টুইট বার্তায় মিসরের পদচ্যুত প্রেসিডেন্ট মুরসির মতো সৌদি বাদশাহ সালমানকে পদচ্যুত করার আহ্বান জানিয়ে সৌদি যুবরাজ সাউদ বিন সাইফ আল নাসর সৌদি বাদশাহর নির্দেশে অপহরণ হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ভিন্ন ভিন্ন গাত্রবর্ণের কয়েকটি শিশুকে জানালা দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা দেখছেন— এমন একটি ছবির টুইট সর্বোচ্চ ‘লাইক’ পেয়ে ইতিহাস গড়েছে মর্মে ১৭ আগস্টের ‘সংবাদ’-এ উল্লেখ করা হয়েছে। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে সহিংসতা ছড়ানোর জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু আলজাজিরা টিভি চ্যানেল বন্ধের নির্দেশ দেন ফেসবুক পোস্টে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তো প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রশাসনিক, বৈদেশিক, সামরিক প্রতিটি বিষয়ে মতামত, সিদ্ধান্ত, নির্দেশ দিচ্ছেন।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন আর ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না। ক্ষমতায় আসার পর তিনি বিগত ৭ মাসে মাত্র একটি একক সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় রামনাথ কোবিন্দকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি টুইটার বার্তায় অভিনন্দন জানিয়েছেন। ইসলামিক স্টেটও টুইট বার্তায় বলেছিল, ‘স্পেনে একটি হামলা অনিবার্য’; ১৯ আগস্টে বার্সেলোনায় সেই আক্রমণটি ঠিকই হলো। আমাদের মহামান্য রাষ্ট্রপতির সন্তান, কিশোরগঞ্জের এমপি রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক বলেছেন, ‘কোন শিক্ষক স্কুলে না গেলে শিক্ষার্থীরা যেন আমার ফেসবুক মেসেঞ্জারে খবর দিয়ে দেয়।’ টুইটের এসব বক্তব্য আবার প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার খবর।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিবিষয়ক অবৈতনিক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশের উন্নয়নচিত্র তুলে ধরার জন্য মন্ত্রী, এমপি, আমলা সবাইকে পরামর্শ দিয়েছেন। বর্তমান সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার কর্মপরিকল্পনায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারিত হওয়ায় ফেসবুক ও প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকরাও গ্রাম থেকেই বসেই দ্রুত সংবাদ পাঠাতে পারছেন।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনের সাংগঠনিক কাজ, ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক যোগাযোগ স্থাপন এবং জনগণের মধ্যে যে কোন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ফেসবুক, টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহৃত হয়। ফেসবুক, টুইটারের মতো অন্যান্য সামাজিক মিডিয়া, বিভিন্ন ওয়েবসাইট, ইউটিউব, টেক্সট মেসেজ ইত্যাদি ব্যবহার করে তরুণ ও যুবকরা বিভিন্ন ইস্যুতে নির্ধারিত স্থানে জমায়েত হচ্ছেন, আড্ডা দিচ্ছেন; আড্ডায় সাহিত্য, নাটক, সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন; সমাবেশ, মিছিলের মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করছেন। ফেসবুক, টুইটারের বন্ধুরা বিয়েবার্ষিকী আর জন্মদিনে পারস্পরিক শুভেচ্ছা, আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে সমবেদনা জানাচ্ছেন, একজন আরেকজনকে তার প্রিয় গানটি শোনাচ্ছে, ছবিটি দেখাচ্ছে।
ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন পুরনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়ার রোমাঞ্চ পুলকিত করে সবাইকে। অন্যদিকে নতুন বন্ধুত্ব গড়ার জন্য ফেসবুকের সঙ্গে তুলনীয় উপযোগী ও উত্তম প্ল্যাটফর্ম আর একটাও আছে বলে মনে হয় না। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, জাতি নির্বিশেষে পরস্পরের সঙ্গে বন্ধুত্ব যখন হয় তখন একজন আরেকজনের আচার-আচরণ, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারে, অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। ফেসবুক বিভিন্ন উৎসব উদযাপনের কাজটি সহজ করে দিয়েছে; বিয়ে ও জন্মদিনের তারিখ ফেসবুক অন্য বন্ধুদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। দোকান না খুলেও পণ্য প্রদর্শন, বিপণন, বিক্রি সব ফেসবুকে সম্ভব। ফেসবুকে পোস্ট করতে করতে আমরা ভাষা শিখছি, লেখা শিখছি, সাহিত্য বুঝছি।
সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ফেসবুকে আমাদের সামাজিক নানান অসঙ্গতি তুলে ধরা হচ্ছে। সম্প্রতি ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের রোমহর্ষক কয়েকটি ঘটনা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পর জনগণের মধ্যে যেভাবে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তা নজিরবিহীন। অদক্ষ, অপটু হাতে ছবি ও ভিডিও তুলে তা ফেসবুকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষক আর নির্যাতনকারীর প্রতি লাখো জনতার ধিক্কার, ঘৃণার বিষবাণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করেছে; নির্যাতনের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা দেখে নির্যাতনকারীদের প্রতি ঘৃণা এবং নির্যাতিতদের প্রতি সমবেদনায় জনগণ আকুলিত হয়েছে।
শিশুদের মানসিক বিকাশে কুকুর, বিড়ালের আকর্ষণীয় দৃষ্টিনন্দন ভূমিকার ব্যাপক প্রচার ফেসবুকের একক অবদান। ফেসবুকে পশু-পাখির ইতিবাচক আচরণ দেখে মানুষ ক্রমান্বয়ে এদের প্রতি মানবিক হয়ে উঠছে। পাশ্চাত্যে গৃহকর্মী না থাকায় কুকুর-বিড়াল শিশুদের সঙ্গে খেলা করছে, দোলনা দুলিয়ে শিশুদের ঘুম পাড়াচ্ছে, হামাগুড়ি দেওয়া শেখাচ্ছে। অন্যদিকে পশু-পাখির ওপর নির্যাতনে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিবাদে সোচ্চার হচ্ছে ফেসবুক।
পর্যটনকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে ফেসবুক। বিভিন্ন এলাকার দর্শনীয় প্রাকৃতিক দৃশ্য, ঐতিহাসিক স্থান অহরহ ফেসবুকে পোস্ট হচ্ছে যা ভ্রমণে অনেককে আকৃষ্ট করছে।
ফেসবুকে ব্লগ সৃষ্টি করে অনেকে আপনমনে নিজের কথা, দশের কথা, দেশের কথাও লিখে যাচ্ছেন।
