ষাটের দশকে ছোটকালের একটি করুণ স্মৃতি আমাকে মাঝে মাঝে পীড়িত করে। ৫ বা ৬ বছর বয়সী আমার এক চাচাতো ভাই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে গ্রামের ডাক্তার স্যালাইন দেওয়ার জন্য ৫০ বার চেষ্টা করেও শিরা খুঁজে পাননি। ডাক্তার সুচ দিয়ে হাত, পা, শরীর ফুটো করে যাচ্ছে আর বাচ্চাটি বাঁচার আশায় ফ্যালফ্যাল করে ডাক্তারের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। ২ মিনিটের মধ্যেই শিশুটি মারা গেল। দাদি চিৎকার করে বলে উঠলেন, ‘এই ডাক্তার, নাতিকে বাঁচাতে না পারলে এত কষ্ট দিলি কেন?’ এছাড়াও প্রতি বছর কলেরায় হাজার হাজার লোক মারা যেতেন, কিছু লোক কবর তৈরি করতেই থাকতেন, কিছু নিয়োজিত থাকতেন লাশ কবরে আনার জন্য। কলেরার ক্ষেত্রে আইসিডিডিআরের খাবার স্যালাইন প্রবর্তন এবং স্বাস্থ্যসম্মত ল্যাট্রিন ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার বিস্তৃতি লাখ লাখ কোটি কোটি মানুষকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। ঢাকা সিটি করপোরেশনও গণশৌচাগার তৈরি শুরু করেছে।

অনেক প্রতিবন্ধকতার মাঝেও কয়েক দশক ধরে গ্রামের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং দেশের মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ অগ্রগতি সাধন করেছে এবং এ অগ্রগতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে এবং পাচ্ছে। নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোর জন্য অনুসরণীয় হয়ে উঠছে। বিশ্বাঙ্গনে খ্যাতিমান অনেক চিকিৎসক বাংলাদেশে আছেন এবং বাংলাদেশেই বহু জটিল রোগের চিকিৎসা হচ্ছে। অল্প কিছুদিন আগে একটি অদ্ভুত রোগ এবং রোগে আক্রান্ত বৃক্ষমানবকে দেখলাম। মানুষের হাতের আঙুল যে বৃক্ষরূপ ধারণ করে তা আমার জীবনে প্রথম শুনেছি ও দেখেছি। পৃথিবীর অন্য দেশেও এই রোগে আক্রান্ত মানব রয়েছেন। আমাদের দেশের বৃক্ষমানবের দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আমাদের দেশের চিকিৎসকরাই করেছেন। কিন্তু অন্য দেশে এ রোগের চিকিৎসায় সফলতা খুব বেশি আসেনি। গুলিবিদ্ধ গর্ভবতী মাকে সুস্থ করে তুলেছেন আমাদেরই চিকিৎসকরা। মস্তিষ্ক জোড়া লাগানো যমজ নবজাতককে অস্ত্রোপচার করে পৃথক করার কৃতিত্ব আমাদের চিকিৎসকদের।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন দেশের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে স্বাস্থ্যগত সূচকগুলোর উন্নতি বা অবনতির ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। বিশ্বব্যাপী সর্বমহলে স্বীকৃত প্রায় ১৯০ বছরের প্রাচীন যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এর গবেষণা ও বিশ্লেষণে ১৯৮টি দেশের মধ্যে ৫২তম অবস্থানে থেকে স্বাস্থ্যমান উন্নয়নের সূচকে বাংলাদেশ শুধু শ্রীলংকা ও পাকিস্তানকে পশ্চাতে ফেলে দেয়নি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভারতের চেয়েও এগিয়ে। ল্যানসেটের মতে, স্বাস্থ্যসেবায় বরাদ্দ স্বল্পতা, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং বিপুল দারিদ্র্যের মধ্যেও বিগত ৪ দশকে বাংলাদেশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যতিক্রমধর্মী ও বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে।

মাতৃমৃত্যু ও অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সীদের মৃত্যুহার হ্রাস পাওয়া, গড় আয়ু বৃদ্ধি, টিকাদান কর্মসূচির বাস্তবায়ন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ, খাবার স্যালাইনের ব্যবহার, স্বল্পমূল্যের ওষুধের সহজলভ্যতা প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাফল্যের বর্ণনা দিয়ে ল্যানসেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য নিয়ে একটি বিশেষ সংখ্যাও প্রকাশ করেছিল; স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতির ক্ষেত্রে এরূপ স্বীকৃতি বিরল ও গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও বলেন, ‘ভারত অর্থনৈতিকভাবে অনেক এগিয়ে থাকলেও স্বাস্থ্য ও পুষ্টিসংক্রান্ত সূচকে তারা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে।’

সীমিত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারে অগণিত লোকের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ছিল বলেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধের মধ্যেও সীমিত সম্পদ দ্বারা কিউবা উৎকর্ষ স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রবর্তন ও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছে। তদ্রূপ সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার রয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলের স্বাস্থ্যকর্মীদের দেওয়া হয়েছে ল্যাপটপ ও ইন্টারনেট সংযোগ। ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা সম্প্রসারিত হওয়ায় কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইলেকট্রনিক নিবন্ধন পদ্ধতির প্রবর্তন করা হয়েছে। জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ফোন, জেলা সিভিল সার্জনের অফিসের সঙ্গে গড়ে তোলা হয়েছে ভিডিও কনফারেন্সিং ব্যবস্থা। ডিজিটাল নেটওয়ার্কিং গড়ে তোলার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্য কার্যক্রম সহজেই নিয়মিত কেন্দ্র থেকে মনিটরিং করাও সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের প্রক্রিয়াকে উন্নয়নকামী দেশগুলোর জন্য ‘রোল মডেল’ হিসেবে গ্রহণ করতে পরামর্শ দিয়েছে।

সরকারি-বেসরকারি উভয় পর্যায়ে টেলিমেডিসিন সুবিধা ইদানীং পাওয়া যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ফোনে ১৬২৬৩ নম্বরে ফোন করে ২৪ ঘণ্টাব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। ২০০৫ সালে প্রবর্তিত বেসরকারি পর্যায়ে স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত প্রযুক্তি স্টার্টআপ ‘ডক্টরোলা’র সঙ্গে অনেকগুলো হাসপাতাল ও কয়েক হাজার চিকিৎসক সংশ্লিষ্ট আছেন। মাতৃস্বাস্থ্যসংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে এসএমএসের মাধ্যমে সহায়তা করছে বিভিন্ন মোবাইল ফোন কোম্পানি। মহিলা ও শিশু স্বাস্থ্যের উন্নয়নে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহারের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ ২০১১ সালে ‘ডিজিটাল হেলথ ফর ডিজিটাল ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক সাউথ-সাউথ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা বিশেষ করে শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর তাগিদে বর্তমান সরকার প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর তত্ত্বাবধানে প্রতি ৬ হাজার লোকের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করার লক্ষ্য নিয়ে এ পর্যন্ত ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে ১৩ হাজার ৫০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছে। এই ক্লিনিক থেকে সাধারণ রোগের চিকিৎসায় বিনামূল্যে ৩০ প্রকার ওষুধ সরবরাহের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতি মাসে বর্তমানে প্রায় এক কোটি লোক এ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করছেন; সেবাগ্রহীতাদের অধিকাংশ হচ্ছেন গ্রাম এবং শহরের দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষ। আবার এদের মধ্যে শিশু ও মহিলাই বেশি।

