২৯ আগস্টের ‘সংবাদ’ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘মায়ানমারের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে চলমান লড়াই সংঘাতের ঘটনায় সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও অত্যাচার থেকে বাঁচতে সীমান্তজুড়ে বাংলাদেশ অভিমুখী রোহিঙ্গার ঢল তীব্রতর হচ্ছে।’ অন্যদিকে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি প্রধান বলেছেন, ‘বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্তে জিরো পয়েন্ট দিয়ে কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।’
২৪ আগস্ট মায়ানমারের (বার্মা) রাখাইন রাজ্যে ২৪টি পুলিশ পোস্টে হামলার ঘটনায় দায় স্বীকার করেছে রোহিঙ্গা মুসলিমদের সশস্ত্র সংগঠন ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি’ এবং ভবিষ্যতে আরও হামলা হবে বলেও সতর্ক করেছে তারা। মায়ানমার সরকার ইত্যবসরে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মিকে সন্ত্রাসীগোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, বিদ্রোহীদের সঙ্গে সম্পর্কহীন কারও ক্ষতি হবে না। অন্যদিকে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি বলেছে, তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জিহাদ নয়, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য।
আরাকান ভূখণ্ডে রোহিঙ্গা সমস্যা নতুন নয়। আরাকানে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বারবার মায়ানমারের সেনা ও বিদ্রোহী সশস্ত্র গ্রুপের সংঘাতময় পরিস্থিতি প্রতিবেশী বাংলাদেশকে মহাসংকটে ফেলেছে। ২৪ আগস্টে রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলায় মায়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর ১২ জন নিহত হওয়ার পর মায়ানমারের সেনাবাহিনী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে চিরুনি অভিযান শুরু করেছে। মায়ানমার সরকার তাদের দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলাকারীদের ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করায় উদ্ভূত পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আগমন শুরু হয়েছে ১৯৭৮ সালে। প্রায় আড়াই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মায়ানমার সরকারের নির্যাতনে বাংলাদেশে চলে আসেন। এরপর ১৯৯১-৯২ সনে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে মায়ানমারের সামরিক শাসকের ইন্ধনে আরাকানে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার এবং ২০১২ সালে ৫০ হাজার শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। গত বছরের অক্টোবরে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির হামলায় ৯ পুলিশ নিহত হওয়ার পর সরকারের সামরিক অভিযানে ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। এছাড়া অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আছেন প্রায় তিন লাখ। সর্বোপরি বিজিবিকে ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করে থাকেন। বর্তমানে ১১ লাখ রোহিঙ্গা মায়ানমারে বসবাস করলেও লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন।
বাংলাদেশ সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেও উল্লিখিত সব শরণার্থীকে মায়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারেনি। অবশ্য কিছু শরণার্থী ফেরত যেতে চায়নি। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক নীতিমালা মোতাবেক শরণার্থী হয়ে একবার আশ্রয় পেলে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোর করে ফেরত পাঠানো যায় না। এ অবস্থায় মায়ানমার সেনাদের সাম্প্রতিক অভিযানে ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজিবি। একদিকে মায়ানমার সেনাদের গুলি অন্যদিকে বিজিবির অনুপ্রবেশ ঠেকানো— মানবতার কী ভয়ানক বিপর্যয়। স্বীয় সম্বলহীন রোহিঙ্গারা তাদের কোলের শিশু, প্রতিবন্ধী নিকটজন, অশীতিপর মা-বাবাকে নিয়ে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশে নো ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ১ কোটি বাঙালির ভারতের মাটিতে আশ্রয় নেয়ার কৃতজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ এখন আরাকান মুসলমানদের আশ্রয় গ্রহণ স্বাচ্ছন্দ্যে মেনে নিচ্ছে না তার আরেকটু পর্যালোচনা প্রয়োজন।
ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কূটনৈতিক যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং শরণার্থী সমস্যা নিয়ে সারা পৃথিবীর মানুষ ইতিবাচক মনোভাবে আন্দোলিত হয়েছিলেন; মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণের অপরিহার্যতা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের নিকট গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ের এ আন্দোলনে পৃথিবীর কোন দেশ তৎকালীন ভারতের মতো সোচ্চার নয়। একবার শুধু বাংলার সুলতান জালালুদ্দিন শাহ চতুর্দশ শতকে বার্মিজদের কাছে পরাজিত আরাকানের রাজাকে পুনরায় গদিতে বসানোর লক্ষ্যে আরাকান থেকে বার্মিজদের বিতাড়ন করেছিলেন। রোহিঙ্গাদের পক্ষে কোন দেশের জোরালো ভূমিকা না থাকলেও মায়ানমার সরকারের পক্ষে চীন রয়েছে। আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানদের পক্ষে নিরাপত্তা পরিষদের যে কোন সিদ্ধান্তে চীন ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগে সর্বদা সচেষ্ট। রাখাইন রাজ্যের উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদের উদ্বেগ জানিয়ে একটি বিবৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত চীনের ভেটো ক্ষমতার প্রয়োগে বাতিল হয়ে যায়। বাংলাদেশের বিপক্ষেও চীন এভাবে তার ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে কয়েকবার।
ভারতে বাংলাদেশীদের শরণার্থী হওয়ার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হওয়ার মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, ভারতে আশ্রয়গ্রহণকারী সব শরণার্থীকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হলেও আরাকানের শরণার্থীদের ফেরত নেয়ার আগ্রহ মায়ানমারের নেই, ফেরত নিতে মায়ানমারকে বাধ্য করার ক্ষেত্রেও কোন দেশ বা সংস্থার উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
পাকিস্তানি সৈন্যের নির্যাতনে ভারতে শরণার্থী হওয়ার অভিজ্ঞতায় প্রথম দিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে বাংলাদেশ সহানুভূতিশীল ছিল। কিন্তু শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মায়ানমারের গড়িমসি এবং ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় দীর্ঘকাল শরণার্থীদের ভরণ-পোষণসহ উদ্ভূত নানাবিধ সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে বাংলাদেশ এখন নিজের জন্য আরও গভীরতর ক্ষতের সৃষ্টি করতে চায় না। রোহিঙ্গা ছাড়াও পাকিস্তানের আনুগত্য স্বীকারকারী লাখ লাখ বিহারিকে দীর্ঘ ৪৬ বছর বাংলাদেশ আশ্রয় ও খাদ্য সরবরাহ করে যাচ্ছে। আমাদের এ ছোট্ট একটি ভূখণ্ডে ১৬ কোটি লোকের বাস; আমাদের দেশে লোকবসতির ঘনত্ব পৃথিবীর যে কোন দেশের চেয়ে বেশি। আমাদের দেশের তুলনায় পাকিস্তান প্রায় সাতগুণ এবং মায়ানমার পাঁচগুণ বড়; অথচ পাকিস্তানের লোকসংখ্যা মাত্র বিশ কোটি এবং মায়ানমারের মাত্র ছয় কোটি। বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে খাদ্য, বস্ত্র সরবরাহ করার মতো সমৃদ্ধি বাংলাদেশের এখনো আসেনি। বাংলাদেশে চরম দরিদ্রের হার বর্তমান সরকারের আমলে হ্রাস পেলেও এখনও শতকরা ১২ ভাগ লোক চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, এদের অনেকের বসতবাড়ি নেই। আমাদের দেশে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যও নেই। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বর্তমান সরকারের আমলে খাদ্যে অর্জিত স্বয়ংসম্পন্নতা স্থায়ী হতে পারছে না। তাই আগত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য বিরাট বোঝা। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। মায়ানমারের নাগরিকত্ব না থাকায় কোন রোহিঙ্গার পাসপোর্টও নেই। বাংলাদেশে অবস্থান করে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করছে, অন্য দেশে বাংলাদেশি পরিচয়ে পাড়ি দিচ্ছে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা ও বাঙালির মতো চেহারাধারী রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা কঠিন হওয়ায় তারা দেদার ভোটার হচ্ছেন, জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহ করতে পারছেন। বাংলাদেশের পাসপোর্টধারী রোহিঙ্গাদের অনেকে বিদেশে গিয়ে বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত হওয়ার কারণে সব দায় পড়ছে বাংলাদেশিদের ওপর। ফলে ইমেজ নষ্ট হওয়ার কারণে বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশিদের শ্রমিক হিসেবে নিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
প্রচুর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড না থাকায় রোহিঙ্গা রমণীদের অনেকেই শরণার্থী শিবির ও এর বাইরে যৌন পেশায় নামতে বাধ্য হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। উপার্জনের সহজ পথ চোরাচালান, নোট ও পাসপোর্ট জালকরণ, অস্ত্র পাচার, ইয়াবা ব্যবসাসহ নানাবিধ অপরাধে এ শরণার্থী রোহিঙ্গাদের কাজে লাগাচ্ছে স্থানীয় গডফাদাররা। দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অস্ত্র সরবরাহে রোহিঙ্গাদের ভূমিকা মুখ্য বলে অনেকে বিশ্বাস করে। এ জাতীয় নানাবিধ কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানে বাংলাদেশ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে না; শরণার্থীর আগমন ঠেকানো বিজিবির জন্য অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরাকান রাজ্যটির আদি বাসিন্দা কারা, রোহিঙ্গাদের কেন মায়ানমার সরকার তাদের দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না ইত্যাদি নিয়ে নানা পর্যালোচনা, বিশ্লেষণে সর্বজনগ্রাহ্য মতামত গঠন বা স্বচ্ছ ধারণা নেয়া সম্ভব নয়। উইকিপিডিয়া অনুযায়ী, প্রায় খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ বছর পূর্বে ভারত হতে অস্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ নৃগোষ্ঠীর আরাকানে প্রথম বসতি স্থাপনের পর ক্রমান্বয়ে বাঙালি হিন্দু, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। এসব নৃগোষ্ঠীর সংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো এ রোহিঙ্গা।
কেউ কেউ মনে করেন, সপ্তম শতকে আসা পার্সিয়ান বণিকদের মাধ্যমে আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। আবার অন্যদের অভিমত হচ্ছে, অষ্টম শতাব্দীতে আরাকানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আগত মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির সৃষ্টি। পরবর্তীতে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, ফেনী অঞ্চল ছাড়াও বার্মা, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকের আগমন ও মিশ্রণে উদ্ভূত এই সংকর জাতি আত্মপ্রকাশ করে। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকের মতে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অঞ্চলের লোক দেশান্তর হয়ে আরাকান অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছে।
অন্য দেশ বা অঞ্চল থেকে আরাকানে লোক আগমনের সুনির্দিষ্ট কারণ নির্দেশ করা কঠিন হলেও আরবেরা এসেছিল বাণিজ্যের অভিলাষে আর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গিয়েছিল কাজের সন্ধানে। ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ইংরেজরা আরাকানের উর্বর উপত্যকায় কৃষিকাজে আশপাশের বাঙালিদের এনে নিয়োজিত করে। কাজের সন্ধানে এখন যেমন আমাদের দেশের লোকজন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপান, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে ছুটছে তখনও এমনিভাবে চট্টগ্রাম ও ফেনী অঞ্চলের লোকজন জীবিকার সন্ধানে রেঙ্গুন (বার্মার রাজধানীর পূর্বনাম) ও আকিয়াব যেত। আমাদের এলাকা থেকে বার্মায় (মায়ানমার) যেতে কোন পাসপোর্ট, ভিসা লাগত না, কোন সুনির্দিষ্ট সীমান্তরেখায় লোকজনের গমনাগমনে কোন চেক হতো বলেও শুনিনি। আমার এক ঘনিষ্ঠ আত্মীয় আমার জন্মের আগে যে বার্মায় গেছেন আর কখনও বাংলাদেশে ফেরত আসেননি; সেখানে বিয়ে করে সেখানেই স্থায়ী হয়েছেন।
