আজকের (রবিবার, ০১ এপ্রিল ২০১৮) দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার কলাম।
স্বাজাতিক চিকিৎসা
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
বাংলাদেশে চিকিৎসক ও চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে সংবাদে ইতোমধ্যে কয়েকটি কলাম লিখেছি। কিন্তু প্রতিটি পেশার লোকজনের মধ্যে ভালো-মন্দের সংমিশ্রণ রয়েছে। একই উদ্দেশ্যে গঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও এমন পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। তাই কয়েকজনের নেতিবাচক আচার-আচরণকে সামান্যীকরণপূর্বক একই পেশার সকলের উপর আরোপ করার বিষয়টি সুবিবেচনাপ্রসূত নয়। আমাদের দেশে দুর্বলতার প্রচার হয় সর্বাগ্রে দ্রুততার সঙ্গে। আমাদের দেশে সেবামূলক প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি, দুর্বলতা আর অব্যবস্থাপনা নিয়ে জনগণ ত্যক্ত-বিরক্ত। তাই সমাজের সামগ্রিক দুরবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুধু হাসপাতাল এবং চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ বিচার্য ও গ্রাহ্য হবে কেন? আমাদের দেশে অসংখ্য চিকিৎসক আছেন যাদের প্রশংসা বিদেশে চিকিৎসার জন্য গেলে বিদেশি ডাক্তারের কাছে শোনা যায়। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আন্তর্জাতিক বহু প্রতিষ্ঠানও করেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনার, কর্মশালায় আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা রিসোর্স পারসন হিসেবে নিয়মিত আমন্ত্রিত হচ্ছেন এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।
একজন ফেসবুক বন্ধু তার ছেলের রোগের চিকিৎসায় ‘ফি’ না নেয়ায় প্রতিবেশী শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার স্বপন চৌধুরীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এমন বহু চিকিৎসক দেশের আনাচে-কানাচে পড়ে আছেন যারা নিজস্বার্থের কথা বিবেচনা না করে অন্যের স্বাস্থ্যসেবা নীরবে, নিভৃতে করে যাচ্ছেন। আমার পরিবারেই আমি তা দেখেছি। আমার আব্বা আমাদের এলাকায় একটি স্কুলের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষক ছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার, চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি ১৯২০ সনে এন্ট্রান্স পাস করার পর মোক্তারি পড়েছিলেন। তিনি হোমিওপ্যাথ পড়েছিলেন বলে আমার জানা নেই; তবে এলাকার গরিব, নিঃস্ব লোকদের বিনা-পয়সায় হোমিও ওষুধ দিতে দেখেছি। তিনি আঘাত পাওয়া আমাদের পোষা বিড়ালের চিকিৎসাও হোমিওপ্যাথ ওষুধ দিয়ে করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করার পর আমার সেজো ভাই ড. জহির উদ্দিন আহমেদকে সত্তরের দশকের প্রথমদিকে আমার আব্বা গ্রামের বাজারে একটি ঘরে বসে চিকিৎসা করতে বলেন। আমার ভাই বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রামে চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু একটি সাদা কাগজে লেখা ব্যবস্থাপত্রের জন্য টাকা দেওয়ার ব্যাপারে গ্রামের লোক তখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠেনি। গরিব আর নিঃস্বদের কাছ থেকে তিনি কোন ‘ফি’ নিতেন না। কিন্তু অপেক্ষাকৃত সচ্ছল ব্যক্তিরাও আত্মীয়-স্বজনের দোহাই দিয়ে ফি না দিয়ে চলে যেতেন। অনেকে ফি বাকি রাখতেন, বাকি ফি আদায় কখনো আর হতো না। আমাদের এলাকার একজন ফেসবুক বন্ধু লিখেছে যে, তার সাত বছর বয়সে একটি জটিল রোগ আমার ভাইয়ের দেওয়া দেড় টাকার একটি ওষুধে সেরে যায়। সে আরও লিখেছে, ‘জনাব জহির ভাইয়া সপ্তাহে একদিন জি, এম, হাটে চেম্বারে বসে ধনী, গরিব অসহায় পীড়িত সবার বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন।’ চিকিৎসা আয় থেকে জীবনধারণ সম্ভব না হওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ করতে শুরু করেন। কিন্তু টাকা পাচ্ছেন না বলে চিকিৎসা বন্ধ করেননি; হালচাষ বা ধানের চারা রোপণের সময় জমির আইলে বসে রোগী দেখেছেন।
