প্রথম পর্ব
পশ্চিম রামপুরার মহানগর প্রজেক্টে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া হিংস্র মানুষের বর্বর আচরণের একটি ঘটনায় আমি আমার লেখার উপজীব্য ‘স্বাস্থ্যের বিদেশমুখিন মিছিল’-এর শেষ পর্ব স্থগিত করে কুকুরের বাচ্চাদের জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়ার বিষয়টিকে উপজীব্য করেছি। পত্রিকার ভাষ্যমতে, মহানগর প্রজেক্ট এলাকার বাগিচারটেক জামে মসজিদের পাশে মধ্যযুগীয় বর্বরতায় দুটি মা কুকুর ও তাদের ১৪টি চোখ না ফোটা বাচ্চাকে জীবন্ত মাটিচাপা দেওয়া হয়।
বাগিচারটেক কল্যাণ সমিতির নির্দেশে সিদ্দিক নামে এক নিরাপত্তারক্ষী প্রথমে দুটি মা কুকুরকে পেটায়, চোখ উপড়ে ফেলে হাড় ভেঙে দেয়; এরপর তাদের চোখ না ফোটা ১৪টি বাচ্চাকে ছোট ছোট আলাদা পলিথিন ব্যাগে পুরে জীবন্তই পুঁতে ফেলা হয়। স্থানীয়রা অনেকেই শুনেছেন ওদের চিৎকার, কিন্তু এগিয়ে আসেননি কেউই। মামলা হলে ঘটনাস্থলে পুলিশ এসে পচে যাওয়া মৃতদেহগুলো মাটি খুঁড়ে বের করার পর দেখা যায় যে, মা কুকুর দুটোর পা শক্ত করে বাঁধা, মাথা থেঁতলানো, ঘাড় মটকানো, চোয়াল ভাঙা। বাচ্চাগুলোর পচাগলা শরীরে গায়ের রং আর ছোট ছোট আঙুলগুলো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। প্রাণী অধিকার কর্মীদের চেষ্টায় কুকুরের মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় পশু হাসপাতালের পাঠানো হয়েছে।
কোন কারণ ছাড়াই মা কুকুর ও বাচ্চাগুলোকে মধ্যরাতে পিটিয়ে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয় বলে এলাকাবাসী পত্রিকার রিপোর্টারদের জানিয়েছেন।
বর্ণিত পৈশাচিক আচরণের নির্মমতা ফেসবুকে আলোড়ন তুলেছে। এমন নিষ্ঠুর আচরণ দিয়ে ‘মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব’ কী করে হয় তার ব্যাখ্যায় একজন মন্তব্য করেছেন, ‘আল্লাহ যেমন অনুগত ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন, তেমনি তিনি ইবলিশকেও বানিয়েছেন।’ অনেকে লিখেছেন, মানুষের চেহারায় বহু হিংস্র জানোয়ার রয়েছে। যিনি মাটিচাপা থেকে বাচ্চা ও মাদের গলিত লাশ বের করেছেন তিনি ফরিয়াদ করে বলেছেন, ‘তাদের আর্তনাদ এলাকার কোন মানুষের হৃদয় কাঁপায়নি। অবাক করার বিষয়। সামনেই মসজিদ-মাদ্রাসা। সেখান থেকেও কোন ধার্মিক বের হয়ে বলেননি— এভাবে নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোকে মারিস না, এটা পাপ। আল্লাহ বা তার রাসূল এ অত্যাচারের নির্দেশ দেননি। সেই রাতে মানবতা কষাঘাতে জর্জরিত হয়েছে, মা কুকুরের তীব্র আর্তনাদ আর দুধের শিশুগুলোর গোঙানি মানুষের পাশবিকতার কাছে পরাজিত হয়েছে।’ মানুষের হিংস্রতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মানুষ কম হলেও একেবারে নগণ্য নয়। মহানগরের এ ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় প্রাণী অধিকার রক্ষা নিয়ে কর্মরত কেয়ার ফর পজ, পিপল ফর এনিমেল ওয়েলফেয়ার এবং এনিমেল লাভারস অব বাংলাদেশের স্বত্বাধিকারী ও স্বেচ্ছাসেবীসহ পশুকল্যাণে নিয়োজিত প্রায় অর্ধশত স্বেচ্ছাসেবী। নিজের শিশুকন্যা কোলে নিয়ে একজন সাধারণ মেয়ে সেই স্থানে জবানবন্দী দিতে গিয়ে উচ্চস্বরে যে কথাটি বলেছিলেন তা হাজার নিনাদের চেয়েও বলিষ্ঠ ছিল। তার একটি কথা— ‘ওই দারোয়ান একলাই খুনি না, যত মানুষ শুনসে, কিন্তু কিছু কয় নাই— হেরা সবাই খুনি।’
পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা নিরোধমূলক আইন থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে পশুদের ওপর নির্মম, নিষ্ঠুর নির্যাতন বহাল-তবিয়তে অব্যাহত আছে। শুধু চামড়ার জন্য বাঘ মারা হয়, দাঁত আর হাড়ের জন্য হাতি নিধন করা হয়, সুন্দর শিংয়ের জন্য হরিণ, দামি চামড়ার জন্য কুমির, সামান্য মাংসের জন্য পাখি হত্যা হচ্ছে অহরহ। অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য মানুষ হিংস্র হতে পারে, কিন্তু মানুষের সাহচর্যে থাকার আগ্রহ নিয়ে যারা বন থেকে লোকালয়ে স্থায়ী আসন পেতেছে তাদের কেন মারতে হবে? যারা দুর্বল, নিরীহ প্রাণীকে এভাবে নির্দয়ভাবে হত্যা করতে পারে তারা অকম্পন হাতে নির্দ্বিধায় মানুষ হত্যাও করতে পারবে। তাই এ ধরনের মানুষদের আইনের আওতায় এনে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সমীচীন।
খেলাচ্ছলে শুধু বাচ্চারা নয়, অনেক বয়স্ক মানুষও বিনা কারণে বিড়াল, কুকুরের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন চালিয়ে আনন্দ উপভোগ করে থাকে। ছোটকালে বন্যার অথৈ জলে খড়ের গাদায় আশ্রয় নেয়া একটি অসহায়, নিরীহ, অভুক্ত কুকুরকে উল্লাসধ্বনি সহকারে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা পিটিয়ে মারতে দেখে তার কষ্ট এখনো বহন করে বেড়াচ্ছি। মনে হয়েছিল, কর্মবিহীন বন্যায় কুকুর পেটানোর মর্মান্তিক ঘটনায় সবাই বনভোজনের বিনোদন করছে। অসহায় এ কুকুরটিকে বাঁচানোর পক্ষে একটি লোককেও বলতে শুনিনি। আঘাতের পর আঘাতে কুকুরটির মৃত্যুর করুণ চাহনি সৃষ্টির সেরা জীবদের ওই পৈশাচিক আনন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি।
নির্যাতন করে হত্যা করার পর অপরাধীরা যে কথাটি বলে তা হলো, ‘কুকুরটি পাগল ছিল, লোকজনকে কামড় দিচ্ছে।’ কিন্তু একটি বিষয় পরীক্ষিত যে, খাদ্যের অভাব না হলে হিংস্র পশুরাও লোকালয়ে আসে না, মানুষকে আক্রমণ করে না। যে সাপকে দেখলেই মারার জন্য ছেলে, বুড়া সবাই লাঠি খুঁজি সেই সাপও কখনো উত্ত্যক্ত না হলে মানুষকে ছোবল মারে না। পাগল না হলে কোন কুকুর মানুষকে কামড় দিয়েছে তার প্রমাণ আছে বলে মনে হয় না। পাগল কুকুরও উত্ত্যক্ত না হলে কামড়ায় না। কুকুর বেশির ভাগ পাগল হয় মানুষের দেওয়া মাথার আঘাত থেকে। রাস্তাঘাটে যেভাবে কুকুরকে মারা হয়, পেটানো হয়, ঢিল ছোড়া হয়— তা যদি কোন সুস্থ মানুষকে করা হয় সেই মানুষটি শুধু কামড় দেবে না, ঢিল ছোঁড়া ব্যক্তির কলিজা খুলে চিবাবে। প্রতিটি মা তার সন্তান রক্ষায় সর্বস্ব ত্যাগে প্রস্তুত থাকে। কোন মায়ের কোল থেকে তার সন্তানকে ছিনিয়ে নিয়ে পেটাতে থাকলে কোন মা পাগল না হয়ে থাকতে পারবেন? প্রসবের পর কুকুর সর্বদা না খেয়ে বাচ্চাদের পাহারা দেয়, তখনই ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাদের নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে। ঘেউ ঘেউ করে আক্রমণকারীকে ভয় দেখানোর চেষ্টা থাকলেও এত বিরক্তি নিয়েও কোন কুকুর কাউকে কামড় দিয়েছি বলে শুনিনি।
নিজ সন্তান ও পোষা প্রাণী পশ্চিমা বিশ্বের বেশিরভাগ পরিবারে এ দুইয়ের মধ্যে বিশেষ তফাৎ নেই। অথচ এমন সমাজও আছে, যেখানে কুকুরের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, বিনা কারণে পেটানো হয়। আমাদের সমাজটাও কুকুরকে সহজভাবে গ্রহণ করে না। তাই মহানগরের নির্দেশদাতা কমিটি ও প্রহরী সিদ্দিকের পৈশাচিক নির্মমতায় কুকুরের বাঁচার আর্তচিৎকারে কেউ এগিয়ে আসেনি। হিংস্র সিদ্দিকীরা শুধু বাগিচারটেকে নয়, রয়েছে দেশের সর্বত্র; এদের কঠোরহস্তে সামাজিকভাবেও প্রতিহত করতে হবে। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে এত বেশিসংখ্যক জিঘাংসাকে প্রতিরোধ ও প্রতিহত করা সম্ভব হবে না, সাংগঠনিকভাবে সম্মুখে দাঁড়াতে হবে।
পৃথিবীর কোটি কোটি লোক বিভিন্ন পশুর মাংস খেয়ে থাকে। এসব পশুকে একজন পরম মমতায় লালন-পালন করে এবং আরেকজন কিনে নিয়ে জবাই করে তার মাংস উপাদেয় প্রোটিন হিসেবে ভক্ষণ করে থাকে। আরজ আলী মাতুব্বর আক্ষেপ করে বলেছেন, কেঁচোর মতো মানুষের প্রধান খাদ্য মাটি হলে হয়তো প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতো, কিন্তু খাবারের জন্য একটি প্রাণী আরেকটি প্রাণীকে হত্যা করার প্রয়োজন হতো না। খাদ্যের জন্য পশু হত্যা জায়েজ হলেও আমাদের দেশে কুকুর, বিড়ালের ওপর অকারণ নির্মম নির্যাতন মানি কী করে? অবশ্য আমার মানা না মানায় অসুর প্রবৃত্তির লোকগুলোর কিচ্ছু যায় আসে না।
কুকুর আর ঘোড়া পশুদের মধ্যে বেশি বিশ্বস্ত ও প্রভুভক্ত। ১৯২৪-২৫ সালের একটি সত্য ঘটনার ওপর ভিত্তি করে ২০০৯ সালে ১৬ মিলিয়ন ডলার খরচ করে নির্মিত ‘Hachi: A dog’s Tale’ নামের ৯৩ মিনিটের চলচ্চিত্রটি আমরা অনেকে দেখেছি। জাপানের এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এইজাবুরো উয়েনো তার ছাত্র থেকে উপহাররূপে প্রাপ্ত হাচিকো নামক কুকুরটিকে সানন্দে