বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে নিরন্তর প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সনে শান্তিতে নোবেল পেয়েছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার জোট সংগঠন ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু অ্যাবোলিশ নিউক্লিয়ার উইপনস’ (আইসিএএন বা আইক্যান)। পুরস্কার ঘোষণা দেওয়ার অনুষ্ঠানে নরওয়েজীয় নোবেল কমিটি উল্লেখ করেছে যে, বর্তমান বিশ্বে পারমাণবিক সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেছে; যে কোন ধরনের পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার মানবিক যে বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে তার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণে সংস্থাটির কাজের জন্য এবং এ ধরনের অস্ত্রের বিরুদ্ধে একটি চুক্তিভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে উদ্ভাবনীমূলক প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে সংস্থাটিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।

সুইডিশ বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের ৩৫৫টি উদ্ভাবনের মধ্যে ডিনামাইট ছিল উল্লেখযোগ্য। এই ডিনামাইট আবিষ্কার করে আলফ্রেড নোবেল প্রচুর আয় করেন, আর এই আয়ের অর্থ দ্বারাই তিনি পুরস্কার প্রদানের কথা বলে যান। বিস্ফোরক ঘটানোর এই উদ্ভাবনটির ধ্বংসের ভয়াবহতা দেখে আলফ্রেড নোবেল শঙ্কিত হয়ে উঠেন। এই শঙ্কা থেকে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেন এবং যারা এ লক্ষ্যে কাজ করবে তাদের পুরস্কৃত করে উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি নোবেল জীবিত থাকতেই উইল করে নিশ্চিত করে যান।

ধ্বংসাত্মক ডিনামাইটের আয় দিয়ে শান্তির নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলেও বর্তমানে এই পুরস্কার বিশ্বে শান্তি স্থাপনে ব্যক্তি, সংস্থাকে কিছুটা হলেও অনুপ্রাণিত করছে। এ পুরস্কার পেয়েছেন মার্টিন লুথার কিং, শাখারভ, মাদার তেরেসা, নেলসন ম্যান্ডেলা, কৈলাস সত্যার্থীর মতো সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বরা। তবুও এই পুরস্কারকে ঘিরে অনেক বিতর্ক। সাহিত্য, রসায়ন, পদার্থ, চিকিৎসা, অর্থনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কারো অবদান নির্ণয়ের মাপকাঠি বা আধার থাকে; কিন্তু শান্তিতে অবদান পরিমাপের সব সময় বাহ্যিক অবয়ব থাকে না। তাই শান্তিতে নোবেল প্রদানে যত বিতর্কের অবতারণা হয়েছে অন্য খাতে তত হয়নি। এক্ষেত্রে নোবেল কমিটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হওয়ার অভিযোগ অন্যতম। তাদের বিরুদ্ধে ইউরোপপ্রীতির অভিযোগও রয়েছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগ কোন কোন ক্ষেত্রে সত্য বলে প্রতিপন্নও হয়েছে।

জার্মানির লেখক কার্ল ফন অসিয়েতস্কির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতারণা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ১৯৩৫ সনে তাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়ায় সমালোচনার শুরু হয়। ১৯৪৫ সনে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য কর্ডেল হালকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়; অথচ যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব থাকাকালীন তার সিদ্ধান্তে ১৯৩৯ সনে ৯৫০ জন ইহুদিকে জার্মানিতে ফেরত পাঠানো হলে হিটলারের নির্যাতন ক্যাম্পে তাদের অনেককে মেরে ফেলা হয়।

যুদ্ধবাজ কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জারকে ১৯৭৩ সনে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে বিতর্কের ঝড় উঠে। হেনরি কিসিঞ্জার শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাই করেননি, স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশকে নিয়ে বিদ্রূপও করেছিলেন। উত্তর ভিয়েতনামের কাছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট দক্ষিণ ভিয়েতনামের পরাজয়ের ঠিক পূর্বমুহূর্তে শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য আমেরিকার তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার ও ভিয়েতনামের রাজনৈতিক নেতা লে দু থো-এর মধ্যে একটি শান্তি চুক্তি হয়। এই চুক্তির জন্য দুজনকে নোবেল প্রদান করা হলেও লে দু থো এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। সারা বছর যুদ্ধ বাধিয়ে রেখে শেষ বেলায় চুক্তি করার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান যথার্থ বলে অনেকে মনে করেন না। যুদ্ধবাজ ও অশান্তির কারিগর কিসিঞ্জারকে নোবেল দেওয়ার প্রতিবাদে নোবেল কমিটির দুজন সদস্য পদত্যাগ করেছিলেন।

শান্তিতে বিতর্কিত নোবেল

বিজয়ীদের মাঝে আছেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ও ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট মেনাশিম বেগিন। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কুলিয়ে উঠতে না পেরে আনোয়ার সাদাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড শান্তি চুক্তি করে ১৯৭৯ সনে দুজনই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। প্যালেস্টাইনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার কোন প্রতিকার না করে শুধু নিজ দেশের স্বার্থে ইসরায়েলের সঙ্গে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে আজ পর্যন্ত শান্তি আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

তিব্বতের আন্দোলন ও আন্দোলনের আধ্যাত্মিক নেতা দালাইলামাকে বিশ্বে পরিচিত করে তোলার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ১৯৮৯ সনে তাকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। গুয়াতেমালার রিগোবার্তা মেঞ্চু স্বেচ্ছায় মেক্সিকোতে নির্বাসনে থেকে ‘আমি রিগোবার্তা মেঞ্চু’ নামে একটি আত্মজীবনী লিখেই ১৯৯২ সনে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী হন। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ ডেভিড স্টোল প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে, তার আত্মজীবনীর বেশ কিছু তথ্য অসঙ্গত, বিভ্রান্তিকর এবং মিথ্যা।

১৯৯৪ সনে ফিলিস্তিনের ইয়াসির আরাফাত এবং ইসরায়েলের ইসহাক রবিন ও সিমন পেরেজকে যৌথভাবে নরওয়ের ওসলোতে শান্তি চুক্তি করার জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। যদিও এ চুক্তি কখনো কার্যকর হয়নি এবং ফিলিস্তিন সমস্যারও কোন সমাধান হয়নি।

জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধ ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলে ২০০৭ সনে যুক্তরাষ্ট্রের এককালের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী আল গোর নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়ে যান। কিন্তু উল্লেখিত ক্ষেত্রে তার কোন উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম ছিল বলে অনেকে মনে করেন না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার এক বছরের মধ্যে ২০০৯ সনে বারাক ওবামাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হলে সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়। কারণ এক বছর ক্ষমতায় থেকে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকার দৃশ্যমান কোন উদাহরণ তিনি তখনো সৃষ্টি করতে পারেননি। ক্ষমতায় আসার আগেও এক্ষেত্রে তার কোন ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি। ওবামা অবশ্য নিজেই তাকে এই পুরস্কারের যোগ্য মনে করেননি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মায়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে অকুতোভয় আন্দোলনে শত নির্যাতনেও দৃঢ় অবস্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ অং সান সূচিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। তার নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে এতদিন কোন বিতর্ক ছিলো না। সম্প্রতি রাখাইনে মায়ানমারের সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন ও জাতিগত নিধন নিয়ে সূচির কোন ভূমিকা না থাকায় তার নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে অনেকে। পাকিস্তানে শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করার কারণে সন্ত্রাসীদের গুলিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ফিরে আসা মালালা ইউসুফজাইকে ২০১৪ সনে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। কিন্তু তার এই নোবেল পাওয়ার বিষয়টি ধর্মান্ধরা সহজভাবে মেনে নিতে না পারায় তাদের তরফ থেকে প্রচুর সমালোচনা হয়। পশতুন এলাকাগুলো তালেবানদের দখলে আসার পর মেয়েদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিলে মালালা বিবিসির প্রস্তাবে সব সত্য তুলে ধরে ব্লগিং শুরু করে। এছাড়াও মালালা তালেবানদের জারি করা বিধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে মুখ ঢেকে বোরখা পরতে সম্মত ছিল না। সে বলেছিলো, ‘I would never cover my face like that. My face was my identity.’

আমাদের দেশে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। সমালোচনায় বলা হচ্ছে, ড. ইউনূসের সঙ্গে নরওয়ের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান গ্রামীণফোনের অংশীদারিত্বমূলক সম্পর্ক রয়েছে। অনেকের অভিমত, জাতীয় জীবনের চরম সংকটকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে কোন রকম ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়নি।

সমকালীন একই বিষয়ে বেশি অবদান রাখার জন্য অধিকতর যোগ্যদের পুরস্কার না দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যদের পুরস্কৃত করার কারণে এমন বিতর্কের সৃষ্টি।

এই কলামের শুরুতে উল্লেখ করেছি যে, এ বছর আইক্যানকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বিশ্বকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে তাদের নিরন্তর প্রচেষ্টার স্বীকৃতিস্বরূপ; অথচ এ বছরের জুলাই মাসে পারমাণবিক অস্ত্র নিষিদ্ধ ও পর্যায়ক্রমে সেগুলো ধ্বংস করার জন্য প্রণীত জাতিসংঘের একটি চুক্তি ১২২টি দেশ গ্রহণ করলেও পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী ৯টি দেশ এ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। তাই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার কখনো কখনো ফার্স মনে হয়। তবে সব কিছুর পরেও নোবেল পুরস্কারকে এখনও বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পদক হিসেবে গণ্য করা হয়।