আজকের (রবিবার, ০৮ এপ্রিল ২০১৮) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার কলাম।

কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

জিয়াউদ্দীন আহমেদ

রাজনীতিবিদ, মন্ত্রিমহোদয়েরা ‘কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না’ মর্মে মাঝে মাঝে হুঙ্কার দিয়ে থাকেন। শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াতে এমন বাগাড়ম্বরপূর্ণ হুঙ্কার জনগণের কাছে এখন আর কোন গুরুত্ব পায় না। কিন্তু যারা বলেন তারা জনগণের মনোভাব স্টাডি করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এসব বাগাড়ম্বর কথার বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয় না বলেই জনগণ রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে এখন আর মাথা ঘামায় না। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষাকে সামনে রেখে শিক্ষামন্ত্রী বরাবরের মতো আবার বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে প্রচুর লেখালেখি হওয়া সত্ত্বেও আমার ভাবনা প্রকাশের বাসনা থেকে কলম নিয়ে বসলাম।

বিগত কয়েক বছর ধরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা মহামারি আকারে ঘটে যাচ্ছে। এ নিয়ে প্রচুর লেখালেখিও হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, অতীতেও প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। সত্তর দশকের প্রথমদিকে আমাদের অনার্স পরীক্ষার ষষ্ঠ পত্রের প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে যায়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বুঝতে পেরে পরীক্ষা বাতিল করে দেয়। কিন্তু দ্বিতীয়বার প্রণীত প্রশ্নপত্রে আমাদের পরীক্ষা কারোই ভালো হয়নি। ভালো হওয়ার কথাও নয়। যত মেধাবী ছাত্রই হোক না কেন, বইয়ের প্রথম পাতা শেষ পাতা অবধি কেউ পরীক্ষার জন্য মুখস্থ করে না। বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে নির্বাচিত প্রশ্ন ও বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপের মাধ্যমে পরীক্ষার প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়ে থাকে। অনেকে মুখস্থ করার ঘোর বিপক্ষে; কিন্তু কম-বেশি সবাইকে কিছু বিষয় মুখস্থ করতে হয়। এসব কারণে দ্বিতীয়বার প্রণীত প্রশ্নপত্রে কারো পরীক্ষা মনমতো হয় না; প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়া সত্ত্বেও পরীক্ষার্থীরাও একই বিষয়ে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিতে আগ্রহী হয় না। প্রশ্ন ফাঁস হলে সঙ্গে সঙ্গে পরীক্ষা বাতিলের ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাও সম্ভবত এ কারণে বাস্তবায়ন করা হয় না।

প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেই যে সবাই ফাঁস করা প্রশ্ন নিয়ে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করবে তার কোন নিশ্চয়তা নেই। বাহাত্তর সনে দেদার নকল হয়েছে, প্রায় সবাই বই খুলে লিখেছে, কিন্তু সবাই কি প্রথম বিভাগে পাস করেছিল? তিয়াত্তর সনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রায় এক হাজার ছাত্রছাত্রী ফেনী কলেজ থেকে উত্তীর্ণ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম মাত্র দুজন। যাদের জ্ঞান নেই, লেখাপড়া নেই, বোধশক্তি নেই, বইয়ের কোথায় কোন লেখাটি আছে জানে না সে নকল করে বা ফাঁস করা প্রশ্ন দিয়ে কী শিখে কী লিখবে? মেধা বা আইকিউ না থাকলে ফাঁস করা প্রশ্ন দিয়েও যুৎসই পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হয় না।

শিক্ষাজীবনে এতগুলো পরীক্ষা নেয়ার প্রয়োজন নেই বলে অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত শোনা যায়। তাদের কথা মতো পরীক্ষা না থাকলে প্রশ্ন ফাঁসের ঝামেলাও থাকবে না। কিন্তু আমাদের মতো অঘা ছাত্রছাত্রীরা যে শুধু পরীক্ষার সময় মনোযোগ দিয়ে পড়তে অভ্যস্ত এটা বোধ হয় বিশেষজ্ঞদের বিবেচনায় থাকে না। পরীক্ষা না থাকলে যেমন ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে, ঠিক তেমনি প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণেও ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া বন্ধ করে দেবে এবং এ জন্য শিক্ষাক্ষেত্রে একটা অমোচনীয় বিপর্যয় নেমে আসবে। এ প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে শিক্ষকরাও পাঠদানের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে পড়তে পারেন।

