প্রথম পর্ব

১০ সেপ্টেম্বরের ‘দৈনিক ঢাকা’ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম, ‘দেশের হাসপাতালে ফের স্বাস্থ্য পরীক্ষা প্রধানমন্ত্রীর’। তার মায়ের নামে গাজীপুরের কাশিমপুরে প্রতিষ্ঠিত ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেমোরিয়াল কেপিজে বিশেষায়িত হাসপাতাল’-এ দেড় বছর পূর্বে চিকিৎসা নিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘আমি যদি কখনও অসুস্থ হয়ে পড়ি তাহলে আপনারা আমাকে বিদেশে নেবেন না। এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ওঠাবেন না। আমি দেশের মাটিতেই চিকিৎসা নেব’।

যারা মাথাব্যথায় কাতর হয়ে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে চিকিৎসার জন্য বিদেশ চলে যান তাদের জন্য এটা প্রধানমন্ত্রীর একটা সতর্ক বার্তা বলে মনে হয়। অবশ্য কোন ভিআইপি’র দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার উপর আস্থা আছে বলে পরিলক্ষিত হয়নি। আস্থা না থাকার অন্যতম কারণ হলো, এরা সরকারের টাকায় বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণের জন্য আইনগতভাবে স্বত্ববান। বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণে এদের নামের দীর্ঘ তালিকা প্রমাণ করে আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থার নাজুক অবস্থা। অসুখ হলেই তাই এদের মনে ভাসে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের নাম। সরকার খরচ না দিলে সম্ভবত বিদেশি হাসপাতালের নাম এভাবে কেউ মুখস্থ রাখতেন না। কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যেকেও চিকিৎসার জন্য পছন্দ করে থাকেন। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সম্ভবত এখনো চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাননি; যদি চিকিৎসার নাম করে তিনি বিদেশে যান তাহলে দেশে চিকিৎসার আর কিছু থাকবে না। তাকে অন্তত চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া যাবে না।

তবে আমার অভিমত হচ্ছে, ভিআইপিদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়াই ভালো। ভিআইপিরা দেশে চিকিৎসা না নিলে সাধারণ রোগীদের জন্য মঙ্গলজনক। তাদের চিকিৎসা দেশে হলে সাধারণ রোগীদের দুর্ভোগ বেড়ে যাবে; যতক্ষণ তারা চিকিৎসা নেন ততক্ষণ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সাধারণ রোগী ও তাদের পরিবেষকদের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। সব চিকিৎসক ভিআইপিদের নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে, ঐ হাসপাতালের অন্য রোগীদের কথা তারা ভুলেই যান। অন্যদিকে ভিআইপিরা চিকিৎসা শেষে চিকিৎসক ও সেবিকাদের উৎকর্ষ সেবার সপ্রশংস সনদ বিতরণ করেন। এই সনদের জোরে তারা সাধারণ রোগীদের যত্ন নেয়ার কথা আর ভাবেন না।

সম্প্রতি একজন রাজনৈতিক নেতার মায়ের অসুস্থতায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের আঙ্গিনায় হাজার খানেক মোটরসাইকেল ও হাজার দুয়েক যুবককে ভিড় করতে দেখেছি। হাসপাতালের আঙ্গিনায় চিৎকার, হইচই; সবার লক্ষ্য নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ। নেতা যেদিকে যাচ্ছেন, কর্মীরা দলবেঁধে সেদিকে দৌড়াচ্ছেন; কর্মীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, কে আগে গিয়ে নেতার ফরমায়েশ খাটবে। এই নেতার দল কিন্তু এখন ক্ষমতাসীন নয়; তারপরও কর্মীদের এত দরদ। এই সকল কর্মীরা ঠিকমতো নিজের মায়ের খোঁজ নেয় কি না সন্দেহ। তাই নেতাদের শুধু নয়, তাদের আত্মীয়-স্বজনদেরও বিদেশে চিকিৎসা নেয়া সমীচীন— আমরা আমজনতা বাঁচবো।

