ভুয়া ফেসবুক আইডিতে ধর্মসম্পর্কিত অবমাননাকর স্ট্যাটাস দেয়াতে সম্প্রতি রংপুরে সংঘটিত ঘটনায় হিন্দু অধ্যুষিত পাগলাপীর ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে, মালামাল লুট করা হয়েছে।
গঙ্গাচড়া থানার ওসি জিন্নাত আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননামূলক ছবি পোস্ট করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার জুমার নামাজের পর বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হলে প্রায় ১০ হাজার লোক লাঠিসোটা নিয়ে পরিকল্পিতভাবে হিন্দুদের বাড়িঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। অভিযোগ উঠেছে, টিটু রায় নামে ঐ এলাকার একজন হিন্দু ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর এই পোস্টটি দিয়েছে।
রামু, নাসিরনগরের ঘটনা তো এত সকাল বিস্মৃতির অতলে ডুবে যাওয়ার কথা নয়। রামু, নাসিরনগরের ঘটনাও ঘটেছিল ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে। ফেসবুকের স্ট্যাটাস ছাড়াও হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিতভাবে বারবার আক্রমণ চালানো হচ্ছে। গোপন ব্যালটে ভোট হলেও অনেকের ধারণা, সংখ্যালঘুরা নৌকায় ভোট দেয়। খুলনায় প্রয়াত আবদুস সবুর খান এবং চট্টগ্রামে প্রয়াত ফজলুল কাদের চৌধুরী তাই সংখ্যালঘুদের ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করে দিতেন। ২০০১ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মৌন সম্মতিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দুদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া হয়, নারীদের ধর্ষণ করা হয়। ২০১৪ সনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে-পরে হিন্দুদের উপর নির্যাতন হয়েছে।
মনে হচ্ছে, সবাই মিলে আমরা এগুলো বারবার ঘটতে দিচ্ছি। ধর্ম অবমাননার অভিযোগের ভিত্তিতে সৃষ্ট উন্মত্ত উত্তেজনার বিপক্ষে মত দেওয়ার ক্ষমতা কারো থাকে না; কারণ এতে গণতান্ত্রিক ভোট হারানোর প্রেক্ষিত তৈরি হওয়ার সম্ভাবনার উদ্ভব হয়। ফলে স্লোগান দিতে দিতে আগুন লাগানো আর মানুষ মারার আনন্দটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী উপভোগ্য হয়ে উঠে। এটা কেউ মিস করতে চায় না। তাই অবুঝ স্কুলছাত্রদেরও রংপুরে আগুন লাগানোতে উৎসাহী দেখা গেছে। কিন্তু যারা পরিকল্পনা করে তারা দূরে অবস্থান নিয়ে ইন্ধন জোগায়, আগুন লাগায় নির্বোধেরা, ধর্ষণ করে ঘাড়মোটা কামুকেরা। আমার পরিচিত একজন রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তির অভিমত হচ্ছে, ধর্মীয় আন্দোলন হবে ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞ ব্যক্তি দ্বারা; কারণ জ্ঞানী বা জানা ব্যক্তি জান দিতে চায় না।
মুসলমানের ওপর মায়ানমারের সেনা ও স্থানীয় রাখাইনদের বর্বর অত্যাচারে যারা কেঁদেছে তাদের কয়জন রংপুরের এই হিন্দু বাড়িঘরে আগুন লাগিয়েছে তার পরিসংখ্যান বের করা জরুরি। একটি সম্প্রদায়ের ওপর আরেকটি সম্প্রদায়ের অত্যাচারের মাত্রায় হেরফের হতে পারে, কিন্তু ভীতি সৃষ্টি করে দেশত্যাগে বাধ্য করার মধ্যে গুণগত কোন পার্থক্য দৃশ্যমান নয়। এখন ২০ হাজার লোকে গিয়ে আশ্বস্ত করলেও কি রংপুরের হিন্দুদের আগুন-ভীতি দূরীভূত হবে? ১৯৪১ সনের আদমশুমারি অনুসারে পূর্ববঙ্গে বা বাংলাদেশে হিন্দুদের জনসংখ্যা ছিল ৩০% যা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে ১৯৫১, ১৯৬১, ১৯৭১, ১৯৮১, ১৯৯১, ২০০১ ও ২০১১ সনে এসে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২২%, ১৮.৫%, ১৩.৫%, ১২.১৩%, ১১.৬২%, ৯.২%, ৮.৪%। বর্তমানে নাকি ৭%-এ নেমে এসেছে।
সম্প্রদায়-প্রীতির অভিনয়ে সিদ্ধহস্ত কিছু হিংস্র লোকের জন্য পৃথিবীর সর্বত্র সংখ্যালঘুরা নির্যাতিত, নিপীড়িত, ধর্ষিত হচ্ছে। আমাদের দেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু, অথচ ভারতে মুসলমানেরা সংখ্যালঘু। সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িতে আগুন লাগাতে, লুট করতে যদি এতই বাহাদুরি থাকে তাহলে ভারতে মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে আমাদের ব্যথা লাগে কেন? লাগে সম্প্রদায়গত প্রীতির জন্য। এই প্রীতি তো অন্য ধর্মাবলম্বীদেরও থাকতে পারে। মুসলমানদের উগ্র স্বভাব বর্তমান বিশ্বে এমনভাবে প্রচারিত হয়েছে যে, পৃথিবীর যে কোন দেশে সংখ্যালঘু মুসলমানদের ওপর অত্যাচার হলে আমরা মুখচোরার মতো এখন বলে থাকি ‘ইসলাম ফোবিয়া’।
এক সময় আমাদের স্লোগান ছিলো, ‘মানব আমার জাতি, পৃথিবী আমার দেশ’। এই স্লোগান মানুষের মনে স্থান পায়নি, পাওয়ার কথাও নয়। কারণ অধিকাংশ লোকের মনে অজান্তে বাস করে এক একজন ডোনাল্ড ট্রাম্প বা মায়ানমারের অত্যাচারী সেনা। তাই তো নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রতি আমাদের যে অনুভূতি তার অনুরণন রংপুরের হিন্দুদের জন্য হয় না। রংপুর আর রোহিঙ্গাদের ভস্মীভূত বাড়ির ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে? রোহিঙ্গাদের আহাজারি আর রংপুরের হিন্দুদের আহাজারির মধ্যে অমিলটি কোথায়?
