ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ইন্তেকাল করেছেন। তিনি বিগত দুই মাস ধরে মস্তিষ্কের রক্তনালীতে প্রদাহজনিত রোগে ভুগছিলেন। তিনি গত জুলাই মাসে সপরিবারে ব্যক্তিগত সফরে লন্ডনে গিয়ে হাসপাতালে চেকআপ করান; চেকআপ শেষে বাসায় ফিরে জ্ঞান হারিয়ে ফেললে আবার হাসপাতালের নেয়া হয়। এক সময় শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আনিসুল হককে লাইফ সাপোর্টও দেওয়া হয়। এত প্রচেষ্টায়ও একজন স্বপ্নদ্রষ্টাকে বাঁচানো গেল না।

স্বপ্নদ্রষ্টা আনিসুল হক তার ঘোষিত, অঘোষিত পরিকল্পনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তারপরও ঢাকার মানুষ তার মধ্যে নিজেদের হতাশা নিরসনের সফল নায়কের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল। একজন ব্যক্তির অন্তর্ধানে মানুষ যে কীভাবে শোকাভিভূত হয় তার প্রমাণ আজকের ফেসবুক।

আনিসুল হকের মৃত্যুতে দেশবাসী শোকাহত। স্ত্রীর সিরিয়াল দেখার নেশায় প্রতিদিন আমার নিয়মিত খবরও শোনার সুযোগ হয় না। গতকাল হঠাৎ দেখি আমার স্ত্রী সিরিয়াল বাদ দিয়ে খবর শুনছে, বিস্মিত হয়ে টেলিভিশনের দিকে মুখ ফিরিয়ে দেখলাম, খবরে মেয়রের মৃত্যুসংবাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে বিশ্বাস হয়নি; কারণ ফেসবুকে তার মৃত্যুসংবাদ ইতঃপূর্বে বহুবার পেয়েছি। কিছু লোকের বানানো গল্পে তার পালিয়ে যাওয়ার কাহিনী প্রচার করাও হয়েছে। চা দোকানে একটি দলের অন্ধ সমর্থক গলাবাজি করছিল এই বলে যে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লন্ডনে গিয়ে মেয়রের হদিশ পাননি। তার পরিবারের সদস্যদের আকুতিতে পরবর্তীতে আর ভুয়া মৃত্যুসংবাদের পোস্ট দেওয়া বন্ধ হয়।

সকালে ঘুম থেকে উঠে মোবাইল হাতে নিয়ে ফেসবুক খুলেই পেলাম প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে শোকাতুর বউয়ের স্ট্যাটাস। লাইক দিয়ে এগোতে গিয়ে দেখি, সবগুলো স্ট্যাটাসে মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে শোক ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। শুধু শোক নয়, প্রত্যেকের ফেসবুকের ওয়াল ভরে গেছে আনিসুল হকের বন্দনায়। মেয়র আনিসুল হক যে কত জনপ্রিয় তা অবশ্য তিনি জীবিত থাকাকালীন দেখে যেতে পারেননি। শবদেহের নাকি কোন দোষ থাকে না, সবই গুণ। কিন্তু গুণের প্রশংসা কোন জীবিত মানুষকে করা হলে সেই ব্যক্তি অবশ্যই গুণগুলোর বিকাশে আরও উৎসাহী ও উজ্জীবিত হতো। আমাদের দেশে অধিকাংশ পুরস্কার আর খেতাব দেওয়া হয় মৃত ব্যক্তিকে। আমরা জানি, নোবেল পুরস্কার কোন মৃত ব্যক্তিকে দেওয়া হয় না।

আনিসুল হক বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী ছিলেন; উপস্থাপক, সফল ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শিল্পপতি, সংগঠক, রাজনীতিবিদ। ২০১৫ সনে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পূর্বে তিনি বিজিএমইএ এবং এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি ছিলেন। এক সময় তিনি সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিআইপিপিএরও সভাপতি ছিলেন।

