আজকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত আমার কলাম।
শিরচ্ছেদে জল্লাদের অভাব
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
আমার এক খালাতো ভাই দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে আছে; তার স্ত্রী এবং মেয়েরাও তার সঙ্গে সৌদি আরবে থাকে। দেশে এলে বা ফোনে সে সব সময় সৌদি আরবের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তার একটি দোকান আছে ওখানে। তার কথামতো সৌদি আরবের লোকেরা এত সৎ যে, আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব দোকানদার দোকান খোলা রেখে নামাজ আদায় করতে মসজিদে চলে যান; দোকান খোলা থাকলেও কেউ চুরি-চামারি করে না। সৌদি আরব সম্পর্কে আরেকটি অহংকার তার রয়েছে এবং তা হলো প্রকাশ্যে হাতকাটা ও শিরচ্ছেদ। সে শুক্রবারে জুমার নামাজের পর শিরশ্ছেদ দেখার আনন্দ উপভোগ করে। শিরশ্ছেদের সময় দর্শকরা তালি দেন। যে তালি দেন না তার প্রতি সবাই ধিক্কার দেন। খালাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, সৌদিরা সৎ হলে, চুরি-ডাকাতি না থাকলে প্রতি শুক্রবারে হাতকাটা বা শিরচ্ছেদের প্রয়োজন হয় কেন? তার কথামতো এসব শাস্তি নাকি বহিরাগতদের অপরাধের কারণে দেওয়া হচ্ছে। আমি দীর্ঘ ২০ বছর শুধু তার কথা শুনছি আর বিশ্বাস করে চুপ করে আছি।
ইউরোপের সংস্পর্শে আসার পূর্বে তুরস্কেও প্রকাশ্যে প্রচুর শিরচ্ছেদ হতো; ‘সুলতান সুলেমান’ যারা টেলিভিশনে উপভোগ করছেন তারা এ শিরচ্ছেদ দেখতে দেখতে শিহরিত হচ্ছেন কি না জানি না। তুর্কি খেলাফত থেকে মক্কা, মদিনা হাতছাড়া হলে ওয়াহাবি মতবাদের ধর্মীয় শুদ্ধি অভিযানের অজুহাতে সেখানে শুধু বহু মুসলমানকে হত্যা করা হয়নি, সৌদি রাজতন্ত্র বহু সাহাবীর কবরস্থানও ধ্বংস করেছে। তুর্কি খেলাফত আবার এ দুটি অঞ্চল দখল করে নিয়ে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন সৌদ ও তার দুই ছেলেকে বন্দী করে ইস্তাম্বুলে নিয়ে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ করে। প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত জিয়াউল হকের জামানায় পাকিস্তানে দেখেছি; ‘হুদুদ’ আইন তার আমলে চালু হলেও আজ পর্যন্ত সম্ভবত পাকিস্তানে এ আইনে প্রকাশ্যে হাতকাটা বা পাথর মেরে অপরাধীর শাস্তি বিধান করা হয়নি।
আমার ধারণা, এক সময় আমরা পররাষ্ট্রনীতিতে সৌদি আরবকে অনুসরণ করতাম। শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, ধর্মীয় ব্যাপারেও তাদের অনুসৃত নিয়ম-পদ্ধতি আমাদের দেশের সাধারণ জনগণকে প্রভাবিত করত, তাদের অনুসরণে আমাদের অনেক অঞ্চলে একই দিন ঈদের নামাজ পড়া হয়। আমাদের নবী করিম (সা.)-এর জন্ম এ সৌদি আরবে এবং আমাদের হজ করতে হলে সৌদি আরবে যেতে হয়। তাই আমরা যারা মুসলমান তাদের কাছে সৌদি আরবের একটি আলাদা মর্যাদা রয়েছে।
বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ কর্তৃক ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত এ সৌদি রাজত্ব। এ ৮৫ বছরে শাসন করেছেন ছয়জন বাদশাহ। এরা সবাই বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের সন্তান। দেখা যাচ্ছে, ৮৫ বছর ধরে শাসনক্ষমতা ভাইদের মধ্যে আবর্তিত হয়েছে। সম্প্রতি আরেক প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলো। এবার ভাইদের ক্ষমতা না দিয়ে ছেলেকে উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা হয়েছে। বর্তমান বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ নিজের ছেলে ৩২ বছর বয়সী মুহাম্মদ বিন সালমানকে সৌদি আরবের নতুন ক্রাউন প্রিন্স ঘোষণা করেছেন। সৌদি আরবের উত্তরাধিকার নির্ধারণ কমিটির ভোটাভুটিতেও মোহাম্মদ বিন সালমান বিজয়ী হয়েছেন। ফলে বর্তমান বাদশাহর মৃত্যুর পর এই যুবরাজ উত্তরাধিকারসূত্রে রাজ্য শাসনের দায়িত্বও পেয়ে গেলেন। আইনের ডিগ্রিধারী এ যুবরাজ সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন বিষয়ক কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করছেন। তিনি আবার সৌদি রয়েল কোর্টেরও প্রধান।
