আজ দৈনিক সংবাদের উপসম্পাদকীয় বিভাগে লেখা আমার কলাম।
কমিউনিটি পুলিশিং
জিয়াউদ্দীন আহমেদ
পুলিশ সপ্তাহের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুলিশদের আরও জনবান্ধব হতে আহ্বান জানিয়েছেন। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের সরকার গঠনের পর পুলিশকে আধুনিক ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে যে পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কমিউনিটি পুলিশিং। পুলিশের কাছে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই বলে অভিযোগও বেশি। প্রত্যাশা অনুযায়ী সহযোগিতা না পেলে মানুষের অসন্তোষ হওয়া স্বাভাবিক। ব্রিটিশ আমলের হাফপ্যান্ট পরা পুলিশ ছিল লাট-বাহাদুর আর নীলকরের লাঠিয়াল। পাকিস্তান আমলে সামান্য ঘটনায় পুলিশের দাপটে শুধু অপরাধী নয়, আশপাশের নিরীহ লোকদেরও ঘরে থাকা মুশকিল ছিল।
দুঃখজনক হলেও সত্য, অপরাধ দমনে নিয়োজিত পুলিশের অনেকেই অপরাধ করে বসে। অন্যান্য পেশার লোকেরাও ঘুষ খায়, জনগণকে হয়রানি করে; কিন্তু অন্যান্য পেশার সঙ্গে এই পেশার মূল পার্থক্য হচ্ছে, এই পেশার লোকদের চব্বিশ ঘণ্টা অপরাধ করার সুযোগ রয়েছে, দায়িত্বের ভেতর এবং দায়িত্ববহির্ভূত। মামলার বাদী এবং আসামি—উভয়ের কাছ থেকেই অর্থ আদায়ের এমন সুযোগ অন্য পেশায় অপেক্ষাকৃত কম। পুলিশের বিরুদ্ধে আছে গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ। জঙ্গিদের উত্থানের পর গুমের ঘটনা ও অভিযোগ দুটোই বেশি হচ্ছে। নিয়োগ এবং ‘ভালো’ পোস্টিং-এর দেন-দরবার থেকেই পুলিশের অপরাধের শুরু। পুলিশের পদোন্নতির ক্ষেত্রে যত দেন-দরবার হয় তা অন্য কোন পেশায় হয় বলে মনে হয় না।
চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগে অসংখ্য পুলিশ অভিযুক্তও হয়েছে। এক সময় ছিল যখন জিডি বা সাধারণ ডায়েরি করতে গেলেও থানায় এমনভাবে হেনস্থা করা হতো যাতে ভবিষ্যতে এ কাজে আর কেউ আগ্রহ না দেখায়। আমার এককালের এক সহকর্মীর বাসার গৃহকর্মী পালিয়ে যাওয়ার প্রেক্ষিতে থানায় জিডি করতে গেলে পুলিশের প্রথম প্রশ্ন ছিল, ‘মেয়েটিকে গর্ভবতী করে আপনি মেরে ফেলেননি তো?’ এখনো বাদীকে আসামি বানানোর এই মনোবৃত্তির কারণে অনেকে বিপদে থানায় যেতে চায় না। স্বামী-স্ত্রী, বন্ধু-বান্ধবী বা প্রেমিক-প্রেমিকা নিরিবিলি কোথাও বসলে পুলিশ যখন টাকার জন্য সন্ত্রাসীদের মতো কাবিননামা চায় তখন পুলিশের উপর জনগণের আস্থা শূন্যের কোটায় নেমে আসে। এগুলো হলো সাধারণ মানুষের অভিযোগ। রাজনৈতিক দলের অভিযোগ হচ্ছে, পুলিশ বিরোধী দলকে মিছিল, মিটিং করতে দেয় না, তাদের কর্মীদের ওপর নিপীড়ন করে ইত্যাদি। আমোদজনক হচ্ছে, যারা অভিযোগ করেন তারাই হয়তো ক্ষমতায় থাকাকালীন পুলিশ দিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলের কর্মীদের এমনভাবে নাজেহাল করিয়েছেন। তাই দেখা যায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী দলের মিছিল করতে গিয়ে পুলিশের মার খেয়েছেন। মার খাওয়া বিরোধী দল ক্ষমতায় গিয়ে কিন্তু অপরাধী পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না; বরং সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল, মিটিং-এ আগত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের পেটাতে পুলিশকে কাজে লাগানো হয়। আমাদের দেশে বিরোধী দলের কাজ হলো অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিক্ষোভ মিছিলে সাধারণ মানুষের গাড়ি বা দোকান-পাটে ঢিল মেরে কাচ ভাঙার মহোৎসব করা; অন্যদিকে সবকালের সব সরকারের কাজ হলো মারমুখী মিছিল, মিটিং ছত্রভঙ্গ করে জনগণের জানমাল রক্ষা করা। পুলিশকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সরকারি ও বিরোধী দলের মনোভঙ্গির মধ্যে তাই গুণগত কোন পার্থক্য নেই। এক মিছিলে প্রয়াত রাজনীতিবিদ অলি আহাদকে পেটানোর সময় পুলিশকে শাসিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘ক্ষমতায় গেলে তোমাকে আমি দেখে নেব’। উত্তরে পুলিশ বলেছিল, ‘তখন আপনার হুকুমে আমি আপনার বিরোধী পক্ষকে এমনিভাবে পেটাবো।’