আরাকানে মুসলমানদের উদ্বাস্তু হিসেবে গণ্য করে অশান্তির বীজটি রোপণ করে গেছে ইংরেজরা। ইংরেজদের শাসনামলে তারা মায়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করলেও রোহিঙ্গাদের নাম তাতে অন্তর্ভুক্ত করেনি। এ অন্তর্ভুক্ত না করার জেরে মায়ানমার সরকার আরাকানের মুসলমানদের নাগরিকত্ব প্রদানে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। অন্যদিকে মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে গণ্য করে আরাকান থেকে বাংলাদেশে বিতাড়নের সব প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আরাকানের মুসলমানেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের সমর্থন করে বাংলাদেশে রাজাকার, বিহারিদের মতো মারাত্মক ভুল করে বসে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় রাজাকার, বিহারিরা যেভাবে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ইংরেজদের কাছ থেকে ঠিক তেমনি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানরা। রোহিঙ্গাদের এ সহায়তার বিনিময়ে উত্তর রাখাইনে মুসলমানদের জন্য আলাদা একটি রাজ্য গঠন করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইংরেজরা তা পালন করেনি। ফলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের পরাজয়ে বিহারি আর রাজাকারের যে অবস্থা হয়েছিল, বার্মায় জাপানিদের কাছে ব্রিটিশদের পরাজয়ের পর রাখাইনদের কাছে রোহিঙ্গাদের অবস্থাও তদ্রূপ হয়েছিল। কারণ আরাকানের বৌদ্ধ রাখাইনরা সমর্থন করেছিল জাপানকে। ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জাপানি ও রাখাইনদের হাতে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যার শিকার হন। জাপানিদের এ অত্যাচার, নির্যাতনে অসংখ্য রোহিঙ্গা তখন পালিয়ে এসে চট্টগ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
অনেকের অভিমত, আরাকান অঞ্চলের আদি বাসিন্দা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ‘রাখাইন’রা। তাদের ভূমিতে মুসলিম সম্প্রদায়ের লোক অন্য জায়গা থেকে এসে স্থায়ী বসতি স্থাপন ছাড়াও তাদের আয়-রোজগারে ভাগ বসানোর কারণে স্বাভাবিকভাবেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতামূলক বৈরিতা সৃষ্টি হয়। ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলকারী জেনারেল নে উইনের নেতৃত্বে মায়ানমারের সামরিকজান্তা এ অদৃশ্যমান বৈরিতাকে কাজে লাগিয়ে দুই সম্প্রদায়কে পারস্পরিক শত্রু করে তুলতে সমর্থ হয়। ধর্মের স্পর্শকাতরতায় মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজিত হয় বলে মায়ানমারের তৎকালীন সামরিক সরকার রাখাইন ও রোহিঙ্গাদের অর্থনৈতিক বৈরিতাকে সাম্প্রদায়িক বৈরিতায় পরিণত করতেও সক্ষম হয়।
১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ ভাগের সময় রোহিঙ্গা মুসলমানরা পাকিস্তানের সঙ্গে একীভূত হওয়ার চেষ্টা করেছিল; এ উদ্যোগ মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের বৈষম্যের শিকার হওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে।
আরাকানে রোহিঙ্গাদের উৎপত্তি যেভাবেই হোক না কেন তারা যে এখন আরাকানবাসী তাতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ পৃথিবীর অধিকাংশ অঞ্চলে জনবসতি গড়ে উঠেছে মানুষের স্থানান্তরে। দক্ষিণ আফ্রিকা বহু বছর শাসন করেছে স্থানান্তরিত লোকেরাই এবং এখনো স্থানান্তরিতরা সমঅধিকারে দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক। আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া তো অভিবাসীদেরই দেশ।