সৌদি আরব বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় বিশগুণ বড়। আলজেরিয়ার পরে আরব বিশ্বে সৌদি আরব দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তবে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চলই মরুভূমি। দেশটিতে ২ কোটি ৮৭ লাখ লোক থাকলেও ৮৭ লাখ অন্যান্য দেশ থেকে কাজের জন্য আগত। পৃথিবীর এক নম্বর তেল উৎপাদনকারী ও রফতানিকারক দেশ সৌদি আরব এবং পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম হাইড্রোকার্বন মজুদ রয়েছে এ দেশে। তেল বিক্রির প্রচুর অর্থ শুধু দেশের উন্নয়নে নয়, সামরিক খাতেও ব্যয় হচ্ছে। সামরিক খাতে অধিক খরচ বিবেচনায় আমেরিকা, রাশিয়া, চীনের পরেই সৌদি আরবের অবস্থান। কিন্তু সৌদি আরব ব্যতীত অন্য দেশগুলো নিজেদের অস্ত্র নিজেরাই তৈরি করে থাকে, সৌদি আরব ওদের তৈরি অস্ত্র তেল বিক্রির টাকা খরচ করে সংগ্রহ করে থাকে। সৌদি আরবের আশপাশের সবগুলো দেশ মুসলমানদের। ইহুদিদের একটি দেশ আছে বটে, কিন্তু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার প্রতিশ্রুতি লিখিতভাবে ব্রিটেনকে দিয়েছিল সৌদি আরব। ১৯১৭ সনের ব্যালফোর ঘোষণা মোতাবেক ফিলিস্তিনে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার পূর্বে ব্রিটিশরা সৌদি রাজা আবদুল আজিজের কাছ থেকে লিখিত যে সম্মতিপত্র আদায় করে নিয়েছিল তাতে লেখা ছিল, ইহুদি বা অন্য কাউকে ব্রিটিশ সরকার ‘ফিলিস্তিন’ দান করলে তাতে তার কোন ধরনের আপত্তি থাকবে না। তিনি নাকি ওই সম্মতিপত্রে আরও লিখেছিলেন, ‘আমি কিয়ামত পর্যন্ত ব্রিটিশ সরকারের অভিমতের বাইরে যাব না।’
সৌদি আরব ইসলামী আইন দ্বারা পরিচালিত হলেও ইসলামিক রাষ্ট্র নয়। ১৯৩৪ সালে রাষ্ট্রটির নাম দেওয়া হয় ‘কিংডম অব সৌদি আরবিয়া’। ব্যক্তির নামে রাষ্ট্র। এ সৌদি পরিবারে ১৫ হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছে; এর মধ্যে শুধু দুই হাজার সদস্য রাজক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। প্রথম বাদশাহ আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ বহু বিয়ে করেছিলেন; তার সন্তান সংখ্যা প্রায় একশ’। সৌদ বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের ১১৫ জন সন্তান ছিল। পরবর্তী বাদশাহ ফয়সাল বিন আবদুল আজিজের ১৯ সন্তান। এ দেশে কোন রাজনৈতিক দল নেই বা রাজা-বাদশাহ পরিবর্তনে নির্বাচনের কোন ব্যবস্থাও নেই।
ওয়াহাবীজমকে অবলম্বন করে এ রাজতন্ত্র ও রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজ ওয়াহাবী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ বিন ওয়াহাবের মেয়েকে বিয়ে করেন। ওয়াহাবী শ্বশুরের সহায়তায় এ আবদুল আজিজ শিরক-বিদাত উচ্ছেদের নামে তুর্কি খিলাফতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ইরাক দখল করে হজরত আলী (রা.) ও হজরত হুসেন (রা.)-এর মাজার শরিফ ভেঙে ফেলেন। এজন্য একজন শিয়া মুসলিম বাদশাহ আবদুল আজিজকে আসরের নামাজরত অবস্থায় হত্যা করেন।
যে সৌদি আরবে ইসলামিক আইন-কানুনের কঠোর বাস্তবায়ন হচ্ছে, যেখানে মেয়েরা কোন পুরুষ বা অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া কোথাও যেতে পারেন না, যে দেশে মেয়েরা গাড়ি চালানোর লাইসেন্স পান না, যে দেশে অপরাধের জন্য প্রায় প্রতি শুক্রবারে হাতকাটা বা প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ হয় সেই দেশের লোকজন ও রাজপরিবারের সদস্যরা কীভাবে নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লেন? আমার খালাতো ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে না। একজন রমণীকেও দুর্নীতির অভিযোগে আটক করা হয়েছে। যে দেশে হিজাব ছাড়া ছবি তোলায় এক নারীকে হত্যা করে মৃতদেহ কুকুর দিয়ে খাওয়ানোর দাবি তোলা হয়েছে সেই সৌদি আরবের মেয়েরাও দুর্নীতি করে?
