গত সপ্তাহের সংবাদে ‘ফেইসবুকের শুভদিক’ নিয়ে লেখার পর আমার বন্ধুরা ফেসবুক নিয়ে কীভাবে অস্বস্তি প্রকাশ করেছে তার কিছু নমুনা হচ্ছে, ‘তোর ঘরে বোধহয় টিনএইজ নেই। থাকলে বুঝতি’;
‘ফেসবুকে যেসব রুচিহীন, অশ্লীল, রাষ্ট্রবিরোধী কথা লেখা হয় তার উপর কিছু করা দরকার’; ‘কিশোর, যুবকদের অস্বাভাবিক মাত্রায় ফেসবুক ব্যবহারে বখে যাওয়া প্রসঙ্গটি কলামের প্রতিপাদ্য হতে পারে’; ‘ইদানীং রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফেসবুকে যা দেখতে হচ্ছে তার বীভৎসতা সহ্য করতে পারি না’; ‘সহজেই নেটে, ইউটিউবে ঢুকা যাচ্ছে বিধায় যুবসমাজের অনেকে খারাপ সাইটে ঢুকে অজস্র সময় নষ্ট করছে’;
‘মূর্খ ও অজ্ঞ লোকদের কারণে ফেসবুক বিরক্তিকর হয়ে উঠছে’; ‘ফেসবুকের কিছু খারাপ দিকও আছে’। বন্ধুদের আরও অসংখ্য মন্তব্যে বুঝলাম, ফেসবুক নির্ভেজাল শুভ নয়, এর অন্ধকার দিকও আছে।
৯ সেপ্টেম্বরের ‘সংবাদ’ পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী বাগেরহাটের মোল্লাহাটে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করে ভাইরাল করার ঘটনায় আবদুর রহিম নামে এক বখাটে যুবককে আটক করেছে পুলিশ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে না দেওয়া পর্যন্ত ধর্ষিতা পড়ালেখার ক্ষতি এবং লোক-লজ্জার ভয়ে নিশ্চুপ ছিল। ফেসবুকে আসার পর ধর্ষিতা নিজে বাদী হয়ে থানায় মামলা করে। অন্যদিকে ১০ সেপ্টেম্বরের ‘সংবাদ’-এর খবর হচ্ছে, ‘অশ্লীল ছবি ও নারীর ছবি দিয়ে বিভিন্ন ভুয়া নামে ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ আদায়ের অভিযোগে নাটোরে ১১ প্রতারককে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ’।
একক বা দলবদ্ধ হয়ে ধর্ষণের খবরের পাশাপাশি ফেসবুকে তার দৃশ্যের প্রচার সভ্যতার বিবমিষা ছাড়া আর কিছুই নয়। প্রেমের ফাঁদ পাতার একটি নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হচ্ছে ফেসবুক। জোরপূর্বক ধর্ষণ ছাড়াও প্রেমের ফাঁদে ফেলে আবেগময় মুহূর্তগুলোর ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে আপলোডের ভয় দেখিয়ে অনেক লম্পট সহজ, সরল মেয়েদের প্রতারণার জালে আবদ্ধ করে ফেলে। যারা দুর্বল তারা সারা জীবন প্রতারণার জালে জড়িয়ে দুর্বিষহ জীবন বেছে নেয়, আর যারা ক্রমাগত অযাচিত চাপ সহ্য করতে পারে না তারা আইনের দ্বারস্থ হয় অথবা আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এভাবে ফেসবুকের অপব্যবহার ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজকে বিপন্ন করে তুলছে। অসুস্থ লোকের জঘন্য কাজগুলো কেউ সহ্য করে, কেউ প্রতিঘাত করে, কেউ রণে ভঙ্গ দিয়ে ফেসবুক থেকে বিদায় নেয়।
