নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে ব্যস্ততম একটি বাস টার্মিনালে অতি সম্প্রতি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর অভিযোগে ২৭ বছর বয়সী আকায়েদ উল্লাহ নামের একজন বাঙালি মুসলমানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পোর্ট অথরিটি বাস টার্মিনাল বিশ্বের ব্যস্ততম একটি টার্মিনাল; প্রতি বছর প্রায় সাড়ে ছয় কোটি যাত্রী এই বাস টার্মিনাল ব্যবহার করে থাকে। বোমা ফাটিয়ে বেশি লোককে হতাহত করতে আকায়েদ জনবহুল এই স্থানটি বেছে নেয়। লোকদের জখম করার জন্য সময়টাও উত্তম, সকাল সাড়ে সাতটা, লোকজন অফিসে যাওয়ার জন্য ঐ বাস টার্মিনালে তখন জড় হয়ে থাকে। কিন্তু বিস্ফোরণের হিসাব-নিকাশে হেরফের হওয়ায় আকায়েদ উল্লাহ নিজের বোমায় নিজেই বেশি আহত হয়েছে; আহত অন্য তিন জনের অবস্থা তত গুরুতর নয়।

আকায়েদ উল্লাহ পেশায় ট্যাক্সিচালক। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা আকায়েদ বাংলাদেশ থেকে সাত বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিলো। থাকে নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে; ব্রুকলিনে অধিকাংশ বাঙালি ট্যাক্সিচালকের বাসস্থান। আকায়েদ থাকত ভূগর্ভস্থ একটি প্রকোষ্ঠে, দোতলায় থাকেন তার বোন। তার ভাইও থাকেন একই ভবনে। প্রতিবেশীদের বক্তব্য মোতাবেক তাদের পরিবারের সদস্যগণ অন্তর্মুখী স্বভাবের; কারও সঙ্গেই খুব একটা কথা বলত না। তবে তাদের পরিবারে ইসলামিক রীতিনীতি পরিপূর্ণভাবে পরিপালিত হতো। এই হামলা পূর্বপরিকল্পিত ও আইএস দ্বারা অনুপ্রাণিত বলে মনে করা হচ্ছে। বোমা তৈরির কৌশল সে রপ্ত করেছে ইন্টারনেটে বোমা তৈরির ভিডিও দেখে। তার ব্যবহৃত বোমার নাম 'পাইপ বোমা'। ২০১৩ সনে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভে আরেকটি হামলা চালিয়েছিল ২১ বছর বয়েসী একজন অভিবাসী বাংলাদেশি মুসলমান। ২০০৯ সনে নিদাল মালিক হাসান নামের এক মুসলমান সৈনিক ১৩ জন আমেরিকান সেনাকে গুলি করে হত্যা করে ও ৩০ জনকে আহত করে। এ ঘটনায় অভিবাসী মুসলমানদের আর মার্কিন সেনাবাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না সন্দেহ। স্পেনে বারবার সন্ত্রাসী হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উগ্র ইসলামপন্থীদের শায়েস্তা করতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক মার্কিন জেনারেলের নৃশংস পদ্ধতি থেকে শিক্ষা নেবার পরামর্শ দিয়েছেন।