সম্প্রদায়গত কৃত্রিম প্রীতি থেকে মুক্তি পাওয়া তত সহজ নয়। কারণ রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ভোটের রাজনীতির জন্য এই সাম্প্রদায়িক প্রীতি কাজ করে হিপনোটিজমের মতো; তাই তো হিন্দু মহাসভা ভারতে নীতিনির্ধারক, গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার হোতা আজ সত্যনিষ্ঠ যুধিষ্ঠির। শুধু এ কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসনবিরোধী দল ও ব্যক্তি আজ ক্ষমতাসীন। রাজনীতিবিহীন সম্প্রদায়-প্রীতি এত প্রিয় হলে আট বছর ধরে ইরাক আর ইরানের যুদ্ধ চলতো না, সৌদি আরব আর কাতারের মধ্যে শত্রুতার সৃষ্টি হতো না, ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য সৌদি আরব আমেরিকা আর ইসরায়েলের কাছে ধরনা দিতো না, সৌদি বোমায় ইয়েমেনের মুসলমান মরতো না। সম্প্রদায়-প্রীতি নেই বলেই সংযুক্ত আরব আমিরাতের একজন ঊর্ধ্বতন সেনা অফিসার বলেছেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইসরায়েল ভাইয়ের মতো। আর যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বড় ভাই’। তাহলে কোন সম্প্রদায়ের সংজ্ঞায় ইসরায়েল আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানের ‘ভাই’ হলো?
সম্প্রদায়-প্রীতির কারণে রংপুরে আগুন লাগানো হলে দলমত নির্বিশেষে সব মুসলমানের জোট বাঁধার কথা। কিন্তু পত্রিকার খবর অনুযায়ী আগুন লাগানোর পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে শুধু বিএনপি-জামায়াত জোটের স্থানীয় নেতারা। আসলে এগুলো স্বার্থ-প্রীতি; স্বার্থ-প্রীতির চেয়ে বড় প্রীতি পৃথিবীতে এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। সম্প্রদায়-প্রীতি মুখ্য নয় বলেই আহত মুসলিম আইএসরা অহরহ ইসরায়েলিদের চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে।
কারো নাম ও ছবি ব্যবহার করে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে তার মাধ্যমে অবমাননাকর পোস্ট দেওয়া খুব সহজ। ফটোশপে তৈরি বিভিন্ন স্পর্শকাতর ছবি দিয়ে অতি সহজে উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায়। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, অনেক বিদ্বান ব্যক্তি ফটোশপে বানানো এই কৃত্রিম ছবিগুলো বিশ্বাস করে লাইক দেয়, শেয়ার করে, অশালীন ও অভব্য মন্তব্যও করে। এই অভব্য ও অশালীন মন্তব্যগুলো উত্তেজনা সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে।
একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফেসবুকের যে স্ট্যাটাসটি নিয়ে এত কাণ্ড, লাশ পড়ল, পোড়ানো হলো সংখ্যালঘু হিন্দুদের বাড়িঘর তা প্রথম দেয় খুলনার ‘মাওলানা আসাদুল্লাহ হামিদী’। মাওলানা সাহেব কর্তৃক ১৮ অক্টোবরে স্ট্যাটাসটি দেওয়ার পর ৮৭ বার শেয়ার হয়েছে; শেয়ারকারীদের মধ্যে একজন হচ্ছেন রংপুরের ‘এমডি টিটু’। এই এমডি টিটু বা মোহাম্মদ টিটু কীভাবে ১০ হাজার লোকের নিকট ‘টিটু রায়’ হয়ে গেল তার সন্ধান এখনও কোথাও পাইনি। ধর্মান্ধদের চোখে টিটু রায় আর এমডি টিটু একই ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হলেও তাকে দায়ী করার কারণ কী? পত্রিকার খবর মোতাবেক সে তো শুধু শেয়ার করেছে; এমন শেয়ার তো আরও ছিয়াশি জনও করেছে। তাকে ইতোমধ্যে দুবার রিমান্ডে নেয়ার পর সে নাকি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। ভিকটিমকে আসামি করায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।