আমাদের দেশের চিকিৎসকদের গুণগান গেয়ে আমার বন্ধুদের কয়েকজন ফেসবুকে পরোক্ষভাবে ইতিবাচক আরও মন্তব্য করেছেন। চিকিৎসকভেদে যে পার্থক্য রয়েছে তা স্পষ্ট করতে গিয়ে একজন লিখেছেন যে, তার মেয়ের গ্যাস্ট্রিক চরম অবস্থায় পৌঁছালে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের একজন প্রফেসর তার প্রেসক্রিপশনে ৬/৭ প্রকার ওষুধ দিয়ে কাঁচা কলা ও নরম ভাত ছাড়া আর কিছুই খাওয়া যাবে না বলে লিখে দিলেন। না খেয়ে মেয়ে আরও দুর্বল হয়ে গেলে ‘এম এন আলম স্যার’ শুধু একটি ট্যাবলেট দু’ভাগ করে সকালে বিকালে খেতে দিলেন এবং পছন্দমতো সব ধরনের খাবার খেতে বললেন; মেয়ে অল্পদিনে ভালো হয়ে গেল। আরেকজন লিখেছেন, ২০০১ সালে সিকদার মেডিকেল-এ চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরাও বকশিশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। মনোযোগ দিয়ে রোগী ও রোগের চিকিৎসা করার ক্ষেত্রে ড. বি চৌধুরীর প্রশংসা করেছেন একজন।
ড. বি চৌধুরীর রোগ নির্ণয়ের সঠিকতা নিয়ে আমারও একটি অভিজ্ঞতা আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রয়াত নির্বাহী পরিচালক হরিনারায়ণ মজুমদারকে ভুল চিকিৎসায় একজন চিকিৎসক যক্ষ্মার ওষুধ খাইয়ে প্রায় মেরে ফেলছিলেন, ড. বি চৌধুরী পরীক্ষা করে শুধু অ্যান্টাসিড ট্যাবলেট দিলেন এবং তাতেই তিনি ভালো হয়ে গেলেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে আমি আমার জ্যেষ্ঠ সহকর্মী সাবেক নির্বাহী পরিচালক মাহবুবুল ইসলামকে নিয়ে একজন ডাক্তারের চেম্বারে গেলে সব শুনে ডাক্তার সাহেব বললেন, রোগীর কোন সমস্যা নেই, যে রোগ তা কয়েকদিনের মধ্যে ওষুধ খেলেও সারবে, না খেলেও সারবে। তিনি কোন ‘ফি’ নেননি। কিন্তু রোগী এতে নাখোশ; রোগীর চেহারায় বিমর্ষ ভাব লক্ষ্য করে বাধ্য হয়ে ডাক্তার সাহেব কয়েকটি ভিটামিন লিখে দিলেন।
প্রয়াত শিশু বিশেষজ্ঞ ড. এম আর খান সম্পর্কে একটি মজার কথা শুনেছিলাম। আমাদের দেশের মায়েরা জোর করে শিশুদের খাওয়াতে অতি তৎপর থাকেন; না খেতে চাইলে জোর করে মুখে ঠেসে ধরে রাখেন। এমনি একজন মা তার দশ বছরের শিশুকে নিয়ে ডাক্তার এম আর খানের নিকট গেলেন। ‘কী হয়েছে ওর?’— ডাক্তারের এমন প্রশ্নের উত্তরে মা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, ‘স্যার ও কিছু খায় না।’ মায়ের কথা শুনে ডাক্তার সাহেব একটু হাসলেন, শিশুটির মোটাসোটা স্বাস্থ্যের দিকে পুনরায় তাকিয়ে মাকে বললেন, ‘আরেকটু কম খেলে শিশুটি স্বস্তি ও শান্তি পাবে।’
ফেসবুকে উল্লেখ করা হয়েছে বলে আমি কয়েকজন চিকিৎসকের নাম বললাম। সব ভালো চিকিৎসকের নাম লিখতে গেলে কয়েকশত পৃষ্ঠা লাগবে। এমন আরও অগণিত চিকিৎসক আছেন যাদের নিরলস পরিশ্রম, অনির্বচনীয় সততা, স্বজাত দায়িত্ববোধ, একনিষ্ঠ কর্তব্যপরায়ণতা আর রোগীবান্ধব মমত্ববোধ বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে বিদেশমুখিন মিছিলও কিন্তু খুব বড় নয়। কারণ যত অভিযোগই থাকুক না কেন, একটি দেশের জনগণ সম্পূর্ণ বিদেশি চিকিৎসানির্ভর হতে পারে না।