শুধু ভিভিআইপিদের কথা বলি কেন, সচ্ছল, অসচ্ছল নির্বিশেষে প্রতিদিনই চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের মানুষ ভিড় করছে ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডে। দালালের উৎপাত থাকা সত্ত্বেও সাধারণ অবস্থাপন্নরা যাচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম খরচের দেশ ভারতে। শখের বশে কেউ অবশ্য যায় না, বিশেষ পরিস্থিতিতে অনেকে আবার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করেও বিদেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে। রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে যারা ঘোর ভারতবিরোধী তারা বরং বেশি বেশি ভারত যাচ্ছে। সব ক্ষেত্রে ভারতবিরোধী হলেও চিকিৎসা ক্ষেত্রে কিন্তু এরা সর্বদা ভারতের চিকিৎসকদের গুণগান গেয়ে থাকে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেট্টি বাঙালি রোগীদের নিকট খুবই জনপ্রিয়। তার অমায়িক ব্যবহারের সুনাম বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাস, ট্রেনে অল্প খরচে ভারত যাওয়া সম্ভব। এছাড়াও হাসপাতালগুলোর সন্নিকটে রোগীর এটেন্ডেন্টদের স্বল্প ব্যয়ে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। ওখানকার কিছু দালাল সামান্য বকশিশ নিলেও নতুন পরিবেশের সঙ্গে অপরিচিত রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনের জন্য এরা আশীর্বাদস্বরূপ, রোগীদের বসিয়ে রেখে এরা সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে দেয়।

গত সপ্তাহে সংবাদে প্রকাশিত ‘স্বাস্থ্যখাতের স্বীকৃতি’ শিরোনামবিশিষ্ট আমার লেখাটি ফেসবুকে দেওয়ার পর আমার বন্ধুরা বিভিন্ন রকমের মতামত দিয়েছেন। অনেকে স্পষ্টভাবে আমাদের ডাক্তারদের রূঢ় ব্যবহার, সরকারি হাসপাতালের অনিয়ম আর বেসরকারি হাসপাতালগুলোর টাকা কামানোর কারসাজি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। তাদের অভিমত হচ্ছে, আমাদের চিকিৎসাব্যবস্থায় বিরাজমান ত্রুটি নিয়ে রোগীরা চিন্তাগ্রস্ত হলেও বিকল্প না থাকায় বীতশ্রদ্ধ হয়েও দেশে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে; আর চিকিৎসক ও ক্লিনিকের মালিকরা এই সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের দু’জন সাবেক গভর্নরও আমার লেখা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। একজন গভর্নর বলেছেন, বিশ্লেষণধর্মী লেখা, আরেকজন গভর্নর বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় দুটি মুখ্য দুর্বলতা হচ্ছে—বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয় বহনে অধিকাংশ লোক অক্ষম এবং স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান স্বীকৃত নয়।

বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী স্বাস্থ্যমান বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়াভুক্ত আটটি দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কার পরেই বাংলাদেশের অবস্থান। স্বাস্থ্যবিষয়ক জার্নাল ‘ল্যানসেট’ তো বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রশংসা করেছে অনেকবার; বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রশংসা করে তাদের সাময়িকীর একটি বিশেষ সংখ্যাও বের করেছে তারা। স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীন উপজেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সংখ্যা রয়েছে ১৪ হাজার ৩৫৬টি। এছাড়া দেশে রয়েছে অসংখ্য সাধারণ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল। দেশের হাসপাতালগুলোতে সাধারণ ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা হচ্ছে এবং চিকিৎসা করছেন অনেক নামকরা ডাক্তার ও সার্জন। বাংলাদেশে মেডিসিন, কার্ডিওলজি, চক্ষু, দন্ত প্রভৃতিতে একাধিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রয়েছেন। দেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা একটি থেকে বেড়ে হয়েছে চারটি, নতুন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মেডিকেল কলেজের সংখ্যাও বাড়ছে। প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ডাক্তার বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ, উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে আসছেন। শুধু হাসপাতাল আর চিকিৎসকের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি, কতগুলো জটিল রোগের ওষুধ ছাড়া বাংলাদেশে তৈরি ওষুধে অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পর বিদেশেও রফতানি হচ্ছে।

তারপরও মানুষ কেন চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছে এবং কেন বিদেশি ওষুধের উপর বেশি আস্থাবান? ওষুধ নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বরের ‘সংবাদে’র প্রতিবেদনটি পড়লে কিছু ধারণা করা যাবে। সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদন ও বিক্রির দায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৫৯টি মামলা করা ছাড়াও ৭ কোটি ৬২ লাখ ৬৪ হাজার ৬শত টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

এতদ্ব্যতীত একই অপরাধে ৭৮ জন আসামিকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, ৪৫টি প্রতিষ্ঠান সিলগালা করা হয়েছে, ১৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকার ওষুধ জব্দ ও ধ্বংস করা হয়েছে। আমাদের এখানে ওষুধের গুণগত মান রক্ষা করতে পারেনি বলে ২০টি ওষুধ কোম্পানিকে হাইকোর্ট থেকে নিষিদ্ধ এবং ১৪ ওষুধ কোম্পানির অ্যান্টিবায়োটিক উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে।

অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতের এত গুণগান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের মানুষ দেশের চিকিৎসায় ভরসা পাচ্ছে না কেন? এর নানাবিধ কারণ রয়েছে; প্রধান কারণ সম্ভবত বাংলাদেশের চিকিৎসার প্রতি জনগণের আস্থার অভাব। এছাড়া অন্যান্য বিশিষ্ট কারণ হচ্ছে, জনসংখ্যার তুলনায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকের স্বল্পতা, যথাযথ ও মানসম্মত চিকিৎসা প্রদানে ব্যর্থতা, রোগীর মনস্তাত্ত্বিক মোটিভেশনে চিকিৎসকদের অমনোযোগিতা, রোগীকে বাঁচানোর তাগিদে বিদেশের খরচ মেটানোর জন্য আত্মীয়-স্বজনের শেষ সম্বল বিক্রি করে চেষ্টা চালানো, সচেতন জনগণের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার উপযোগী ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অপ্রতুলতা, চিত্তবিনোদনে গিয়ে বিত্তবানদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার আগ্রহ।

জনসংখ্যার আধিক্য, দারিদ্র্য, কিছু চিকিৎসকের অহমিকা, লিপ্সা, অনভিজ্ঞতা, অবহেলা, চিকিৎসক সংগঠনগুলোর হস্তক্ষেপ, সিবিএ-এর দৌরাত্ম্য ইত্যাদি কারণে আমাদের সরকারি হাসপাতালগুলোর দীনতা স্পষ্ট; সরকারের তরফ থেকে চেষ্টা করেও মানোন্নয়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে যেগুলো মানসম্মত সেগুলোর চিকিৎসা ব্যয় আকাশচুম্বী, অধিকাংশ লোকের নাগালের বাইরে। অবশ্য বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলেও প্রচুর অর্থের সংশ্লেষ রয়েছে। তাই ব্যয়ের চেয়ে বেশি বিবেচ্য আস্থা।

হাসপাতাল ও চিকিৎসকের ক্ষেত্রে আস্থা একদিনে সৃষ্টি হয় না বা রাতারাতি নষ্টও হয় না। বিভিন্নভাবে দীর্ঘদিন ধরে রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনদের নিকট থেকে অর্জিত ইতিবাচক মনোভঙ্গি আস্থার সৃষ্টি করে; আর নেতিবাচক অভিজ্ঞতাপ্রসূত প্রতীতি থেকে অনাস্থার উদ্ভব হয়। রোগীর ভুল চিকিৎসা হলে বা চিকিৎসায় অবহেলার কারণে রোগী ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রোগী এবং তার আত্মীয়-স্বজন ডাক্তারের অবন্ধুসুলভ ব্যবহার, ভুল চিকিৎসা নিয়ে হাট-বাজার, রাস্তা-ঘাট, আড্ডায় সহকর্মী, পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধবদের দীর্ঘদিন ধরে বলতেই থাকে। অন্যদিকে ভুল চিকিৎসায় কয়েকজন বিশেষজ্ঞের ব্যর্থতার পর একজন বিদেশি ডাক্তারের অ্যান্টাসিড বা প্যারাসিটামল ট্যাবলেটে যখন মৃত্যুপথযাত্রী রোগী সুস্থ হয়ে উঠে তখন দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থা রাখা মুশকিল। অন্যদিকে ভিভিআইপি বা ক্লিনিকের মালিক চিকিৎসকেরা যখন সামান্য কারণে চিকিৎসা নিতে বিদেশে যাচ্ছেন তখন আস্থা আরও নষ্ট হয়ে যায়।