চলমান উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় এখনও প্রশ্ন ফাঁসের খবর শোনা যায়নি; অন্যবারের মতো গুজবও শুনছি না। শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে মানুষের পক্ষে যা যা সম্ভব সবই করা হয়েছে। এ কথাটি আরও কয়েক বছর আগে বললে তার ভাবমূর্তি এভাবে নষ্ট হতো না। শিক্ষাবিদ জাফর ইকবালসহ প্রায় সব লোকের বিপক্ষে গিয়ে তিনি বারবার গুজবে কান না দিতে সবাইকে সবক দিয়েছেন। তিনি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় একযোগে দৃঢ়কণ্ঠে বলে গেছে, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি’। তার ধারণা দেশের সব লোক তার ইমেজ নষ্ট করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু তার এই আচরণ তার স্বভাবসুলভ বলে মেনে নিতে কষ্ট হয়। গতানুগতিক হলে বাম রাজনীতিতে দীক্ষা নেয়ার দরকার ছিল না। সব হারিয়ে এক সময় প্রশ্ন ফাঁসের সত্যতা উপলব্ধি করলেন, সত্যকে মেনে নিয়ে প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পাঁচ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করলেন, বিদ্যমান আইন সংশোধনপূর্বক আরও কঠোর করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলেন, পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা হলে পরীক্ষা শুরুর আধঘণ্টা আগে উপস্থিতির ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আরোপ করলেন এবং পরীক্ষা চলাকালীন ফেসবুক বন্ধ রাখার চেষ্টাও করলেন। সব কিছুই করেছেন, কিন্তু তা জঙ্গিদের ক্ষেত্রে অবলম্বিত বিলম্ব পদক্ষেপের মতো। ফোঁড়টা সময় মতো না দিলে যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায় তার পুনরুদ্ধার আর হয় না।

লাখ লাখ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে খুব অল্প ছাত্রছাত্রী ফাঁস করা প্রশ্নের পেছনে ছুটছে। খারাপ লোকগুলো যখন প্রাপ্ত প্রশ্ন ছড়িয়ে দেয় তখন মেধাবী এবং মূল্যবোধে বলীয়ান ছাত্রছাত্রীরাও তাদের পরীক্ষা নিয়ে দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে, তাদেরও আগাম প্রশ্নপত্র পেতে ইচ্ছে করে। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, বিগত কয়েক বছর ধরে সংঘটিত প্রশ্ন ফাঁসের পেছনে কোন ধরনের বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য খুঁজে পায়নি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে গঠিত তদন্ত দল। বিস্মিত হতে হয় যখন ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে, মোবাইল ফোন নম্বর উল্লেখ করে প্রশ্ন ফাঁসের কথা জানানো হয়। এতে ধারণা হয়, প্রশ্নপত্র ফাঁস করার ক্ষেত্রে অন্য রাজনীতি রয়েছে। ফাঁস করা প্রশ্ন আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য গোপনে বিক্রি করার কথা। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে তারা অর্থের বিনিময়ে তা বিক্রি না করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর প্রশ্নপত্র ফেসবুকে আপলোড করা হচ্ছে; পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর ফেসবুকে দেওয়ার উদ্দেশ্যও বোধগম্য হয় না। ফেসবুকে দিয়ে বিনিময় মূল্য পাওয়ার কোন উপায় আছে বলে আমার জানা নেই। তাহলে নেটে দেওয়ার উদ্দেশ্যটা কী? পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর নেটে দেওয়া হলে পরীক্ষার্থীদের কী লাভ? অথবা পরীক্ষা আরম্ভ হওয়ার এক ঘণ্টা আগে পেলেই বা পরীক্ষার্থীরা কীভাবে লাভবান হয় তাও স্পষ্ট নয়। এই অল্প সময়ে প্রস্তুতি নেয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করে নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর নকল করার জন্য সঙ্গে করে পরীক্ষার হলে নেয়া সহজতর হতে পারে। পরীক্ষা হলে যদি অবাধে নকল করা সম্ভব হয় তাহলে ফাঁস করা প্রশ্নের দরকার কী, গোটা বই নিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকতে পারে।