সংঘটিত ঘটনাকে হাল্কা করার অভিপ্রায়ে টিটু রায় নামের একজন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী যাতে বলির পাঁঠা না হয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত করা অপরিহার্য। টিটু রায় দোষী হলে তার শাস্তি বিদ্যমান আইনানুগ হবে; কিন্তু টিটু রায়ের জন্য অন্য হিন্দুদের ঘরে আগুন লাগানো হলো কেন? এটাই ক্রিমিনাল অফেন্স। একজন অপরাধীর জন্য অন্য নিরপরাধীরা শাস্তি পেতে পারে না। বিদায় হজের ভাষণে আমাদের নবী করিম (সা.) স্পষ্ট করে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘একজনের অপরাধে অন্যকে দণ্ড দেওয়া যায় না। বাবার অপরাধের জন্য ছেলেকে এবং ছেলের অপরাধের জন্য বাবাকে দায়ী করা চলবে না’। তার বাণী যারা অমান্য করেছেন তারা কি ধর্ম অবমাননাকারী নয়?
একজনের দেওয়া তথ্য থেকে জানলাম, ফেসবুকে মাওলানা আসাদুল্লাহ হামিদীর স্ট্যাটাসের নিচে আবুল কাশেম নামের একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আপনি ওই জানোয়ারের কার্টুন ও লেখা পোস্ট করেছেন? এতে মুসলিম সমাজের যতটা উপকার হচ্ছে তার চেয়ে ক্ষতি বেশি হচ্ছে। দয়া করে এটা মুছে ফেলুন।’ কিন্তু আসাদুল্লাহ হামিদী ঐ প্রতিবাদ ও পরামর্শ আমলে নেননি। মাওলানা সাহেবের বক্তব্য হচ্ছে, সিলেট থেকে তার পরিচিত একজন বিষয়টি তাকে জানালে তিনি তা ডাউনলোড করে পোস্ট করেন। তার মতে স্ক্রিনশটটি সৃষ্টি করেছে কোন এক ‘রাকেশ মণ্ডল’।
আমাদের দেশে রাজনৈতিক মারামারি লাগাতে হলে, ধর্মীয় দাঙ্গা বাধাতে হলে একটি হিন্দু নামের কদর অনেক বেশি। রায়, কৃষ্ণ, হরি, রাধা, নাথ, মণ্ডল ইত্যাদি নামে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে আপত্তিকর বক্তব্য, ছবি দিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা যত সহজ সিদ্দিক, শফিক, রফিক, হাফিজ, মুরাদ নামে তত সহজ হয় না। ভারতে আবার দাঙ্গা বাধানোর জন্য অনুরূপভাবে মুসলমান নাম খোঁজা হয়। খারাপ জিনিস যত গোপন থাকে ততই মঙ্গল, মাওলানা আসাদুল্লাহ সাহেব গোপনে থাকা অবমাননাকর স্ক্রিনশটটি ডাউনলোড করে সবাইকে জানানোর জন্য এত উৎসাহী হলেন কেন?
আমরা অহংকার করে বলে থাকি, বাংলাদেশে বহুযুগ ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে। এই কথাটি রাজনীতিবিদেরা জোরেশোরে বলে থাকেন। কিন্তু এই কথাটি কি এদেশের সংখ্যালঘুরা কখনো উচ্চারণ করেছে? অন্য ধর্ম ও ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীল হলে সংখ্যালঘুদের পূজাপার্বণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত সতর্কতার প্রয়োজন হতো না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রংপুরের ঘটনাটিকে একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেছেন। সরকার ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পুনর্নির্মাণের ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এই পুনর্ভরণের ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। পুড়বে দুর্বৃত্তরা, গড়বে সরকার? সরকারি কোষাগার দুর্বৃত্তদের কারণে খরচ হবে কেন? ব্যয়িত সব খরচ ওদের নিকট থেকে আদায় করা জরুরি।
মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত রক্তদানে ৭১-এ বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। সবার প্রত্যাশা ছিল, বর্বর পাকিস্তানিদের মতো আর কেউ লুঙ্গি খুলে লিঙ্গ দর্শনে ধর্ম বিচার করবে না। এখনও প্রত্যাশা করি, বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক নীতি প্রতিষ্ঠিত হবে; সাম্প্রদায়িক হত্যা, লুটতরাজ প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে আমরা সবাই হবো এক একজন ‘বঙ্গবন্ধু’।