২০০৪ সালে ফেসবুকের যাত্রা। প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন, মার্ক জুকারবার্গ। প্রতিষ্ঠার পর এর ব্যবহার শুধু হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে জুকারবার্গের সতীর্থদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালে সর্বসাধারণের জন্য ফেসবুক উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পৃথিবীব্যাপী বর্তমানে প্রায় দেড়শ’ কোটি লোক ফেসবুক ব্যবহার করছে। আমাদের দেশে এখন দেড় কোটি লোক ব্যবহার করলেও ২০২১ সালের মধ্যে ১০ কোটিতে বৃদ্ধি পাবে বলে অনেকের অভিমত। পৃথিবীতে প্রতিদিন দুই লাখ লোক নতুন করে ফেসবুকের সদস্য হচ্ছে।
এইরূপ জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও ফেসবুকের অহিতকর বিষয়গুলোর বিবেচনায় সিরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ইরানে ফেসবুক নিষিদ্ধ। মুসলিম জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত উইঘুরের রাজধানী উরুমকিতে ২০০৯ সালে দাঙ্গায় প্রাণ হারায় ১৯৭ জন। দাঙ্গা বাঁধানো ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ফেসবুক মুখ্য ভূমিকা পালন করায় সারা দেশে ফেসবুক বন্ধ করে দেয় চীনা সরকার। প্রধানমন্ত্রী নাভিন রামগুলামের নামে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খুলে চালানো অপপ্রচার রুখতে ২০০৭ সালে কয়েক ঘণ্টার জন্য ফেসবুক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল আফ্রিকার দেশ মরিশাসে।
সহজ আচরণবিধি ও কম খরচের কারণে বাসা-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস-আদালত, হাট-বাজার, বাস-স্টিমার-রেলগাড়ি সর্বত্র নির্বিচারে ফেসবুকের ব্যবহার হচ্ছে। আসক্তির কারণে ফেসবুক ব্যবহারে অনেকের অনেক সময় মাত্রাজ্ঞানও লোপ পায়। অফিসিয়াল বৈঠক, সভা, সেমিনার, কর্মশালা, সিম্পোজিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝেও অনেককে ফেসবুকে মশগুল থাকতে দেখা যায়। পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পারস্পরিক কুশলাদি জানার মাঝেও কেউ কেউ ফেসবুক নিয়ে ব্যস্ত থাকে। অসৌজন্যমূলক এই আচরণ অন্যের বিরক্তির কারণ হলেও তার প্রতি ফেসবুক ব্যবহারকারীদের কোন ভ্রূক্ষেপ নেই।
বর্তমান বিশ্বে এই প্রযুক্তির অবদান ও ব্যবহারকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না বলে অনিষ্টের হোতারা ফেসবুককে শক্তহাতে আঁকড়ে ধরেছে। এদের জঘন্য ও কুৎসিত ব্যবহারে অনেকের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। নিজের ও পরিবারের সদস্যদের স্বস্তির আবহে অকল্যাণের আশঙ্কায় অস্বস্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।
