দ্বিতীয় পর্ব

‘স্বাস্থ্যের বিদেশমুখিন মিছিলে’র প্রথম পর্ব ১৬ অক্টোবরের ‘সংবাদে’ ছাপা হলে আমি তা বন্ধুদের পড়ার জন্য ফেসবুকে পোস্ট করি। কিন্তু একজন বন্ধুও আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে ইতিবাচক কথা বলেনি। বরং অনেকে আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছেন, একই চিকিৎসকের অবস্থানভেদে একই চেহারায় দুই রূপ পরিলক্ষিত হয়। সরকারি হাসপাতালে যখন বসেন তখন চিকিৎসক থাকেন গম্ভীর, ভাব ধরেন হিটলারের; একই চিকিৎসক যখন তার ক্লিনিকে বসেন তখন তার মতো ভালো, নম্র, বিনয়ী ব্যবহারের চিকিৎসক কোথাও দ্বিতীয়জন পাওয়া যাবে না। আরও কয়েকজন লিখেছেন, কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের বাহ্যিক কাঠামো পাঁচতারা হোটেলের চেয়েও চাকচিক্যময়; কিন্তু ভেতরের চিকিৎসাব্যবস্থা তত সুদৃঢ় নয়। এই বাহ্যিক অবয়বের সাজসজ্জার জন্য রোগীকে অর্থ ব্যয় করতে হয়। একজন মন্তব্য করেছেন, এখানে কোন কোন ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় ভারতের চেয়েও বেশি। কয়েকজন বলেছেন, ডাক্তারেরা সবচেয়ে মেধাবী, অথচ স্বাস্থ্যগত নীতিনির্ধারণে তাদের কোন ভূমিকা থাকে না বলে এরা সেবার চেয়ে চিকিৎসাকে ব্যবসায়িক দৃষ্টি দিয়ে বিচার করে থাকেন। আরেকজন লিখেছেন, চিকিৎসকেরা রোগী রেখে রাজনীতির স্লোগান দিতে বেশি ভালোবাসেন। আরেকজন বলেছেন, ছোটকাল থেকে মানসিক গঠনে সেবার ছোঁয়া স্পর্শ না করলে তাদের ডাক্তারি পড়া উচিত নয়। পেশাদারিত্বে মনোযোগী নন বলেই আমাদের দেশের চিকিৎসকেরা রোগীদের সমীহ আদায় করতে অক্ষম— এমন মন্তব্য করেছেন আরেকজন। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ব্যতিক্রম বলে উল্লেখ করেছে চিকিৎসক ভাইঝি।

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোয় চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের যে দুর্ভোগ-দুর্দশা পোহাতে হয় ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারও পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, মৃত্যুশয্যায় রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনেরা সৃষ্টিকর্তার পরেই চিকিৎসকদের উপর বেশি নির্ভরশীল; তাই রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনদের চোখে ভালোটার চেয়ে মন্দটা নজরে পড়ে বেশি। আমাদের দেশে চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের প্রতি বিতৃষ্ণা জন্মানোর যুক্তিসঙ্গত কিছু কারণও আছে। চিকিৎসকের সাক্ষাতের জন্য দীর্ঘদিন পূর্বে তাদের বালাম বইতে নাম লিখিয়ে রাখতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে সাক্ষাতের সময় দেওয়া হয় ছয় মাস পরে। ভাবুন তো, রোগ কি ছয় মাস পর্যন্ত স্থির হয়ে চিকিৎসার জন্য বসে থাকবে? তাতেও মুক্তি মেলে না; ছয় মাস পরে গেলেও চেম্বারে রোগীদের দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়ে উঠেছে। আমরাও অবশ্য অপেক্ষা করার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি; কোন অভিযোগ করি না। এত কষ্ট করে ডাক্তার সাহেব দেখে দিচ্ছেন— এতেই আমরা কৃতার্থ হয়ে যাই।

সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে রোগীকে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বারে আগে গিয়ে দেখানো এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অনেকের নিকট থেকে জানতে পেরেছি। নতুবা সরকারি হাসপাতালে ঐ ডাক্তারের ওয়ার্ডে সিট পাওয়া যায় না। রোগীরাও একদিনের ফি দিয়ে সহজ পথটি বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে বিদেশে চিকিৎসকের সাক্ষাৎ পেতে বসে থাকতে হয় না, ডাক্তার ট্রাফিক জ্যামের অজুহাত দেখিয়ে দেরিতে আসেন না, অন্য দশটি হাসপাতাল বা ক্লিনিকে তাদের সংশ্লিষ্টতা থাকে না, চিকিৎসায় চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিকতা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলার সুযোগ পায় না।

রোগী বা রোগীর এটেন্ডেন্টদের চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য প্রদান না করাও জনগণের মধ্যে চিকিৎসা সম্পর্কে আস্থা সৃষ্টির অন্তরায়। নামকরা ডাক্তারদের বেশি কথা বলার সময় থাকে না বলে রোগী বা রোগীর এটেন্ডেন্টদের কোন জিজ্ঞাসার উত্তর দেয়ারও সময় থাকে না। কিছু জানার জন্য প্রশ্ন করা তো দূরের কথা, ডাক্তারের গাম্ভীর্যে রোগী ভড়কে যায়। এ প্রসঙ্গে একটি সত্য কাহিনী বলি; বাবা তার রোগী সন্তানকে নিয়ে গেছেন চিকিৎসকের কাছে। চিকিৎসক পরীক্ষা করে ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেন। ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে রোগীর বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘বাচ্চার কী হয়েছে?’ ডাক্তার বললেন, ‘আপনি বুঝবেন না’। রোগীর বাবা আবার অনুনয় করে বললেন, ‘তবুও বলুন না’। ডাক্তারের উত্তর, ‘হাই ফিভার’। রোগীর বাবা শান্তভাবে বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে বিএ (অনার্স) এমএ করেছি, হাই ফিভার বুঝবো না কেন?’ ডাক্তার সাহেব ফ্যালফ্যাল করে রোগীর বাবার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। রোগীর এই বাবা ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রথম শ্রেণির অফিসার পদে যোগ দিয়ে পরবর্তীতে বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন।

রোগ নিয়ে আমাদের দেশে কতগুলো বদ্ধমূল ধারণা রয়েছে; জ্বর হলে ভাত খাওয়া যাবে না, ডায়রিয়া হলে শুধু কাঁচা কলা বা পেঁপে রান্না করে খেতে হবে ইত্যাদি। তাই রোগী এবং তার স্বজনেরা পথ্য খাওয়া নিয়ে চিকিৎসককে প্রশ্ন করবেই। ‘ভাত খেতে পারবো কি না, গোসলে ঠাণ্ডা, না গরম পানি ব্যবহার করবো’ ইত্যাদি প্রশ্নে চিকিৎসক বিরক্ত হন। বিরক্তি ভাব দেখে অনেকে প্রশ্ন করার সাহস করে না, অনেকে প্রশ্ন করে উত্তর না পেয়ে অসন্তুষ্টচিত্তে বাসায় ফিরে আসে। এই অসন্তুষ্টি নিরসনেও অগত্যা অনেকের বেছে নিতে হয় বিদেশের চিকিৎসা। কারণ স্বজনদের বাঁচানোর প্রচেষ্টায় মানুষ নিজের সর্বস্ব হারাতেও সম্মত থাকে।

চিকিৎসকদের অবহেলার আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনা মাঝে মাঝে পত্রিকায় ছাপা হয়, মর্গে পরিত্যক্ত মৃতদেহের হঠাৎ জীবিত হয়ে উঠা। এটা যে একজন রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনের জন্য কত দুর্বিষহ তা একমাত্র ভুক্তভোগী জানে। বাংলাদেশ ব্যাংকে আমার এককালের সহকর্মী ও বন্ধু দেওয়ান আবদুস সুলতানের বাবা মৃত্যুর আগে সন্তানদের কাছে একটি আর্জি রেখেছিলেন; তার মৃত্যুর পর চব্বিশ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত তাকে যেন কবর দেওয়া না হয় এবং মুখটা না ঢেকে বেঁচে আছেন কি না তা যেন মাঝে মাঝে যাচাই করা হয়। সংবাদপত্র পড়ে তার ধারণা জন্মেছিল, সব চিকিৎসকের জীবন-মৃত্যু নির্ণয়ের সঠিক ধারণা নেই। কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসনের কারণে সামাজিক চাপ থাকায় মৃত্যুর চব্বিশ ঘণ্টা পার হওয়ার পূর্বেই বন্ধুর বাবাকে কবর দিতে হয়েছিল বলে আমার বন্ধু এখনো আফসোস করে থাকে। সংখ্যায় যত নগণ্যই হোক না কেন, জীবিত লোককে মৃত ঘোষণা করা জঘন্যতম অপরাধ। কারণ চিকিৎসকের ভুলের জন্য জীবিত লোককে কবরস্থ করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আল্লাহ মালিক কাজেমীর একটি প্রাসঙ্গিক বক্তব্য হচ্ছে, ‘নিজের ভুলে মরবো, অন্যের ভুলে মরবো কেন?’