কাজের ধরনের কারণে পুলিশের পক্ষে চোর, গুণ্ডা, মাস্তান, খুনি, মাদকসেবীসহ নানাবিধ অপরাধীদের এড়িয়ে চলা সম্ভব নয়। অপরাধীরা বাঁচার জন্য প্রতিদিন প্রতিমুহূর্তে তদবির করবে, ঘুষ দেবে বা অন্য কোন উপায়ে প্রলুব্ধ করবে। কারণ কঠোর নীতিবান লোকও বাঁচার তাগিদে অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে কসুর করে না। চব্বিশ ঘণ্টা এমনভাবে প্রলোভন থাকলে অনৈতিক কাজে নির্লিপ্ত থাকা শুধু পুলিশ নয়, কোন পেশার লোকের পক্ষেও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
অনৈতিকভাবে বারবার প্রলুব্ধ করার পরিবেশে দৃঢ় মনোবলের সাধু, সন্ত, ধার্মিকদের পক্ষেও সৎ হয়ে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ে। অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে দৃঢ় মনোবলও যথেষ্ট নয় যদি না পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সততার চর্চা করেন। আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় পুলিশের চাকরি নিয়ে সততার চর্চা করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন। চোরাচালানের তালিকাভুক্ত মালামাল জমা দিতে গেলে বড় কর্মকর্তা বাকি মালামাল কোথায় জানতে চাইলেন এবং বাকি মালামাল জমা না দিলে প্রশাসনিক ব্যবস্থার নেয়ার হুমকি দিলেন। সব মাল জমা দেওয়ার পরও যখন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভিন্ন সুরে কথা বলতে থাকেন তখন গ্রেফতারকৃত সংশ্লিষ্ট কালোবাজারির কথা আমার আত্মীয়ের মনে পড়লো, ‘স্যার, এই মাল ধরে নিজের বিপদ ডেকে আনবেন না।’ এমন অনেক বিরক্তিকর অভিজ্ঞতায় একবার এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করলে সন্ত্রাসী ধমক দিয়ে আমার আত্মীয়কে এই বলে শাসাতে থাকে যে, ‘থানায় নিয়ে এক মিনিটও রাখতে পারবি না, থাকলে একটা সিগারেট দে, খাই।’ যখন ছেড়েই দিত হবে তখন আমার আত্মীয় সন্ত্রাসীকে রাস্তায় জনসম্মুখে পিটিয়েছিলেন। মোবাইলে ভিডিও করে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়ার যুগ ছিল না বলে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন বিএনপি’র মতিন সাহেব; তার আমলেই বাংলাদেশ সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। তার আমলে আমার বাড়ির ছাদ ঢালাইয়ের জন্য মিশ্রিত সিমেন্ট-বালু ব্যবহার করতে পারিনি সন্ত্রাসীদের হুকুমে; তাদের অনুমতি না নিয়ে ছাদ ঢালাই করার কাজ শুরু করাই ছিল আমার অপরাধ। আমার ঘনিষ্ঠতম বিএনপি’র একজন প্রভাবশালী যুবক আমাকে নিয়ে গেল তাদের নির্বাচিত এক ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে; যুবক কমিশনার সব শুনে বুঝলো যে, বাড়ি নির্মাণের কাজ বন্ধ রাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সন্ত্রাসীর সঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ পরিচয় থাকায় তার পক্ষে কিছু করা সম্ভব নয়। তবে আমি যদি চাই সে তার দলবল নিয়ে ওই সন্ত্রাসীদের মোকাবিলা করতে পারবে বলে জানালো। আমি আগের চেয়ে আরও বেশি ভয় পেলাম। চাঁদার জন্য আমার মাথায় পিস্তল ধরেছিল যে সন্ত্রাসীরা তাদের তাড়াতে আরেক দল মাস্তানের নিয়োগ সুবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে হলো না।
ব্যক্তি ও সমাজজীবনে কেউ আন্তরিকতার সঙ্গে পুলিশের উপস্থিতি কামনা না করলেও প্রয়োজনে পুলিশের নিকট ধর্ণা দেয় না এমন লোক অতি অল্প। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, চোর, ডাকাত, সন্ত্রাসী, খুনি, ধর্ষক, মাদকসেবীরাও কোন কোন সময় পুলিশের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে থাকে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন সাহেবের আমলেই আমাদের এলাকার এক ছোটখাটো মাস্তানকে এক বড় মাস্তান ও তার সঙ্গীরা এনে পিটাচ্ছিল। ছেলেকে বাঁচানোর আকুতি-মিনতি ও বুকফাটা আর্তনাদ ফলপ্রসূ না হওয়ায় ছোট মাস্তানের মা পরিশেষে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। জনতার মারমুখী আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সব লোকই পুলিশের আগমনের প্রত্যাশা করে থাকে।