ব্লগ হচ্ছে নিজের সংবাদপত্র; লিখতে সম্পাদকের দ্বারস্থ হতে হয় না; নিজেই সম্পাদক, নিজেই লেখক। শাহবাগের ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র আন্দোলনকে টার্গেট করার অভিপ্রায়ে বহুল প্রচারে এখন ব্লগার মানেই ‘নাস্তিক’। কিন্তু আস্তিক, নাস্তিক, ধর্মনিরপেক্ষ, ধার্মিক, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক, সক্ষম, নিরীহ, নিঃস্ব, ধনী, দুর্বল, সবল, জ্ঞানী, নির্বোধ নির্বিশেষে অনেকেরই ফেসবুক ব্লগ আছে। নিজের সৃষ্ট এই লেখনী জগতে নিজের ধ্যান-ধারণার প্রকাশে নিজেই একচ্ছত্র সম্রাট-সম্রাজ্ঞী। কেউ রাজনীতির গুণগান গাইছে, কেউ রাজনীতির গুষ্টি উদ্ধার করছে; কেউ নিজ ধর্মের পক্ষে বলছে, কেউ বা বিপক্ষে; কেউ নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে, কেউ ঘোর বিপক্ষে, কেউ ট্রাম্পকে পাগলাগারদে পাঠাতে চাচ্ছে, কেউ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এদের অনেকে অনেক শক্তিশালী লেখক, এরা প্রচুর পড়াশোনা করে। ভুল তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করার ব্যাপারে কারো অপচেষ্টা অন্যজন মুহূর্তের মধ্যে আসল তথ্য দিয়ে ভণ্ডুল করে দিচ্ছে। এদের অনেকের জানাশোনার গভীরতা দেখলে বিস্মিত হতে হয়। এদের জ্ঞান, গরিমায় সমৃদ্ধ লেখাগুলো পড়লে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় টকশোর তর্কাতর্কির শোটিকে উচ্চমার্গের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বলে প্রতিভাত হয় না। এদের অনেকের লেখনীর ধার এত শক্তিশালী যে, প্রত্যুত্তর তৈরি করা বিপক্ষ গোষ্ঠীর কলমের শক্তিতে কুলায় না বলে প্রতিশোধ নেয়া হয় পেশী শক্তির গোপন ব্যবহারে।
ফেসবুক বর্তমান সময়ে সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। আমার বন্ধু ‘দৈনিক ঢাকা’ পত্রিকার সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ইউনুসের মতে যোগাযোগ, মতামত তৈরি ও সংবাদ পরিবেশনায় ফেসবুক বর্তমানে এক নম্বরে, ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া দুই নম্বরে এবং প্রিন্ট মিডিয়া বা সংবাদপত্র তিন নম্বরে অবস্থান করছে। একটু ভিন্নমত পোষণ করলেও আমি তার মতের সম্পূর্ণ বিপক্ষে অবস্থান নেয়ার সাহস দেখাতে পারিনি। কারণ এ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রচলিত সংবাদপত্রকে সামান্যতম হলেও প্রতিদ্বন্দ্বী করে তুলেছে। এক নিবন্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সম্পর্কে লেখা হয়েছে, ‘মাধ্যমগুলোর প্রতি কিশোর, তরুণ ও যুবকদের আসক্তি এবং অংশগ্রহণের মাত্রা অন্যান্য মাধ্যমকে সুপারসনিক গতিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে’। স্বল্পমূল্যের স্মার্টফোনের সহজলভ্যতা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেটের ব্যাপ্তি সাধারণ জনগণকে ফেসবুকে পারস্পরিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ করেছে। ছাত্র-শিক্ষক, কুলি-মজুর, কৃষক-কৃষাণী, কামার-কুমার, দাস-দাসী, চোর-ডাকাত, পণ্ডিত-মূর্খ, জ্ঞানী-নির্বোধ সবার কাছে স্মার্টফোন এখন জনপ্রিয়। এদের অনেকের ফেসবুকে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ হতবাক করার মতো। কাঠের টেবিল বা কাঁসার বাটিতে তবলা বাজিয়ে নিজের আনন্দে শুধু গানই গান না, নাচেনও এবং তা আবার রেকর্ড করে ফেসবুকে পোস্টও করেন।
গ্রামের যারা কখনো ছবি তোলার সুযোগ পাননি, তারা নতুন জামা পরেই সেলফি তুলে সঙ্গে সঙ্গে পোস্ট করছেন; বন্ধুরা লাইক দিচ্ছে, প্রশংসা করছে; অসংখ্য ‘লাইক’-এ সবাই স্মার্ট, সুশ্রী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে। বিশ্ববরেণ্য বহু চিত্রশিল্পী নিজেরাই নিজেদের পোর্ট্রেট এঁকেছেন। ‘মোনালিসা’ যদি শিল্পীর নিজের মুখচ্ছবির শৈল্পিক রূপ হয় তাহলে সেলফিতে সফটওয়্যারের ঘষামাজা অপরাধ নয়। ‘সেলফি’ শব্দটি ইতোমধ্যে অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।
প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের আলোচনা, পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে প্রিন্ট মিডিয়ার জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করেছে ফেসবুক। এখন ইচ্ছে করলেই অসত্য তথ্য দিয়ে খবর পরিবেশন করা সম্ভব হয় না। কারণ দেশে এখন এমন কোন অঞ্চল নেই যেখানকার লোক ফেসবুক ব্যবহার করে না। যে ঘটনা তাৎক্ষণিক ফেসবুকে পাওয়া যায় সেই একই ঘটনা প্রিন্ট মিডিয়ায় পাঠক পায় পরদিন। ফেসবুকের জনপ্রিয়তা দেখে অনেকে স্বপ্রণোদিত হয়ে খবর সংগ্রহ, পরিবেশন, বিশ্লেষণ এবং প্রচারে অংশ নিচ্ছে। পেশাদার মিডিয়ায় খবর প্রচারিত হওয়ার আগেই অপেশাদার অ্যাকাউন্টধারীরা ফেসবুক ও ব্লগে ছড়িয়ে দিচ্ছে সাম্প্রতিক খবরের সর্বশেষ তথ্যটি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তি বা সমাজের ভালো কাজগুলোর পাশাপাশি অনাচারগুলোও অন্যরা জানতে পারছে। ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন, বউ পিটানো, বউয়ের হাতে প্রবীণ শাশুড়ির লাঞ্ছনা, সন্তানের অবহেলায় প্রবীণ মা-বাবার দুর্গতি, নাবালক-নাবালিকার বিয়ে, যৌতুকের বলিদান, সন্ত্রাস, চুরি, ডাকাতি, অপহরণ আগেও হতো, এখনও হয়। কিন্তু গ্রামাঞ্চল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে প্রিন্ট মিডিয়ায় একটি সংবাদ পাঠানো কী পরিমাণ ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হতো তা শুধু আগেকার পল্লী অঞ্চলের রিপোর্টারেরাই বুঝতো। তাই গ্রামগঞ্জের এ সব ঘটনা ছাপার অক্ষরে মুদ্রণ কালেভদ্রে হতো। আমাদের কলেজজীবনেও টরেটক্কার একটি টেলিগ্রাম পাঠাতে ১০ মাইল ভ্রমণ করে নিকটতম ফেনী শহরে আসতে হতো।
সংঘটিত ঘটনার দু-একটি স্থির ছবি আমাদের সময় তাৎক্ষণিক তোলা সম্ভব হলেও যত্রতত্র ভিডিও করার কোন ব্যবস্থাই ছিল না। এখনও সব পত্রিকার রিপোর্টার গ্রামগঞ্জে নেই। স্থিরচিত্রে একটি ঘটনার একটি ক্ষুদ্রতম অংশকে পত্রিকায় পরিস্ফুট করা সম্ভব, বাকিটুকু বর্ণনার মাধ্যমে পাঠকদের অবহিত করা হয়। এক্ষেত্রে অবহিতকরণ ও পাঠকের আন্দোলিত হওয়া নির্ভর করে লেখকের লেখনী শক্তির উপর। লেখক নিরপেক্ষ না হলে ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার সুযোগও থাকে। কিন্তু ফেসবুকের প্রতিজন অপেশাদার ব্যক্তি এক একজন রিপোর্টার। দৃশ্যমান ক্যামেরা কাঁধে ঝুলিয়ে ছবি তোলার প্রয়োজন হয় না, মোবাইল ফোন ঘটনার নায়কদের অগোচরে ছবি তুলে ঘটনা ঘটার এক সেকেন্ডের মধ্যে সারা পৃথিবীর মানুষকে তা জানিয়ে দিচ্ছে। টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার জীবন্ত ছবির অনেকগুলো অপেশাদার ব্যক্তির স্মার্টফোনে তোলা আছে।