আমেরিকান মানবাধিকারকর্মী মার্টিন লুথার কিং আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের স্বপ্ন দেখাতে গিয়ে পৃথিবীতে প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন, ‘আমার একটি স্বপ্ন আছে’। স্বপ্নের কথা বলে কৃষ্ণাঙ্গদের আশান্বিত করতে গিয়ে মার্টিন লুথার কিং শ্বেতাঙ্গের গুলিতে জীবন দিয়েছেন। তদ্রূপ আনিসুল হক মেয়র নির্বাচনের মাঠে ঢাকা উত্তরবাসীদের স্বপ্ন দেখতে আহ্বান করেছিলেন। তিনি নিজে যে আকাশছোঁয়া নান্দনিক স্বপ্নের বুনন করেছিলেন মেয়র হয়ে তার বাস্তবায়নে দিনরাত পরিশ্রম করে গেছেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট ছাত্রছাত্রীদের কনভোকেশনে বলেছিলেন, ‘স্বপ্ন জীবনের সমান, কখনো কখনো জীবনের চেয়েও বড়’।

ঢাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাপ্রসূত ধারণা হচ্ছে, ঢাকা শহরের সমস্যা দূরীকরণযোগ্য নয়; এই শহরে সমস্যা ক্রমপুঞ্জীভূত হয়ে জগদ্দল পাথরের মতো দাঁড়িয়ে থাকবে, এগুলো সরানো কারো বাপের সাধ্য নেই। পৃথিবীর অপরিচ্ছন্ন ও বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয়। এ শহরের অধিকাংশ এলাকায় অ্যাম্বুলেন্স ঢোকার অবস্থা নেই, রাস্তা চলাচলের উপযোগী নয়, অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম, খাবার পানির জন্য হাহাকার, সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতায় নৌকা চলে, ফুটপাত হকারের দখলে, ফুটপাতের চাঁদায় মাস্তান কোটিপতি, খাল দখল করে ভবন নির্মাণ, অননুমোদিত যানবাহনের রাস্তা দখল, ভাসমান মানুষের মিছিল, ফুটপাতে মলমূত্রের দুর্গন্ধ, ময়লা-আবর্জনায় রাস্তা-ঘাট সয়লাব। ঢাকাবাসী জানে, হাজারো সমস্যার সমাধান অতীতে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। একটি সংস্থার মালিকানা ও তদারকিতে থাকা সত্ত্বেও খাল কীভাবে ভরাট হয়ে সুরম্য অট্টালিকায় পূর্ণ হয়ে গেল তার জবাব কোথাও নেই। আরেকটি প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও তদারকির ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কী করে ঢাকার সরু গলিতে বহুতল ভবন হলো— তার উত্তর কাউকে দিতে হয় না। এসব কারণে মেয়র আনিসুল হককে বাস্তবের জগত থেকে সরিয়ে মানুষকে স্বপ্নের মায়াময় জগতে নিয়ে যেতে হয়েছে। একই কারণে মেয়র আনিসুল হকের প্রদত্ত আশ্বাস ঢাকাবাসীর নিকট স্বপ্ন মনে হয়েছে।

মেয়র আনিসুল হক তার দেখা স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে উচ্চারণ করেছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে উত্তরের ফুটপাত এমনভাবে গড়া হবে যেন অন্ধজনও সহজে চলতে পারে। গুলশান, বনানীসহ কয়েকটি এলাকা দেখলে বোঝা যায় তিনি স্বপ্ন শুধু দেখেন না, অন্যদেরও তা দেখিয়ে ছাড়েন। তিনি দেখা স্বপ্নে ঢাকাবাসীকে আশ্বস্ত করে আরও বলেছিলেন, বাসযাত্রী ওঠানামায় শৃঙ্খলা আনা হবে, জনগণের চলাচলের সুবিধার্থে নতুন আরামদায়ক বাস দেওয়া হবে, কারওয়ান বাজারের পাইকারি বাজারকে নির্মিত ভবনে স্থানান্তরে উদ্যোগ নেয়া হবে, রাস্তাঘাটের বিশাল আবর্জনার স্তূপকে সম্পদে রূপান্তর করা হবে, মহাখালীর বাসস্ট্যান্ডের জট হ্রাস করা হবে, ঢাকা শহরে সবুজের সমারোহ থাকবে, নগর হবে অবৈধ বিলবোর্ডমুক্ত, হতদরিদ্র ও ছিন্নমূল শিশুদের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হবে, সিটি করপোরেশনে জন্য সুষ্ঠু প্রশাসন গড়ে তোলা হবে। এছাড়াও তিনি ঢাকাবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়ে বলেছিলেন, ঢাকা হবে মশামুক্ত, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সমৃদ্ধ, গড়ে উঠবে ফরমালিনমুক্ত বাজার ব্যবস্থা, সড়কগুলোকে করা হবে সিসি ক্যামেরার আওতায় সুরক্ষিত, নির্মাণ করা হবে পাবলিক টয়লেট।