বাঙালি মুসলমানদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি সুনাম ছিলো। সন্ত্রাস আর বিদ্রোহের দুর্যোগকবলিত দেশগুলোতে শান্তি স্থাপনে সহায়তাকারী হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রথম পছন্দনীয় দেশ। যে দেশের লোক বিশ্বে শান্তি স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে সেই দেশের লোক যদি শুধু ধর্মীয় অনুভূতির একাত্মতায় নিরীহ অন্য ধর্মাবলম্বীদের মারতে পাইপ বোমা ফাটায় তখন বাঙালি মুসলমানদের ভাবমূর্তি বলে আর কিছু থাকে না। বহুদিন পূর্বে এক মার্কিন রাষ্ট্রদূত তো 'মডারেট মুসলমান' বলে বাঙালিকে খুশী করার চেষ্টা করেছিলো, যদিও এ ধরনের উপাধি অপমানজনক। বলা হয়, বাঙালিরা ধর্মপ্রাণ হলেও ধর্মান্ধ নয়। কথাটি কথার কথা। কারণ সাম্প্রতিককালে সংঘটিত অনেকগুলো ঘটনা বাঙালি মুসলমানের কপালে কলঙ্কের তিলক পরিয়ে দিয়েছে। হলি আর্টিজানের রোমহর্ষক ঘটনায় বাঙালির ধর্মান্ধতা নিয়ে বিশ্ববাসীর দ্বিধাদ্বন্দ্ব কেটে গেছে। বিশ্ববাসী জানলো, বাঙালি মুসলমানেরাও ধর্ম ও ধর্মীয় অনুভূতির কারণে জীবন দিতে ও নিতে পারে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে'কে হত্যা পরিকল্পনার অভিযোগে সম্প্রতি নাইমুর জাকারিয়া রহমান নামে বিশ বছর বয়সী এক বাংলাদেশিকে লন্ডন থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার সহযোগী ছিল পাকিস্তানি তরুণ মোহাম্মদ আকিব ইমরান। সাম্প্রতিক সময়ে লন্ডনে বারবার সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় লন্ডনবাসীরাও মুসলমানদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছে। ওয়েস্টমিনিস্টার ব্রিজ এলাকায় এক ব্যক্তি এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করে পাঁচজনকে হত্যা করে, একটি কনসার্টে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২২ জন নিহত হয়, লন্ডন ব্রিজ এলাকায় পথচারীদের উপর সন্ত্রাসীদের গাড়ি তুলে দেওয়া ও ছুরি হামলায় নিহত হয় ১১ জন। আসন্ন বড়দিনে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনায় গ্রেফতার হয়েছে ৪ জন। লন্ডনে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কোন মুসলমান পথচারীকে দেখলেই অন্য পথচারীরা এখন আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।

ইউরোপের মধ্যে ফ্রান্সে সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটেছে সবচেয়ে বেশি। 'আল্লাহু আকবর' ধ্বনি দিয়ে এক ব্যক্তি ছুরিকাঘাত করে একটি রেলস্টেশনে একজন নারীর গলা কেটে হত্যা করেছে এবং আরেকজনের শরীরের বিভিন্ন অংশে ছুরিকাঘাত করেছে। ফ্রান্সের নিস শহরে বাস্তিল দিবসের উৎসবে জড়ো হওয়া জনতার ওপর লরি নিয়ে হামলা চালানো হলে ৮৪ জন নিহত হয়। ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে একযোগে কয়েকটি স্থানে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছে ১৩০ জন। তুরস্কের একটি বিমানবন্দরে সন্ত্রাসী হামলায় ৪৫ জন নিহত হয়েছে। বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসের একটি ব্যস্ততম বিমানবন্দর ও মেট্রোরেল স্টেশনে সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয়েছে ৩৫ জন। স্পেন, ফিনল্যান্ড, রাশিয়ায় পথচারীদের উপর সন্ত্রাসী আক্রমণ সাম্প্রতিককালের ঘটনা। সিডনি শহরে ১৩ জন অস্ট্রেলিয়ানকে জিম্মি করা হয়েছিলো এক সময়। প্রায় সব হামলারই দায় স্বীকার করেছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট বা আইএস। এর ফলাফল কিন্তু সুখকর নয়। মুসলমানদের এই সব উপর্যুপরি আক্রমণে ইউরোপে উগ্র ডানপন্থীদের দ্রুত উত্থান ঘটছে এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি বাড়ছে। এই উগ্র ডানপন্থী দলগুলো অভিবাসন ও মুসলিমবিরোধী।