বাংলাদেশে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী ডাক্তার হতে চায়; তাই ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম পছন্দ চিকিৎসাশাস্ত্র। মেধাবী বলেই তো চিকিৎসকদের নিকট জনগণের প্রত্যাশা বেশি। মেধাতালিকায় প্রথম কাতারের বলেই তো এদের পক্ষে হরেক রকম রোগীর হরেক রকম আচরণ অনুধাবন ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। কিন্তু বিসিএস উত্তীর্ণ চিকিৎসকরা কয়েক বছরের জন্য উপজেলায় গিয়ে চিকিৎসা করতে উৎসাহী নন। উপজেলায় পোস্টিং হলেও বছরের বেশির ভাগ সময় থাকেন বড় বড় শহরে। উপজেলায় থাকেন না বলেই সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয়কে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতি ক্ষমা করা হবে না মর্মে হুঁশিয়ারি দিতে হয়। ভালো ছাত্র বলে উপজেলায় কিছুদিন চাকরি করা যাবে না— এমন মানসিকতা প্রথমেই জন্ম নিলে ভালো ডাক্তার হওয়ার সবক আর কার্যকর থাকে না।

আমাদের দেশে রোগীর যথাযথ সেবা নার্সদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব হয় না; কারণ প্রয়োজনানুযায়ী নার্সের নিয়োগ নেই। এ কারণে রোগীর স্বজনেরা রোগীর সঙ্গে অহর্নিশ থাকার চেষ্টা করে। আমার ধারণা, রোগীর সঙ্গে রোগীর আত্মীয়-স্বজন না থাকলে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে অযত্ন, অবহেলায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে যাবে। সব রোগীর চোখ-মুখ বন্ধ করে চব্বিশ ঘণ্টা শুয়ে থাকার প্রয়োজন হয় না। কোন কোন রোগীর মাঝে মাঝে কথা বলা প্রয়োজন, গান শোনা দরকার, টেলিভিশনের আনন্দঘন অনুষ্ঠানগুলো দেখা আবশ্যক। রোগীর রোগভিত্তিক শ্রেণিবিভাজন করা সম্ভব হয় না বলে ডাক্তার, নার্সদের নির্দেশে সব রোগীকে থাকতে হয় মূর্তির মতো নিশ্চুপ। তাই রোগীর একাকিত্বের অসহায়তা কাটানোর জন্য সাধারণ ওয়ার্ডগুলোতে নার্স, ডাক্তারদের বকা শুনেও স্বজনেরা রোগীর পাশে থেকে যান। কিন্তু আইসিইউ বা সিসিইউতে রোগীর এটেন্ডেন্টদের একেবারেই যেতে দেওয়া হয় না; অবশ্য যেতে দেওয়া সমীচীনও নয়। অথচ রোগীর সংকটাপন্ন অবস্থায় নার্সদের অবস্থান থাকে বহুদূরে, বহুচেষ্টা করেও মুমূর্ষু রোগীর পক্ষে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা সহজ হয় না। রোগী বাঁচানোর ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের চেয়ে নার্সের ভূমিকা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমাদের দেশের অধিকাংশ নার্স সংবেদনশীল নয়; মৃত্যু দেখতে দেখতে তাদের সহ্যক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। অন্যদিকে এরা অভিযোগ শুনতেও অভ্যস্ত নয়। রোগীর অভিযোগ থাকে বলেই সম্ভবত রোগীর আত্মীয়-স্বজনদের ধারে-কাছে যেতে দেওয়া হয় না।