আমি নিজে কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ; আমার একজন সম্পাদক ও সাংবাদিক সুহৃদ আমার অসুস্থতার সংবাদ নিতে গিয়ে দেশে বিরাজমান চিকিৎসার বেহাল দশা নিয়ে একটি কাহিনী শুনান। আমার উল্লিখিত অগ্রজ সাংবাদিকের বউও একজন চিকিৎসক; চিকিৎসক স্ত্রীর কাশির সাথে রক্ত যাচ্ছিল বলে তারা দু’জন দেশের প্রখ্যাত ও প্রবীণ একজন ডাক্তারের শরণাপন্ন হলেন। চিকিৎসক মহোদয় আবার রোগীর শিক্ষক ছিলেন। ছাত্রীর রোগের বর্ণনা শুনে রেগে ছাত্রীকে তাৎক্ষণিক যক্ষ্মার ওষুধ খাওয়া শুরু করতে নির্দেশ দেন। পনের দিন পর রোগীর জন্ডিস দেখা দিলো। প্রবীণ চিকিৎসক মহোদয় দেশ, বিদেশে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, কর্মশালায় চিকিৎসার উপর গবেষণামূলক আলোচনায় অংশগ্রহণ করে থাকেন। তাই জন্ডিসের ব্যাপারে তার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ পাওয়া গেল না, তিনি এক মাসব্যাপী বিদেশে। বাধ্য হয়ে স্বামী-স্ত্রী দু’জন গেলেন আরেকজন নামকরা ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার সব শুনে বললেন, ‘আমার পক্ষে স্যারের দেওয়া ওষুধ পাল্টানো সম্ভব নয়; স্যার যা বলেছেন তাই পালন করুন’। জন্ডিসের মাত্রা বাড়তে থাকায় বহু চিকিৎসকের নিকট ধর্ণা দিলেন; সবাইর একই ব্যবস্থাপত্র, ‘যক্ষ্মার ওষুধ চলবে’। কেউ কিন্তু কাশি পরীক্ষা করতে বললেন না। শরণাপন্ন অবস্থায় বাধ্য হয়ে ছুটলেন ভারতে। ওখানে অশীতিপর এক ডাক্তারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন; ডাক্তার রোগীর সাথে এক ঘণ্টা যাবৎ হাসি-ঠাট্টার কথোপকথন করে আবিষ্কার করলেন যে, কম বয়সে রোগীর নিউমোনিয়া হয়েছিল এবং তখন পরিপূর্ণ চিকিৎসা হয়নি। বয়স বাড়ার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় নিউমোনিয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত লাং থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। যক্ষ্মার ওষুধ বন্ধ হলো, নতুন ওষুধে রোগী অল্প সময়ে আরোগ্য লাভ করলেন। কিছুদিন পূর্বে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সতীর্থের স্ত্রী দেশের একটি নামকরা হাসপাতালে মারা গেল। মারা তো আমরাও যাব, মরার আগে আমাদের হাসপাতাল সম্পর্কে যে অভিজ্ঞতা তা কেমন? বন্ধুর স্ত্রীর নিউমোনিয়াসহ নানাবিধ রোগ। নিজে কাশি দিয়ে কফ বের করতে পারছে না। চিকিৎসকের পরামর্শে মাথার পরীক্ষা করার জন্য রোগীর চুলে শ্যাম্পু করা হলো; সমস্যা বাধলো চুল শুকানোর ব্যবস্থা নিয়ে। চুল শুকানোর জন্য রোগীর নিউমোনিয়ার মধ্যে মাথার চুলে দুটি ফ্যান ছেড়ে দেওয়া হলো। রোগীর কাশি বেড়ে গেল। হাসপাতালে হেয়ারড্রায়ার নেই। হয়তো চিকিৎসার ক্ষেত্রে এগুলো ধর্তব্যের মধ্যেই পড়ে না, কিন্তু রোগীর স্বামীর যে বিরূপ ধারণা জন্মালো তার অপনোদন কীভাবে সম্ভব? আমার বন্ধুর ধারণা, তার স্ত্রীকে অপচিকিৎসায় মেরে ফেলা হয়েছে।

সংখ্যায় পর্যাপ্ত না হলেও আমাদের দেশে দক্ষ ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক আছেন, কিন্তু তাদের নাগাল পেতে চেষ্টা, তদবিরে ঘাম ঝরে যায়। অন্যদিকে বিদেশি চিকিৎসকদের সঙ্গে আমাদের দেশের চিকিৎসকের মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে, আচরণগত ও দৃষ্টিভঙ্গির। আমাদের ডাক্তারদের আচরণে মনে হয়, ‘ফি’ কোন বিষয় নয়, রোগীরা তাদের কৃপাপ্রার্থী; তারা দয়া না করলে রোগীরা চিকিৎসা পেত না। প্রতিটি রোগী অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে; তাই চিকিৎসক নম্র না হয়ে রোগীর নিকট নম্রতা কেন প্রত্যাশিত তা বোধগম্য নয়। রোগীর আস্থা অর্জনে চিকিৎসকদের খুব বেশি মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না।