প্রতিটি ঘটনায় আমরা নিন্দা জানাচ্ছি। অন্যদিকে শুধু হয়রানি থেকে বাঁচার জন্য নিউইয়র্ক ও লন্ডনের বাঙালিরা দফায় দফায় বৈঠক করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কঠোর নিন্দা জানাচ্ছে। নিউইয়র্কে বাংলাদেশি আমেরিকান পুলিশ অ্যাসোসিয়েশনও এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। কিন্তু এসবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন গলেনি। অভিবাসন আইনের পরিবর্তন যে অত্যন্ত জরুরি তা ট্রাম্প মার্কিনীদের পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন— অভিযুক্ত হামলাকারী আকায়েদ চেইন মাইগ্রেশন সুবিধা নিয়ে পারিবারিক অভিবাসন ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছে। এই নীতি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য বেমানান। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশি অভিবাসীরা এমনিতেই উদ্বিগ্নের মধ্যে দিনাতিপাত করছিলো, তার মধ্যে আকায়েদের সন্ত্রাসী ঘটনা বাঙালিদের আরও ভীত করে তুলেছে। কারণ এমনিতেই ট্রাম্প প্রশাসন মুসলিম অভিবাসীদের বিরুদ্ধে। বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে সকল বাঙালি মুসলমান এই সকল সন্ত্রাসী ঘটনায় বিব্রত। বৈধ কাগজপত্র থাকলেও বাঙালি মুসলমান জানে, দেশটি তাদের নয়। দেশের অর্থনীতির চালক তারা কখনো হতে পারবে না; চাকরিতে বাঙালি মুসলমানদের নিয়োজিত করার নিশ্চয়তা প্রতিটি সন্ত্রাসী ঘটনার সাথে সাথে তিরোহিত হচ্ছে। অন্যদিকে যারা বৈধ হওয়ার চেষ্টা করছে তাদের সেই চেষ্টা বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে; বৈধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসে অনেকে ঝুলে যেতে পারে।

আকায়েদ উল্লাহ’র বাবা প্রয়াত মো. সানাউল্লাহ একজন মুক্তিযোদ্ধা। গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয়ে, স্বজনদের উপর নির্যাতন হতে পারে এমন আশঙ্কায় মুক্তিযোদ্ধারা হাতের নাগালে পেয়েও পাকিস্তানি সৈন্য বা রাজাকারদের অনেক সময় আক্রমণ করেনি। অথচ একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হয়েও ধর্মীয় উন্মাদনায় অন্ধ হয়ে সব বাঙালিদের ক্ষতি করলো আকায়েদ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য দুয়েকজন আকায়েদই যথেষ্ট।

মনে হচ্ছে, বাঙালি নতুন পরিচয়ে বিশ্বে পরিচিত হতে চলেছে। মডারেট বাঙালি মুসলমান এখন বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত, ধর্ম হয়ে উঠছে জাতীয়তাবাদের মূলমন্ত্র। ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদের জন্য বাঙালি মুসলমান এখন মরতে শিখেছে; জিহাদের নামে আফগানিস্তানের তালেবান আর মধ্যপ্রাচ্যের আইসিস-এ যোগ দিয়েছে। আশ্চর্য হই তখন যখন শুনি লন্ডনপ্রবাসী শিক্ষিত বাঙালি মুসলমান নারীরা যুদ্ধরত ক্লান্ত আইএস-দের উৎফুল্ল করতে স্বেচ্ছায় বউ হওয়ার জন্য নানা দেশের বিপদসঙ্কুল পথ পাড়ি দিয়ে সিরিয়ায় পৌঁছে। জিহাদি এই বধূদের চেহারা উন্মোচনের জন্য পাশ্চাত্যের মিডিয়াগুলো দরাজ গলায় বারবার ঘোষণা দিয়েছে। বাঙালি ললনার কোমল মন জেহাদি তাড়নায় কঠোর হয়েছে। আমরা যারা ধর্মান্ধ তারা বাঙালি ললনাদের এইরূপ আত্মত্যাগে যারপরনাই খুশী। বাঙালি মুসলমানের এই চরিত্রটি ঢেকে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা বারবার হিংসাত্মক আক্রমণে ব্যর্থ হয়েছে। উন্মোচিত হচ্ছে বাঙালি মুসলমানের নতুন চরিত্র 'উগ্রতা'। শান্তিপ্রিয়, আইন মানায় অভ্যস্ত বাঙালি মুসলমান অশান্ত হয়ে উঠেছে। তাই তো মুক্তিযোদ্ধার সন্তান মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধে উজ্জীবিত হয়ে ভিন্নধর্মের লোকদের মারার জন্য কোমরে পাইপ বোমা বাঁধতে কুণ্ঠিত হয় না। এখন আর অসাম্প্রদায়িক মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাঙালি পরিচয়টি মুখ্য নয়, মুখ্য হচ্ছে মুসলমান বাঙালি।

নিন্দনীয় সহিংস সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হোলি আর্টিজানের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনা দিয়ে শুরু হলেও এখনো থামেনি। একই বাঙালি মুসলমান যখন বিদেশেও ধর্মের নামে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’কে হত্যার পরিকল্পনা করে কিংবা ম্যানহাটনের জনবহুল বাস টার্মিনালে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে তখন কি বাঙালিরা মডারেট মুসলমান বলে মার্কিন দূতের বক্তব্য বিশ্ববাসীর নিকট গ্রহণযোগ্য হবে? এদেশে সুফি সম্প্রদায়ের শান্ত, নম্র আচরণ অন্য ধর্মাবলম্বীদের মুসলমান হতে অনুপ্রাণিত করেছে। সেই মুসলমান এখন আমরা উগ্রবাদী অভিধায় অভিহিত হচ্ছি। শান্তির ধর্ম ইসলাম এখন ভিন্নরূপ নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছে। অতি কথিত অসাম্প্রদায়িক মননের বাঙালি এখন আর পহেলা বৈশাখের বাঙালি থাকছে না। সম্প্রদায়-প্রীতি এখন অভিবাসী বাঙালিদের বিপদে ফেলছে; বিদেশে বাঙালি চাকুরী হারাচ্ছে, তাদের আয়ের পথ রুদ্ধ হচ্ছে, অন্য দেশের নাগরিকত্ব লাভের লালিত বাসনা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে। সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও চেতনার অকালমৃত্যু এভাবে ডেকে আনছি।

ইদানীং দেশে বিদেশে বাঙালি মুসলমানের একটি নতুন ধর্মীয় পরিচয় তৈরি হচ্ছে যা নবপ্রজন্মের জন্য সম্ভাবনাময় দেশগুলো দুর্গম ও দুর্ভেদ্য হয়ে উঠছে। কোন মুসলমান দেশে অন্য কোন দেশের মুসলমানের স্থায়ীভাবে বসবাসের কোন সুযোগ নেই, সুযোগ আছে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর দেশগুলোতে। কিন্তু ঐ দেশগুলোর পর্যাপ্ত উর্বর ভূমি বাঙালি মুসলমানদের জন্য কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে উঠছে। তাই বলে ঐ দেশগুলোতে লোক নেয়া বন্ধ হচ্ছে না; শূন্যস্থান পূরণ হবে মুসলমান ব্যতীত ভিন্ন ধর্মের লোক দ্বারা। ক্ষতিটা হচ্ছে মুসলমানের। ইদানীং একটি কট্টর গোষ্ঠী পশ্চিমা দেশগুলোতে তৈরি হয়েছে যারা মুসলমান পোশাক-পরিচ্ছদ দেখলেই ঘৃণা প্রকাশ করে থুতু ছিটাচ্ছে, সম্ভব হলে মুসলমানদের সংস্পর্শ এড়িয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমে এইরূপ ইসলাম-বিদ্বেষ দিন দিন বাড়ছে; লন্ডনে উগ্র যুবকেরা হিজাব পরা পথচারী মেয়েদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দৌড়ে পালাচ্ছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে পাশ্চাত্যে শুধু নিরাপত্তার কারণে বোরকা, নেকাব বা হিজাব এবং চেহারা আবৃত রাখে এমন সব পোশাক পরিধানে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হচ্ছে। জিহাদি হামলা ঠেকাতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ সেনেগালের সরকার সেদেশে মহিলাদের বোরকা পরা নিষিদ্ধ করার কথা ভাবছে। নাইজেরিয়াভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী বোকো হারামের হুমকির মুখে সেনেগালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোরকা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কঙ্গোতে প্রকাশ্যে হিজাব ও বোরকা পরা নিষিদ্ধ করার সাথে সাথে মুসলমানের মসজিদে ঘুমানোও নিষিদ্ধ করেছে। সরকারের অভিযোগ হচ্ছে, হিজাব এবং বোরকা পরে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো সহজ। তুরস্ক, সিরিয়া ও তিউনেশিয়ায় দীর্ঘদিন বোরকা নিষিদ্ধ ছিলো।

