সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রতিদিন রোডেশিয়ার মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা রবার্ট মুগাবের ছবি আমাদের উদ্বেলিত করত। শ্বেতাঙ্গদের অধিকারভুক্ত রোডেশিয়াকে স্বাধীন করতে কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রামকে বিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামরূপে আমাদের কাছে প্রতিভাত হতো।

৩৭ বছর রাজত্ব করে অতি সম্প্রতি জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্ট সেই রবার্ট মুগাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন মুগাবের এককালের ঘনিষ্ঠতম সহকর্মী এমারসন নাঙ্গাগোয়া। নির্বাচনকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় থাকার নানাবিধ কৌশল প্রয়োগের কারণে রবার্ট মুগাবেকে একনায়কতান্ত্রিক বা স্বৈরাচারী শাসক বলা যায় কি না জানি না। ইতিহাসে আমরা স্বৈরশাসক হিসেবে হিটলার, বেনিতো মুসোলিনি, আগুস্তো পিনোশে, মুয়াম্মার গাদ্দাফি, জেনারেল ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো, ইয়াহিয়া জামেহ, চিয়াং কাইশেকদের নাম জানি। তবে এদের সবার শাসনকাল ও পতনের পরিণতি এক রকম নয়। এককালের জনপ্রিয় নেতা ৯৩ বছরের রবার্ট মুগাবের প্রস্থান স্বাভাবিক ছিল না। শপথ অনুষ্ঠানে এমারসন নাঙ্গাগোয়া রবার্ট মুগাবেকে নিজের পিতা হিসেবে উল্লেখ করলেও তার ক্ষমতাচ্যুতিতে জিম্বাবুয়ের জনতা কিন্তু উল্লাসে রাস্তায় নেমে পড়েছিল।

ব্রিটেনের শ্বেতাঙ্গ মানুষের শাসন থেকে মুক্তি লাভের সংগ্রামী নেতা রবার্ট মুগাবে ১৯৬৪ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ১০ বছর রোডেশিয়ার কারাগারে বন্দী ছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েই তিনি মোজাম্বিকে পালিয়ে যান এবং রোডেশিয়ার স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করেন।

আফ্রিকার এ দেশটি ক্রিকেটের বদৌলতে বাংলাদেশের সবার কাছেই পরিচিত। জিম্বাবুয়ের নাম ছিল রোডেশিয়া। একজন শ্বেতাঙ্গ সিসিল রোডসের নাম অনুসারে এই অঞ্চলটির নাম হয় রোডেশিয়া। পৃথিবীতে আরেকটি দেশ সৌদি আরবও একজন ব্যক্তির নামে হয়েছে। ১৯৮০ সালে শ্বেতাঙ্গদের হাত থেকে মুক্তি লাভের পর কৃষ্ণাঙ্গরা দেশের নাম দেন জিম্বাবুয়ে।

জিম্বাবুয়ের রক্তপাতহীন বিদ্রোহে সেনাবাহিনী জিতলেও তারা ক্ষমতার ভাগীদার হয়নি, মুগাবের প্রতি আক্রমণাত্মক ব্যবহারও করেনি। ৪১ বছরের কনিষ্ঠ স্ত্রী গ্রেস নোটোম্বিজদাকে তার উত্তরাধিকারী করতে গিয়ে মুগাবে নিজের বিপত্তি ডেকে আনেন। মুগাবের দীর্ঘদিনের সহকর্মী এমারসন নাঙ্গাগোয়াকে সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ থেকে সরিয়ে তার বউকে ভাইস প্রেসিডেন্ট করায় সেনাবাহিনী ক্ষেপে উঠে। পরিস্থিতি মানুষকে কত দ্রুত পাল্টে দিতে পারে তা জিম্বাবুয়ের সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যায়। মুগাবের স্ত্রীকে যারা ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কিছুদিন পূর্বে নির্বাচন করল তারাই সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপে পরমুহূর্তে বিপক্ষে চলে গেল। আরও বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, যিনি এখন প্রেসিডেন্ট হলেন তিনি যুগ যুগ ধরে রবার্ট মুগাবের সব অপকর্মের ডান হাত ছিলেন। জনগণ এমারসন নাঙ্গাগোয়াকে এখন আবার সমর্থনও দিচ্ছে।

সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গদের অবৈধ শাসন থেকে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মুক্ত করতে গিয়ে প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭ বছর জেল খেটেছেন। জনগণের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েও তিনি তার শাসন দীর্ঘায়িত করেননি বলে শুধু নিজ দেশে নয় ম্যান্ডেলা সারা বিশ্বের জননন্দিত নেতা। জীবনে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কারসহ ২৫০টি পুরস্কারে ভূষিত হন। রবার্ট মুগাবে দেশের ক্ষমতা নিজের হাতে রেখেও যদি জিম্বাবুয়ের অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারতেন তাহলে হয়তো তার পতনে জনগণ উল্লাস করতেন না। বিগত প্রায় ২০ বছর ধরে জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে ভয়াবহ মন্দা বিরাজ করছে। তার শাসনামলে দেশটির অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে অগণিত মুদ্রা ছাপিয়ে বাজারে ইস্যু করেছে; এ অতিরিক্ত মুদ্রা ইস্যু করার কারণে নিজেদের মুদ্রা পরিশেষে নিছক সাদা কাগজে পর্যবসিত হয়ে পড়ে। জনগণের কাছে নিজস্ব মুদ্রার কোন কদর না থাকায় জিম্বাবুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০০৮ সালের পর থেকে আর কোন মুদ্রা ছাপায়নি।

আমি ইন্দোনেশিয়ায় একটি ডাব খেয়েছি ষাট হাজার রুপিয়ার বিনিময়ে, একটা শার্ট কিনেছি সাত লাখ রুপিয়া দিয়ে। অনুরূপ অবস্থা দেখেছি উজবেকিস্তানে। একশ’ মার্কিন ডলারের বিনিময়ে পেয়েছিলাম নব্বই হাজার উজবেকিস্তানি ‘সোম’। তাই বলে জিম্বাবুয়ের মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে অন্য কোন দেশের তুলনা চলে না। আমাদের দেশে ১০% মুদ্রাস্ফীতিতে গরিবদের নাভিশ্বাস উঠে যায়; অথচ জিম্বাবুয়ের মুদ্রাস্ফীতির বর্তমান হার হচ্ছে ১১,০০০০%।

১৯৩০ সালে বিশ্বমন্দায় জাপানে অনুরূপ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল; এক বস্তা ইয়েন দিয়ে একটি সিগারেট পাওয়া যেত। মুদ্রাস্ফীতির এ অবস্থায় জিম্বাবুয়ে সরকার বারবার তাদের সর্বোচ্চ নোটের মূল্যমান বাড়িয়েছে। পরে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, নোটের বর্ধিত মূল্যমানের শূন্য দিতে দিতে সারা নোট ভরে যেত। আমাদের সর্বোচ্চ মূল্যমানের নোট হচ্ছে ১০০০ টাকা। জিম্বাবুয়ের সর্বোচ্চ নোটের মূল্যমান হচ্ছে ১০০ বিলিয়ন ডলার। একটা নিবন্ধে দেখলাম, ১০০ বিলিয়ন ডলার দিয়ে ৩টি ডিম বা ১টি টি-শার্ট পাওয়া যায়। লাগামহীন এ মুদ্রাস্ফীতির কারণে জিম্বাবুয়ে সরকার বাধ্য হয়ে নিজ দেশের মুদ্রা বাতিল করে ২০০৯ সালেই মার্কিন ডলার আর দক্ষিণ আফ্রিকার মুদ্রা রান্ড ব্যবহার শুরু করে।

জিম্বাবুয়ে উৎপাদনের বিপর্যয়কর অবস্থাও মুদ্রাস্ফীতির অন্যতম কারণ। বাংলাদেশের জিডিপি বা দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি বহু বছর ধরে ৬%-এর উপরে যা এখন ৭% উন্নীত হয়েছে। ভারত ও চীনের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি। অথচ জিম্বাবুয়ের দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির হার বহু বছর ধরে নেতিবাচক; প্রবৃদ্ধি কমতে কমতে ২০০৫ সনে ১৬ শতাংশে নেমে যায়।

জিম্বাবুয়ের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ৯০০ কোটি ডলার। ঋণের সুদ ও কিস্তি পরিশোধ করতে না পারার কারণে এখন আর কেউ ঋণ দিতে আগ্রহী হচ্ছে না। জিম্বাবুয়ে কোন লোকের হাতে বা ব্যাংকে ৩৫,০০,০০,০০,০০,০০,০০,০০০ জিম্বাবুয়ে ডলার থাকলে তার বিনিময়ে তিনি পাবেন মাত্র ১ মার্কিন ডলার। আমরা জানি কাতারের মাথাপিছু আয় সবচেয়ে বেশি; ৮৭,৭১৭ ইউএস ডলার। আমাদের বাংলাদেশে মাথাপিছু আয় ১৬১২ মার্কিন ডলার। অথচ বিশ্বের সর্বনিম্ন মাথাপিছু আয়ের দেশ জিম্বাবুয়ের মাথাপিছু আয় মাত্র ৯ মার্কিন ডলার।

দেশটির এ চরম মন্দার জন্য দুর্নীতি এবং ভূমি সংস্কারকে দায়ী করা হয়। সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গরা জিম্বাবুয়ের কৃষি উপযোগী জমিগুলো দখল করে রেখেছিল। রবার্ট মুগাবের সরকার শ্বেতাঙ্গদের কাছ থেকে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে প্রকৃত চাষিদের মধ্যে বণ্টন না করায় উৎপাদনে ধস নামে। সরকারের কর্তারা যখন অপরাধ করে তখন অন্য প্রভাবশালীরাও তার সুযোগ নিয়ে থাকে। কৃষিজমিগুলো শ্বেতাঙ্গদের হাতবদল হয়ে সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাতে চলে যায়; কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে সেনাবাহিনী বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্পর্ক না থাকায় জমিগুলো পতিত অবস্থায় পড়ে থাকে। ফলে শ্বেতাঙ্গরা যে উৎপাদন করত তাও বন্ধ হয়ে যায়।

রবার্ট মুগাবের সরকারের আরেকটি অপকর্ম দুর্নীতি। তবে দুর্নীতির জন্য কোন দেশের অবস্থা এত মন্দ হওয়ার কথা নয়। দুর্নীতি কম-বেশি সব দেশেই হয়। একবার কোথাও যেন পড়েছিলাম যে, ইন্দোনেশিয়ায় ঘুষ গ্রহণ করে ঘুষগ্রহীতা রশিদ দিয়ে থাকে। দুর্নীতির অর্থ দেশের অভ্যন্তরে বিনিয়োগের ব্যবস্থা সরকারই মাঝে মাঝে করে থাকে। দুর্নীতির অর্থ বিদেশে পাচার হলেই মুশকিল। জিম্বাবুয়ে দুর্নীতির জন্য মুগাবেকে সরাসরি কেউ দায়ী করেনি। কিন্তু শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার অভিপ্রায়ে ক্ষমতার আশপাশের লোকদের দুর্নীতিতে প্রশ্রয় দেওয়া নিজের দুর্নীতির চেয়েও বড় অপরাধ। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সৎ অভিধায় ভূষিত হলেও বাগে রাখার কৌশল হিসেবে আমলা ও জেনারেলদের দুর্নীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদ্রূপ মুগাবের ক্ষমতার আশপাশের সবগুলো লোকও দুর্নীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ছিলেন।

রবার্ট মুগাবের সেই ঘোষণা ‘ঈশ্বরই শুধু আমাকে ক্ষমতা থেকে সরাতে পারে’— এতদিন পর বাস্তবায়িত হলো। কিন্তু অধিষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট তো মুগাবেরই চেলা; নতুন প্রেসিডেন্ট ইতিহাসের শিক্ষা নিলে জিম্বাবুয়ে বাঁচবে।