এক সময় ছিল অবসর মুহূর্তে মানুষ মঞ্চনাটক, সিনেমা বা টেলিভিশন দেখে সময় কাটাতো; দীর্ঘ ছুটিতে দর্শনীয় স্থানে বেড়াতে যেত বা আত্মীয়-স্বজনের সান্নিধ্য কামনা করত। এখনো হয়তো এগুলোই করে, তবে হাতে থাকে মোবাইল এবং চোখ থাকে ফেসবুকে। ফেসবুকের কারণে এখন রক্তের সম্পর্ক, আত্মীয়তার বন্ধন দিনদিন শিথিল হচ্ছে। ফেসবুকে নিবিষ্ট থাকার কারণে ছেলে, মেয়েরা আজকাল মা-বাবার সাথে কোন অনুষ্ঠানে যেতে আগ্রহী হয় না। অনেক স্বামী, স্ত্রী পাশাপাশি শুয়ে থেকেও দু’জন দুদিকে ফিরে ফেসবুকে ব্যস্ত থাকতে আরামবোধ করে। ফলে এখন প্রতিবেশী ও আপন বাস্তব মানুষটির চেয়ে ভার্চুয়াল মানুষটি অনেক বেশি আনন্দদায়ক হয়ে উঠেছে।
উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ফেসবুক আইডি ভুয়া। ভুয়া নাম, ভুয়া ঠিকানা, ভুয়া বয়স এবং ভুয়া পেশার ছদ্মবেশে অবুঝ, নিরীহ ছেলে বা মেয়েকে প্রতারিত করা, ভণিতার বাকচাতুর্যে প্রেমের ফাঁদ পাতা, বিপক্ষ মতকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করা ভুয়া আইডি ব্যবহারের মুখ্য উদ্দেশ্য। অসংখ্য আইডিতে অ্যাকাউন্টধারীর ছবির পরিবর্তে থাকে ছবির ছায়া; ফুল, ফল, নায়ক, নায়িকা, খেলোয়াড়, দলীয় নেতা বা নেত্রী অথবা দলীয় নির্বাচনের প্রতীক। ঠিকানা যাচাইয়ের কোন পদ্ধতি না থাকায় এসব ভুয়া অ্যাকাউন্টে উল্লিখিত টেলিফোন নম্বরও ভুয়া। এদের অনেকে হয়তো প্রকৃত বন্ধু অথবা আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থার লোক বা সন্ত্রাসী অথবা জঙ্গি। এক ব্যক্তির একাধিক অ্যাকাউন্ট থাকার সুবিধায় এরা এক এক অ্যাকাউন্ট এক এক লক্ষ্যে ব্যবহার করে থাকে। বিপক্ষ মতকে থামানোর জন্য নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে এরা হয়ে উঠে অশিষ্ট, অভদ্র, অসভ্য, বর্বর, জঘন্য, কুরুচিময় ও কুৎসিত। কোন অ্যাকাউন্টে এরা প্রেমের অমিয় বাণী শোনায়, অন্য অ্যাকাউন্টে প্রতিপক্ষকে জঘন্য ও কুরুচিপূর্ণ ভাষায় গালাগালি করে।
মেয়েদের ছবি সংবলিত অ্যাকাউন্টধারীদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সচরাচর আগ্রহসহকারে গৃহীত হয়। এই বিষয়টি শুধু ফেসবুকের ক্ষেত্রে নয়; অনেক বিখ্যাত সাহিত্যিকও তাদের প্রথমদিকের লেখা পত্রিকা বা সাময়িকীতে ছাপানোর নিশ্চয়তা বিধানে মেয়েদের নাম ব্যবহার করেছেন। এই ভুয়া আইডির লোকেরা নির্মল আনন্দ বা সখ্যতা গড়ার জন্য ফেসবুকে আসে না; আসে আদর্শ, উদ্দেশ্য প্রচার ও প্রচারণা করার জন্য। অলিখিত হলেও এরা সংঘবদ্ধ গোষ্ঠী। নিজ নিজ রাজনীতি ও ধর্মের পক্ষে বলা, লাইক দেওয়া, শেয়ার করা ছাড়াও বিপক্ষের মতামতকে নানাভাবে শায়েস্তা করার ব্রত নিয়ে এরা সার্বক্ষণিক সক্রিয়। প্রকৃত হিসাবধারীরা লজ্জায় এদের সঙ্গে বাদানুবাদ থেকে বিরত থাকে; কারণ ফেসবুকে বন্ধু হচ্ছে তাদের মা, বাবা, ভাই, বোন, পুত্র, কন্যা এবং সজ্জন ব্যক্তি।
অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল যে কোন লোকের আপন আপন আদর্শ, মত, ধর্মমত নিয়ে ফেসবুকে সক্রিয় থাকাটা দোষণীয় নয়। কিন্তু মনগড়া, মিথ্যা, বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, কাল্পনিক, হাস্যকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত, উসকানিমূলক, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষপূর্ণ পোস্টগুলো বিরক্তিকর ও জঙ্গি তৈরির সহায়ক। শ্রীলঙ্কায় তামিলদের উপর তাদের সেনাবাহিনীর নৃশংস নির্যাতনের ছবি বা ভিডিও রোহিঙ্গাদের ওপর মায়ানমারের নির্যাতন বলে প্রচার করা হয়। স্কুল ছাত্র-ছাত্রীদের উপর বোকো হারামের অত্যাচার, ইয়াজিদিদের ক্ষেত্রে আইএস-এর নিষ্ঠুর আচরণ কাশ্মীর এলাকায় ভারত বা মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলি সেনার নিবর্তনমূলক আচরণ বলে পোস্ট করা হয়। বিভ্রান্তি ও প্রতারণাপূর্ণ এ জাতীয় পোস্ট যুবকদের আকৃষ্ট ও বিভ্রান্ত করে। এই পোস্টগুলোর নির্জলা মিথ্যার কেউ প্রতিপক্ষ হলে অশালীন ভাষায় শুধু প্রতিবাদ করা হয় না, তলোয়ারের এক কোপে কল্লা কাটার শপথ নেয়ার ঘোষণাও শুনিয়ে দেওয়া হয়। এদের মিথ্যার নির্জলতা আদিম যুগের বর্বরতাকেও হার মানায়। রোহিঙ্গাদের উপর অত্যাচারের মাত্রা যে এর চেয়ে কম তা কিন্তু নয়; প্রশ্ন হচ্ছে খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা একবার হারালে সত্য খবরও আর বিশ্বাস করানো যায় না।
ভুয়া অ্যাকাউন্টধারী ফেসবুকের মাধ্যমে বিভিন্ন আবর্জনা শুধু পোস্ট করেই ক্ষান্ত হয় না, ধর্ম ও রাজনীতির দোহাই দিয়ে অন্যদের সেই আবর্জনায় শরিক হতে প্রলুব্ধ করে। অদ্ভুত ও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, শিক্ষিত, অশিক্ষিত নির্বিশেষে অনেকে তা সঠিক ভেবে বোকার মতো ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ ও নির্দেশনা অনুযায়ী ‘মন্তব্য’ও করে।
বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহ, মারামারি, কাটাকাটি, আগুনে পোড়া আহত বা মরদেহের বিকৃত ছবি কোমলমতি শিশুদের মনে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। ফেসবুকের একটি ভিডিও ক্লিপ আমাকে এখনো মর্মাহত করে। একটি গরুকে ছুরির দু’টি পোচ দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ছেড়ে দেওয়া হলে গরুটি বাঁচার তাগিদে লাফ দিয়ে উঠে দৌড় দেয়; পেছনে পেছনে শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সবাই উৎফুল্ল হয়ে চিৎকার, তালি দিতে দিতে দৌড়ায়, অনেক দূর যাওয়ার পর এক শক্তিশালী যুবক লাঠির আঘাতে গরুটিকে মাটিতে ফেলে দিয়ে চেপে ধরে দ্বিতীয়বার জবাই করে; একটু আগে যে গরুটি বাঁচার ক্ষীণ আশায় প্রাণপণে দৌড়াচ্ছিল সেই গরুটি অসহায় অবস্থায় কিছুক্ষণের মধ্যে নির্জীব হয়ে যায়। এগুলো মানুষকে হিংসাবিরোধী না করে বরং হিংসাশ্রয়ী করে তুলছে।
