দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার আজকের (রবিবার, ১১ মার্চ ২০১৮) কলাম
মৃত্যুঞ্জয়ী জাফর ইকবাল
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক, পদার্থবিদ, শিক্ষাবিদ, বৈজ্ঞানিক—এমন বহুবিধ বিশেষণ বা অভিধায় বিভূষিত করা যায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালকে। কল্পকাহিনীর উপন্যাস লিখে তিনি এখন বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার শীর্ষে। তার প্রয়াত বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে সুপরিচিত; প্রতিকূল পরিবেশে ‘রাজাকার’ শব্দটি যখন বিলীন হয়ে যাচ্ছিল ঠিক তখনই নাটকের একটি পাখির চরিত্রে ‘তুই রাজাকার’ সংলাপটি দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ আবার তা জাগিয়ে তোলেন। রম্য ম্যাগাজিন উন্মাদের সম্পাদক, কার্টুনিস্ট ও সাহিত্যিক আহসান হাবীব তার ছোট ভাই। তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ফয়জুর রহমান ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা; মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তার বাবাকে পাকিস্তানি আর্মিরা গুলি করে হত্যা করে। তার মাও লেখালেখি করতেন। তার স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হকও শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তার দুটি সন্তান পৃথিবীর সেরা দুটি বিশ্ববিদ্যালয়—যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনলজি এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কারের তিনি ভূষিত হয়েছেন। এমন পরিবারের বিদ্বান লোকটি আমেরিকার একটি আকর্ষণীয় চাকরি ছেড়ে দিয়ে তার মাথা ও ঘাড়ে মাদরাসা পড়ুয়া এক ফেরিওয়ালা যুবকের ছুরির কোপ খাওয়ার জন্য দেশে চলে এলেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিকাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং উৎসবের সমাপনী অনুষ্ঠান চলাকালে ৩ মার্চ, ২০১৮ তারিখ বিকেলে মুহম্মদ জাফর ইকবালকে পেছন থেকে ছুরিকাঘাত করা হয়। মুক্তমঞ্চের তখনকার ছবিতে জাফর ইকবালের পেছনে পুলিশ ও কয়েকজন যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। এ দাঁড়িয়ে থাকাটা স্বাভাবিক; মঞ্চে দাঁড়ানোর প্রাধিকার নিয়ে রাজনৈতিক দলীয় সভায় শুধু যুবক নয়, প্রবীণদের মধ্যেও মারামারি হয়ে থাকে। সম্ভবত পুলিশের ধারণা ছিল, পেছনে দাঁড়ানো যুবকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাধর ছাত্র, এদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেও অপমানিত হতে হবে। কারণ কয়েকদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল; ভুলে রেখে যাওয়া মোবাইল ফেরত নিতে আসা ছাত্রের পরিচয় জিজ্ঞেস করায় দোকানদারের কর্মচারীকে বেধড়ক মার খেতে হয়েছিল।
বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ও কিশোর উপন্যাসগুলোর জন্য জাফর ইকবাল নবীন প্রজন্মের কাছে অসাধারণ জনপ্রিয় একজন লেখক।
তিনি নবীনদের দেশমাতৃকাকে ভালোবাসতে উজ্জীবিত করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে উদ্বুদ্ধ করেছেন, ভালো নাগরিক হওয়ার জন্য তিনি বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ শুনে তা মনেপ্রাণে অনুভব করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
ফেসবুক, টুইটার প্রভৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট করতে তিনি শিক্ষার্থীদের নিষেধ করেছেন। মা, বাবা পাঠ্যবই বহির্ভূত বই পড়তে না দিলে রাতে টর্চলাইট জ্বালিয়ে গোপনে বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ‘প্রশ্ন ফাঁস মানি না, মানব না’ লিখা একটা প্লাকার্ড নিয়ে শহীদ মিনারে একাকী বসে থেকেছেন।
