২০১২ সালের হাইকোর্টের এক রুলিং অনুসারে দেশে কুকুর নিধন বেআইনি; এর ব্যত্যয় করে নির্যাতন বা হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন করে এ সব অপরাধের আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনা কারণে পশুদের নির্যাতন করার অমার্জনীয় অপরাধে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ বর্বরোচিত আচরণ করার সাহস কারো না জন্মায়।
আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং কলাম লেখক। আমার লেখা ‘হিংস্র মানুষ ও প্রভুভক্ত কুকুর’ সম্পর্কে ফেসবুকে মতামত দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘বিটু, তোর এই লেখাটি আমাকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছে। যৌক্তিক এই লেখাটির গুণগত মানও উৎকৃষ্ট’। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান লিখেছেন, ‘I am happy to see some people are coming forward to protest such cruelty against animals. I feel animals are far better than humans. Continue your good writings.’ কুকুরের উপর অত্যাচার নিয়ে আমার লেখার উপর বহু বন্ধু বক্তব্য রেখেছে, কিন্তু কেউ কুকুরের বিপক্ষে বলেননি। প্রথম পর্বটির ২১টি শেয়ার হয়েছে, শেয়ারের শেয়ার কয়টি হয়েছে জানি না। দ্বিতীয় পর্ব নিয়েও অনুরূপ মন্তব্য ও শেয়ার হয়েছে। এতেই প্রতিপন্ন হয়, কুকুরদের এখনও বহু লোক পছন্দ করেন।
কুকুরের ঘ্রাণশক্তি মানুষের চেয়ে কমপক্ষে ১০ কোটিগুণ বেশি এবং শ্রবণশক্তি চারগুণ। তাই আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধে সহায়তা করতে, পলাতক অপরাধীকে পাকড়াও করতে, মাদকদ্রব্য শনাক্ত করতে, লুকায়িত বিস্ফোরক অনুসন্ধানে, ঘাতকের অপকর্মে মাটির নিচে লুকায়িত লাশ খুঁজে বের করতে কুকুরের ব্যবহার সর্বত্র পরিলক্ষিত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে হিটলারের নাকি ২ লাখ প্রশিক্ষিত যোদ্ধা কুকুর ছিল। চোর, ডাকাত আগমনের তাৎক্ষণিক আগাম সংবাদ পেতে পোষা কুকুরের পাহারা আদি যুগ থেকে চলে আসছে। গ্রামে কুকুরের ডাকে আমাদের ঘুম ভেঙেছে, উঠে চোর তাড়িয়েছি বহুবার। তাই বোধ হয় সৃষ্টিকর্তা কোন জীবকেই অনর্থক সৃষ্টি করেননি। জুমার নামাজের দিন ইমাম সাহেবকে এমন কথা বলতেও শুনেছি যে, এ জগতে সব জীবের অংশগ্রহণেই পৃথিবীর ভারসাম্য বজায় রয়েছে। তাহলে তো সৃষ্টির সেরা হওয়ার কারণে সব জীবের প্রতিই মানুষের সদয় আচরণ করা উচিত।
সম্প্রতি আরাকান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা এক রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে তাদের পালিত কুকুরটিও ৩০ মাইল পথ পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। মিয়ানমারের সেনারা যখন মালিকের বাড়িতে আগুন দিচ্ছিল তখন কুকুরটি ঘেউ ঘেউ করে সেনাদের তাড়ানোর চেষ্টা করে। কিন্তু রাইফেলের গুলির সম্মুখে টিকতে পারেনি। বাংলাদেশ অভিমুখে যাত্রায় মনিবের সঙ্গে পাহাড়-পর্বত পার হয়ে নাফ নদী পর্যন্ত আসার পর মনিব তার পোষা কুকুরটিকে শেষ আদর করে নৌকায় উঠে। কুকুরটিও নৌকায় উঠতে চায়, কিন্তু তোলা হলো না। মনিবকে হারিয়ে কুকুরটি নদীর পাড়ে পাগলের মতো ছোটাছুটি করতে থাকে। মনিবের নৌকা কিছুদূর যাওয়ার পর কুকুরটি ঝাঁপ দিয়ে নৌকার দিকে সাঁতার কাটতে থাকে। কুকুরের দিকে মনিবের হঠাৎ নজর পড়লে নৌকার অন্যান্য যাত্রীদের রাজি করিয়ে নৌকাটি ঘুরিয়ে কুকুরটিকে নৌকায় তোলা হয়। এখন শরণার্থী শিবিরে মনিবের সঙ্গে কুকুরটিও খেয়ে, না খেয়ে বাংলাদেশে শরণার্থী হয়েছে।
একটি কুকুর যে মানুষের মনোজগতে আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে তা আমার পারিবারিক জীবনে প্রত্যক্ষ করেছি। আমার ঢাকাস্থ বসতি এলাকাটি এক সময় বস্তিতে পূর্ণ ছিল; এখনও অনেকটা তাই। অগণিত ছোট-বড় ছেলেরা দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় কাটায়। ছিনতাই, মারামারি, মারামারির পর তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার হাস্যোজ্জ্বল জটলা— সব কিছুই বাড়ির সম্মুখে রাস্তায় হতো, এখনও হয়। সন্ধ্যা হলেই মাদকাসক্তদের অন্ধকারাচ্ছন্ন সরু গলিতে আনাগোনা বেড়ে যায়। মাদকাসক্তদের ঘরের আনাচে-কানাচে ঘুরতে কুকুর হচ্ছে একমাত্র বাধা; অবলা কুকুর ছাড়া ঘেউ ঘেউ করার সাহসী কোন মানুষ আজ পর্যন্ত দেখিনি। পাহারাদার রাখা হয়েছে; কিন্তু তারা যে সন্ত্রাসী এবং মাদকব্যবসায়ীদের সহায়তা করে থাকে তা গভীর রাতে টহলে আসা পুলিশ থেকে জেনেছি। পুলিশ গলিতে ঢুকার সঙ্গে সঙ্গে প্রহরীরা ফোন করে সন্ত্রাসী ও মাদকবিক্রেতাদের সতর্ক করে দেয়। বাধা একমাত্র কুকুর; তাই সন্ত্রাসী, মাদকাসক্তরাও তাদের বাধা সরাতে কুকুরকে বিষ দেয়, দিনে সবার সম্মুখে বাধাহীন নির্যাতন করে। লোকজনও কুকুরের ঘেউ ঘেউয়ের চেয়ে মাদকাসক্তদের পছন্দ করে বেশি। তাই বাড়ির মালিকেরাও কুকুর দেখলে ঢিল মারে, পা ভেঙে দেয়। ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবারের জন্য ভাঙা পা নিয়ে কুকুর আবার রাস্তায় আসে।
ছোট বাচ্চারা খেলাচ্ছলে কুকুরদের পেটায়, ঢিল মারে; একবার দুটি কুকুরছানার গলায় টেলিফোনের তার বেঁধে টাঙিয়ে রাখলে আমার ছেলে অর্ণব তার বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রাপথে তাদের রক্ষা করে গলার বাঁধন খুলে রাস্তায় ছেড়ে দেয়। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর তার মনে হলো, বাচ্চাগুলো একই কাজ আবার করতে পারে। সে ফিরে এসে দেখে, কুকুরছানা দুটিকে আরও শক্ত করে বেঁধে টাঙিয়ে রেখেছে, আর ছেলে, বুড়ো সবাই টাঙানো কুকুরের দিকে ঢিল মেরে আনন্দ করছে। অর্ণব ওদের পুনরায় রক্ষা করে বাসায় নিয়ে এলো এবং তারা ‘নারগাল’ ও ‘সাগরাদ’ নামে আমৃত্যু আমাদের পরিবারের সদস্য হয়ে ছিল। আরেকদিন আমাদের পাড়ায় একজন ষাটোর্ধ্ব বয়সী লোক সদ্যপ্রসূত চারটি কুকুরছানাকে লাঠির