গ্রহণ করেন। হাচিকো প্রতিদিন অধ্যাপককে বিশ্ববিদ্যালয়গামী ট্রেনে তুলে দিয়ে একা একা ঘরে ফিরে যেত। অধ্যাপক সন্ধ্যায় যখন ফেরত আসতেন হাচিকো রেলস্টেশনের গেটে মনিবের জন্য অপেক্ষা করত। তারপর দু’জন হাঁটতে হাঁটতে বাসায় ফিরত। এভাবে দেড় বছরে কুকুর হাচিকো একদিনও রেলস্টেশনে আসতে ভুল করেনি। কিন্তু একদিন ক্লাসে লেকচার দেওয়ার সময় অধ্যাপক এইজাবুরো উয়েনো হঠাৎ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে মারা গেলেন। দেড় বছরের হাচিকো মনিবের অপেক্ষায় প্রতিদিনের মতো সন্ধ্যায় টিকিট গেটের সামনে বসে আছে, কিন্তু তার মনিব আর ফেরেনি। হাচিকো রেলস্টেশনের টিকিট গেট ছেড়ে দূরে কোথাও যায়নি; মনিবের আসার প্রতীক্ষায় ৯ বছর ৯ মাস ১৫ দিন রেলস্টেশনে কাটিয়েছে। একবার তাকে অধ্যাপকের এক আত্মীয়ের দূরবর্তী বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু হাচিকো রেলস্টেশনে আবার ফেরত আসে। স্টেশনের বাইরে এক দোকানদার হাচিকোকে চিনত বলে প্রতিদিন কিছু খাবার দিত। ১৯৩৫ সালের ৮ মার্চ হাচিকোর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়। হাচিকোর মৃত্যুতে শোকাচ্ছন্ন জাপানে জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়। হাচিকোকে তার মনিবের পাশে টোকিওর আওইয়ামা সিমেট্রিতে কবর দেওয়া হয়। তবে হাচিকোর মৃত্যুর পূর্বেই তার উপস্থিতিতে তার একটি ভাস্কর্য রেলস্টেশনে স্থাপন করা হয়।
মহাভারতের যুধিষ্ঠির তার সঙ্গী কুকুর নিয়ে সশরীরে স্বর্গে আরোহণকালীন বাধা দেওয়া হলে ব্যথিত যুধিষ্ঠির স্পষ্ট ভাষায় প্রতিবাদ করে বলেন যে, ‘স্বর্গে যদি যেতেই হয় তবে কুকুর নিয়েই যাব, স্বার্থপরের মতো ওকে ছেড়ে যেতে পারব না।’ কমনওয়েলথের সদস্য হিসেবে ব্রিটেনের রানী আমাদেরও রানী; তার অনেকগুলো কুকুর আছে। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ দুটি কুকুর নিজে লালন-পালন করতেন। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরও নাকি অনেকগুলো কুকুর রয়েছে; তার কুকুরের চিকিৎসক আবার আমাদের পোষা কুকুরেরও চিকিৎসা করে থাকেন। এ একটি কারণে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি পশুপ্রেমিকদের শ্রদ্ধা বেড়েছে। কথিত আছে, মহাবীর আলেকজান্ডার ভারতীয়দের কাছ থেকে চারটি লড়াইয়ের কুকুর উপহার পেয়েছিলেন।
মানুষ যখন নির্দয়, নিষ্ঠুর ও কলুষিত হয়ে যায় তখন তার কাছে আর মানবিকতা প্রত্যাশা করা যায় না। মানুষ তখন শুধু পশু মারে না, মানুষও মারে। কুকুর, বিড়াল মেরে সামাজিক জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হয় না বলে দূষিত হয় সমাজ, সভ্যতা, বিশ্ব। এ দূষণ সংক্রমণ ব্যাধির মতো বাহিত হতে থাকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে।