জিয়াউদ্দীন আহমেদ

৭ জানুয়ারী, ২০১৮ তারিখে 'সংবাদ'-এর খবর হচ্ছে, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিচারে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের বিধান সহজ করতে একটি প্রস্তাব ইসরাইলি পার্লামেন্ট নেসেটে উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, 'রাজনৈতিক, জাতীয়, ধর্মীয় অথবা আদর্শিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য' ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার চেষ্টা করা হলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে। এই আইনে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সশস্ত্র গ্রুপ হামাসের তীব্র আক্রমণ এখন আর দেখা যায় না; এখন ফিলিস্তিনিরা ইন্তিফাদায় গুলতি দিয়ে ইসরাইলী সেনাদের মোকাবিলা করছে।

বাংলা ভাষায় 'তুঘলকি কাণ্ড' কথাটি এসেছে মধ্যযুগে দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের কয়েকটি পাগলাটে কর্মকাণ্ড থেকে। এই পাগলাটে কর্মকাণ্ডের একটি হচ্ছে, দিল্লী থেকে মধ্য প্রদেশের দেবগিরিতে পাহাড়ের মাঝে রাজধানী সরিয়ে নেয়া। তাঁর এই অকস্মাৎ সিদ্ধান্তে পারিষদের সকলে দ্বিমত পোষণ করলেও তুঘলক ছিলেন অটল। কিন্তু রাজধানী স্থানান্তরের ছয় মাসের মধ্যে তাঁর খেয়াল হলো যে, দেবগিরিতে জংলি ছাড়া অন্য কারো বসবাসের জন্য উপযোগী নয়; ফলে আবার দিল্লিতে প্রত্যাবর্তন। ইসরাইল পৃথিবীতে আরেকটি অশান্তি ডেকে আনতে তাদের রাজধানী তেলআবিব থেকে সরিয়ে জেরুজালেমে নেবে। এই কুটিল কাজে হঠাৎ করে ইন্ধন যুগিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের তুঘলকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর অনেকগুলো ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে বিষয়টি তোলা হয়েছিলো। নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো প্রয়োগে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষে কোন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি। সাধারণ পরিষদে অল্প কয়েকটি দেশ ব্যতীত সবগুলো দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও তা দিয়ে ইসরাইলের জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তরে আন্তর্জাতিক আইনে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে না। কারণ সাধারণ পরিষদের কোন সিদ্ধান্ত পালনে সদস্য দেশগুলো বাধ্য হয়। তবে জনমত সৃষ্টিতে সাধারণ পরিষদের একটা ভূমিকা নিশ্চয়ই রয়েছে।

১৯৮০ সনে ইসরাইল 'জেরুজালেম আইন' পাস করে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী ঘোষণা করে। কিন্তু জাতিসংঘ ইসরায়েলের ওই আইনটি অকার্যকর ও বাতিল ঘোষণা করে। এছাড়াও তাদের এই একতরফা ঘোষণায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কান দেয়নি। তবে ১৯৯৫ সনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত পাস করলেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের উপর অর্পণ করা হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ইতঃপূর্বে যুক্তরাষ্ট্রের কোন প্রেসিডেন্ট উদ্যোগী না হলেও ট্রাম্প তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর।

ট্রাম্পকে পাগলা তুঘলকের সাথে তুলনা করেছি বলে তাঁর তীক্ষ্ণ বাস্তব জ্ঞানকে অস্বীকার করা যাবে না।

মধ্যপ্রাচ্যের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতি বিচার-বিশ্লেষণ করেই ট্রাম্প এই ঘোষণা দিয়েছেন। তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো এখন হইচই করলেও তাদের মধ্য সদ্ভাব কখনোই ছিলো না, এখনো নেই। ইসলামিক স্টেটের সাথে দীর্ঘদিন যুদ্ধ করে ইরাক আর সিরিয়া ক্লান্ত, সৌদি আরব প্রতিদিন প্রতিবেশী ইয়েমেনে বিমান হামলা করছে, ইরানকে শায়েস্তা করতে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দৃশ্যমান এবং ইসরাইলের সাথে গোপনে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে যাচ্ছে, সৌদি আরবের সাথে জোটভুক্ত মুসলিম দেশগুলো কাতারকে একঘরে করে রেখেছে, লিবিয়া অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত, মিসরে নির্বাচিত মুরসি সরকারের পতন ঘটানোর পর বর্তমান সরকারের টিকে থাকাটা অনেকটা যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থননির্ভর, জর্ডান তো ইসরাইলকে বহু পূর্বেই স্বীকৃতি দিয়েছে। দূরবর্তী দেশ মালয়েশীয়া জেরুজালেম উদ্ধারে তাদের সেনা প্রস্তুত রাখার ঘোষণা দিলেও তা ফলপ্রসূ প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে হয় না। একমাত্র মিশর ও তুরস্কের সামরিক শক্তি ইসরাইলের মুখোমুখি হলে যুদ্ধটা দর্শনীয় হতে পারে। কিন্তু ন্যাটোর সদস্য তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের অকৃত্রিম বন্ধু ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাঁধাতে যাবে বলে মনে হয় না। ইরান এখন যুদ্ধে যাবে না; আট বছর ইরাকের সাথে যুদ্ধ করে ইরান কাহিল; তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে ইরান অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভে টালমাটাল। ইরান যুদ্ধে এলে ইসরাইল প্রথমেই তাদের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করবে। এখন সৌদি আরবের পীড়াপীড়ি থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি না থাকায় ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করতে পারছে না। পাকিস্তানও ফিলিস্তিনিদের জন্য সুখকর নয়; পাকিস্তানি সেনারা তাদের জর্ডানে অবস্থানকালীন ফিলিস্তিনিদের পিটিয়ে উদ্বাস্তু বানিয়েছিলো।

জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এই স্বীকৃতির প্রতিবাদে ওআইসিভুক্ত মুসলিম দেশগুলো পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণা অর্থহীন বলে মনে হয়; কারণ ১৯৬৭ সন থেকেই পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত।

পূর্ব জেরুজালেমকে প্রথমে জর্ডান এবং পরবর্তীতে ইসরাইল দখল করলেও এই দুটি দেশ কখনো প্রকৃত অধিবাসী ফিলিস্তিনিদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে থাকাকালীন অস্থায়ী পাসপোর্ট, ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে পূর্ব জেরুজালেমের স্থায়ী বাসিন্দা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে পরবাসী হয়ে থাকতে হতো। পূর্ব জেরুজালেম ইসরাইলের দখলে যাওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের সাথে ইহুদিরাও একই আচরণ করছে। পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের নাগরিক নন, জর্ডানের নাগরিক নন, এমনকি এখনকার স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ফিলিস্তিনের নাগরিকও নন। এই অঞ্চলে জন্ম নেয়া ফিলিস্তিনিরাও বিদেশি; অথচ পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে জন্ম নেয়া একজন ইহুদি ইসরাইলের নাগরিক হতে পারে।

অদ্ভুত মনে হয় এই ভেবে যে, একটি আলাদা দেশের রাজধানীর স্থান নির্ধারণের এখতিয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্কন্ধে নিয়ে নিয়েছে। যেভাবে ঘোষণা এসেছে তাতে মনে হয় জেরুজালেম যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কোন একটি শহর। যুক্তরাষ্ট্র এত অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে যে, পৃথিবীর যে কোন প্রান্তে তাদের স্বার্থহানি হলে বা কোন দেশে তাদের জনগণের বিপদ হলে, বিপদের আশঙ্কা দেখা দিলে আমেরিকা কারো তোয়াক্কা না করে তাদের স্বার্থের অনুকূলে সামরিক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। পানামার ব্যবসায়ীদের পাচার করা মাদকে মার্কিন তরুণেরা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এমন অভিযোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পানামার প্রেসিডেন্ট নরিয়েগাকে পানামা থেকে ধরে নিয়ে তাদের দেশের জেলে ঢুকিয়ে রেখেছিলো বহু বছর। যুক্তরাষ্ট্রের এমন শক্তি প্রয়োগ বহুবার দেখা গেছে। রোনাল্ড রিগ্যান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা গ্রহণের পর সামরিক আগ্রাসন পরিচালনা করেন লেবানন, গ্রানাডা, লিবিয়া প্রভৃতি দেশে। প্রেসিডেন্ট বুশ মিথ্যা অজুহাতে ইরাককে আক্রমণ করে ধ্বংস করেছে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সামরিক অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করা হয়েছে।

তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে ১৯১৭ সনে জেরুজালেম দখল করার পর ১৯৪৮ সন পর্যন্ত ফিলিস্তিনের পুরো ভূখণ্ডটি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তখন ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ফিলিস্তিনের মাটিতে ইহুদিদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনে সহায়তা করা হবে।

১৯৪৭ সনে জাতিসংঘও জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে রেখে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে আরব ও ইহুদিদের জন্য আলাদা দু'টি রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ফলে বৃটেন এবং জাতিসংঘের সহায়তায় ১৯৪৮ সনে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু আরব দেশগুলো ইসরাইলের অস্তিত্ব মানতে সম্মত ছিলো না। তাই ইসরাইলের জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যেই পাঁচটি আরব দেশ মিশর, ইরাক, লেবানন, জর্ডান এবং সিরিয়া একযোগে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করতে আক্রমণ শুরু করে। এছাড়াও ১৯৫৬, ১৯৬৭, ১৯৭৩ সনেও আরবদের সাথে ইসরাইলের যুদ্ধ হয়েছে; কিন্তু প্রতিটি যুদ্ধে আরবেরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে অবশেষে মিসর ও জর্ডান ইসরাইলকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে।

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে গণঅভ্যুত্থান বা ইন্তিফাদা ডাক দিয়েছেন হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়া। রাজপথে নেমে এসেছে হাজার হাজার ফিলিস্তিন যাদের হাতে গুলতির চেয়ে বড় কোন অস্ত্র নেই। নিরস্ত্র মানুষদের বিক্ষোভ সশস্ত্র যুদ্ধের চেয়ে ভয়ানক হয়ে থাকে। ইন্তিফাদা নিষ্ঠুর নিপীড়নে দমন করা হলে মধ্যপ্রাচ্যসহ সারা পৃথিবীতে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের আত্মঘাতী হামলা বৃদ্ধি পেতে পারে।

zeauddinahmed@gmail.com

(লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও সিকিউরিটি প্রিন্টিং কর্পোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক)

আজকের (১৪ জানুয়ারী, ২০১৮) তারিখে দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত উপসম্পাদকীয়।