বিদেশে বিমানবন্দরের হেনস্তার কথা আমরা সবাই জানি; বাংলাদেশের সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই ঘণ্টাখানিক নাড়াচাড়া না করে কাউকে প্রবেশানুমতি দেওয়া হয় না। পাসপোর্ট পরীক্ষার সময় যেভাবে বাঙালিদের দিকে বারবার তাকায় তাতে নিজেদের অপরাধী মনে হয়। পাকিস্তানি বা আফগান পাসপোর্টধারীদের মতো সবুজ পাসপোর্টধারী বাঙালি মুসলমান দেখলেই বিদেশিরা সন্দেহ ও ভয়ে আতঙ্কিত হয়ে উঠছে। শুধু মুসলমান নামের কারণে বোম্বের সিনেমার নায়ক শাহরুখ খানকে বহুবার এবং ভারতের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট এপিজে আবদুল কালামকে একবার দীর্ঘক্ষণ মার্কিন বিমানবন্দরে আটক রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

অভিবাসনবিরোধী ট্রাম্পের নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই আশ্রয়প্রার্থী বাঙালিরা হতাশায় অস্থির। পরিবারের একজন সদস্য আশ্রয় পেলে অন্য সদস্যদেরও আশ্রয় পাওয়ার আইনগত অধিকার মার্কিন কর্তৃপক্ষ অস্বীকার করতে পারতো না। আকায়েদের ঘটনা অবহিত হয়েই ট্রাম্প এই সুযোগের অপব্যবহার সম্পর্কে তার পূর্বের অবস্থানের যৌক্তিকতা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। হাজার হাজার বাঙালি অভিবাসীর আশ্রয়-আবেদনের সুরাহা না হওয়ায় বহু বছর ধরে দেশের আত্মীয়-পরিজন থেকে তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে। এই সকল বাঙালিদের নেই কোন ভালো কাজ, নেই চিকিৎসাব্যবস্থা, নেই আবাসন, নেই জীবনের নিশ্চয়তা। শত শত ছাত্র-ছাত্রী শুধু আর্থিক সচ্ছলতার প্রত্যাশায় বিদেশে পাড়ি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু আর কয়েকজন আকায়েদের উদ্ভব হলে ষোল কোটি মানুষ অল্প সময়ে বত্রিশ কোটিতে বর্ধিত হয়ে ছোট্ট এই ভূখণ্ড বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে, বিদেশের অফুরন্ত সুযোগ ভোগ করবে অন্য দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা। বিজয়ের ৪৬ বছর পূর্তিতে জঙ্গিমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ঘোষিত হয়েছে। কিন্তু সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্সও বিশ্বের সাথে বাঙালি মুসলমানের বিচ্ছিন্নতা রোধ করতে পারবে কি না সন্দেহ।