স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সাফল্য ১৯৭৯ সালে প্রবর্তিত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)। মানুষের শরীরে প্রবেশের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকা আশপাশের কোটি কোটি জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে টিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। শুরুতে সরকারিভাবে ৬টি টিকা দেওয়া হতো, এখন ১০টি দেওয়া হয়। তবে বেসরকারিভাবে ১৮ টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ১৮টি ভ্যাকসিনে ১৮টি রোগ প্রতিরোধ হয়। এখন টিকাদান কর্মসূচি এমন উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে যে, টিকা দেওয়ার ঘোষিত স্থানে আসার জন্য শুধু শিশুদের সাজানো হয় না, মায়েরাও সুসজ্জিত হয়ে অনেকটা বেড়ানোর হাসি-খুশি মন নিয়ে টিকাদানের অস্থায়ী ক্যাম্পে উপস্থিত হন। জনসচেতনতা সৃষ্টি ও উদ্দীপনার উৎসব তৈরিতে মিডিয়া এবং এনজিওগুলোর অবদান কম নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের এসব সফল পদক্ষেপ ও কর্মসূচির আলোকে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়নেরও পরামর্শ দিয়েছে।

২০০০ সালে জাতিসংঘ সহস্রাব্দ উন্নয়নের যে ৮টি লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করে তার মধ্যে শিশু মৃত্যুহার হার কমানো, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এইডস, ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগব্যাধি দমন উল্লেখযোগ্য। ২০১৫ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুমৃত্যুর হার ৪৮ জনের মধ্যে সীমিত রাখার সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০১৩ সালেই পূরণ হয়ে যায়; বর্তমানে এ হার ৩৭।

১৯৯০ সালে এ শিশুমৃত্যুর হার ছিল ১৫১ জন। অন্যদিকে এক বছরের কম বয়সী ও নবজাতক শিশুমৃত্যুর হার ২০১৫ সালের মধ্যে হ্রাস করার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ৩১ জনের বিপরীতে ২০১৩ সালেই ৩২-এ নেমে আসে। ১৯৯০ সালে এই হার ছিল ৯৪ এবং বর্তমানে তা ২৩। বেঁধে দেওয়া সময়ের আগেই বাংলাদেশ শিশুমৃত্যুহারের ক্ষেত্রে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১০ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে এমডিজি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করেছে।

এক বছর বয়সী শিশুর হামের টিকা গ্রহণের অনুপাত ১৯৯০ সালের ৫৪ শতাংশ থেকে বর্তমানে ৯০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ১৯৯০ সালে অনূর্ধ্ব ৫ বছর বয়সী শিশুর কম ওজন হার ছিল ৬৬ ভাগ যা বর্তমানে হ্রাস পেয়ে অর্ধেকে নেমে এসেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে এক বছরের নিচে শিশুদের প্রথম টিকা গ্রহণের হার প্রায় ৯৯ শতাংশ। এখন ইপিআই-এর আওতাভুক্ত শিশু ৮১ শতাংশ যা ১৯৮৫ সালে ছিল ২ শতাংশ। ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ খাওয়ানোর হার ৯৫%-এ উন্নীত হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচির অসামান্য সাফল্যের জন্য বাংলাদেশ ২০০৯ ও ২০১২ সালে শ্রেষ্ঠ অ্যাওয়ার্ড ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন’ লাভ করেছে। দেশব্যাপী খাওয়ার স্যালাইনের সহজপ্রাপ্যতা শিশুমৃত্যুর হার ব্যাপকভাবে হ্রাস করেছে।