আমাদের সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফেসবুক একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দিয়েছে। ফেসবুকে আমাদের সামাজিক নানান অসঙ্গতি তুলে ধরা হচ্ছে। সম্প্রতি ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের রোমহর্ষক কয়েকটি ঘটনা ফেসবুকের মাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হওয়ার পর জনগণের মধ্যে যেভাবে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে তা নজিরবিহীন। অদক্ষ, অপটু হাতে ছবি ও ভিডিও তুলে তা ফেসবুকে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধর্ষক আর নির্যাতনকারীর প্রতি লাখো জনতার ধিক্কার, ঘৃণার বিষবাণ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহকে ত্বরিত ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য করেছে; নির্যাতনের পৈশাচিক নিষ্ঠুরতা দেখে নির্যাতনকারীদের প্রতি ঘৃণা এবং নির্যাতিতদের প্রতি সমবেদনায় জনগণ আকুলিত হয়েছে।
বাংলাদেশে রাজন, তনু, রাকিব হত্যা, খাদিজাকে কোপানো ফেসবুকের মাধ্যমে প্রথম উন্মোচন হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার অবস্থান প্রতি ঘটনার কেন্দ্রে নিশ্চিত করা অসম্ভব। ফেসবুক না থাকলে বর্ণনাকারে ঘটনা ঘটার কয়েকদিন পর উক্ত ঘটনাগুলো পত্রিকার ভেতরের পাতায় ছোট্ট এক কলামে হয়তো প্রকাশিত হতো; অথবা এই সব ঘটনার কোন প্রতিবেদনই হতো না।
এগুলো প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য সতর্কবাণী; এই মিডিয়াকে আরও সক্রিয় করতে ফেসবুক অনুপ্রাণিত করছে।
প্রিন্টিং মিডিয়ার মতো খবরের সত্যতা প্রমাণে ফেসবুকের রিপোর্টারদের গলদঘর্ম হতে হয় না। প্রিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় যতটুকু নিয়ন্ত্রণ করা যায় ফেসবুকে ততটুকু করা সহজতর নয়। অবশ্য ‘মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নন’ এ ধরনের কথা লিখে ফেসবুকের অ্যাকাউন্ট হোল্ডারদের বাঁচারও তাগিদ নেই। প্রলয়ঙ্করী ও বিধ্বংসী অসত্য ঘটনা না হলে ফেসবুকের সংবাদকে আইনের আওতায় সচরাচর আনা হচ্ছে না। তাই ফেসবুকের অকুতোভয় সত্য, মিথ্যা কর্মকাণ্ড জনমত গঠনে অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে। অবশ্য ফেসবুকে সার্চ ইঞ্জিন থাকায় এর সত্যাসত্য সহজেই নিরূপণ সম্ভব বিধায় প্রোপাগান্ডা চালানোটা অনুসন্ধিৎসু ও যুক্তিপ্রবণ ব্যক্তির জন্য সহজ হয় না।
যে সব দেশে গণতন্ত্র আছে, জনগণের বাক্স্বাধীনতা আছে, সত্য প্রকাশের জন্য জেলে যেতে হয় না সেই সব দেশে ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভূমিকা আমাদের দেশের মতো তত গুরুত্বপূর্ণ হয়তো নয়। উন্নত দেশগুলোতে মানুষ রাজনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে কিছুটা নির্লিপ্ত। উন্নত দেশগুলোতে পত্রিকার আদ্যোপান্ত খুব কম লোকই পড়ে থাকেন। ছুটির দিন ব্যতীত কেউ বাসায় পড়ার জন্য পত্রিকা কিনে না। চলার পথে পত্রিকা কিনে রেল বা বাসস্টেশনে দাঁড়িয়ে প্রধান প্রধান শিরোনাম পড়ে পত্রিকাটি ডাস্টবিনে ফেলে চলে যায়। ট্রেন ভ্রমণে কেউ কেউ পত্রিকা পড়লেও অধিকাংশ যাত্রী বই পড়ে। তাদের বই পড়ার আরেকটি আদর্শ স্থান হচ্ছে বাথরুম। আমেরিকাসহ অধিকাংশ উন্নত দেশে বাথরুমকে তাই ‘রেস্ট রুম’ও বলা হয়। এদের অবসর কাটানোর বহু ব্যবস্থা রয়েছে বলে আমাদের মতো ফেসবুক নিয়ে মহাব্যস্ত থাকার সময় তাদের নেই। অন্যদিকে অন্যকে নিয়ে মাথা ঘামানোর দায়িত্বও কেউ বহন করে না। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ এদের ক্লাব ব্যতীত সর্বত্র আলাদা করে রেখেছে।