আমাদের মনে থাকে না যে, কারো নিকট যা আনন্দ, অন্যের নিকট তা দুঃখ বয়ে আনতে পারে। অধিকাংশ মানুষ সুন্দরের পূজারী। আকর্ষণীয় ও মানানসই সাজসজ্জা ছাড়া সাধারণত কেউ সেলফিও তোলে না। তাই তো লাস্য ও লাবণ্যভরা বয়স পার হলে সুচিত্রা সেন লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে গিয়েছিলেন; শত চেষ্টায়ও তাকে জনসম্মুখে আনা যায়নি। সিনেমা জগতে এক সময়ে পুরুষদের নিদ্রা হারামকারিণী মেরিলিন মনরো যৌবন থাকতে থাকতেই আত্মহত্যা করেছিলেন। রূপবতী ব্রিজিত বারদো, গ্রেটা গার্বো সিনেমা জগত থেকে বিদায় নিয়ে নিজের বাড়িতে অনেকটা আত্মগোপন করে বাকি জীবন কাটিয়েছেন।
ফেসবুকের বিপজ্জনক আশঙ্কা হলো, আইডি হ্যাকড্ হয়ে যাওয়া। হ্যাকড্ আইডির তরফ থেকে আপত্তিকর মন্তব্য, বিকৃত বা অশ্লীল ছবি পোস্ট দেওয়া অথবা মানহানিকর সংবাদ পরিবেশনের কারণে আইনে অভিযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়; অপরাধ না করেও অন্য অসৎ লোকের অসৎ কাজে সংশ্লিষ্ট হয়ে জেল, জরিমানায় বিপদগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
অশালীন, কদর্য, নোংরা, অশ্রাব্য মন্তব্যকারীরা ফেসবুকের ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে শুধু হুমকি নয়, বিরাট অন্তরায়ও বটে। শিষ্টতা, সুনীতি, ভদ্রতা, নম্রতা এদের অশ্রাব্য, অমার্জিত মন্তব্যে মার খাচ্ছে বিধায় ফেসবুক যুক্তিনির্ভর মিডিয়া না হয়ে, হয়ে উঠছে অযৌক্তিক ভাগাড়ে। ভুয়া আইডির দাপট, বিকৃত মানসিকতা এবং অরুচিকর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সংঘবদ্ধ অপচেষ্টায় ফেসবুক অনেকের নিকট এখন অপাঙ্ক্তেয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেকে দুষ্টুমি করে বন্ধুদের মধ্যে চমক সৃষ্টির অভিপ্রায়ে কিছু ঘটনা তৈরি করে পোস্ট করে। নায়করাজ রাজ্জাকের ইন্তেকালের পূর্বেই ফেসবুকে মৃত্যুর সংবাদ প্রচারিত হয়। অমিতাভ বচ্চনের মৃত্যু সংবাদে শেয়ার করার পর আমার ভাতিজা জিতুর তাৎক্ষণিক মন্তব্য ছিল, ‘তামাশা’। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আনিসুল হকের ভিত্তিহীন ‘ইন্তেকাল’-এর সংবাদে ‘ইন্নালিল্লাহ’ লিখেছেন অসংখ্য লোক। ক্রিকেটার নাসিরের শিশুকালের ছবি দিয়ে বলা হলো, ‘রাস্তায় ক্রন্দনরত অবস্থায় বাচ্চাটিকে পাওয়া গেছে; মা-বাবার নজরে আনার জন্য শেয়ার করুন’। আমি শেয়ার করে বউয়ের নিকট বেকুব বনে যাই। এগুলো এক সময় ঈশপের গল্পের রাখাল বালকের মতো মর্মান্তিক বিপদ ডেকে আনতে পারে। একবার অবিশ্বাস তৈরি হলে সত্যিকার ঘটনায়ও কেউ আর শেয়ার করবে না।
রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী প্রতীক নিজের ছবির সঙ্গে পোস্ট করার বাতিকও অনেকের মধ্যে লক্ষ্য করা যায়। চিকিৎসকের নামে অনেকগুলো পোস্টে দ্রব্যগুণের বর্ণনা দিয়ে খেতে উৎসাহিত করা হয়। কিন্তু এ সকল পরামর্শ পরিপালনে কারো কারো বিদ্যমান রোগের কারণে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যে কত মারাত্মক হতে পারে তা ফেসবুক বন্ধুদের অনেকের জানার কথা নয়।