১৯৯০ ও ২০০১ সালে মাতৃমৃত্যুহার ছিল যথাক্রমে ৫৭৪ ও ৩২০ যা ২০১৩ সালে হয়েছে ১৭০। এমডিজির মেয়াদকালে প্রতিবছর গড়ে ৩ শতাংশ হারে মাতৃমৃত্যু কমানোর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে হ্রাস পেয়েছে ৩ দশমিক ০৬ শতাংশ হারে। গর্ভধারণ থেকে নবজাতক জন্মের ২৮ দিন পর্যন্ত গর্ভধারণ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে মায়ের মৃত্যুকেই এখানে মাতৃমৃত্যু হিসেবে ধরা হয়েছে। নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব নিশ্চিত করার পাশাপাশি দক্ষ মিডওয়াইফ নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। গর্ভবতী মায়েদের প্রসবকালীন এবং গর্ভাবস্থায় একটু সচেতনতা অবলম্বনে প্রসবকালীন অনেক জটিলতা এড়ানো সম্ভব। অন্যদিকে পুষ্টিকর খাবার মায়ের রক্তশূন্যতা রোধ এবং পরে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। গর্ভাবস্থায় ও প্রসবপরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে বয়স্ক মহিলাদের সম্পৃক্তকরণ, বাল্যবিবাহ নিরুৎসাহিতকরণ, দেরিতে সন্তান নেয়া এবং দেশজুড়ে প্রতিষেধকের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণই মাতৃমৃত্যু হ্রাসের অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশে এইডসের প্রাদুর্ভাব এখনো শতকরা ০.১ ভাগ যা মহামারী সীমার নিচে। এমডিজির নির্ধারিত সূচক বিচারে এ হার সন্তোষজনক। ম্যালেরিয়া ও যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে এমডিজির লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়েছে। কিছু দুর্গম অঞ্চল ছাড়া বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ পরিলক্ষিত হয় না। যক্ষ্মার মতো মরণব্যাধির হাত থেকেও বাংলাদেশ অনেকটাই মুক্ত। পোলিও ও কুষ্ঠরোগ মোটামুটি নির্মূলের পথে।

পর পর তিন বছর পোলিওমুক্ত থাকায় বাংলাদেশ ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের সনদ পেয়েছে। বাংলাদেশে এখন ধনুষ্টঙ্কারমুক্তও।

বিভিন্ন সংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণেও বাংলাদেশের সফলতা রয়েছে। ২০১১ সাল থেকে অটিজম মোকাবিলায় বাংলাদেশ গভীর মনোযোগ দিয়েছে।

মাথাপিছু আয় তুলনামূলক কম হলেও মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রভূত উন্নতি হয়েছে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানাবিধ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছার কারণে আমাদের গড় আয়ু শুধু ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি নয়, পৃথিবীর সব দেশের গড় আয়ু থেকে বেশি। আমাদের গড় আয়ু বর্তমানে ৭১ দশমিক ৮ বছর যা বিশ্বে ৭১ দশমিক ৪ বছর। বর্তমানে ৯৭ ভাগেরও বেশি দেশীয় চাহিদা পূরণ করে পৃথিবীর ১২৭টি দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রফতানি করছে।

ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ রোধে সারা দেশে ২০৪টি ফার্মাসিকে ‘মডেল’ ফার্মেসি হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

নতুন নতুন জেনারেল হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা ছাড়াও দেশের বিদ্যমান হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কেনা হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি। অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, হেলথ টেকনোলজি ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজ এবং নার্সিং ট্রেনিং ইনস্টিটিউট। ১৯৫৬ সালে ড. ইব্রাহীমের পরিবারের ছোট একটি ঘরে যে বারডেমের শুরু, তা আজ শুধু জাতির গর্ব নয়, স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিকভাবেও। বিশ্বের বৃহত্তম ‘শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট’ র নির্মাণকাজ চলছে। দেশে বিশ্বমানের একটি ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেয়া হয়েছে।

মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল বা এমডিজি অর্জনের সময় শেষ হয়েছে ২০১৫ সালে; এখন ঘোষিত হয়েছে ২০১৬ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদি ‘সাসটেনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ (এসডিজি); এতে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো হচ্ছে, সব মানুষের জন্য গুণগত স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টিমান উন্নয়ন, যথার্থ ওষুধ ও ভ্যাকসিন নিশ্চিতকরণ। অতি সম্প্রতি মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বার্ষিক সম্মেলনে সংস্থার মহাসচিব স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেছেন মর্মে ১০ সেপ্টেম্বরের সংবাদ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। ১৮ সেপ্টেম্বরের সংবাদের নিজস্ব বার্তা পরিবেশক উল্লেখ করেছে যে, ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে আইনি, নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত দিক থেকে বাংলাদেশ সঠিক পথেই রয়েছে বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।’ বিশ্বের অব্যাহত স্বীকৃতি আদায়ের নিমিত্তে এমডিজি’র মতো এসডিজিতে সফলতা আনতে অনবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার অপরিহার্য।