সামাজিক অনাচার প্রতিরোধে পুলিশ রয়েছে, প্রশস্ত রাস্তার বদৌলতে ঘটনায় তাৎক্ষণিক পুলিশের উপস্থিতি নির্যাতিতদের আশ্বস্ত করে বলে ঘটনার স্থানে ভিড় জমে না; প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিবেশী বিশেষ নম্বরে পুলিশকে একটি ফোন করা ছাড়া আর কোন কৌতূহল দেখায় না।
ইদানীং অনেক আন্দোলন আর প্রতিবাদের প্লাটফর্ম হচ্ছে ফেসবুক। জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ এই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তিউনিসিয়া, মিসর, সিরিয়া, লিবিয়াসহ অন্যান্য আরব দেশে যে গণজাগরণের উদ্ভব হয়েছিল তা ‘আরব বসন্ত’ নামে সমধিক পরিচিত। তিউনিসিয়া, মিসর বা আমাদের দেশের ‘গণজাগরণ মঞ্চে’র সমাবেশ, মিছিল আয়োজনে কোন কেন্দ্রীয় নেতা বা সংগঠনের প্রয়োজন হয়নি। এগুলোর পশ্চাতে ছিল ফেসবুক ব্যবহারকারী সাহসী ও শিক্ষিত যুবসম্প্রদায়। পারস্পরিক যোগাযোগে প্রতি সেকেন্ডের হালনাগাদ তথ্য ফেসবুকের মাধ্যমে অবহিত হয়ে নির্ধারিত স্থানে, নির্দিষ্ট সময়ে সমবেত হয়ে নিজেদের মধ্যে সুদৃঢ় ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে আলাদা কোন ঘোষণার প্রয়োজন হয়নি। সুশৃঙ্খলভাবে একই সুরে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ার ক্ষেত্রে কোন নেতা, নেত্রীর নামে লিফলেট বিলি বা দেয়ালে পোস্টার সাঁটাতে হয়নি।
দুর্ভিক্ষ রোধে ফেসবুক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বন্যায় জনগণের দুর্বিষহ জীবনের চিত্রায়ন ছাড়াও ত্রাণ বিতরণ ও ত্রাণসামগ্রী নিয়ে সামান্যতম দুর্নীতির সচিত্র সংবাদও পরিবেশন করছে ফেসবুক। ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণে এখন আর গতানুগতিক সাংগঠনিক কাঠামোর প্রয়োজন হয় না। সাম্প্রতিক বন্যায় ত্রাণসামগ্রী সংগ্রহ ও বিতরণে বাংলাদেশের বন্ধুদের সঙ্গে এক ও একাত্ম হয়ে কাজ করেছে কানাডায় অবস্থান করে কানাডাপ্রবাসী ভাতিজা শামীম আহমেদ জিতু।
ফেসবুক আর টুইটার আসার পর পাঠক এখন আর বিশ্লেষণধর্মী বিরাট আকারের লেখাগুলো পড়তে চায় না। অবশ্য আগেও খুব কম পাঠকের নিকট পর্যালোচনামূলক লেখাগুলো সমাদৃত হতো। এখন ফেসবুকের কুশীলবেরা ছোট, ছোট খবর ও ছবি পোস্ট করে পাঠক ও দর্শকদের কাছে ফেসবুকের কল্যাণে বিলি করছে। জনগণও সর্বশেষ তথ্যচিত্রের আপডেট পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত।
আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান ছাড়া দেখা-সাক্ষাৎ করে কুশলাদির বিনিময় দুর্বিষহ যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে প্রায় লুপ্ত হতে যাচ্ছে; ফেসবুক বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মানুষগুলোকে নিত্যদিনের গাঁথামালায় এক সুতায় গেঁথেছে।
বিনোদনের পাশাপাশি ফেসবুক তথ্য, উপাত্ত ও সংবাদ পরিবেশনার অন্যতম মাধ্যমে পরিণত হয়ে উঠেছে। সামাজিক মাধ্যমে যেমন সমাজের অনেক খবর পাওয়া যায়, যা মূলধারার সংবাদমাধ্যম ব্যবহার করতে পারে, তেমনি মূলধারার সংবাদমাধ্যমের কাছেও থাকে অনেক খবর যা প্রকাশিত হওয়ার পর তার লিংক সামাজিক মাধ্যমে তুলে দেওয়া হয়। ফলে কনটেন্ট দেওয়া নেয়ার একটা সম্পর্ক দুই মাধ্যমের মধ্যে ক্রমে দৃঢ় হচ্ছে।