তার স্বপ্ন বাস্তবায়নে স্বল্প সময়ে তিনি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২ হাজার ৭৬৭টি অস্থায়ী অবকাঠামো, ৫৪টি স্থায়ী স্থাপনা এবং ৪৫০টি স্থায়ী অবকাঠামো উচ্ছেদ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। জমি, ফুটপাত ও ভূমি উদ্ধার করা হয়েছে ৩ লাখ ৩৪ হাজার বর্গফুট। ১০টি স্থানে অবৈধ পার্কিং বন্ধ করা ছাড়াও বিভিন্ন দূতাবাসের দখলে থাকা ফুটপাত উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া যা করা হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, তেজগাঁও ও গাবতলীর ট্রাক পার্কিং অপসারণ, দুর্নীতিগ্রস্ত নিজের অফিসে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দুজন জ্যেষ্ঠ নির্বাহী প্রকৌশলীকে বরখাস্ত ও আরও দুজন প্রভাবশালী কর্মীর পদাবনতি করা, নির্ধারিত সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়া ও মানুষের চাহিদা অনুযায়ী সেবা প্রদানে কর্মচারী-কর্মকর্তাদের উদ্বুদ্ধ করা, ট্রাফিক জ্যাম হ্রাস করতে ইউলুপ নির্মাণ, গুলশান-বনানীতে ব্যয়সাশ্রয়ী শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাস চালু, অবৈধ ব্যানার-ফেস্টুন সরানো, শহরের বিভিন্ন স্থানে পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, ভাসমান মানুষদের জন্য অত্যাধুনিক টয়লেট নির্মাণ, ভেহিকল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালুকরণ, ময়লা-আবর্জনার সুষ্ঠু সংরক্ষণে মিনি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণ, মশা নিয়ন্ত্রণে হস্তচালিত স্প্রে মেশিন ও ফগার মেশিন ক্রয়।

স্বপ্নদ্রষ্টা আনিসুল হক তার ঘোষিত, অঘোষিত পরিকল্পনার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি। তারপরও ঢাকার মানুষ তার মধ্যে নিজেদের হতাশা নিরসনের সফল নায়কের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল। একজন ব্যক্তির অন্তর্ধানে মানুষ যে কীভাবে শোকাভিভূত হয় তার প্রমাণ আজকের ফেসবুক। বাসোপযোগী ঢাকা নির্মাণের জন্য মেয়র আমাদের কাছে কিছু সময় চেয়ে নিয়েছিলেন। আরও সময় দিতে ঢাকাবাসী রাজি ছিল। তার মৃত্যুতে ফেসবুকে যে সব আবেগায়িত কথা ছিল তার মধ্যে কয়েকটি এমন: ‘ওর চোখে আঁকা স্বপ্নে আমরাও যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলাম তা কি ও জানতে পেরেছিলো?’ ‘ঢাকার উত্তরের চেহারা উনি খুব অল্প সময়ে চেঞ্জ করে দিয়েছেন’; ‘স্বপ্ন দেখাতে শুরু করে মাঝপথে চলে গেলেন। আশায় বুক বেঁধেছিলাম, এইবার বুঝি ভালো কিছু হবে। হচ্ছিলও তাই, দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখেছি’; ‘আনিস ভাইয়ের ছিল মননশীল চিন্তা-চেতনা, সৃজনশীল ভাবনা ও নান্দনিক প্রতিভা। ৩০ মাস মেয়র থাকাকালীন রাজধানী ঢাকার মানুষ দেখেছে তার জীবনচরিতের সুকুমারবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ’; ‘সমাজে যখন নষ্ট মানুষ দিন দিন বেড়ে চলেছে, সে সময় আনিসুল হকের মতো ব্যক্তির বড় প্রয়োজন ছিল’; ‘আত্মীয় নয়— স্বজনও নয়! তবুও কিছু মানুষের মৃত্যুতে স্বজন হারানোর বেদনা অনুভূত হয়, কেন কে জানে!’; ‘...অথচ জীবিত অবস্থায় প্রিয় আনিসুল হক “মেয়র” হিসেবে তার সাফল্যের কথা তেমন কারও কাছেই শুনে যেতে পারেননি!’