অনেকের মতে আমাদের দেশে চিকিৎসা খরচ বেশি; আবার অনেকের মতে চিকিৎসা খরচ বেশি না হলেও তা বহন করার আর্থিক সচ্ছলতা অনেকের নেই। কিডনি অচল হলে একজন রোগীকে সপ্তাহে কয়েকবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। সরকারি হাসপাতালে ডায়ালাইসিসের খরচ তুলনামূলক কম; কিন্তু সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সুযোগ পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে টেকনিশিয়ানদের মর্জির উপর ডায়ালাইসিস করাটা নির্ভর করে। ডায়ালাইসিস করার সময় ডায়ালাইসিসের টেবিলে কয়েক বছর পূর্বে শাহবাগে অবস্থিত সরকারি হাসপাতালে আমার ভাগ্নি-জামাই অল্প বয়সে মারা গেল। ভাগ্নির সম্মুখ থেকে সুস্থ অবস্থায় তার স্বামীকে ডায়ালাইসিস রুমে নিয়ে গেল; কিছুক্ষণ পর সংবাদ পেলাম রোগী আর জীবিত নেই। তখন দেখেছি, ডায়ালাইসিস শুরু করার পর ডায়ালাইসিসের টেবিলের আশপাশে পর্যবেক্ষণের জন্যও কোন চিকিৎসক বা টেকনিশিয়ান থাকে না। এই টেকনিশিয়ান বা ওয়ার্ড বয়দের উপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আমার ধারণা, চিকিৎসক বা টেকনিশিয়ানের অবহেলায় আমার আত্মীয়ের মৃত্যু হয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতালগুলো ব্যবসার জন্য খুলেছে বলে টাকাই তাদের নিকট মুখ্য। কিন্তু সরকারি হাসপাতালগুলো যে অগ্রিম টাকা না পেলে নানা অজুহাতে চিকিৎসা করতে অস্বীকার করে থাকে তার প্রমাণ মিলে ১৮ অক্টোবরের ‘সংবাদে’র একটি মর্মান্তিক খবর থেকে। খবরটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, ‘তিন সরকারি হাসপাতালেও স্থান হলো না অন্তঃসত্ত্বা মায়ের’। প্রসববেদনায় কাতর পারভীন নামে একজন মা শুধু টাকার অভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও আজিমপুরের মাতৃসদন ও শিশুস্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে না পেরে মাতৃসদনের সম্মুখে আজিমপুরের রাস্তার পাশে সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হন। মাতৃসদন থেকে যারা টাকার জন্য অন্তঃসত্ত্বা মাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল তারাই আবার মাতৃসদনের দোতলা থেকে রাস্তায় মায়ের বাচ্চা প্রসব ও প্রসবের পর শিশুটির করুণ মৃত্যু অম্লানবদনে পর্যবেক্ষণ করছিল। গোলাপশাহ মাজারের ফুটপাতে রাত্রিযাপনকারী এই মায়ের প্রসববেদনায় একজন দয়াপরবশ হয়ে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেল; পরীক্ষা করে ওখানকার চিকিৎসক বুঝতে পারলেন যে, বাচ্চা প্রসবে সিজার করতে হবে। তারা সিজারের জন্য মিটফোর্ড হাসপাতাল অধিকতর উপযোগী বলে সেখানে তাকে পাঠিয়ে দিলো। মিটফোর্ড হাসপাতাল আবার এই অন্তঃসত্ত্বা মাকে পাঠালো আজিমপুর মাতৃসদনে। মিটফোর্ড হাসপাতাল সিজারের জন্য নিজেদের চেয়ে মাতৃসদনকে আরও বেশি দক্ষ ভেবে প্রসববেদনায় কাতর পারভীনকে আজিমপুর পাঠিয়ে দিলো। কিন্তু মাতৃসদনে কোন কার্ড বা রেজিস্ট্রেশন না থাকায় তারা প্রসববেদনায় অস্থির মাকে ভর্তি করাতে অস্বীকৃতি জানায়। প্রসববেদনা মারাত্মকভাবে দেখা দেয়াতে দোতলা লেবার রুমে নেয়া হলেও সিজারের প্রয়োজনীয় টাকা না থাকায় একজন চিকিৎসকের নির্দেশে অন্তঃসত্ত্বা মাকে আবার মাতৃসদন থেকে বের করে দেওয়া হয়। আর দৌড়াদৌড়ি করা সম্ভব না হওয়ায় মা রাস্তায় গিয়ে সবার সম্মুখে বাচ্চা প্রসব করে। প্রতিবেদক এ পর্যায়ে লিখেছে, ‘পারভীনের চিৎকার আর সদ্যপ্রসূত শিশুটির মৃত্যু দৃশ্য দেখে প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে কেঁদে ফেলেন’। প্রসববেদনায় কাতর পারভীনের প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল ও আজিমপুরের মাতৃসদনের চিকিৎসকদের এমন নিষ্ঠুর আচরণ মোচন হয় না বলেই গরিবেরাও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চায়।

বারডেমে আমার এ ব্যাপারে একটি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে। রোগী আমার মেজো ভাই, সাবেক সচিব; যারা তাকে নিয়ে গেছেন তারাও আমার অপর দুই ভাই, তাদের মধ্যে একজন ডাক্তার, আরেকজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক। যিনি ডাক্তার তিনি আবার সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিচালকও। এই দু’জন তাদের অবস্থান বর্ণনা করার পরও অ্যাকাউন্ট্যান্ট সাহেব তাদের কথায় কর্ণপাত করলেন না। রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও আগাম টাকা জমা না দেওয়া পর্যন্ত রোগীকে বেডের ধারে-কাছেও যেতে দেওয়া হলো না। আমাদের দেশে বিল পরিশোধে অক্ষমতায় লাশ আটকে রাখার খবরও পত্রিকায় পড়েছি। এগুলোর সব হয়তো সত্য নয়; কিন্তু এই অসত্যগুলো যে সত্যের চেয়ে অনেক জোরালো হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেদিকে কারো খেয়াল আছে বলে মনে হয় না।