আমাদের দেশে হাসপাতাল, ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু নিয়ে প্রায়ই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে থাকে। মৃত্যু প্রত্যাশিত নয় বলে অকস্মাৎ মৃত্যু আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে গভীর আবেগের সৃষ্টি করে এবং এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের সামান্যতম অবহেলা বা ভুল, জনরোষের সৃষ্টি করে। কিন্তু ভুল চিকিৎসা নির্ণয় খুবই জটিল; তার নির্ণয়ে গভীর তদন্ত ও বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন হয় এবং তা করাতে হয় আরেকজন চিকিৎসককে দিয়ে। চিকিৎসক দিয়ে চিকিৎসকের ভুল চিহ্নিত করা সহজ নয়। প্রতিটি পেশায় ভালো কাজের জন্য পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য তিরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। কারণ প্রতিটি পেশায় লোকভেদে আন্তরিকতা ও অবহেলা পাশাপাশি বিরাজ করে। শাস্তি দেওয়া উদ্দেশ্য না হলেও চিকিৎসকদের কমপক্ষে জবাবদিহিতা থাকা দরকার। একজন উপজাতি চিকিৎসক ব্যতীত আজ পর্যন্ত আর কোন চিকিৎসকের কর্মে অবহেলার জন্য শাস্তি হয়েছে বলে জানা যায় না।

তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণের জন্য গবেষণার প্রয়োজন হয় না। কিছু চিকিৎসকের অবহেলা দৃষ্টিকটুভাবে ধরা পড়ে। অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর দেহাভ্যন্তরে কাঁচি, গজ, নিডল ইত্যাদি রেখে দেওয়ার ঘটনা মাঝে মাঝে বিভিন্ন মিডিয়াতে গুরুত্বসহকারে প্রচারিত হয়ে থাকে। এগুলোরও কোন বিচার হয়েছে মর্মে শোনা যায়নি। ভুয়া ডাক্তার বা ওয়ার্ড বয় দ্বারা অপারেশন করানোর খবরও মাঝে মাঝে শোনা যায়। প্রতিবাদবিহীন প্রচারিত এই সব খবরের প্রতি তখন জনগণের বিশ্বাস প্রোথিত হয়ে যায়। মিডিয়ায় এমন সংবাদও লক্ষ্য করা যায় যে, সরকারি চিকিৎসক তার নিজস্ব ক্লিনিকে টাকা রোজগারে ব্যস্ত; সরকারি হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে আয়া, বুয়া, ওয়ার্ড বয়রা ডাক্তারের প্রক্সি দিয়ে যাচ্ছেন; রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনকে মাঝে মাঝে আশ্বাস দিয়ে বলছেন, ‘ডাক্তার স্যার ট্রাফিক জ্যামে আছেন, এক্ষুণি হাজির হবেন’। ‘এক্ষুণি’ কয়েক ঘণ্টায়ও শেষ হয় না। মৃত্যুশয্যায় থেকে কোন রোগী ডাক্তার এবং তাদের সহায়তাকারীদের বিরাগভাজন হতে চায় না বলে এগুলোর কোন প্রতিবাদ হয় না। চিকিৎসকগণ আবার দল বেঁধে ধর্মঘটও পালন করেন।

আমাদের দেশে চিকিৎসকরা রোগীর প্রতি সংবেদনশীল নন, তাদের অধিকাংশের মধ্যে রোগী-বান্ধব আচরণ পরিলক্ষিত হয় না। অসংখ্য রোগীর চাপ ও অত্যধিক ব্যস্ততার জন্য তারা থাকেন গম্ভীর, চেহারায় থাকে বিমর্ষ ও ক্লান্তির ছাপ; এরা রোগীর সঙ্গে হেসে কথা বলতে জানেন না; রোগীকে হাসাতে জানেন না। অত্যধিক রোগীর চাপে চিকিৎসকেরা রোগের কথা সম্পূর্ণ না শুনেই চিকিৎসাপত্র লিখতে শুরু করে দেন বলে সকলের অভিযোগ। তবে রোগীর সব কথা শোনার প্রয়োজন না থাকলেও রোগী তা শুনাতে ব্যাকুল থাকে। কিন্তু আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা রোগীদের এই মানসিক প্রত্যাশাটি সচরাচর উপেক্ষা করে থাকেন। তাই যথাযথ ব্যবস্থাপত্র দেওয়া সত্ত্বেও রোগের প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো অব্যক্ত থাকায় রোগী ও তার এটেন্ডেন্টদের মনে চিকিৎসা নিয়ে সন্দেহ বা অসন্তুষ্টির উদ্ভব হয়।