আজকের উপসম্পাদকীয় লেখাটির প্রিন্ট সংস্করণ এখনো নেটে আসেনি তাই ই-সংস্করণ থেকে ইমেজ কপি করে পোস্ট করা হলো। আমি নিচে আমার মোবাইল থেকে লেখাটি দিয়ে দিলাম পড়ার সুবিধার্থে।
মেধার চাকুরী
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
সরকারি চাকরিতে প্রচলিত কোটার সংস্কারের জন্য দেশের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমেছিলো; অন্যান্য কোটার বরাদ্দ কমিয়ে মেধা কোটা বাড়ানোর দাবী আদায়ে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে। চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাভিত্তিতে ৪৪ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পোষ্যদের ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা কোটা ১০ শতাংশ, আদিবাসী ৫ শতাংশ এবং প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ কোটা ছিলো। উক্ত তথ্য পর্যালোচনা করলে সবার পক্ষে বুঝা সম্ভব যে, মুক্তিযোদ্ধা কোটা ব্যতীত অন্য কোটার পরিমাণ এত কম যে সেগুলোর কমানোর সুযোগ খুবই কম। একশত জন নিয়োগ দিলে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সাপেক্ষে একজন প্রতিবন্ধী নিয়োগ পেতো।
আমি চাকুরী লাভের প্রত্যাশায় অনেকগুলো নিয়োগ পরীক্ষা দিয়েছি এবং চাকুরীরত অবস্থায় অনেকগুলো নিয়োগ প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টও ছিলাম। নিয়োগ প্রদানে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে উত্তীর্ণ প্রার্থীদের দিয়ে একটি প্যানেল তৈরি করা হয়। প্যানেলভুক্ত প্রার্থীদের কোটাভিত্তিক মেধাতালিকা তৈরি করা হয়। কর্মকর্তার নিচের পদগুলোর ক্ষেত্রে যে জেলার কোটা বেশী খালি, নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই জেলার প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অগ্রাধিকার প্রাপ্ত জেলার জন্য প্রণীত তালিকার মেধাক্রম অনুসারে প্রার্থী নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। এটা সত্য যে, কোটা না থাকার জন্য কখনো কখনো কোন একটি জেলার প্রার্থী সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েও নিয়োগের জন্য বিবেচিত হয় না। তবে যারা চাকুরী পায় তাদেরও মেধা যাচাই হয়ে থাকে, তাদের লিখিত এবং মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। শুধু উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মধ্যে থেকে বরাদ্দ কোটা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হয়। এছাড়া কোটার মধ্যে নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যেও মেধার প্রতিযোগিতা হয়, সংশ্লিষ্ট কোটায় সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্তদেরকেই নির্বাচন করা হয়ে থাকে।
আমি যে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করেছি তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তার দুটি পদে এখন প্রায় প্রতি বছর সরাসরি নিয়োগ দেওয়া হয়। আরেকটি প্রতিষ্ঠান
দ্য সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশন বা টাকশালে দশ বছরেও কর্মকর্তা পর্যায়ে দশটি পদ খালি হওয়ার সুযোগ হয় না। ব্যাংকিং সেক্টর সম্প্রসারিত হওয়ায় এই সেক্টরে লোকবলের নিয়োগ বেড়েছে। স্বায়ত্তশাসিত, আধাস্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোতে খুব বেশী নিয়োগ পরিলক্ষিত হয় না। সরকারের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন এজাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত লোকবলের কারণে লোকসান গুনছে বলে পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স ও স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়েও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকুরী পাচ্ছেন না। কারণ পদ খালি নেই। পিএসসি'র মাধ্যমে প্রতি বছর কয়েক হাজার লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রাইভেট সেক্টরে কিছু লোকবলের নিয়োগ হলেও দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে। প্রতিবছরই উচ্চশিক্ষা নিয়ে শ্রমবাজারে আসা শিক্ষার্থীদের প্রায় অর্ধেক বেকার থাকছে অথবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। হালনাগাদ সঠিক পরিসংখ্যান খুঁজে পাওয়া কঠিন; তবু যে তথ্য পেয়েছি তাতে দেখা যায়, দেশে বর্তমানে ৩ বা ৪ কোটি লোক বেকার। প্রতিবছর প্রায় ১৬ লাখ (কেউ বলছে ২২ লাখ) কর্মক্ষম লোক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এদের মধ্যে কাজ পায় ৭ লাখ, বাকি ১৫ লাখ বেকার থেকে যায়। কোটা সংস্কারের দাবীর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি মতো সরকারের কর্মকর্তা পদে সংস্কার না করে কোটা সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। এতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী সব চাকুরী প্রার্থী লাভবান হয়েছে বলে মনে হয় না। কোটা না থাকলে কিছু বেশী সংখ্যক মেধাবীর চাকুরী হবে, কিন্তু এতে কম মেধাবীদের দুর্দশা আরও বাড়বে।
মেধা নির্ধারণেও হেরফের আছে। কারণ একশ পদের জন্য দশ লক্ষ প্রার্থীর মধ্যে নির্বাচিত একশত জনই শুধু মেধাবী তা বলা যাবে না। একশত এক নম্বরের প্রার্থী নিশ্চয়ই অঘা নয়। বিভিন্ন পরীক্ষায় অনুসৃত পরীক্ষা পদ্ধতি মেধা যাচাইয়ে কতটুকু উপযোগী তা পর্যালোচনা সাপেক্ষ। যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সাবজেক্টে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়েছেন তাদের অনেকে কিন্তু পাকিস্তান আমলের সিএসএস এবং বাংলাদেশ আমলের বিসিএস পরীক্ষায় ভালো করেননি; অথচ তারা তাদের সাবজেক্টে মেধাবী। স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেয়ার পর বিসিএস পরীক্ষার জন্য একজন ছাত্র বা ছাত্রী সাধারণ জ্ঞানের বই মুখস্থ করা শুরু করে দেয়; ইদানীং বিসিএস কোচিং সেন্টারেরও প্রবর্তন হয়েছে। এতে মনে হয়, স্নাতকোত্তর ডিগ্রী নেয়ার পরই জ্ঞানার্জনের শুরু এবং এই মুখস্থ ও কোচিং থেকেই মেধার বিকাশ ঘটতে থাকে।
এমএ পাস করার পর চাকুরীর জন্য বহু পরীক্ষা দিয়েছি। আমি করণিক পদসহ কয়েকটি পদের জন্য লিখিত পরীক্ষা দিয়ে পাস করতে পারিনি। করণিকের প্রার্থী যাচাইয়ে টিকলাম না কেন? নিশ্চয় মেধাবী নই বলে পাস করতে পারিনি। চাকুরীর জন্য পরীক্ষায় টিকলাম না অথচ এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় মেধাভিত্তিক বৃত্তি পেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ও পার হলাম কৃতিত্বের সাথে, অথচ ফেল করলাম চাকুরীর পরীক্ষায়। আমার মনে হয়, আমি চাকুরীর জন্য সাধারণ জ্ঞানের একটি বই মুখস্থ করে পরীক্ষা দেওয়ার কৌশল রপ্ত করতে পারিনি বলেই কম মেধাবী হয়ে গেলাম। আমি যে সাবজেক্টে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করলাম সেই সাবজেক্টের উপর কোন পরীক্ষায় তিন বা চারটির বেশী প্রশ্ন ছিলো না। অর্থনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া আর চাকুরীর জন্য দশ বছর আগে অর্থনীতিতে কে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলো তা মুখস্থ করা এক কথা নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর এক জীবনে যা লিখেছেন তা আমাদের দুই জীবনেও পড়ে হৃদয়াঙ্গম করা সম্ভব নয়। একজন লোকের জানার বাইরে কোটি কোটি জ্ঞান রয়েছে, প্রশ্নকর্তাগণ কোন্ সময় কোন্ প্রশ্ন করবেন তা আন্দাজ করাও কঠিন। পদ্মাসেতু কত ফুট লম্বা তা না জানলে কাউকে অঘা বলে চাকুরীর পরীক্ষায় বাদ দেওয়া সহজ, কিন্তু যাকে নির্বাচন করা হয়েছে তার চেয়ে কম মেধাবী তা সর্বক্ষেত্রে সত্য নাও হতে পারে। জানার শেষ নেই বলে চাকুরীর পরীক্ষার ক্ষেত্রে কমন পড়লেই মেধাবী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। চাকুরীর জন্য জেনারেল নলেজের পরীক্ষা দিতে হলে প্রস্তর যুগ হতে হাল আমলের ডোনাল্ড ট্রাম্পের যৌন সম্পর্ক নিয়ে মুদ্রিত পুস্তক বা পত্রিকার প্রতিবেদনগুলোর তথ্য জানতে হবে। তাই বলছিলাম, চাকুরীর পরীক্ষায় পাস করার ক্ষেত্রে সব মেধা দিয়ে হয় না, নিয়তিও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করে।
মেধার বিকাশে সরকার প্রদত্ত সুযোগ-সুবিধা দেশের সব অঞ্চলের সবাই সমানভাবে ভোগ করতে পারে না। সকলের জন্য সমান সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত চাকুরী পাওয়ার ক্ষেত্রে শুধু মেধা একমাত্র বিচার্য হতে পারে না। ব্রিটিশ আমল বা পাকিস্তান আমলে কোন কোন এলাকার লোক বা বিশেষ শ্রেণির লোক শিক্ষা গ্রহণ, চাকুরীতে নিয়োগ বা ব্যবসা-বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা পেয়ে শহরে বসবাস করার সুযোগ পেয়েছিলো। এই বিশেষ শ্রেণির লোকেরা রাজধানী বা বড় বড় শহরের সকল সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে জ্ঞান, গরিমায় উচ্চস্তরে পৌঁছে যায়। এই বিশেষ শ্রেণির উত্তরসূরিরা মেধার জোরে এতদিন নিরবচ্ছিন্নভাবে চাকুরী পেয়েছেন। সুবিধাভোগী এই শ্রেণির বংশধরেরাও সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সুবিধা পেতেই থাকে। দু-একটি ব্যতিক্রম ব্যতীত বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলের লোকজনের মেধা বিকাশের সুযোগ খুবই নগণ্য, তাই তারা শহরের চার, পাঁচ যুগ পূর্বের বাসিন্দাদের সাথে কোন প্রতিযোগিতায়ই টিকে না।
কোটা প্রবর্তন ও সংরক্ষণের ব্যাপারে ইতঃপূর্বে কোন সরকার কখনো আপত্তি করেনি। কেউ কেউ মুক্তিযোদ্ধা কোটার বিরুদ্ধে মনের মধ্যে ক্ষোভ জমিয়ে রাখলেও প্রকাশ্যে বলার সাহস করেনি; ছাত্র, ছাত্রীদের সাম্প্রতিক আন্দোলনে তারা তা বলার সুযোগ পেল। তবে এটা সত্য যে, মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানের জন্য কোটা প্রযোজ্য হলেও নাতি বা নাতনির জন্য কোটা অক্ষুণ্ণ রাখাকে কেউ যৌক্তিক মনে করছে না। অনেক শিক্ষাবিদ দীর্ঘকালব্যাপী কোটা প্রথা রাখার প্রয়োজনীয়তা নেই বলেও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু প্রতিবন্ধী, উপজাতি বা নারীদের জন্য কোটা থাকবে না কেন? কোটা না থাকলে প্রতিবন্ধীদের কেউ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে চাকুরী দেবে বলে মনে হয় না। নারীদের এখনো ধর্মীয় আবরণে ঘরে আবদ্ধ রাখার প্রচেষ্টা প্রবল; তাদের কিছুটা অগ্রাধিকার না দিলে নারীর প্রত্যাশিত ক্ষমতায়ন হবে কী করে? একইভাবে সারা দেশের উন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থা একই রকম নয়। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে একজন ছাত্র বা ছাত্রীকে স্কুলে যেতে হয় দুর্গম ও বন্ধুর পথ পেরিয়ে। তাদের উন্নয়নও সমতল ভূমির মতো নয়। কাজেই তাদের কিছুটা বাড়তি সুযোগ দেওয়া সমীচীন ও বাঞ্ছনীয়।
কোটা প্রথা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও সংস্থায় চালু আছে। লেবাননের মুখ্য তিনটি পদ চুক্তি করে তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে—রাষ্ট্রপতি হবেন একজন ম্যারোনীয় খ্রিস্টান, প্রধানমন্ত্রী হবেন সুন্নী মুসলমান এবং স্পিকার হবেন শিয়া মুসলমান। সংসদের আসনসমূহের অর্ধেক খ্রিস্টান ও অর্ধেক মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত। পাকিস্তান, সৌদি আরব, ইরানসহ সতেরটি দেশে মুসলমান ব্যতীত অন্য কোন ধর্মের লোক রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারে না। বিশ্বব্যাংকের সর্বোচ্চ পদ আমেরিকানদের জন্য এবং আইএমএফ-এর শীর্ষ পদ ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য বরাদ্দ। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পদগুলো কয়েকটি দেশের জন্য বরাদ্দ করা আছে, অস্থায়ী পদগুলো অঞ্চল ভেদে কোটায় নির্বাচিত হয়। আমাদের পার্লামেন্টে নারীদের সদস্যপদ লাভে কোটা রয়েছে। সামরিক বাহিনীতে পুরুষদের উচ্চতা প্রয়োজন হয় ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি, আর মহিলাদের ক্ষেত্রে দরকার ৪ ফুট ২ ইঞ্চি। ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, জাপান, চীন, কানাডা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রভৃতি দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও চাকুরীর ক্ষেত্রে কোটার প্রচলন রয়েছে।
উন্নত দেশগুলো অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে শুল্কমুক্ত অগ্রাধিকারমূলক
রপ্তানীর সুযোগ দিয়ে থাকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই অগ্রাধিকারমূলক কোটাভিত্তিক রপ্তানী স্থগিত করার পর পোশাক রপ্তানীকারকদের মধ্যে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো ইউরোপও যদি পোশাক রপ্তানীর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ কোটা বাতিল করে তাহলে শুধু রপ্তানী খাতে নয়, বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও ধস নামবে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং দেশ উচ্চশিক্ষার নিমিত্তে বৃত্তি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশ বা অঞ্চলের জন্য কোটা নির্ধারণ করে দেয় বলেই বাংলাদেশের ছাত্র, ছাত্রীদের বৃত্তি লাভে কিছু ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রতিযোগিতা করতে হয় না।
প্রশাসনে খুব মেধাবী লোকের প্রয়োজন আছে বলেও মনে হয় না। মানব জীবনকে উন্নততর অবস্থানে নেয়ার জন্য এদের কোন উদ্ভাবন বা আবিষ্কার নেই; কোন প্রশাসক পৃথিবীর মানুষের জন্য কিছু আবিষ্কার করেছে এমন কোন প্রমাণ নেই। এই প্রশাসকেরা নীতিনির্ধারকও নয়, নীতিনির্ধারকদের আজ্ঞাবহ মাত্র। সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার মন্ত্রিপরিষদের। রাজনীতিবিদদের জন্যও তাই মেধা যাচাইয়ের একটা পদ্ধতি থাকা দরকার। জনগণও দলভিত্তিক ভোট দেয়; যোগ্যতার ভিত্তিতে ভোট দেওয়া হলে শুধু দলের প্রতীকে অযোগ্য লোক জয় করতে পারে না। বাংলাদেশের খেলার মান যাই হোক না কেন, আন্তর্জাতিক কোন টুর্নামেন্টে আমরা বাংলাদেশের খেলোয়াড়ের পক্ষে থাকি। যারা পাকিস্তানি ক্রিকেটের সমর্থক তারা খারাপ খেললেও পাকিস্তানকেই সমর্থন করে থাকে, ভারত ভালো খেললে কি আমরা সবাই ভারতকে সমর্থন করি? কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের মানসিকতাই কোটায় আবদ্ধ।
কোটা নির্দিষ্ট করার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো দেশের সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করা, একই রাষ্ট্রে মানুষে মানুষে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমান্বয়ে বিলোপ করা। কিন্তু এমন সমতা এখনো আনা যায়নি বলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের জন্য, নারীদের জন্য এবং পঙ্গু-বিকলাঙ্গদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করা যৌক্তিক। ৫% কোটা সংরক্ষণের জন্য প্রতিবন্ধীরা শাহবাগ মোড়ে ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে অবস্থান করছে বহুদিন। অন্যদিকে দেশের নাগরিক প্রতিনিধিরাও সরকারি চাকুরীতে তাদের জন্য কোটা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করেছেন। কারণ দেশের অন্যান্য মানুষ এবং গোষ্ঠীর তুলনায় এরা আজও পিছিয়ে। এছাড়া পুরুষদের আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণের কারণে নারীরাও বহু যুগ ধরে যথাযথ স্থান পায়নি। মেধার পরিপূর্ণতা বলতে কিছু নেই, বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ জন মেধাবী—মেধার তাই সামান্যীকরণ সম্ভব নয়। বর্তমান সরকারের আমলে প্রচুর কর্মসংস্থান হওয়া সত্ত্বেও বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এই একটি ছোট্ট দেশ এতগুলো লোকের ভার বহনে অক্ষম। কোটার সংস্কারে নয়, সন্তান উৎপাদন কমানো গেলে বেকার সমস্যার সমাধান সম্ভব।
লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক
zeauddinahmed@gmail.com