নির্বাচনে ট্রাম্পের সমর্থনে প্রচুর ভুয়া নিউজ ফেসবুকে পরিলক্ষিত হয়েছিল। আশঙ্কা করছি, আমাদের দেশের নির্বাচনগুলোতেও ফেসবুকে অপপ্রচারের বন্যা বইতে থাকবে।
অনেকে সচেতনভাবে ভুয়া সংবাদ দিয়ে ফেসবুকের বন্ধুদের সমতে আনার চেষ্টা করে, সহানুভূতি আদায়ের অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়। এগুলো ঘন ঘন হয় সাধারণত ধর্ম আর রাজনীতির ক্ষেত্রে। একবার পবিত্র ধর্মগ্রন্থের ছবি দিয়ে বলা হলো, ছবিতে প্রদর্শিত কোরআন শরীফটি আমাদের নবী করিম (সা.)-এর নিজ হাতে লেখা; প্রকৃত মুমিন হলে সবাই যেন ‘আমিন’ লিখে যায়। অগণিত লোক ‘আমিন’ লেখার পর শুধু দু’জন ক্ষীণস্বরে লিখলো, ‘আমাদের নবী তো নিরক্ষর ছিলেন’। ইসরাইলী সেনা কর্তৃক প্যালেস্টাইনি একটি শিশুকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে মারার করুণ দৃশ্য ‘শেয়ার’ না করলে ‘মুসলমানিত্ব’ থাকবে না এমন মন্তব্য ছাড়াও আমি প্যালেস্টাইনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল বিধায় আমার শেয়ার করার পর আমার ছেলে অর্ণবের মন্তব্য ছিল, ‘ইসরাইলি সেনারা বুঝি পায়ে চপ্পল পরে?’ পরে খেয়াল করে দেখলাম যে, যারা শিশুটিকে নির্যাতন করছে তাদের পায়ে চপ্পল। সম্প্রতি একটি এফ-১৬ বিমানের ছবি দিয়ে বলা হয়, ‘মালয়েশিয়া মায়ানমার আক্রমণ করেছে, ঝড়ের গতিতে শেয়ার করে মুসলিম উম্মাকে উৎসাহিত করুন’। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের উপর ফটোশপে তৈরি করা খাপছাড়া পা রেখে ছবি পোস্ট করার পর অনেকের মন্তব্য ছিল, ‘ওর ঠিকানাটা দেন, ওর গর্দান না নেয়া পর্যন্ত ঘুম হবে না’।
প্রযুক্তি অপপ্রয়োগ করে মানুষ ফেসবুকে পাঁচকে সাত বানিয়ে তা আবার বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। মায়ানমারের সুচি’র চোখ দিয়ে জীবন্ত সাপ বেরুনোসহ একটি বিকৃত ছবি অতি সম্প্রতি পোস্ট করা হয়েছে যা অতি সহজে সাধারণের নিকট বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছে।
ভয়ের কারণ হচ্ছে, যাচাই-বাছাই ছাড়া এসব পোস্টের সূত্র ধরে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। রাজনীতির অন্ধ সমর্থনে বাকবিতণ্ডা আর ধর্মের অবমাননার অসত্য তথ্যের পরিবেশনায় বন্ধুদের মধ্যে মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টির সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া রামু এবং নাসিরনগরের ঘটনা।
ফেসবুকের ব্যবহার দ্রুত সম্প্রসারণ থেকে প্রতিপন্ন হয়, ফেসবুক শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী, গরিব, নির্বিশেষে সকলের নিকট জনপ্রিয় হওয়া ছাড়াও মনের অগোচরে অনেকে ফেসবুকে নেশাগ্রস্তও হয়ে পড়ছে। নেশা বা আসক্তির কারণে ধনী-দরিদ্র, রিকশাচালক-ভ্যানচালক, নারী-পুরুষ, যুবক-যুবতী, শিশু-কিশোর সকলের যাচ্ছেতাই ব্যবহারে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে এই ফেসবুক। ফেসবুকে এই আসক্তি মানুষের জীবনকে করেছে স্থবির ও গতিহীন।
