দ্বিতীয় পর্ব

মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, ‘পশুদের প্রতি আচরণ দিয়ে একটি জাতির মহানুভবতার বিচার করা যায়’। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেজন সেজন সেবিছে ঈশ্বর’। আল্লাহ্ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘আমি কোন কিছুই অযথা সৃষ্টি করিনি’। জীবের প্রতি সদয় আচরণের বাণী শুনিয়ে গেছেন অসংখ্য মহামানব। ওই বাণী আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষের কর্ণকুহরে প্রবেশ করেনি; তাই বেশিরভাগ মানুষ জীবের প্রতি নির্দয় আচরণ করে থাকে।

প্রখর বুদ্ধিমত্তা, দুর্দান্ত সাহস ও প্রভুভক্তির জন্য ভেড়া, ছাগল, গরুকে চারণভূমিতে সুশৃঙ্খল ও সারিবদ্ধরূপে আনা-নেয়ার দায়িত্বে কুকুরকে নিয়োজিত করা হচ্ছে সেই আদিকাল থেকে। বর্তমানে রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের নিরাপত্তা বিধানে কুকুরকে নিয়োজিত করা হয়। এছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিস্ফোরক অনুসন্ধানে কুকুরের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এজন্য বাংলাদেশ সরকার প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর আমদানি করছে।

প্রভুভক্ত কুকুর বিপদে পড়া প্রভুকে রক্ষায় নিজের জীবন দিতেও দ্বিধা করে না। পাশ্চাত্যে অনেক পরিবার আছে যেখানে ব্যস্ত বাবা-মায়ের সন্তানেরা সঙ্গী হিসেবে দিনের একটা বড় সময় কাটিয়ে দেয় পোষা প্রাণীটির সাথে। যাদের ফেসবুক আছে তারা হয়তো অনেকে কুকুর, বিড়ালের অদ্ভুত অদ্ভুত কর্ম দেখেছেন। কোথাও কুকুর নিজে হামাগুঁড়ি দিয়ে শিশুকে হামাগুঁড়ি শেখাচ্ছে, কোথাও বিড়াল-কুকুর যৌথভাবে দোলনা দুলিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়াচ্ছে, কোথাও কুকুর শিশুর সঙ্গে লুকোচুরি খেলছে, কোথাও ফিডারে শিশুকে দুধ খাওয়াচ্ছে। এছাড়াও সাপের ছোবল থেকে মনিবশিশুকে রক্ষা করতে গিয়ে প্রভুভক্ত কুকুরের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। প্রচণ্ড শীতে সংজ্ঞাহীন মনিব বা মনিবের সন্তানকে জড়িয়ে ধরে রেখে নিজ দেহের উত্তাপ দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে পোষা বিড়াল আর কুকুর।

পোষা কুকুর, বিড়াল মনিব ও পরিবারের সদস্যদের শুধু বিপদে রক্ষা করে তা নয়, এদের সাহচর্যে রোগ-বালাই থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের মতে, পোষা প্রাণী লালন-পালনকারীদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে কম। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী পোষা প্রাণী পালন করলে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং হার্টের জন্য ক্ষতিকর কর্টিসোন হরমোন হ্রাস করে হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়।

আত্মনিবেদিত পোষা কুকুরের মনিবের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়ার উদাহরণ আছে শত শত। আর্জেন্টিনার মিগুয়েল গুজমানের মৃত্যুর পরদিন তার পোষা কুকুর ‘ক্যাপিটান’ অদৃশ্য হয়ে যায়; গুজমানের মৃত্যুর এক সপ্তাহ পর সমাধিতে গিয়ে তার স্ত্রী ক্যাপিটানকে সমাধির উপর করুণ স্বরে বিলাপ করতে দেখে হতভম্ব হয়ে যান। বিস্ময়ের বিষয় হচ্ছে, সমাধি দেওয়ার সময় কুকুর ক্যাপিটান বাসায় ছিল; তাহলে ক্যাপিটান গুজমানের সমাধি শনাক্ত করলো কীভাবে?