জাতিসংঘের মত অনুযায়ী রোহিঙ্গারা বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে নির্যাতিত জাতি। রোহিঙ্গাদের এই নিষ্পেষিত অবস্থা নিরসনে জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের রিপোর্ট সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, তাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বাংলাদেশ থেকে যেসব রোহিঙ্গা নিজ বাড়িঘরে ফিরে যেতে চান, তাদের ফেরত নেয়ার জন্য মায়ানমার সরকারের প্রতি সুপারিশ করা হয়। কিন্তু কফি আনান কমিশনের প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে মায়ানমারের নিরাপত্তাকর্মীদের ওপর ‘আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির’ এ আক্রমণ রিপোর্ট বাস্তবায়ন অনিশ্চিত করে তুলেছে। এ ব্যাপারে ‘দ্য আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির’ বক্তব্য হচ্ছে, ‘কফি আনান কমিশন ভালো কাজ করছে বুঝতে পেরে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার পরিকল্পনা নেয় সেনাবাহিনী। ... ২৫ তারিখ রাতে আমাদের এ হামলার দু’দিন আগেই সেনাবাহিনী এআরএসএর (স্যালভেশন আর্মির) ঘাঁটিগুলোয় আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। এজন্য আত্মরক্ষার্থে আগেই হামলা চালানো ছাড়া আমাদের আর কোন বিকল্প ছিল না।’ আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির ধারণার বশবর্তী হয়ে আগেভাগে আক্রমণ করার যথার্থতা প্রমাণের অবকাশ এখন আর নেই। এই আক্রমণ মায়ানমারের সৈন্যদের অত্যাচার করার সুযোগ এনে দিয়েছে। অন্যদিকে শরণার্থীদের ব্যবহার করে যারা চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা এবং মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত সেই চক্রটি আরাকানে শান্তি স্থাপনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কি না তাও বিচার্য।
এ স্যালভেশন আর্মির গঠন সৌদি আরবের পবিত্র ভূমিতে হয়েছে মর্মে পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সৌদি আরব অন্য মুসলমান দেশের বিরুদ্ধে যত সরব আরাকান রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে তত উচ্চকিত মনে হয় না। পত্রিকার রিপোর্ট মতে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসসহ সিরিয়া ও ইয়েমেনের বিদ্রোহী গ্রুপকে সৌদি সহায়তা ও অর্থায়নে আজারবাইজান থেকে অস্ত্র এনে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সৌদি আরব, কুয়েত প্রতিযোগিতা করে হাজার হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র কিনছে। ফ্রান্স থেকে চল্লিশ হাজার ডলারের সুগন্ধির একটি ছোট্ট শিশি কিনে এক সৌদি যুবরাজ ফ্রান্সে দর্শনীয় নায়কে পরিণত হয়েছিলেন। ফেসবুকে মাঝে মাঝে সৌদিদের ইফতারে উপকরণের ছবি দেখানো হয়; না দেখলে বোঝানো যাবে না এরা কীভাবে খাদ্যের অপচয় করে। এ অপচয়ের সামান্যতম অংশ রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জীবনধারণে সহায়ক হতে পারে।
আরাকানে রোহিঙ্গাদের বিপর্যয় শুধু মুসলমানের বিপর্যয় নয়, মানবতার বিপর্যয়। মুসলমান মুসলমান চিৎকারে মুসলিম দেশগুলোর কার্যকরী ভূমিকা আদায় করা যাচ্ছে না; সার্বিয়ায় মুসলিম নিধন থামাতে আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলো যে ভূমিকা নিয়েছিল অনুরূপ একটি কার্যকর ভূমিকা আরাকানে নেয়া যে হবে না তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি থেকে স্পষ্ট। তাই নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থানরত নিঃস্ব, নিরন্ন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ঝড়, বৃষ্টির খোলা আকাশে একমুঠো খাদ্য, এক প্রস্থ কাপড় দিয়ে কফি আনানের রিপোর্ট বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টদের শুভবুদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা জরুরি।