মাথায় পেরেক লাগিয়ে গুঁতা দিয়ে মারছিল। ছেলে অর্ণব প্রতিবাদ করলে লোকটি বললো, ‘কালো কুত্তা মারা জায়েজ’। ঐ লোকের সঙ্গে ঝগড়া করে চারটি বাচ্চা নিয়ে অর্ণব বাসায় উঠলো; কিন্তু পেরেকের গুঁতায় সেপটিক হয়ে পচন ধরায় প্রচুর চিকিৎসা দিয়েও তিনটিকে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। শুধু একটি কালো কুকুর ‘সামায়্যাল’ নামে এখনও আমাদের বাসায় আছে। এই কুকুরগুলো আমার ছেলে অর্ণবের জীবনে একটি মৌলিক পরিবর্তন এনে দিয়েছিল; যখন তখন বাইরের আড্ডা বন্ধ করে সে বাসায় থেকে নিয়মিত লেখাপড়া ও কুকুরের পরিচর্যা করত।
কুকুর, বিড়াল ভালোবাসে এমন প্রচুর লোক দেখেছি। টাকশালের নির্বাহী প্রধান থাকাকালীন আমার সহকর্মীর মেয়ে আদিবা মেহরাজ শ্রাবণী প্রায় প্রতিদিন আমাকে নালিশ করে জানাতো, কে কে কুকুর পেটাচ্ছে। কুকুর পেটানোর আওয়াজ পেলে ঐদিন সে আর লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে পারতো না। অদ্ভুত পৃথিবী—রামপুরায় এক প্রহরী সিদ্দিক জীবন্ত কুকুর মাটিচাপা দিয়েছে, আরেক প্রহরী তাজুলের কুকুরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা দেখেছি। তাজুল রাস্তায় এলেই টাকশালের সব কুকুর তার পেছনে পেছনে ঘুরতো, তিনিও দোকান থেকে প্রতিদিন খাবার কিনে তাদের যত্নসহকারে খাওয়াতেন। আবার অন্যদিকে সহকর্মী সোমেনের ‘কালিয়া’ নামের কুকুরটিকে ‘পাগল’ অভিধায় পিটিয়েই মেরে ফেলার ঘটনাও টাকশালে ঘটেছে।
কুকুর ও বিড়াল এই দুটি প্রাণী মানুষের বসতির বাইরে এখন আর বাস করে না। পোষা হলে আমাদের দেওয়া অথবা পোষা না হলে ফেলে দেওয়া খাবারই এদের একমাত্র আহার। কুকুর, বিড়ালদের প্রতি সহানুভূতি না থাকলে লালন-পালন করার প্রশ্ন আসে না; কিন্তু অনেকে অপত্যস্নেহে তাদের সন্তানের মতো লালন-পালন করেন। কুকুর সম্পর্কে কিছু লোকের মধ্যে ভুল প্রতীতির সৃষ্টি হয়েছে; বদ্ধমূল এই ভুল ধারণা ভাঙানো তত সহজ নয়। আমার বিশ্বাস, পশুদের প্রতি সদয় আচরণ করে সৃষ্টিকর্তাকেও খুশি করা যায়।
কুকুর, বিড়ালের প্রতি সহিংসতা বা নিষ্ঠুরতা কোন সভ্য সমাজের কাম্য হতে পারে না। নিজ সন্তান ও পোষা প্রাণী— পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ পরিবারে এই দুইয়ের মধ্যে বিশেষ তফাৎ নেই। পাশ্চাত্যে নিঃসন্তান এক প্রবীণ মহিলা তার পোষা কুকুরটির মৃত্যুতে প্রতিবেশীকে ফোন করে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলে কান্নার কারণ জিজ্ঞাসায় মহিলা বললেন, ‘আমি আজ আমার পরিবারের একজন প্রিয়তম সদস্যকে হারিয়েছি’। অথচ আমাদের সমাজে কুকুরের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বিনা কারণে পেটানো হয়। একটি কবুতর মারার জন্য প্রায় ১০০ বিড়ালকে মুগুর দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করার ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে দেখেছি। চারতলা ভবনের ছাদ থেকে কুকুর নিচে ফেলে দেওয়ার দৃশ্যও ফেসবুকে ছিল। উক্ত দুটি ঘটনাই ভারতের। এমন লোক সমাজে আছে বলেই মহানগরের নির্দেশদাতা কমিটি ও প্রহরী সিদ্দিকের পৈশাচিক নির্মমতায় কুকুরের বাঁচার আর্তচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। ঢাকা শহরে রাস্তা ছাড়া বাচ্চাদের খেলার জায়গা নেই, কুকুর ছাড়া ঢিল মারার কোন প্রতিপক্ষও নেই।