পুলিশের কাজ শুধু বহুবিধ নয়, ঝুঁকিপূর্ণও। জঙ্গি উত্থানে এই ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে গেছে। গজিয়ে উঠা জঙ্গিদের চাপে রাখার ক্ষেত্রে সফলতার জন্য বাংলাদেশের পুলিশ আন্তর্জাতিক প্রশংসা ও স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলে বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক হিসেবে আমাদের পুলিশেরা নিয়োগ পাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, এখন বিশ্বের যে কোন কর্মশালা, কনফারেন্সে বাংলাদেশ পুলিশের মতামতের গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যেভাবে হঠাৎ জঙ্গিদের উত্থান হয়েছিল তাতে পাকিস্তানের মতো অবস্থার উদ্ভবের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। পাকিস্তানে আত্মঘাতী বোমায় প্রায় প্রতিদিন লোক মরছে; মসজিদে নামাজরত অবস্থায় মানুষদের বোমা মেরেই জঙ্গিরা থামছে না, মৃত মানুষগুলোর জানাজায় আগত লোকগুলোকেও গুলি করে খতম করা হচ্ছে। জঙ্গির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের শক্ত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এখনও পাকিস্তান বা আফগানিস্তান হয়ে যায়নি।
মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ আর নিরস্ত্র জনতা একাকার হয়ে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়েছে বলে পুলিশের প্রতি এখনও সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদিত হয়। রাজনৈতিক প্রত্যাশা বিবেচনায় না নিয়ে বলা যায়, পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে গৃহীত কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থায় মহল্লা মহল্লায় পুলিশের সঙ্গে সাধারণ মানুষের যোগাযোগটা তৈরি হচ্ছে। অপরাধ দমন, অপরাধ উদ্ঘাটন, অপরাধীদের গ্রেফতার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ও এলাকার জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতায় কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের বাস্তবায়নে জনগণের সঙ্গে পুলিশের দূরত্ব দিনদিন কমছে। তবে জনসংখ্যার তুলনায় পুলিশের লোকবল পর্যাপ্ত নয়; সেনাবাহিনী, প্রশাসনিক ক্যাডারের তুলনায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন পদে লোকবল তত না বাড়লেও বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশের সার্বিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়াও উন্নতমানের অস্ত্র ও লজিস্টিক সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। দেশে ও বিদেশে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পুলিশদের মোটিভেট করার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
অপরাধপ্রবণতা সকল শ্রেণি বা পেশার মানুষের মধ্যেই থাকতে পারে। অন্য পেশায় অপরাধী হয় নির্দিষ্ট ব্যক্তি; কিন্তু একজন পুলিশ অপরাধ করলে বদনামটা হয় পুরো পুলিশ বাহিনীর। কিন্তু শত প্রলোভন থাকা সত্ত্বেও কিছু পুলিশ কখনো অপরাধে জড়ায় না, অনৈতিক কাজ করে না। অন্যদিকে সহিংস ঘটনায় আক্রান্তকে উদ্ধার করতে গিয়ে কত পুলিশ হতাহত হয়েছে তার হিসাবে জনগণকে আগে কখনো আগ্রহী বলে মনে হয়নি। কারণ পুলিশ এবং সাধারণ মানুষ পরস্পর পরস্পরকে কখনোই বন্ধু মনে করেনি। এখন একজন পথচারী সাধারণ মহিলাও পুলিশের বিপদে এগিয়ে আসে। বর্তমান সরকারের আমলে পুলিশের ইমেজ ক্রাইসিস ঘুচিয়ে জনগণের বন্ধু করে তোলার প্রচেষ্টায় কিছুটা আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। কলকাতার মতো মোটা, ভুঁড়িওয়ালা পুলিশের প্রত্যাশা আমরাও করি না। সৎ, নিষ্ঠাবান, দায়িত্বশীল, কর্মঠ ও সাহসী বহু পুলিশকর্মী আছে বলেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো নরকে পরিণত হয়নি।
[লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক]
zeauddinahmed@gmail.com
ঢাকা, রবিবার, ২১ জানুয়ারী ২০১৮
