে তোলার জন্য এই কোটা প্রথার প্রচলন। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের অনগ্রসর শ্রেণীকে সুবিধা দিয়ে সমতা বিধানের লক্ষ্যে কোটার প্রবর্তন করা হয়। কিন্তু বহু প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থা অনুসরণ করে লোক নিয়োগ দিয়েছে বলে মনে হয় না। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে কোন কোন জেলার লোকসংখ্যার আধিক্য দৃষ্টিকটুভাবে পরিলক্ষিত হয়।
জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কোটা যেহেতু কেউ চাচ্ছে না, তাহলে থাকারই দরকার নাই। কোটা বাদ।’ কিন্তু কোটা ব্যবস্থার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংবিধান সরকারকে উপজাতি, প্রতিবন্ধী প্রভৃতি সুবিধাবঞ্চিত লোকদের অগ্রাধিকার দিতে বিধি-বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা দিয়েছে। দেশের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ গ্রহণার্থে উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্যও কোটা দরকার। কোটা না থাকলে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর পশ্চাতে অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে। যারা দীর্ঘকাল কোটা ব্যবস্থা রাখার বিপক্ষে বলছেন তারাও জানেন যে, ভৌগলিক কারণে সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চল ও শিক্ষাবঞ্চিত লোকেরা এখনও সুবিধাভোগী লোকদের কাছাকাছি আসতে পারেনি। এদের সমতায় আনাই লক্ষ্য যা সময় নির্দিষ্ট করে বন্ধ করা সমীচীন হবে না। বিভিন্ন সময় যৌক্তিক কারণেই বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানুষের জন্য এই কোটা পদ্ধতির সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিভিন্ন বঞ্চিত মানুষদের অন্তর্ভুক্ত করতে, নির্ধারিত কোটা পুনর্বিন্যাস করার প্রয়োজনে কয়েকবার কোটার সংস্কার করা হয়েছে; এখন আবার বিচার-বিশ্লেষণ করে তা করা যেতে পারে। একটা কথা সত্য, মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা পূরণ করার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তীর্ণ প্রার্থী সব সময় পাওয়া যায় না। এই মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ করার জন্য কোন কোন ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় প্রার্থী দিয়ে প্যানেল বড় করতে হয়। তাই মুক্তিযোদ্ধা কোটার প্রাপ্যতা হ্রাস করার বিষয়টি বিবেচনা করা শ্রেয় হবে।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com