তবে ফাঁস করা প্রশ্নপত্র দিয়ে স্বল্প সময়ে এমসিকিউ-এর সমাধান করা হয়তো সম্ভব। কিন্তু এমসিকিউতে এ পর্যন্ত কেউ খারাপ ফলাফল করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে এক্ষেত্রেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের খুব বেশি প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় না; কারণ পরীক্ষা হলে সবাই আলোচনা করে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর লিখে থাকে; এ ব্যাপারে হল পরিদর্শকগণ স্কুলের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করে থাকেন। অন্যদিকে রেজিস্ট্রেশনের সময় স্কুল থেকে মেধাবী ও কম মেধাবীদের এমনভাবে বিন্যাস করা হয় যাতে একজন মেধাবীর সঙ্গে আরেকজন কম মেধাবীর সিট থাকে। পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষার এমসিকিউ প্রশ্নোত্তর ইতোমধ্যে বাদ দেওয়া হয়েছে, অন্যান্য পরীক্ষায়ও তুলে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়েছে। ভিন্ন উদ্দেশ্যে যে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে তা আরেকটি ঘটনা থেকে অনুমিত হয়; প্রাথমিক শ্রেণির প্রশ্নপত্রও ফাঁস করে ফেসবুকে দেওয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার ফাঁস করা প্রশ্নের গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের কাছে কি সত্যিই আছে? আমি তো জীবনের প্রথম পরীক্ষার উত্তরপত্রে হুবহু প্রশ্ন লিখে দিয়ে এসেছিলাম। তাহলে প্রশ্নপত্র ফাঁস করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বা সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করাই কি মুখ্য উদ্দেশ্য? মানুষের ওপর রাজনীতির প্রভাব এত বেশি যে, সমাজের সব পেশার লোক দুই ভাগে বিভাজিত; এ বিভাজন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থেকে উদ্ভূত। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করার ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থকেও তুচ্ছ জ্ঞান করে থাকে। নতুবা শিক্ষকরা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে ছাত্রদের না দিয়ে ফেসবুকে দেয় কেন?

প্রশ্নপত্র ফাঁসরোধ করতে না পারায় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পদত্যাগের দাবি উঠেছে সংসদে। শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ একজন সজ্জন ব্যক্তি। তার রাজনৈতিক অঙ্গনে সক্রিয় পদচারণা শুরু হয় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে। তিনি ‘বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন’ এবং ‘ছাত্র ইউনিয়নের’ সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখা ছাড়াও তিনি অনেকগুলো বই লিখেছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে ভূমিকা ও অবদানের জন্য ‘ওয়ার্ল্ড এডুকেশন কংগ্রেস গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড’ পদকে তাকে ভূষিত করা হয়েছে। তার সততা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য এখনও শুনিনি। ঘুষ নেয়ার অভিযোগে তার দুই সহকর্মীর গ্রেফতার হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তার ব্যক্তিগত সহকর্মীর আচার-আচরণ স্টাডি করার ক্ষমতা মন্ত্রিমহোদয়ের থাকা উচিত ছিল। তার ব্যক্তিগত সততা আছে বলেই অসৎ কর্মকর্তার দুর্নীতির বিরুদ্ধে সভা-সমিতিতে জনসম্মুখে বলতে পারেন। যারা ঘুষ খায় তাদের প্রতিরোধ করা খুব সহজ নয়। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই সম্ভবত তিনি সহনশীল মাত্রায় ঘুষ খেতে বলেছেন। অবশ্য পরবর্তী ব্যাখ্যায় তিনি আট বছর পূর্বের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে ঘুষের মন্তব্যটি করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। আমার ধারণা, বর্তমান পরিবেশ নিয়ে করলেও খুব অপ্রাসঙ্গিক হতো না। সৎ এবং সাহসী না হলে এমন মন্তব্য করা সহজ নয়। তার এমন বক্তব্যে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। সমালোচকরা বলছেন, ঘুষ খাওয়া প্রতিরোধ না করে তিনি ঘুষ খাওয়ার ক্ষেত্রে প্রশ্রয় দিচ্ছেন। অবশ্য একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে এমন মন্তব্য ঘুষখোরেরাও প্রত্যাশা করে না। কিন্তু যারা এমন বলেন না তারা কি তাদের দফতরে ঘুষ খাওয়া বন্ধ করতে পেরেছেন? শিক্ষামন্ত্রীর জন্য দুঃখজনক হচ্ছে, বছরের প্রথম দিনে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর হাতে প্রায় ৩৬ কোটি বই তুলে দেওয়ার কৃতিত্ব ম্লান হয়ে যাচ্ছে শুধু প্রশ্ন ফাঁসের কারণে।