রাজনৈতিক সচেতনতা, দেশাত্মবোধ হচ্ছে তার অহংকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বহুদিন থাকার পর একদিন তার মনে হলো তিনি এদেশের বর্ষাকাল মিস করছেন, বর্ষাকালের ব্যাঙের ডাক তিনি শোনেন না বহুদিন; এমন দেশাত্মবোধ থেকেই তিনি দেশে ফিরে এসেছেন। জাফর ইকবাল নবীন, প্রবীণ সবার কাছে জনপ্রিয় হলেও তিনি একজন বেশি গালি শোনা মানুষ। স্বাধীনতাবিরোধী ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে প্রগতিশীল, বিজ্ঞানভিত্তিক চিন্তাধারার প্রকাশে সাহস দেখিয়েছেন বলে জাফর ইকবাল বিভিন্ন সময় প্রতিক্রিয়াশীলদের রোষানলে পড়েছেন। তিনি অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো জ্ঞানীর ভাব নিয়ে দেশের সমস্যায় নির্লিপ্ত থাকেননি; প্রতিটি সমস্যায় নিজেকে সরাসরি সংশ্লিষ্ট করেছেন। অনেক বুদ্ধিজীবী দেশের সমস্যা-সঙ্কুল বিপদে দূরে অবস্থান করে নিরপেক্ষতার ভান করে সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকেন। জাফর ইকবাল তা কখনো করেননি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বলায় তিনি শত্রু হয়েছেন প্রতিক্রিয়াশীলদের, বিজ্ঞানের কথা বলায় তার প্রতিপক্ষ হয়েছে ধর্মান্ধরা, যুক্তির চর্চা করায় মারমুখী হয়েছে সংস্কৃতিবিমুখ অর্ধশিক্ষিতরা, মুক্তকণ্ঠে সেক্যুলারের কথা বলায় বিরূপ হয়েছে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী, তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়েছেন সগোত্রীয় বুদ্ধিজীবীরা, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জাগ্রত রাখার তার সযত্ন প্রয়াসে ক্ষেপেছে স্বাধীনতাবিরোধীরা। প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় চরম বিতৃষ্ণায় তাকে অসত্য কথনের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছে, রাজাকারের শাস্তি দাবি করে গণজাগরণ মঞ্চে বক্তব্য রাখায় সাদা কাফনের বার্তায় মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হয়েছে আর সমন্বিত ভর্তি-পরীক্ষার কথা উচ্চারণ করে স্বজাতি শিক্ষকদের নিকট হয়েছেন নিন্দিত। তাই তার মাথা, ঘাড়ে ছুরির ঘা পড়াটা খুবই স্বাভাবিক। অন্যান্য অনেক বুদ্ধিজীবীর মতো সমাজ, দেশ নিয়ে নির্জীব, নির্লিপ্ত থাকলে এ বর্বর আক্রমণ হয়তো হতো না।
অদ্ভুত এ দেশ, বিস্ময়কর এ দেশের মানুষ। ধর্মান্ধ ফয়জুরের মতো এদেশের লোকগুলো ধর্মবিরুদ্ধ সুদখোরকে কিছু বলে না, দুর্নীতিকে লালন করে, ক্রনিক ঋণখেলাপীকে মান্য করে, চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসী, ছিনতাইকারীদের ভয় করে, ঘুষখোরদের সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দাওয়াত করে; অথচ দেশের সুখে-দুঃখে যিনি জনতার কাতারে থেকে জাতীয় সমস্যার স্বপ্রণোদিত সমাধান দিতে কার্পণ্য করেননি তাকে মারার জন্য ছুরি হাতে ছুটে যায়।
প্রফেসর জাফর ইকবাল এবং তার স্ত্রী প্রফেসর ড. ইয়াসমিন হককে বহুদিন যাবৎ হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ফয়জুরও নাকি দীর্ঘদিন যাবৎ জাফর ইকবালকে মারার জন্য সুযোগ খুঁজছিল। মুক্তিযুদ্ধকালীন যেভাবে রাজাকার, আলবদরেরা তালিকা করে বুদ্ধিজীবীদের কতল করেছে, এখনকার জঙ্গিরাও কাকে কাকে মারতে হবে তার তালিকা তৈরি করেছে। ঐ তালিকার শীর্ষে জাফর ইকবালের নাম আছে। ২০১৬ সনে জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হকের মোবাইল ফোনে যে এসএমএস আসে তাতে লেখা ছিল, ‘Welcome to our new top list! your breath may stop at any time.’ (আমাদের শীর্ষ তালিকায় আপনাকে স্বাগতম, আপনার নিঃশ্বাস যে কোন মুহূর্তে থেমে যেতে পারে)। অন্যদিকে জাফর ইকবালের মোবাইল ফোনে আসা এসএমএসে লেখা ছিল ‘hi unbeliever! we will strangulate you soon.’ (হাই অবিশ্বাসী! আমরা শীঘ্রই আপনার কণ্ঠরোধ করব)।
হামলাকারী ফয়জুর রহমান নিজেকে মাদরাসার ছাত্র বলে পরিচয় দিলেও সে তার নিজ গ্রামে মাঝে মাঝে গিয়ে লুঙ্গি, গামছা ফেরি করে বিক্রি করত। একটি কম্পিউটার দোকানেও কিছুদিন সে কাজ করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জিজ্ঞাসাবাদে হামলাকারী বলেছে, ‘জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু। তাই তাকে হত্যার উদ্দেশে হামলা করেছি।’ এছাড়াও ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ নামক উপন্যাস লিখে নবীকে ব্যঙ্গ করায় তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে হামলাকারী।
‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ বইটি ফয়জুর পড়েছি কি না সন্দেহ; কারণ অনেকে কিছু না জেনে বিনা কারণেও সবার সঙ্গে রাস্তায় লোক পিটায়। একটি ভিডিও ক্লিপে একজনকে জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়ে মাইকে বক্তৃতা দিতে দেখলাম; তিনি বলছেন, ‘কুলাঙ্গার জাফর ইকবাল যে অবমাননা করেছে, কটূক্তি করেছে’; পাশ থেকে একজন এ বক্তাকে জিজ্ঞেস করলো, ‘ভাই, জাফর ইকবাল কী কটূক্তি করেছে?’ বক্তা বললো, ‘উনি আমার নেতার বিরুদ্ধে... আসল বিষয়টা ভাই জানি না’। ফেসবুকেও এমন না জানা লোকের অজস্র বক্তব্য। ‘ভূতের বাচ্চা সোলায়মান’ বইটি ছোট ছোট শিশুদের নির্মল আনন্দ দানের উদ্দেশ্যে লেখা। ‘প্রেতসাধনা’ নামে একটি বই পড়ে কয়েকজন কিশোরী বদ্ধ ঘরে গোল হয়ে ‘ওরোন ওরাহ হিরাক্ট গিম্বা লান’ মন্ত্র পড়ে ভূত আনে। বড় ভূতে ভয় পাবে বিধায় তারা যুক্তি করে একটি বাচ্চা ভূতকে ডাকে। যে ভীতু বাচ্চা ভূতটির আগমন হয় তার নাম সোলায়মান। এ শিশু ভূত সোলায়মান, বইতে আঁকা ছবি দেখে আনন্দ পায়, নিজে ছবি আঁকে। মন্ত্র পড়ে আনা এই ভূত আম্মুর কাছে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে এবং দুইদিন পর ভূতের বাচ্চাটি মায়ের হাত ধরে চলেও যায়। এখানেই গল্পের পরিসমাপ্তি। বাস্তব জগতে হাজার হাজার লোকের নাম সোলায়মান; কত উপন্যাস, নাটক, সিনেমায় সোলায়মান নামের চরিত্র দেখেছি। এক্ষেত্রে ধর্মের কী অবমাননা হলো তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়। আমি যে ভিডিও ক্লিপের কথা প্রথমে উল্লেখ করেছি সেখানে বক্তা সম্ভবত জাফর ইকবালকে ভালো করে চেনেই না, জাফর ইকবালের বিরুদ্ধে কেন বক্তৃতা দিচ্ছে তাও সে জানে না। এটাই হচ্ছে ধর্মান্ধতা। ভিডিও ক্লিপের বক্তা আর ফয়জুরের মধ্যে এক্ষেত্রে কোন পার্থক্য নেই— দুজনই প্ররোচিত, প্রভাবিত, অন্ধ।
যে ফয়জুর ধর্ম অবমাননার জন্য জাফর ইকবালকে আক্রমণ করেছে সে ফয়জুরের নামাজ পড়ার তালিকা নিয়ে তার গ্রামের মসজিদের ইমাম ও গ্রামের সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে ফয়জুরের ঝামেলা হয়। ফয়জুর সালাফি মতাদর্শের বলে সে মসজিদে ভিন্ন তরিকায় নামাজ আদায় করত। আমাদের এলাকায় সুন্নি ব্যতীত অন্য কোন তরিকাকে এক সময় সহ্য করা হতো না, টুপি পরার ভিন্নতা দেখে এদের চিহ্নিত করে সুন্নিরা অপমান করত। গ্রামের মুরব্বিরা তদ্রূপ ফয়জুরকে ডেকে সুন্নি কায়দায় নামাজ পড়ার পরামর্শ দেয়, কিন্তু সে তা মানেনি। মানুষ সত্যিই অদ্ভুত; ফয়জুরের ধর্মাচার নিয়ে যেখানে ইমাম সাহেব ও মুরব্বিরা একমত নন, সে ফয়জুর আবার অন্যের ধর্ম অবমাননায় ক্ষেপে উঠে।
মুহম্মদ জাফর ইকবালের ওপর জঙ্গি হামলার পর রাজনৈতিক দল দুটি যেভাবে পরস্পরকে দোষারোপ করে বিবৃতি দিচ্ছে তাতে মনে হয় তাদের বিবেচনায় আমজনতা অন্ধ, বোবা, কালা। আমাদের বোধশক্তি বা জ্ঞান-গরিমার ওপর রাজনৈতিক নেতাদের কোন ভরসাই নেই, তারা ধরেই নিয়েছে আমরা কিচ্ছু বুঝি না। এ দুটি দল পরস্পর পরস্পরকে জঙ্গির পৃষ্ঠপোষক, চক্রান্তকারী বলে জঙ্গি ইস্যুটির গুরুত্ব কমিয়ে দিচ্ছে। তাদের পানি ঘোলা করার পারস্পরিক দোষারোপে মনে হচ্ছে, এই দল দুটির ঘোলা করা পানিতে পরিশেষে মাছ শিকার করবে জঙ্গিরাই। জাফর ইকবাল বেঁচে গেলেন সত্য, কিন্তু মরে গেল অগণিত মেধাবী মুসলিম ছাত্রের উচ্চশিক্ষার বাসনা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ড. জাফর ইকবাল একজন সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব; তার ওপর আক্রমণে বিদেশ-বিভূঁয়ে বাঙালি মুসলমানের গমনাগমন কণ্টকাকীর্ণ হয়ে গেল।
(লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক)
zeauddinahmed@gmail.com