আজকাল কতগুলো টেলিভিশন সিরিয়াল চলাকালীন অতি জরুরি কারণেও দর্শকের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটানো কঠিন অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। তদ্রূপ কোন কারণে সাময়িকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিচলিত হয়ে পড়ে। এই সময় তাদের আর কোন বন্ধু থাকে না, চারদিকে দেখে শুধু শূন্যতা, তাদের একাকিত্বের যাতনা শুরু হয় তখন।
অনেক ছাত্র-ছাত্রী পড়ার টেবিলে বই এবং স্মার্টফোন পাশাপাশি রাখে; একবার বই, একবার ফেসবুকে চোখ রাখে। স্মার্টফোন সরানো হলে এরা পড়ালেখায় একটুও মনোনিবেশ করতে পারে না। ফেসবুক না থাকলে এদের অস্থিরতা বেড়ে যায়; ফেসবুকে এক চোখ থাকলে এরা পড়ালেখায়ও স্বস্তি বোধ করে।
শিশু-কিশোরদের আবদ্ধ রুমে ভার্চুয়াল জগতে মন্ত্রমুগ্ধ বিচরণ তাদের প্রতিবন্ধী করে তুলছে; খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপের অভাব তাদের বামন বানিয়ে দিচ্ছে, মানসিকভাবে বিকলাঙ্গ করছে, পড়াশোনার সময় অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। আসক্তির কারণে ভার্চুয়াল জগতের বাইরে পরিবারের সাহচর্য এরা পছন্দ করে না; গল্প, উপন্যাস, নাটক, কবিতা এদের নিকট বিষাদ ঠেকে। বদ্ধ রুমের এই একাকিত্বের মধ্যে ফেসবুকের খারাপ বন্ধুরা অতি সহজে এদের মোটিভেট করার সুযোগ পায়।
বিরতিহীনভাবে ফেসবুকে ডুবে থাকলে চোখ ও মস্তিষ্কের মধ্যে চাপ পড়ে, ঘাড় ও কোমরে স্থায়ী ব্যথা বাসা বাঁধে। চলাফেরা, খেলাধুলা না থাকলে লিভার, কিডনিসহ হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।
অনুসন্ধানী ওয়েবসাইট উইকিলিকসের প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের ভাষ্য, ‘ফেসবুক মানুষের ইতিহাসে গুপ্তচরবৃত্তির কাজে নিয়োজিত সবচেয়ে ঘৃণাব্যঞ্জক হাতিয়ার’। অন্যদিকে ফেসবুক জুড়ে ‘সেলফি’র দৌরাত্ম্য দেখে ‘আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন’ এই ‘বাতিক’কে
মানসিক ব্যাধি হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং এই রোগের নাম দিয়েছে, ‘সেলফাইটিস’।
প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার দেখে আলবার্ট আইনস্টাইনও বলেছিলেন, ‘প্রযুক্তি আমাদের মানবতাকে অতিক্রম করেছে’।
প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা, অনুভূতি, অনুরণনের নির্মল অভিব্যক্তির পাশাপাশি বস্তু, ঘটনা, পরিবেশকে নিরপেক্ষ, পক্ষপাতহীন, বস্তুনিষ্ঠ ও অবিকৃতভাবে পেশ করার ব্রত নিয়ে বন্ধুদের আগমনে ফেসবুক হয়ে উঠতে পারে ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যা কারো জন্যই অচ্ছুত হবে না।