প্রাণীপ্রেমিক সংগঠনগুলো প্রাণীদের প্রতি নিষ্ঠুরতা রোধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সচেতনতা তৈরির জন্য ক্যাম্পেইন করছে, বন্ধ্যাকরণ ও রোগপ্রতিষেধক বিভিন্ন টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছে। এ কাজে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে সহায়তা করছে অভয়ারণ্য-বাংলাদেশ প্রাণী কল্যাণ ফাউন্ডেশন। আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ সংস্থা, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সহায়তায় চলতি বছরে জানুয়ারি মাস থেকে ঢাকা উত্তরের ৪৫ নং এবং ৪৬ নং ওয়ার্ডে এ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে যা পর্যায়ক্রমে নগরীর সবগুলো ওয়ার্ডে চালু করা হবে। এ লক্ষ্যে অভয়ারণ্য ও ঢাকা সিটি করপোরেশন উত্তর এবং দক্ষিণের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিও স্বাক্ষর হয়েছে। তবে ঢাকা ও সারাদেশে এই কার্যক্রমের সম্প্রসারণে গৃহীত পদক্ষেপ অনেক মন্থর বলে মনে হয়।
‘পোকামাকড় কামড়ায় হিংসার কারণে নয়, বাঁচার প্রয়োজনে’। কোন এক সময়ে সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে কুকুর নিধন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা; এখন আইনগত বাধা থাকায় শ্বাসরোধ করে হত্যা করার প্রক্রিয়া-পদ্ধতি রহিত করা হয়েছে। ১৯২০ সালের প্রাণী নিষ্ঠুরতা আইনের ৩ ও ৭ ধারা অনুযায়ী কোনো ধরনের পশুপাখিকে হত্যা করা বা নির্যাতন করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। ২০১২ সালের হাইকোর্টের এক রুলিং অনুসারে দেশে কুকুর নিধন বেআইনি; এর ব্যত্যয় করে নির্যাতন বা হত্যা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রয়োজনে নতুন আইন করে এ সব অপরাধের আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিনা কারণে পশুদের নির্যাতন করার অমার্জনীয় অপরাধে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে ভবিষ্যতে অনুরূপ বর্বরোচিত আচরণ করার সাহস কারো না জন্মায়।
অন্যদিকে জনগণের মধ্যে কুকুর নিধন রোধে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে দেশের প্রাণীপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বেওয়ারিশ একটি কুকুরকে নিষ্ঠুরভাবে পেটানোর দায়ে রাজধানী ঢাকার রামপুরায় আটক হয়েছিল তিন যুবক। এবারও রামপুরার মহানগর আবাসিক এলাকায় সংঘটিত ঘটনায় রামপুরা থানা তাৎক্ষণিক সাড়া দেয়ায় থানার অফিসার ইনচার্জসহ সবাইকে সাধুবাদ জানাচ্ছি।