প্রশ্ন ফাঁসের জন্য দেশ রসাতলে যাচ্ছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মতো দেখি। আমিও এ ব্যাপারে দ্বিমত করি না। প্রশ্ন ফাঁসের জন্য শুধু যে লেখাপড়ার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের অনীহা জন্মাচ্ছে তা নয়, শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি সবার বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হচ্ছে। তবে এতে মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে মর্মে যে সব অভিমত বিভিন্ন পণ্ডিত ব্যক্তিরা দিয়েছেন তার সঙ্গে একমত হতে আমার মন সায় দেয় না। বিগত কয়েক বছরের মতো প্রশ্নপত্র যে ফাঁস হয়নি তার সঙ্গে নিশ্চয়ই কেউ ভিন্ন মত পোষণ করবেন না। বিগত কয়েক বছর যারা ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিয়েছে তাদের কেউ সম্ভবত এখনও কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেননি। আমরা তো আগেকার লোক; আমরা তো ফাঁস করা প্রশ্নে পরীক্ষা দিইনি। তাহলে বাড়িঘর, অফিস-আদালত সর্বত্র মূল্যবোধের এত অবক্ষয় দেখি কেন? ফাঁস করা প্রশ্ন দিয়ে পরীক্ষা না দিয়েও প্রতিটি পেশার লোকজনের মধ্যে এত ঘুষখোর, এত দুর্বৃত্ত জন্মালো কী করে? যারা ঘুষ খায়, চুরি করে, ফাঁস হওয়া প্রশ্ন নিজ সন্তানের হাতে তুলে দেয় তারাও প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে সোচ্চার।

প্রশ্ন ফাঁস রোধ করা একটু জটিল ও কঠিন। পাবলিক পরীক্ষাসমূহে লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর জন্য হাজার হাজার পরীক্ষাকেন্দ্রের প্রয়োজন। বহু পরীক্ষাকেন্দ্র দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন থেকে শুরু করে পরীক্ষার হলে বিতরণ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে বহু ব্যক্তির হাতে প্রশ্নপত্র ঘুরপাক খায়। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, কম্পোজ, মুদ্রণ ও প্যাকিংয়ে সংশ্লিষ্ট থাকেন ২৫০ জন; তাদের মোবাইল ফোন বহন করতে দেওয়া হয় না, ফটোস্ট্যাট করার সুযোগ রাখা হয় না, তাদের ওপর নিবিড় মনিটরিং বা পর্যবেক্ষণও থাকে। কিন্তু এই লোকগুলো যদি দলভিত্তিক সলাপরামর্শ করে প্রত্যেকে কমপক্ষে একটি করে প্রশ্ন মুখস্থ রাখতে পারে তা প্রতিহত করবে কীভাবে? এ কারণেই প্রশ্নপত্র মুদ্রণের প্রস্তাব আমি টাকশালের নির্বাহী প্রধান থাকতে গ্রহণ করিনি।

[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]

zeauddinahmed@gmail.com