বর্তমানে দুর্নীতি দমন নামে যুবরাজের নেতৃত্বে যে অভিযান চলছে তাতে রাজপরিবারের অনেকে আটক হয়েছেন। সৌদি আরবের অ্যাটর্নি জেনারেলের মতে, গত ৩ বছর ধরে চালানো তদন্ত অনুযায়ী দেশে কমপক্ষে ১০ হাজার কোটি ডলার বা ৮ লাখ কোটি টাকার দুর্নীতি হয়েছে। আমাদের অর্থমন্ত্রীর এ বছরের সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের হিসেবে বাংলাদেশের ২ বছরের ব্যয় সৌদি আরবের উক্ত দুর্নীতির অর্থ দিয়ে নির্বাহ সম্ভব।
দুর্নীতি দমনের নামে এ ধরপাকড়কে অনেকে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের প্রকাশ্যরূপ বলে অভিহিত করলেও সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতারা এর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ধর্মীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত কাউন্সিল আবার আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো টুইট করে বলেছে, ‘দুর্নীতি দমন অভিযান সৌদি আরবের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মতোই গুরুত্বপূর্ণ।’
মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের ধর্মভীরু বলে মনে হলেও বাস্তব চিত্র কিন্তু ভিন্ন। সৌদি রমণীরা আপাদমস্তক ঢেকে রাখেন বলে রাস্তায় বিদেশি রমণীদের দেখলে হঠাৎ পাশে গাড়ি থামিয়ে উত্ত্যক্ত করা সৌদি পুরুষদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এরা গৃহাভ্যন্তরে আরও কদর্য আচরণ করে থাকেন। সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশের মেয়ের বক্তব্য থেকে সৌদিদের ধর্মীয় লেবাসের আড়ালের কদাকার চিত্র ফুটে উঠেছে। মেয়েটি পালিয়ে ফেরত আসার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হলে সে বলল, ‘আমি তো দেহ ব্যবসা করতে যাইনি। আমি তো গেছি কামের জন্য, কাম করমু, ভাত খামু, পয়সা ইনকাম কইরা পোলাপান মানুষ করমু। কষ্টের লাইগা গেছি।’
মনে হচ্ছে, এরা সব নোংরামিই বিশ্ববাসীর নজর থেকে ভণ্ডামির আড়ালে এতকাল করে আসছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সুলতান সৌদি সমাজকে বিশ্বের আধুনিক রীতিনীতির সংস্পর্শে আনার চেষ্টা করছেন। নতুন ফরমান মোতাবেক অভিভাবকের অনুমতি ছাড়াই মেয়েরা আগামী বছর থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন, স্টেডিয়ামে গ্যালারিতে বসে নারীরা খেলা উপভোগ করতে পারবেন। ইতোমধ্যে সৌদি মেয়েরা ভোটার হয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ভোটে জিতেছেনও। একজন ললনা তো আমেরিকা থেকে বক্সিংয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে সৌদি আরবে তা মেয়েদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কয়েকজন রমণী একটি অজ্ঞাত স্থানে গিয়ে অ্যালকোহলের স্বাদে ব্যান্ডের তালে তালে নর্তনও করেছেন।
নভেম্বরে সৌদি সরকার একটি রাজ ডিক্রি জারি করে বলে যে, ‘দুর্নীতির মূল উৎপাটন না করতে পারলে এবং দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা না গেলে মাতৃভূমির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যাবে না।’ কট্টরপন্থি সৌদিতে যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সুলতান আরও মডারেট ও সহনশীল ইসলামিক ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু ইসলামিক ব্যবস্থা কঠোর বা সহনশীল করার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি কি কারও মর্জির ওপর নির্ভর করে? তিনি কি প্রকাশ্যে হাতকাটা বা শিরচ্ছেদের পরিবর্তনও আনবেন? তাকে এক্ষেত্রে পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হবে বলে মনে হয় না; কারণ সম্প্রতি পত্রিকায় দেখলাম, প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদের জন্য জল্লাদ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই শুধু জল্লাদের অভাবে প্রকাশ্যে শিরচ্ছেদ বন্ধ করার কথা ভাবছে সৌদি সরকার।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
ঢাকা, রবিবার, ২৮ জানুয়ারী ২০১৮
zeauddinahmed@gmail.com