মনিবের পরিবারের সদস্যদের জীবনরক্ষায় পোষা কুকুর নিজের জীবনকে বিপন্ন করছে যুগ যুগ ধরে। এমন উদাহরণও রয়েছে, হাসপাতালে মনিবের রোগশয্যায় কোন স্বজনকে দেখা না গেলেও পোষা কুকুরটি না খেয়ে পাহারা দিয়েছে মনিব সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত। মনিবের মৃত্যুশোকে মনিবের কবর আমৃত্যু আঁকড়ে থাকার সত্য ঘটনা আছে অজস্র। চার হাজার মাইল অতিক্রম করে হারিয়ে যাওয়া কুকুরের ঘরে ফেরার কাহিনী পৃথিবীকে অবাক করেছে।

মনিব বাড়ি ফিরলে প্রভুভক্ত পোষা কুকুর, বিড়ালের আনন্দের অভিব্যক্তি অনেকে দেখেননি। কিছুক্ষণ পর মনিবকে দেখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করে চিত্রায়িত করা যাবে না। নিঃস্বার্থ ভালোবাসার এমন অনুরণন অন্য কিছুতে অনুভূত হওয়ার কথা নয়। প্রবীণ বয়সে একটু সঙ্গের আশা, দুটো কথা বলার আগ্রহ প্রবল হয়; চারদিকের প্রাণচাঞ্চল্যে এই আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। এই প্রবীণ বয়সের একাকিত্বের হতাশা একটি পোষা কুকুর বা বিড়াল দূর করে দিতে পারে।

বিভিন্ন ধর্মে কুকুরের প্রতি ইতিবাচক, নেতিবাচক উভয় ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায়। নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা হচ্ছে, নোংরা বলে কুকুর অপবিত্র। কিন্তু কোন জীবটি নোংরা নয়? মানুষ যে গোপনে গোপনে কখনো কখনো কত বেশি নোংরা হয় তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। কই, মাগুর, শিং, শৈল, বোয়াল, টাকি, দেশি মুরগি কী খেতে পছন্দ করে তা গ্রামের লোক হিসেবে ভালো জানি। এই প্রাণীগুলো যা খায় তা আর কোন প্রাণী খায় কি না সন্দেহ। তাহলে এই প্রাণীগুলো ঘরে নিষিদ্ধ নয় কেন? অথচ কই, মাগুর মানুষের সবচেয়ে উপাদেয় খাদ্য। খুন, সন্ত্রাস, ধর্ষণ, ঘুষ, দুর্নীতি— এইগুলোর সঙ্গে তো মানুষই জড়িত, কুকুর নয়। এই সকল নোংরামির ধারেকাছেও কুকুর থাকে না। তারপরও কুকুর মানুষের চেয়ে নোংরা? উচ্ছিষ্ট কি শুধু কুকুর খায়? সভ্য জগতে মানুষ যখন খাবার থেকে বঞ্চিত হয় তখন ক্ষুধায় মানুষ কি ডাস্টবিনের খাবার খায় না? কারো জ্বালাতন না করে উচ্ছিষ্ট খেয়ে পরিবেশ দূষণ থেকে যে প্রাণীটি মানবসমাজকে রক্ষা করছে সেই প্রাণীটিকে মারতে সিদ্দিকের মতো অপাঙ্ক্তেয় লোকের সৃষ্টি কি অপরিহার্য ছিল? যারা সাপ খায়, ব্যাঙ খায়, ইঁদুর খায়, প্রস্রাব খায়, জীবন্ত বানরের মগজ কাঁটাচামচ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খায় তাদের তো অর্থনৈতিক লাভে নোংরা অভিধায় আদর, আপ্যায়ন কম করি না; তাদের সঙ্গে বৈঠক করি, রাজভোজে আপ্যায়িত করি। অন্যদিকে তাদের দেশে জীবিকা নির্বাহে বসবাস করতে নিজের পবিত্র ভূমি ত্যাগ করছি।