চিকিৎসকদের সংগঠন কিছুদিন পূর্বে সমর্থনযোগ্য একটি প্রতিবাদ করছে পাবনায়। পাবনা জেলার ডিসি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সহকারী পরিচালককে একজন চিকিৎসক পাঠাতে ফোনে বলা হলে সহকারী পরিচালক জেলা প্রশাসককে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পরামর্শ দেন। সহকারী পরিচালকের এ ব্যাপারে বক্তব্য হচ্ছে, হাসপাতালে তখন অতিরিক্ত চিকিৎসক ছিলেন না; এছাড়াও পরীক্ষার জন্য রোগীর হাসপাতালে আসা রোগীর স্বার্থে শ্রেয়। জেলা প্রশাসকের আদেশমত তার বাসা বা অফিসে গিয়ে চিকিৎসা প্রদানের বিরুদ্ধ কথা বলাতে সহকারী পরিচালককে ওএসডি করা হয়েছিল। এখানে কার দায় কতটুকু তা নির্ধারণ খুব কঠিন নয়। সিভিল সার্জন জেলা প্রশাসকের অসুস্থতার গুরুত্ব অনুধাবন করে একজন চিকিৎসক নিয়ে ঠিকই জেলা প্রশাসকের বাংলোতে উপস্থিত হয়ে পরীক্ষা করেছেন। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের জন্য চিকিৎসক পাঠানো হলে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের সাধারণ রোগীর হয়তো দুর্ভোগ হতো, কিন্তু সহকারী পরিচালককে ওএসডি হতে হতো না।
কিছুদিন পূর্বে ‘সংবাদ’-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘অপ্রয়োজনীয় সিজার স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায় প্রসূতি ও নবজাতকের’। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে অপ্রয়োজনে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ছে। সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এক প্রশ্নের জবাবে স্বীকার করেছেন যে, সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সিজারিয়ান ডেলিভারির সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞদের অভিমত হচ্ছে, স্বাস্থ্যগত কারণে নয়, ব্যবসার জন্যই অনেক অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ান করা হয়। কিন্তু শিক্ষিত রমণীদের অধিকাংশই আজকাল স্বেচ্ছায় সিজারিয়ান প্রসব পছন্দ করে থাকেন এবং তাদের ইচ্ছায় অধিকাংশ সিজারিয়ান প্রসব হয়। কিন্তু গর্ভবতী মায়ের গোপনে বলা কথাটি চাউর হয় না বলে এক্ষেত্রেও দোষটা পড়ে চিকিৎসকের উপর।
বাংলাদেশের মতো এত জনবহুল একটি দেশে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারি হাসপাতালের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু জনবহুল একটি দেশের সকলের চিকিৎসা শুধু সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধ সম্পদ আর সীমিত শয্যাসংখ্যা দিয়ে সম্ভবও নয়। দ্বিতীয়ত, মুক্তবাজার অর্থনীতির করালগ্রাসে সরকারের কব্জায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করা অযৌক্তিকও বটে। তাই চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত উদ্যোগে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চিকিৎসা দান অস্বীকার করার উপায় নেই; এই সকল বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোগী স্বাস্থ্যসেবা নিচ্ছে এবং কোন কোন ক্লিনিক সততার সঙ্গে জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
অনেক উন্নত দেশেও সঠিক সময় যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া যায় না। ইউরোপের বহু দেশে জরুরি না হলে চিকিৎসকের সাক্ষাতের জন্য কয়েক মাস পূর্বে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। তবে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব দেশের সব সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বগুলোর একটি হলো সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। আশার কথা, আমাদের দেশে ইউনিয়ন ও উপজেলাভিত্তিক সরকারি স্বাস্থ্যসেবার একটি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবায় সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা গেলে চিকিৎসাক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান সম্ভব।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com