ধর্মমতে এক পতিতা একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে তার চামড়ার মোজা ও ওড়না দিয়ে কুয়া থেকে তুলে পানি খাওয়ানোর জন্য তার সব অপরাধ ক্ষমা করে দেওয়া হয়। শেখ সাদীর তাঁর কবিতায় উল্লেখ করেছেন যে, মরুভূমিতে একটি তৃষ্ণার্ত কুকুরকে এক ব্যক্তি তার টুপি এবং পাগড়ি ব্যবহার করে একটি কূপ থেকে পানি তুলে এনে কুকুরটিকে পান করানোর কারণে খোদা তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেন। পশুদের সেবায় আমাদের জন্য পুণ্য রয়েছে কি না সে ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘প্রতিটি তাজা কলিজার অধিকারী প্রাণীর সেবার মধ্যেই পুণ্য রয়েছে’ (মুসলিম)।

আমার মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু জসীম চাকরি থেকে অবসর নিয়ে পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি ধর্ম নিয়ে গবেষণা করছে; সে একজন ধার্মিকও। সে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, কোরআনে চারটি আয়াতে কুকুরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাতে কুকুরের বিরুদ্ধে কোন নেতিবাচক বক্তব্য নেই। ধর্মের তথ্যের জন্য সে পবিত্র কোরআন ব্যতীত অন্য কোন তথ্যকে প্রাথমিক ও অকাট্য উৎস হিসেবে মানতে নারাজ। তাই সে কুকুরের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধ মনোভাব পোষণের কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে বলে মনে করে না। এক লেখায় দেখলাম, মালেক বিন আনাসকে মক্কায় হজব্রত পালনের কাজে একটি কুকুর বিক্রি থেকে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কোন পশু জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে কি না সে প্রশ্নে ধর্মীয় পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও ১০টি পশুকে বেহেস্তে প্রবেশ করার অনুমতি দেওয়া হবে বলে অধিকাংশ পণ্ডিত মনে করেন; যার একটি হবে আসহাব আল-কাহফ-এ উল্লেখিত ওই বিশ্বস্ত কুকুরটি।

কুকুর, বিড়াল নিধনকে জায়েজ করার জন্য অনেকে পশুপ্রেমিকদের প্রতি উপহাস করে বলেন, যেখানে মানুষ ভাত পাচ্ছে না সেখানে কুকুর, বিড়াল পোষা বিলাসিতা। তারা আরো বলেন, দেশে যেখানে বড় বড় অপরাধের বিচার হয় না সেখানে আবার ‘কুত্তা-বিলাই’ হত্যার বিচার কে করবে? অপরাধীর ছলের কোন অভাব হয় না। অধিকাংশ কুকুর তো উচ্ছিষ্ট খেয়ে বাঁচে। এতেও এত ক্ষোভ কেন? বিচিত্র মানুষের বিচিত্র স্বভাব। যাদের ভালো লাগে তারা পশু লালন-পালন করবে, খাওয়াবে; যাদের অপছন্দ তারা তা করবে না। কিন্তু মারার অধিকার তাদের দিলো কে? এরা নালিশ করতে পারে না বলে অনেক অত্যাচারী চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ অপরাধী এবং সিরিয়াল কিলারের জীবন শুরু হয় এনিম্যাল এবিউজ-এর মাধ্যমে। Jeffrey Dahmer, Albert DeSalvo, Ted Bundy সহ সকল সিরিয়াল কিলাররাই তাদের জীবনের কোন এক সময়ে প্রাণীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করেছে। এজন্য উন্নত দেশে বাচ্চাদের মাঝে এনিমেল এবিউজ-এর প্রবণতা রোধের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে আমলে নেয়া হয় যাতে ভবিষ্যতে তাদের মাঝে হিংসাত্মক মনোভাব গড়ে না ওঠে।

(প্রথম পর্বে আমার দুটি ভুল তথ্য ছিল: প্রথমটি চিহ্নিত করে আমার মেজো ভাই মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক সচিব, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফেসবুকে উল্লেখ করেছেন, ব্রিটেনের রানি আমাদের ‘রানি’ নন। দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে মেয়ে ঐশী লিখেছে, কুকুর হাচিকোকে নিয়ে জাপানিজ ‘Hachiko Monogatari’ সিনেমাটি প্রথম প্রদর্শিত হয় ১৯৮৭ সনে। আমার লেখায় ২০০৯ সালের ‘Hachi: A Dog’s Tale’ ছবিটি আমেরিকায় পুনর্নির্মিত)।